অন্ধ চীনা সিপাহীদের কথা || টাইকো হিরাবায়সি

অনুবাদ: মঈনুস সুলতান ০০:০৪ , আগস্ট ৩০ , ২০১৯

টাইকো হিরাবয়সি ১৯০৫ সালের ৩ অক্টোবর জাপানের এক ক্ষয়িষ্ণু কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। উনিশ বছর বয়সে এই তরুণী লেখক সমাজতান্ত্রিক ধারার সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়ে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে যোগ দেন। তার রচিত একটি গল্প পুরস্কার পেলে তিনি ‘সর্বহারাদের লেখক’ হিসাবে সামাজিক স্বীকৃতি পান। ১৯৭২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু পর্যন্ত লেখক বহুবার তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য কারাবরণ করেন; এবং এক পর্যায়ে কারাগারেই যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন। ‘অন্ধ চীনা সিপাহীদের কথা’ শীর্ষক গল্পটি ১৯৪৬ সালে ‘সিকাই বুনকা’ বা ‘বিশ্ব সংস্কৃতি’ নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো।

১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ। গুমা জেলার পরিষ্কার আকাশে উত্তরীয় হাওয়ায় উড়ে আসে একটি এরোপ্লেন। কাকতালীয়ভাবে ঐ দিনে বিরাট রকমের বিমান হামলা হয়ে যায়। আমি—বুদ্ধিজীবি থেকে রূপান্তরিত হওয়া এক কৃষক, এদিনে নাসিকি থেকে সড়ক ধরে তুষারে আচ্ছাদিত আকাগি পর্বতের কাছাকাছি চলে আসি। তারপর কাকিকামবারা থেকে আশিনো রেলপথের ট্রেইন ধরে কাইরু পর্যন্ত এসে, রয়োজ রেললাইনে ট্র্যান্সফার হয়ে তাকাসাকিতে নামি। আমাকে আজ আবার সিংগে রেললাইন ধরে উয়েনের দিকে যেতে হবে।

বেলা যদিও অপরাহ্ন, চারটা তিরিশের কাছাকাছি, তবু কলকারখানাময় এ শহরের ধূলি ধূসরিত ছাদগুলোর ওপরে আকাশ এখনো আলোয় উজ্জ্বল। কিন্তু এখানে সেখানে চিরসবুজ গাছপালার পত্রালির ফাঁকে শূন্যসমূহ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। প্ল্যাটফর্মের ওয়েটিং রুমটি অন্ধকারই, তবে বিস্তর লোকজনে ঠাসা। এদের কেউ কেউ শাকসবজিতে পরিপূর্ণ বৃহৎ সব বাঁশের ঝুড়ি বাঁকে বা কাঁধে ঝুলিয়ে কিংবা মেঝেতে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। এসব কিছু থেকে সমস্ত আবহে প্রতিধ্বনিত হয় এক ধরণের কোলাহল ও চঞ্চলতা।
আমি দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটির দিকে এক নজর তাকিয়ে ওয়েটিং রুম ছেড়ে যাওয়ার উদ্যোগ নি। ঠিক সে সময় উর্দিপরা পুলিশের একটি ছোট্ট দল স্টেশনের ওভারব্রীজ পার হয়ে প্ল্যাটফর্মে নামে। এদের মধ্যে আছেন পুলিশের চিফ ও ডেপুটি, দু’জনেই হাতে সাদা দস্তানা ও মাথায় লোহার হেলমেট পরে আছেন। ডেপুটি পুলিশ অফিসার স্টেশন মাস্টারের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটেন। পুলিশ চিফ তাদের সহসা থামিয়ে দিয়ে বোধকরি বিষয়টি নিজ হাতে তুলে নেন। স্টেশন মাস্টার দ্রুত টিকিটঘরে ফিরে গিয়ে একখণ্ড সাদা চক হাতে ফিরে আসেন। এসেই তিনি মানুষজনকে ঠেলে সরিয়ে চক দিয়ে প্ল্যাটফর্মে সাদা দাগ কাটতে শুরু করেন।

আমি প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির সামনে এক পা বাঁকিয়ে দাঁড়াই। দিন কয়েক আগে ভিড়ে ঠাসা রয়োজ রেলপথে চলাচলের সময় কেউ একজন পেরেকের একটি বস্তা ফেলে দিলে আমার পা আহত হয়েছিলো। স্টেশন মাস্টার আমার কাছে এসে আমাকে জোরে ঠেলে ধাক্কিয়ে, চক দিয়ে সাদা দাগটিকে আরো বিস্তৃত করেন। ঐ সময়ে রেলপথে যা নিত্যদিনের ঘটনা অর্থাৎ ট্রেইনটি আসতে বিস্তর বিলম্ব হয়। যাত্রীরা স্টেশন মাস্টারের উদ্ধত আচরণে মোটামুটি অভ্যস্থ বলে কোনরূপ প্রতিবাদ ছাড়াই সরে দাঁড়িয়ে কী ঘটছে কৌতূহল নিয়ে তা দেখে।

