মুক্তিযুদ্ধকালীন চলচ্চিত্র ও নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি

অনিন্দ্য আরিফ ০৬:০০ , আগস্ট ০৮ , ২০১৯

একসময়ের বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী অনিন্দ্য আরিফের বর্তমান পেশা সাংবাদিতা। ছাত্রাবস্থা থেকে যুক্ত ছিলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে।  কাজ করেছেন কয়েকটি তথ্যচিত্রে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতা, লিটলম্যাগ এবং অনলাইন পোর্টালে চলচ্চিত্র বিষয়ক তার অনেকগুলো নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।  মহান চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব চার্লি চ্যাপলিনের জীবন ও সিনেমা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘চার্লি চ্যাপলিন’ নামে একটি গ্রন্থ।


পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের আর্বিভাবের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরানো। লুমিয়ের ব্রাদার্স যখন শিল্পকলার এই মাধ্যমটিকে বিশ্বের সামনে প্রথম উন্মোচন করলেন তার অল্প কিছু বছর পরেই এই মাধ্যমটি উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছিল। আর ঢাকায় প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় ১৮৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল।  প্রদর্শনীর দায়িত্বে ছিল বেডফোর্ড কোম্পানী। এরপরে ইতিহাসের পাতা উল্টালে এই অঞ্চলে বিশ্বমাপের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে হয়ত বা গুটিকয়েক, কিন্তু এখানকার মানুষ এই মাধ্যমে অনেক বুদ হয়ে থেকেছে। চলচ্চিত্র এখানে একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃত।

দেশের খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক প্রয়াত আলমগীর কবিরের ভাষায় : ‘দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলের চলচ্চিত্র প্রাথমিক যন্ত্রপাতি, নিম্নমানের ফিল্ম প্রডাকশন, প্রডাকশনে খুবই অল্প পুঁজির বিনিয়োগসহ নানা ধরনের অবহেলার শিকার হয়েছে।  কিন্তু কখনও যে জিনিসটার অভাব এখানে দেখা যায়নি—সেটা হলো ব্যাপক দর্শকের উপস্থিতি।’ (আলমগীর কবির, ‘বাংলাদেশ সিনেমা : এ্যা ক্রিটিক্যাল নোট’, ১৯৮৯ : ৪৭)

এই অঞ্চলের জনগণের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মাধ্যমটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পরিলক্ষিত হয় বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১ সালে এখানে যে ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো, বহুল সংখ্যক জনগণ শরণার্থী হয়ে পাশের দেশে অবস্থান করেছিলো এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিলো তখন এই মাধ্যমটিও সেইসব ইতিহাস ধারণ করেছিলো। সেলুলয়েডবন্দী হয়েছিল সেইসব লোমহর্ষক দৃশ্যাবলী। বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণের যন্ত্রণা, দুর্ভোগ, প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহ বিমূর্ত হয়েছিল স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকারদের বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রে।  এগুলো সবই নির্মিত হয়েছিল যুদ্ধের সময়। এনবিসি, এবিসি, সিবিসি, আইটিএন, বিবিসি এবং গ্রানাডা টেলিভিশন যুদ্ধের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর চিত্র ধারণ করেছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিয়ার লেভিন এবং ভারতের শবনম সুখদেব বাংলাদেশে এসে যুদ্ধের দৃশ্যাবলী সেলুলয়েডবন্দী করেছিলেন। ওই সময়ে বিশ্বে তখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন বাংলাদেশের স্বপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহানুভূতি প্রদর্শন করেছিল। পাঁচটি বিদেশি রাষ্ট্র স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিল। দেশগুলো হলো : যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান এবং ভারত। সাধারণত, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশকে গণহত্যার শিকার এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে নির্যাতকের ভূমিকায় দৃশ্যায়ন করেছিল।

