ইতিহাস ও পুরাণ প্রসঙ্গে রমিলা থাপার

অনুবাদ : অজিত দাশ ০৮:০০ , সেপ্টেম্বর ০১ , ২০১৯

রমিলা থাপার বিশিষ্ট ভারতীয় ইতিহাসবেত্তা এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় এমিরিটাস অধ্যাপকতার প্রধান চর্চার বিষয় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস—প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে ‘এ হিস্টোরি অফ ইন্ডিয়া’ বহুল আলোচিত—দু’বার ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণে ভূষিত হয়েছেন, কিন্তু দু’বারই অস্বীকার করেছেন। সম্প্রতি ইতিহাস ও পুরাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা তার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সাক্ষাৎকারটি বাংলা অনুবাদে প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন : প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস এবং মহাকাব্যগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে বের করতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টিকে আপনার কাছে প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, নাকি তাতে আরো ঝামেলা তৈরি হতে পারে?

উত্তর : ইতিহাস মূলত কোনো কমিটি গঠনের মাধ্যমে রচিত হয় না। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ নিজেই তা রচনা করেন। কমিটি বরং একজন ইতিহাসবিসের রচিত ইতিহাসকে মূল্যায়ন করে দেখে। মহাভারত এবং রামায়ণের মতো গ্রন্থগুলোকে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অন্তর্ভুক্তকরণ সবসময়ই জটিল। এতে করে নানা বিতর্ক তৈরি  হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত এগুলোকে সাধারণত মহাকাব্য হিসেবে ধরা হয়, কেননা তা ইতিহাসের নির্দিষ্ট দিন-তারিখের হিসেবে রচিত হয়নি—ইতিহাসের ক্রম পরিবর্তনে নানা সময়ে এর মধ্যে যোজন বিয়োজন ঘটেছে। আর এ কারণেই ভানদরকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এর সংস্কৃত পণ্ডিত ভিএস সুখথংকর মহাভারত রচনার সময়টি সম্পাদনা করেছেন। তিনি সেটার রচনাকাল হিসেবে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৪০০ পর্যন্ত সময়কাল উল্লেখ করেছেন।

 

প্রশ্ন : ভারতের জনবুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে এক প্রবন্ধে আপনি উল্লেখ করেছেন—আমরা যেরকম সমাজে বাস করি সেখানকার জনসাধারণের জন্য বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন। তার মানে এমন, কিছু লোক যারা সঠিক সময় সঠিক প্রশ্নটি হাজির করতে পারবেন। ‘আমরা যেরকম সমাজে বাস করি’ এটা দ্বারা আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?  

উত্তর : যদি নির্ধারণ করে বলতে হয়, তাহলে বলবো শেষ চারটি বছর আমরা যেমন সমাজ ব্যবস্থায় আছি তা উল্লেখ করতে চেয়েছি। কেননা এই চার বছর কোনরকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাটাকেই নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যারা কিনা আমাদের মর্যাদা এবং কর্তৃত্ব দাবি করে, তাদের মাধ্যমে বলা হয়েছে কী ভালো আর কী মন্দ। যখনি প্রশ্ন করা হয়েছে তার উত্তর এসেছে সহিংসভাবে। এমনকিছু গণ্যমান্য লোকদের হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের বিরোধী লোকদের গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার নজিরও রয়েছে, যা তাদের মতাদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।       

 

প্রশ্ন : সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী অনেকেই ভারতীয় সংবিধানের ভূমিকায় উল্লেখিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বাদানুবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। আপনার কি মনে হয়, এর কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে? 