কিছুক্ষণের মধ্যে অপরিচ্ছন্ন, বরফে ছাদ ছাওয়া একটি ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসে। আমি কিছু লক্ষ্য করার আগেই পুলিশের দলটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়। আমি যে বগিতে ওঠার কথা ভাবছি, তারা তার দু’টি দরোজার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। ঠিক এখানেই প্ল্যাটফর্মে চক দিয়ে সাদা দাগ কাটা হয়েছে।

বগিটি মনে হলো মোটামুটি খালিই, কিন্তু আমি তাতে ওঠার চেষ্টা করতেই পুলিশ রূঢ়ভাবে আমাকে থামিয়ে দেয়। তখন সহসা আমি দেখতে পাই—কামরাটির মাঝামাঝি সুদর্শন তরুণ একজন উচ্চপদস্থ অফিসার তার ডেপুটিকে সাথে নিয়ে বসে আছেন। আমি তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নাসিকার দিকে তাকিয়ে ততক্ষণাৎ তাকে রাজকুমার তাকামাতসু বলে চিনতে পারি।

কুমার তাকামাতসুকে আমি চর্মচক্ষে দেখবো, তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। এতদিন যাকে কল্পলোকের চরিত্র হিসাবে ভাবতাম, তাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে আমার মনে এক ধরনের তীব্র আবেগজনিত আলোড়নের সৃষ্টি হয়। আমি সুদর্শন কুমারের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করি। ভাবি, চিৎকার করে উঠে সবাইকে বলবো, ‘দ্যাখো হে, রাজকুমার সত্যি সত্যিই এখানে এসেছেন।’ কিন্তু আমি কিংবা অন্য যাত্রীদের এখন আবেগ প্রকাশের সময় নয়। আমরা যদি ভীড়ে ঠাসা কোন না কোন বগিতে জান বাজী রেখে উঠতে না পারি, তাহলে আমাদের পরবর্তী ট্রেনের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, তা কেউ বলতে পারবে না।

আমি ততক্ষণাৎ ট্রেনের মাঝামাঝি একটি বগির দিকে দৌড়াই। কিন্তু সহসা জলজ্যান্ত রাজকুমারকে চাক্ষুষ করার উত্তেজনা আমার গতিকে শ্লথ করে দেয়। আমি ট্রেনে পড়িমরি করে ওঠার জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সারির শেষে দাঁড়িয়ে ভাবি, এ কামরায় কি আজ কোনমতে উঠতে পারবো?

অবশেষে এক পর্যায়ে কোনক্রমে কামরাটির কাছে চলে আসি। বগিটি মারাত্মক রকমের অপরিচ্ছন্ন। জানালার কাচ ভাঙা, দরজায় কাচের বদলে একটি তক্তা পেরেক দিয়ে আটকানো। এক বৃদ্ধা যাত্রী তার মালামালের গাট্টির উপর ঠায় বসে আছেন। তার পাশে ক্রন্দনরত একটি শিশু। এদিকে-ওদিকে অগোছালোভাবে ছড়ানো ফুরোসিকি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা একটি দেরাজ ও বাঁধন খুলে যাওয়া কয়েকটি ঝাড়ু। এসব বিভ্রান্তির মাঝে আমার চোখে কেবলই ভাসে, একটু আগে এক পলকের জন্য দেখা নীলাভ কুশন দিয়ে সাজানো রাজকুমারের কামরাটি। একজন পুলিশ অফিসার এসে চিৎকার করে সবাইকে আরো সরে জায়গা করে দিতে নির্দেশ দেন। কেউ তার কথা না শুনে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

অবশেষে আমি এখানে ওঠার আশা ছেড়ে দিয়ে সর্বশেষ বগিটির দিকে দৌড়াই। কামরাটিতে কোন যাত্রী দাঁড়িয়ে নেই। একজন সৈনিক, সম্ভবত নিচু র‍্যাংকের কোন অফিসার হবেন; কামরা থেকে নীরবে বেরিয়ে আসা সাদা পোষাকের সৈন্যদের মাথা গুনছেন। সৈন্যদের শরীর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাদের সকলের কাঁধে আড়াআড়ি করে রাখা কম্বল। ভালো করে তাকিয়ে আমি তাদের গায়ে ময়লার পুরু স্তর দেখতে পাই। আমি বগিটির দরোজার দিকে তাকিয়ে সৈন্যদের এরকম বেহাল অবস্থা কেন, তা ভাবি! একটু ভালো করে নজর করতেই তীব্র ভয় ও বিভ্রান্তিতে আমার পা দু’টি কাঁপতে শুরু করে।