পশ্চিমা গণমাধ্যম যেভাবে বাংলাদেশীদের যন্ত্রণা আর দুর্ভোগকে চিত্রায়িত করেছে, সে প্রবণতাকে মার্কিন লেখক এবং চলচ্চিত্রনির্মাতা সুসান সনটাগ পশ্চিমাদের ঔপনিবেশিক জনগণকে ‘অদ্ভুত’ হিসাবে প্রতিপন্ন করার ‘সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত প্রথা’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তিনি বর্ণনা করেছেন যে কিভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যম পূর্বের জনগণের ‘আঘাতগ্রস্ত দেহ’ এবং বিপর্যস্ত অবস্থার চিত্রায়ন করে ‘অন্য জনগণের’ ট্র্যাজেডিকে বিমূর্ত করতে চায়, যাদেরকে তারা বরাবরই ‘দরিদ্র’, ‘পশ্চাৎপদ’ এবং ‘তমসাকবলিত’ হিসাবে দেখে। ইলিয়েনর এম. হাইট এবং গ্রে ‍ডি স্যাম্পসনের মতে, ‘পশ্চিমা ভিস্যুয়ালাইজেশন’ সবসময়ই পূর্বের এবং পশ্চিম বাদে অন্য দেশগুলোর জনগণকে ‘আদিম’ এবং ‘অদ্ভুত’ হিসাবে দেখাতে চায়। আমরা তাই ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’এর পোস্টারে একটি দুর্ভিক্ষপীড়িত শিশুকেই দেখতে পাই। পশ্চিমা যেসব নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, তারা সবাই ওই ধরনের দৃশ্যায়নই করেছেন। 

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতারা যেসব প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন সেগুলোতে শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয়দের অবদানই ব্যক্ত হয়েছে। সুখদেব তার ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম’-এ ১৯৪৭ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠী কিভাবে বঞ্চণার শিকার হয়েছেন, তার দৃশ্যায়ন করলেও মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয়দের অবদানকে মহানভাবে তুলে ধরতে ভুলেননি। আলমগীর কবিরের মতে, ‘উন্নত যন্ত্রপাতি, ইস্টম্যান কালার স্টক এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন সত্ত্বেও ভারতের এই নন্দিত তথ্যচিত্র নির্মাতা কেবল একজন বহিরাগতের সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই এই সংগ্রামকে দেখাতে পেরেছিলেন।  স্পষ্ট কিছু কারণেই তিনি আসল বিষয়টি বাদ দিয়ে গেছেন : সেই চেতনা, যার বলে প্রায় নিরস্ত্র এক জনগোষ্ঠী এশিয়ার সবচেয়ে সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় কিংবা মৃত্যুর যুদ্ধে নেমেছিলো।’ (আলমগীর কবির, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, ২০১৯, ৬২)। ‘রিফিউজি ৭১’ এবং ‘লুট এ্যান্ড লাস্ট’ প্রামাণ্যচিত্র দুটিতেও একইভাবে ভারতকে উদ্ধারকর্তা এবং রক্ষাকারী হিসাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের সংখ্যা সম্ভবত ১২ থেকে ১৫ টি।  কিন্তু এইসব চলচ্চিত্রের অনেকগুলোই বাংলাদেশী দর্শকরা দেখতে পারেননি। বিশেষ করে বিদেশী চলচ্চিত্রকারদের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রগুলোই বাংলাদেশের মানুষের কাছে অপ্রদর্শিত থেকে গেছে। অনেকগুলোই এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন ১৯৯৫ সালে তারেক মাসুদ নির্মিত ‘মুক্তির গান’ যখন মুক্তি পেল, তখন অনেকেই জানতে পারলেন যে লিয়ার লেভিন নামে একজন মার্কিন নির্মাতা ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ওপর একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।

বাংলাদেশীরা যেমন তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রে স্বদেশীদের প্রতিরোধ, বিদ্রোহ এবং যন্ত্রণাকে চিত্রায়িত করেছেন তেমনি ওই সময়ে পাকিস্তানী একজন নির্মাতা এ জে কারদার ‘বিট্রায়াল’ তথ্যচিত্র নির্মাণ করে তার উল্টোটা তুলে ধরতে চেয়েছেন। পূর্বের বৈষম্যকে অস্বীকার করে পাকিস্তানী সেনা শাসকদের পক্ষালম্বন করে তিনি যে প্রোপাগান্ডার সিনেমা তৈরি করেছেন তাতে যুদ্ধের দায় বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতে, ‘অতীতের যেসব ইমেজ বর্তমানদ্বারা স্বীকৃত হয় না, তা অদৃশ্য চিত্রায়নে পরিণত হয়।’ তাই বাংলাদেশীদের কাছে যেহেতু এই তথ্যচিত্র সম্পূর্ণ তাদের বর্তমানের গোষ্ঠীস্বার্থের বিপরীত, তাই এটা অর্থহীন হয়ে গেছে।

