কাফকার জগতে আমি

অমল চক্রবর্তী ০৮:০০ , সেপ্টেম্বর ০৩ , ২০১৯

কাফকা নামটি শুনলেই মনে ভেসে ওঠে কেন্দ্রচ্যুত এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ পরিবার থেকে, পরিবেশ থেকে, এমনকি নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন।

কাফকা ছাড়া আধুনিক সাহিত্যের সকল আলোচনাই অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে ১৯১৫ সালে প্রকাশিত তার ‘মেটামরফোসিস’ কথাসাহিত্যে এক পরাবাস্তব জগৎ সৃষ্টি করে উনিশ আর বিশ শতকের মধ্যে যোজন দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে।

কাফকা আমাকে কেন এতো টানে? আমিতো ছাপোষা বাঙালি, ছেলেমেয়ে, গিন্নি নিয়ে ভালোই আছি। আমার তো চেকোস্লোভাকিয়ায় কোনো এক জার্মান ভাষাভাষী ইহুদি পরিবারে বড় হবার, প্রেমে ব্যর্থ হবার, কোনো এক অবসাদগ্রস্ত জীবনের অন্ধ কানাগলিতে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা নেই; আমিতো ভোরে উঠে বদ্ধ ঘরে নিজেকে নোংরা গা ঘিনঘিনে পোকা হিসেবে খুঁজে পাই না। তবু কাফকা আমাকে টানে। জীবনানন্দ দাশ কি ভুল বলেছেন : ‘আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে’।

ফ্রানৎস কাফকা বিচ্ছিন্নতাবাদের কবি। অডেন তাকে বলেছেন ‘বিংশ শতকের দান্তে’। জার্মানভাষী বোহেমিয়ান লেখক কাফকাকে বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসাবে গণ্য করা হয়। তার রচনা, বাস্তবতা এবং কল্পনাপ্রসূত উপাদানগুলোকে মিশেল করে তার নায়কেরা এন্টি-হিরো, যারা সামাজিক-আমলাতান্ত্রিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরাজিত।

কাফকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লেখা যেমন : ‘আমেরিকা’, ‘দা ট্রায়াল’ও ব্যক্তি-মানুষের অসহায় উন্মূলতা, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বের উদ্বেগ, অপরাধবোধ এবং অযৌক্তিকতার বিষয়গুলো অকপটভাবে তুলে ধরে। কাফকার লেখায় বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার চমৎকার মিশেল দেখি। লাতিন আমেরিকান জাদুবাস্তবতার পথতো তিনিই দেখিয়েছেন। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস লিখেছেন, ‘মেটামরফোসিস তাকে শিখিয়েছে কীভাবে ভিন্নভাবেও বর্ণনা করা সম্ভব’।

‘মেটামরফোসিস’ নভেলার শুরু নাটকীয়ভাবে—এক সকালে কেরানি ছোকরা গ্রেগর আবিষ্কার করে সে তো আর মানুষ নয়—প্রকাণ্ড এক পোকা। সবাই গ্রেগরের সময়নিষ্ঠতা, দায়িত্ব সচেতনতা এবং অফিসগামী চেহারার সঙ্গে অভ্যস্ত। কিন্তু এই সকালে কী হলো এমন? গ্রেগর কোনোদিন এই পরিবার ছাড়া কিছু ভাবেনি—ওর আদরের বোন, প্রিয় বাবা-মা—সবার কথা ওর মনে হয়েছে। কিন্তু পোকায় রূপান্তরের পর তার জগৎ পাল্টে গেলো। কেউ তাকে মনে রাখলো না। প্রথমে সে রূপান্তরটিকে অস্থায়ী মনে করে এবং পরে আস্তে আস্তে এই রূপান্তরটির পরিণতিগুলি বিবেচনা করে। গ্রেগর তার ম্যানেজার এবং তার পরিবার, উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, তবে তারা দরজার পেছন থেকে যা কিছু শুনতে পায়, তা বুঝতে পারে না। গ্রেগর অনেক কষ্টে নিজেকে মেঝের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যায় এবং দরজা খোলায়। পোকায় রূপান্তরিত গ্রেগর নিজেকে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা করার সময় দেখতে পায় যে, তার অফিসের ম্যানেজার, প্রধান কেরানি, গ্রেগরের অনিচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি সম্পর্কে ক্ষিপ্ত হয়ে তার উপর নজরদারি করতে এসে গেছে। এতেই সে বুঝতে পারে, সে এক ত্রাসের পৃথিবীতে পেঁছে গেছে।

গ্রেগরের পরিবার আতঙ্কিত হয় এবং তার বাবা তাকে সহিংস হুমকি দিয়ে তাকে আবার নিজের ঘরে ফেরত পাঠান। এই নারকীয় অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়ে দেয় বিচ্ছিন্নতা কী এবং কত প্রকার। শেষ দৃশ্যে পোকাটিকে থেতলে গ্রেগরের পরিবার টাটা বাইবাই করে চলে গেলো ঘুরতে। অনেকদিন পর তারা সুখ আর স্বাধীনতার স্বাদ নিলো।