আমি পরিষ্কার দেখতে পাই, এই সৈনিকদের সকলেই অন্ধ! তারা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে অন্য সৈনিকদের পেছন দিক স্পর্শ করে কায়-ক্লেশে হাঁটছে। তাদের সকলকে প্রচণ্ড রকমের ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে দেখায়। অনেক দিন ধরে না ছাঁটার কারণে তাদের চুল দীর্ঘ হয়েছে। তাদের মির-মির করা চক্ষুকোটর থেকে ক্রমশ অশ্রু ঝরছে। বলা মুশকিল—এ সিপাহীদের বয়স ঠিক কত? আমি আন্দাজ করি, পয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝামাঝি। আরেকটু সাবধানে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারি—প্রতি পাঁচজন অন্ধ সেনার পেছনে একজন করে স্বাভাবিক দৃষ্টিওয়ালা সিপাহী। ছড়ি হাতে স্বাভাবিক সিপাহীটির পরনে প্রথাগত জাপানি সৈনিকদের থেকে কিছুটা ভিন্ন রঙের ইউনিফর্ম। তারা যেভাবে অন্ধ সিপাহীদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এতে মনে হয়—তারা এদের থেকে উঁচু র‍্যাঙ্কের।

একজন সৈনিক, ‘কোয়াই কোয়াইডে, কোয়াই কোয়াইডে’, বা ‘জলদি হাঁটো, জলদি হাঁটো’, রব তুলে সামনের অন্ধ সিপাহীকে ছড়ি দিয়ে খোঁচা দেয়। সহসা আমি বুঝতে পারি, এই অন্ধ সিপাহীদের দলটি জাতীয়তায় চৈনিক। এখন আর বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না, তাদের কেন এত অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর ও আজব দেখাচ্ছে।

ট্রেন থেকে নেমে অন্ধ চীনা সিপাহীরা সকলে প্ল্যাটফর্মে দলবেঁধে জমায়েত হয়। তাদের সংখ্যা পাঁচ শতের কাছাকাছি। আমি যেন নিজের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, তাই আবার গভীর মনঃসংযোগ করে সাবধানে তাকাই। সিপাহীগুলো তাদের ক্ষত-বিক্ষত চোখ আধবোজা করে রেখেছে, বোধ করি আলোর তীব্রতা সইতে না পেরে। প্রতিটি দৃষ্টিহীন চক্ষুকোটর থেকে ক্রমশ গড়িয়ে নামছে অশ্রুজলের ধারা। এদের প্রত্যেকেই যে সম্পূর্ণরূপে অন্ধ, এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ থাকে না। তলোয়ার ঝোলানো একজন উচ্চপদস্থ জাপানি অফিসার অন্ধ সিপাহীদের জমায়েতের কাছাকাছি হঠাৎ করে চলে আসলে, গুটি কয়েক দৃষ্টিওলা ব্যবস্থাপক গোছের সেনা তাকে স্যালুট দেয়। তিনি জানতে চান, ‘অন্যদের আসার কী হলো?’ ‘তারা পরের ট্রেনে আসছে স্যার’, বলে অন্ধ সিপাহীদের মাথা গুনতি থামিয়ে জবাব দেয় নিচু র‍্যাঙ্কের এক জাপানি অফিসার।

এসব ধুন্দুমারের মাঝে বিভ্রান্ত এক যাত্রী অন্ধ চীনা সিপাহীদের দিকে তাকিয়ে, ‘এ দুনিয়াতে কী হতে চললো?’ বলে আক্ষেপ করে। একজন মধ্যবয়সী মহিলা-যাত্রী চোখে রুমাল দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। এ বিষয়টা যাত্রী সকলের কাছে পরিষ্কার হয় যে, জাপানি কমান্ডার ও অন্যান্য অফিসাররা চীনা অন্ধ সিপাহীদের সাধারণ যাত্রীদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে চান। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতো বৃহৎ ও গতি এতো শ্লথ যে, এদের লুকিয়ে রাখার কোন উপায়ই থাকে না। তাদের চারপাশে কৌতূহলী যাত্রীদের ভীড় কেবলই বাড়তে থাকে।