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকারদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিলো বিরাট একটি চ্যালেঞ্জ। তাদেরকে প্রথমবারের মতো নন-ফিকশনাল চলচ্চিত্রে নিজস্ব ইতিহাসকে ফুঁটিয়ে তুলতে হয়েছিলো। একদিকে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ পাকিস্তান সেনাবাহিনী সংঘটিত করেছিলো এবং যে বর্বরোচিত গণহত্যা তারা চালিয়েছিলো, তার সার্থক দৃশ্যায়নের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানান দেওয়ার জরুরৎ ছিলো। আবার অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এবং একশনের চিত্রায়নের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক চেতনা জাগ্রত এবং একটি বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করার দায় তাদের ওপর বর্তে ছিলো। সেক্ষেত্রে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘এ্যা স্টেট ইজ বর্ন’, আলমগীর কবিরের ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ এবং বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি ঐতিহাসিক দলিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের প্রামান্য সাক্ষ্য।  ডেভিড উইলিয়ামস সিনেমাকে বলেছেন—‘অতীত-প্রগতিশীল ক্রিয়ার কাল’। এর অর্থ হলো ধুসর হয়ে যাওয়া অতীতকে বর্তমানে নিয়ে আসার ক্ষমতা সিনেমার রয়েছে।  ঠিক সেই অর্থে শব্দ সংযোজন এবং ইমেজ দ্বারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রামাণ্যচিত্র অতীতের ভাষ্য বর্তমানেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। এগুলো দশকের পর দশক বাংলাদেশের জনগণকে চেতনা যোগাবে এবং জাতীয় সংহতি তৈরি করবে।

‘স্টপ জেনোসাইড’ ছিলো জহির রায়হান পরিচালিত তথ্যচিত্র। এই চলচ্চিত্রটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে গণহত্যার বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী নারী-পুরুষরা একটি উন্নত জীবনের আশায় যে অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ (চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা : আলমগীর কবির) বাংলাদেশি গেরিলাদের নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ-প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়েছিলো। ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’ (চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : জহির রায়হান) বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শ ও কাঠামো তুলে ধরেছিলো। ‘ইনোসেন্ট মিলিওয়নস’ (চিত্রনাট্য : জহির রায়হান ও পরিচালনা : বাবুল চৌধুরী) ছিলো বাঙালি শিশুদের দুর্দশার বয়ান।

তবে এইসব তথ্যচিত্রে নারীরা উপস্থাপিত হয়েছে প্রথাগত চিন্তার প্রতিফলন হিসাবে।  তাদেরকে দেখানো হয়েছে নির্যাতনের শিকার হিসাবে। কিন্তু যে অল্প সংখ্যক নারী অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন, তারা এই তথ্যচিত্রগুলোতে অনুপস্থিত।  নারীদেরকে দেখানো হয়েছে যন্ত্রণাগ্রস্ত মাতা হিসাবে যারা জীবন রক্ষার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ স্থান খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যুদ্ধের ফলে ভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন।  তারপরেও এই তথ্যচিত্রগুলো নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অমূল্য দলিল ও সাক্ষ্য হিসাবে জনগণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর ব্যুহের ভেতরে থাকা কিছু মানুষ স্বাধীন হতে যাওয়া দেশের চলচ্চিত্রশিল্পে বৈপ্লবীক ধারার পরিবর্তন আনার ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। এই তথ্যচিত্রগুলো তারাই নির্মাণ করেছিলেন। তাই শৈল্পিক বা ব্যবহারিক দিক থেকে আসন্ন নতুন যুগের কথা মাথায় রেখে জহির রায়হানের নেতৃত্বে একদল চলচ্চিত্র-নির্মাতা চলচ্চিত্রশিল্পের পূর্ণ জাতীয়করণের একটি পরিকল্পনা করেছিলেন।  কিন্তু জহির রায়হানের রহস্যজনক অন্তর্ধান এবং কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাদের এই পরিকল্পনা কাগজে কলমেই থেকে যায়। তাই, যে তথ্যচিত্রগুলো বাংলাদেশের নতুন সিনেমার ইঙ্গিত দিয়েছিলো, তা বাস্তবায়িত না হয়ে দেশের সিনেমাজগত দুর্গতির দুর্বিপাকে নিমজ্জিত হয়।

//জেডএস//

x