উত্তর : এটা বড় প্রশ্ন। ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো পোশাকি বিষয় নয় যে, চাইলে পরিধান করে ফেলা যায়। এটা অন্যের প্রতি কেমন দৃষ্টিভঙ্গি হবে সেটি নির্ধারণ করে। যদিও এটি একটি উদার দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেই বিবেচিত। ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টি যদি লোকজনের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহলে অন্যের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কী ভুল রয়েছে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার মাধ্যমে একটি প্রয়োজনীয় বিষয় প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি ইতিবাচক পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া তৈরি হবে। একদিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য রাষ্ট্রে বিদ্যমান ধর্মগুলোর সহাবস্থান বোঝালেও পাশাপাশি সেই ধর্মগুলোর সমমর্যাদাও প্রয়োজন।

আর সমমর্যাদার প্রশ্নেই তাদের মন খারাপ হয়ে যায়, যারা রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিসেবে সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। তবে রাষ্ট্রে বিদ্যমান ধর্মগুলোর সমমর্যাদার পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতা নাগরিকদের ধর্মপরিচয়ের উর্ধ্বে এমন একটি নাগরিক সমাজের বিবেচনা করে যেখানে সকল নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। ফলে রাষ্ট্র তখন একচেটিয়াভাবে হিন্দু রাষ্ট্রকে সমর্থন করতে পারে না। এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে সুযোগ সুবিধাও দিতে পারে না। নাগরিকত্ব হবে সমানাধিকারের উপর ভিত্তি করে।       

ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নাগরিকদের যে পূর্বপরিচয়, তার পরিবর্তন করতে হবে। এই বিপুল পরিবর্তনের কথা কোথাও বিশদভাবে আলোচিত হয় না। এটি প্রায়ই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একত্রিত হলেও কেবলমাত্র স্লোগাননির্ভর হবে না বরং নূন্যতম মানবাধিকার নিয়ে হলেও একটি নতুন সমাজ গঠন করবে।   

 

প্রশ্ন : আপনার বইগুলোতে ইতিহাস কীভাবে রচিত হয়, এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সমকালীন অনেক আন্দোলন (সেটা হিন্দুত্ববাদী হোক অথবা দলিত আন্দোলন) নিয়ে বেশ কিছু জনশ্রুতি তৈরি হয়েছে যা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোকে অনুপ্রাণিত এবং উদ্ভাবিত করেছে। এরকম জনশ্রুতি নিয়ে ইতিহাসবিদ হিসেবে আপনার মতামত কী?   

উত্তর : জনশ্রুতি বা পৌরাণিক কাহিনীগুলো হলো এমন কিছু যাতে আমরা বিশ্বাস করি। জ্ঞানের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, যত বেশি বেশি জ্ঞানার্জন করা যায় ততই ইতিহাসের সঙ্গে এর পার্থক্য নির্ণয় করা সহজ হয়ে পড়ে। জনশ্রুতিগুলো হলো জ্ঞানের একটি ধারা। জনশ্রুতি বা পৌরাণিক কাহিনীগুলোর সঙ্গে ইতিহাসের সম্পর্ক হলো ইতিহাস থেকে কিছু মন্তব্য নিয়েই এগুলো তৈরি হয়। ঐতিহাসিকদের পৌরাণিক কাহিনী এবং ঐতিহাসিক কাহিনীগুলোকে আলাদা করতে হয়। আমি উনবিংশ শতাব্দীতে ফিরে যাব না এবং এটাও বলবো না, ইতিহাস হলো সত্যের পুনঃনির্মাণ, কেননা আমরা সত্য ঘটনা সম্পর্কে অবগত নই। অতীতে যে বাস্তবতা বিদ্যমান ছিলো সেটা বিজ্ঞানের মতো নয়। আমরা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটা প্রমাণ করতে পারবো না যে, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো আদৌ ঠিক তেমন ঘটেছে কি না, যেমনটা অনুমান করা হয়ে থাকে। পৌরাণিক ঘটনাগুলো অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরণ বটে কিন্তু ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি সেটা থেকে ভিন্ন হয়, কেন না তা কল্পনানির্ভর নয়। ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন তথ্যসূত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা উন্মোচন করার চেষ্টাই করেন। তবে পৌরাণিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো এই যে, এগুলো সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা, মানুষজনের ধারনা, অনুভূতি ও তাদের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ধারনা পেতে সহযোগিতা করে। আমরা এই পৌরাণিক ঘটনাগুলো গুরুত্বসহকারে যাচাই করি এবং সেগুলোর মধ্যে কী রয়েছে তা খুঁটিয়ে বের করার চেষ্টা করি।

 

প্রশ্ন : ইতিহাসবিদ হিসেবে পদ্মাবতী রূপকথা বিষয়ে আপনার মতামত কী?