অবশেষে ট্রেন ছেড়ে দিলে আমরা সাধারন যাত্রীরা পড়িমড়ি করে বগির দিকে দৌড়াই। আমি চলমান কামরার পাদানীতে দাঁড়িয়ে ভেতরের দিকে তাকাই। পুলিশ দলটির যারা প্ল্যাটফর্মে অন্ধ চীনা সিপাহীদের পাহারা দিচ্ছিলো, তারাও লাফিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা পরস্পরের সাথে কানাকানি করে। তাদের একজন বলে, ‘আমার মনে হয় এদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে কোনো পরীক্ষা নিরিক্ষা চালানো হয়েছে’। ‘এরা হয়তো কোন রকমের বিস্ফোরণের শিকার’ মন্তব্য করে হেলমেট পরা এক পুলিশ। ‘কিন্তু বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে সত্যিই পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার কোন কী প্রয়োজন ছিল?’ পাল্টা মন্তব্য ছুড়ে দেয় তার সঙ্গীটি। আমি তাদের আলাপচারিতার রেশ ধরে কাছে দাঁড়ানো মাঝবয়সী এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করি, ‘অন্ধ সিপাহীরা কোথা থেকে ট্রেনে চেপেছে?’ মহিলা একটু ভেবে নিরাসক্ত গলায় জবাব দেন, ‘মনে হয় সিনোনই এলাকা থেকে’। ‘তাহলে এরা নিশ্চয়ই নগোয়া অঞ্চল থেকে আসছে’। আমি স্বগোক্তি করি। কামরার যাত্রীরা দ্রুত বিষয়টি ভুলে গিয়ে গালগল্পে মেতে ওঠে। মাঝবয়সী মহিলা, যার সাথে আমার একটু আগে কথা হয়েছে, আলগোছে জানায়, ‘আমি ইচিগো থেকে আসছি, আমার মেয়েকে নিয়ে চিবাতে যেতে হচ্ছে’। মহিলাটি আরো বলেন যে, তার মেয়ে স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক, গলায় বিচ্ছিরি রকমের ফোঁড়া হওয়ার কারণে সে ডিউটিতে সময়মতো যোগ দিতে পারেনি। প্রায় সপ্তাহখানেক দেরিতে কাজে যোগ দিতে যাচ্ছে। কিন্তু চিবাতে যাওয়ার সরাসরি ট্রেন পায়নি, তাই এ ট্রেনে করে যতদূর যাওয়া যায়, তারপর কোন স্টেশনে নেমে অপেক্ষা করবে, যদি সরাসরি যাওয়ার কোন ব্যবস্থা করা যায়। মহিলাটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বারবার এই ট্রেন যাত্রার ক্লান্তি ও ক্লেশের কথা বলে। একটু আগে মহিলাটি যে রকম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চীনা সিপাহীদের বিষয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন, তাতে আমি মনে মনে আহত হয়েছিলাম। এখন আমি তার নিস্পৃহতার কারণ বুঝতে পারি। জাপানিরা তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে এমনই মেতে আছে যে, তাদের অন্য বিষয়ে ভাবার কোন অবকাশই নেই।

ট্রেনটি একটি স্টেশনে এসে থামে। আমি বসার জায়গা খুঁজে পাওয়ার জন্য যে কামরাটিতে অন্ধ চীনা সিপাহীরা বসে ছিল তাতে এসে উঠি। কামরাটি খালি, কিন্তু দুর্গন্ধের জন্য বেশীক্ষণ টেকা যায় না। আমি আবার আগের কামরায় ফিরে আসি। ট্রেনের কন্ডাকটার,‘পরবর্তী স্টেশন জিম্বেবারা’, হাঁকতে হাঁকতে যাত্রীদের মধ্য দিয়ে চলে যায়। এতক্ষণে কামরার পশ্চিমদিকে জানালাগুলো অস্তগামী সূর্যরশ্মির প্রতিসরণে জ্বলে যাচ্ছে। প্রকাণ্ড রক্তিম সূর্য যেন ধীরগামী ট্রেনের সাথে তাল মিলিয়ে দিগন্ত জুড়ে আস্তে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে।

ট্রেনের সিজিলে কিঞ্চিত পরিবর্তন হয়, আমি বুঝতে পারি যে, অন্ধ চীনা সিপাহীদের বয়ে আনা বগিগুলো কেটে রাখা হয়েছে, তাতে আমার কামরাটি হয়ে পড়েছে ট্রেনের সর্বশেষ বগি। আর হ্যাঁ, আমার মনে পড়ে, রাজকুমার এখনো বসে আছেন আমার কামরাটির খানিক আগের একটি কম্পার্টমেন্টে। এতবড় ঘটনাটি সহযাত্রী কাউকে বলতে আমার ইচ্ছা হয় না, ভীষণ ক্লান্ত লাগে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে পর আমি তাকাসাকি স্টেশনের সামনের দোকানদারদের জিজ্ঞেস করি যে, তারা অন্ধ চীনা সিপাহীদের আর কখনো ট্রেনে উঠতে দেখেছে কি? দোকানীরা সকলে আমাকে জানায়, এরকম কোন ঘটনা কখনো তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আমি ভাবি, মনে হয়, তারা এখান থেকে কখনো ফিরে যায়নি।

//জেডএস//

x