উত্তর : এই রূপকথাটির একজন পৌরাণিক পূর্বপুরুষ রয়েছেন। পদ্মাবতীর এই পুরো ঘটনাটি ছিল এক ধর্মান্ধ আভিজাত কবি দ্বারা রচিত একটি কাল্পনিক কবিতা যিনি এই কবিতা রচনার মাধ্যমে তার শৈল্পিক অনুভূতি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কবিতাটি তৎকালীন সময়ে একটি চমৎকার কবিতা হিসেবে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। যদিও এই রূপকথাটি আমাকে তেমন বিস্মিত করেনি, কারণ প্রাচীন ভারতীয় বংশপরম্পরায় পারিবারিক ক্ষমতায়ন নিয়ে আমি দীর্ঘ কাজ করেছি। তৎকালীন সমাজে খুব অল্পই উচ্চবংশীয় পরিবাররা ক্ষমতায় এসেছিল। মূলত এই পরিবারগুলো দুঃসাহসী এবং ক্ষমতার জন্য বাজি ধরতেও প্রস্তুত ছিল। পারিবারিক ক্ষমতায়নের পর থেকে তাদের কুলজী রক্ষা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে। ফলে তারা সেই সকল লোকদের আমন্ত্রণ জানায় যারা তাদের কুলজী রক্ষা করতে সক্ষম হবে। শুরুতে চারণ কবিরা আমন্ত্রণ পেলেও পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণরা সেই জায়গা দখল করে। এই ব্রাহ্মণরাই পরবর্তীকালে একটি বংশপরম্পরা তৈরি করে। আর ধীরে ধীরে সেটি আমাদের কাছে অনেক অনেক বেশী ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে। আর এই সময়ে এসে কেনো একটি নির্দিষ্ট বংশপরম্পরা বা কুলজী খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বর্তমান সমাজব্যবস্থা এবং রাজনীতিতে এর ভূমিকা রয়েছে।

সামাজিক পরিবর্তনের ক্রমবিবর্তনে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতা দখলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীরই একটি ভূমিকা রয়েছে। আজ হয়তো যারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, পূর্বে হয়তো তাদের তেমন ক্ষমতাই ছিলো না। তাই একটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক অনিরাপত্তা তৈরি হয়। ফলে কেউ কেউ প্রচুর লোক নিয়ে সমাবেশ করার মধ্য দিয়ে তাদের সামনে একটি নির্দিষ্ট প্রতিমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করে। অবশ্য এমন সমাবেশের মাধ্যমেই তা প্রতিষ্ঠা পায়।   

 

প্রশ্ন : হিন্দুত্বকে ঐতিহ্যগতভাবে ব্রাহ্মণ্য মতাদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদী এবং শিবাজি চৌহানের মতো পশ্চাদপদ শ্রেণির নেতাদের উত্থানে আপনার কি মনে হয়, হিন্দুত্বের সামাজিক ভিত্তি অন্যান্য অনেক বিবেচনায় গভীর হয়েছে? 

উত্তর : শুরুর দিকে আদি হিন্দুত্বের একটি প্রভাব ছিলো যাতে অনেক বেশী ব্রাহ্মণ্য মতাদর্শ ছিলো। এখনতো তারা রাজনৈতিক দল হয়েছে এবং একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অন্যের কাছে পৌঁছাতে হবে। আর সেটার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে একটি উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের দলে যোগদানের উৎসাহ দেওয়া। আর তাইই হচ্ছে—গুজরাটে নির্বিচারে তফশিলি জাতিগোষ্ঠীদের হিন্দুতে রূপান্তর করা হচ্ছে। এটা অনেকটা এরকম যে, তফশিলি জাতিভুক্ত হলেও তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠও হয় তাহলেও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বা ধর্মাচার পালনে তাদেরকে ছাড় দিতে হবে। অন্যান্য পশ্চাদপদ জাতিগোষ্ঠীদের কাছে হিন্দুত্ব প্রচারের একটি সহজ উপায় হলো তাদেরকে গিয়ে বলা—হিন্দু হলে কেবলমাত্র ধর্মীয় আচার-আচরণ বা গোড়া হিন্দু ধর্মের অনুসরণ করতে হয় না। অন্যান্য অনেক জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ই গোড়া হিন্দু রীতিনীতি অনুসরণ না করেই হিন্দু হতে পারে বা হিন্দুত্ব ধারণ করতে পারে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করার মধ্য দিয়েই হিন্দুত্ববাদীরা স্পষ্টতই তফশিলিদের কাছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ধর্মাচার পালন না করার ছাড়টুকুই প্রত্যাশা করেন।        

 

প্রশ্ন : দিল্লিতে বসবাসরত অভিজাত লুটিয়েন ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের কথিত প্রস্তাবনা ঘিরে একরকম নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তাদের কাছে ব্যক্তির যোগ্যতার থেকে আভিজাত্যের মূল্য বেশি। একজন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে নতুন এই প্রবণতাগুলোকে কীভাবে দেখছেন, যেখানে আভিজাত্যের চেয়ে ব্যক্তির যোগ্যতাকে খাটো করে দেখা হচ্ছে? 

উত্তর : আমি নিজেও এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি। আম্বেদকার বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আমাকে একটি বক্তৃতার জন্য ডাকা হয়েছিলো তখন সেখানে অনেক গ্রুপ বিরোধিতা করেছিলো। তাদের দাবি, আম্বেদকারের বক্তৃতাটি তাদের ওই গ্রুপেরই একজনকে দেওয়া উচিৎ। ঠিক তেমনভাবে বর্তমানেও একদল রয়েছেন, যারা মনে করেন সমাজের উচ্চাসন বা নির্দিষ্ট কোনো জায়গা কেবলমাত্র ব্রাহ্মণদের (সমাজের উঁচু শ্রেণির) জন্যই বরাদ্দ থাকবে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই প্রতিফলন সমাজের বিভিন্ন অংশে দেখা যাচ্ছে এবং তুমি জোর গলায় বলতেও পারছ, ‘না আর যাহোক, যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার নিরিখেই ব্যক্তিকে বিবেচনা এবং সম্মান দিতে হবে’। তোমাকে বরং তার সামাজিক অবস্থান, বর্ণ, ধর্ম এবং অর্থের নিরিখেই সম্মান দিতে হচ্ছে।

তবে এই প্রবণতাগুলো যেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে না কেনো, হোক সেটা উচ্চবর্গ বা নিম্নবর্গ, এটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সমাজের মূল ভিত্তিকাঠামোটি তৈরি হয় শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। যেখানে অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তির মূল্যবোধ তৈরি হয়। অতএব আমাদের সামাজিকীকরণ এবং দক্ষতা দুটোই তৈরি হয় শিক্ষ্যাব্যবস্থার মাধ্যমে। এমনকি শেষমেষ চাকরি দেওয়াও হয় শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে। পদমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান, বর্ণ এবং মতাদর্শ ইত্যাদির ভিত্তিতে ব্যক্তির যোগ্যতাকে অবমূল্যায়ন করার মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। 

 

প্রশ্ন : একটা বৃহৎ শ্রেণি ছিলো যারা গুণগত শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করেছে। সে কি কারণে একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে? 

উত্তর : এখান থেকেই শিক্ষকতার ইতিহাস শুরু হয়েছে। প্রাক-আধুনিক যুগ ছিলো অনেক বেশি অভিজাত। অভিজাতদের প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি—বিশেষ করে সেইসব অভিজাতদের যাদের জ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—সেটি মূলত সাম্প্রতিক ঘটনা। আমি মনে করি এটি একটি ভালো দিক যে, এই প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। তবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ কী রকম প্রশ্নের সম্মুখীন তাদের করা হয়েছে।

সূত্র : দ্যা হিন্দু, মার্চ ২০১৮ সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অনুরুদ্ধ রমন এবং বিকাশ পাঠক

//জেডএস//

x