এই নভেলাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—প্রথম অংশে আমরা পোকা হিসেবে গ্রেগরের একটি বিস্ময়কর পরিবর্তন খুঁজে পাই। যিনি একদা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বাবা-মা এবং একমাত্র আদরের বোন বিস্মিত হলেও তার সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ করে।

দ্বিতীয় ভাগে আমরা দেখি—পরিবারটি এই পরিবর্তনের মোকাবিলা করছে। গ্রেগরকে খাওয়ানো এবং পরিষ্কার করা এবং গ্রেগর কতটা খেয়েছে তা মা এবং বাবাকে জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই চেষ্টা তারা করে। আমরা এও দেখি—গ্রেগর নিজেকে পোকামাকড়ের পর্যায়ে নামিয়ে পরিবারের সব উদাসীনতাকে মানতে চেষ্টা করে। গ্রেগরের ঘরে ভাড়াটে রেখে আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেবার চেষ্টাও চলে। কিন্তু বিশাল পোকারূপী গ্রেগরকে দেখে ভাড়াটেরা আতঙ্কে চলে যায়।

চূড়ান্ত অংশে গ্রেগর ক্রমেই বুঝতে পারে যে, তাকে কেউ আর চায় না। পরিবার তার যত্ন নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেললে গ্রেগর আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একসময় পরিবার পুরোপুরি তার যত্ন নেওয়া বন্ধ করে দিয়ে নতুন ক্লিনিং লেডির হাতে এই কাজটি ছেড়ে দেয় এবং গ্রেগরের আরামের ব্যাপারে উদ্বেগও হারিয়ে ফেলে। এদিকে গ্রেগর খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে এক রাতে নীরবে মারা যায়।

‘মেটামরফোসিস’-এর কাহিনী যেমন সাদামাটা দেখি আদতে তা নয়—পুরো ব্যাপারটাই যেন পরাবাস্তব। এরই মাধ্যমে গ্রেগরের মগজের ভেতর দিয়ে আমরা এক পরাবাস্তব ভ্রমণে এগিয়ে যাই। একসময় মনে হয় না যে, এই পোকা গ্রেগরের আরেক সত্তার নাম। এ যেন আমাদের সেই লোকগীতির সুর : ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা, মন জান না...’। ঈডিপাস-কমপ্লেক্সের রূপায়ণ দেখতে পাই কাফকা ও তার বাবার সম্পর্কের মধ্যে। তার বান্ধবী মিলেনার কাছে এক স্বপ্নের কথা বলেছেন তিনি। স্বপ্নে দেখা যায়, কাফকা কাউকে খুন করেছে, সে তার মাকে ধাওয়া করে বাড়ি চলে আসে, তারপর...শেষে প্রচণ্ড ক্রোধে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম : কেউ যদি মিলেনাকে নিয়ে খারাপ কিছু বলে, যেমন বাবা (আমার বাবা), আমিও তাকে খুন করবো। কাফকার জগতের অন্ধকার তার মনের অবচেতনের প্রকাশ মাত্র। বাবা এখানে এক বিশাল স্বৈরাচারীর প্রতীক। বাবা-ছেলের সম্পর্কের চিত্রায়ণে আরও একটি অর্থ নিহিত—কাফকার বাবার সঙ্গে তার খারাপ সম্পর্কের ছায়া তার লেখায় নানানভাবে মূর্ত। অবশ্যই ‘মেটামরফোসিস’ গল্পের বাবা-চরিত্রে কাফকার নিজের বাবার ছায়া ফুটে ওঠে। কাফকার মানসিক জগৎ বুঝতে হলে বাবা হের্মানের সঙ্গে তার সম্পর্কের জটিলতাকে জানতে হবে। তিনি অবশ্যই কাফকার প্রথম জীবনের বড় প্রভাবক ছিলেন। কাফকা যখন ৩৬-এ পা দিলেন, তখন তার বাবার কাছে ৫০ পাতা চিঠি লিখেছেন। সেখানে দেখা যায়, বাস্তবের বাবার মতোই তার নভেলার বাবা চরিত্রটি বিমানবিক প্রতিষ্ঠান।

‘মেটামরফোসিস’ বিচ্ছিন্নতাকে মূর্ত করেছে। এখানে ভয়, শূন্যতা আর প্যারানয়া কাজ করছে। কাফকার এন্টি-হিরো গ্রেগর সামসার রূপান্তরকে বলা যেতে পারে প্রতিষ্ঠানের চাপে ন্যুব্জ মানব হিসেবে।

‘দা ট্রায়াল’ উপন্যাসের জোসেফকেও, যেমন সে জানে না কে বা কারা তাকে শাস্তি দিচ্ছে; তেমনি এবসার্ড গ্রেগর সামসার জগতও একই। এই প্রতীকধর্মী নভেলায় কাফকা মানুষকে অমানবিক পরিবেশে রেখে তার অসহায়ত্বকে উলঙ্গভাবে তুলে ধরেছেন।

গ্রেগর সামসার মতো কাফকা পেশগতভাবে প্রাগে বীমা কোম্পানির এজেন্ট ছিলেন। তিনি এই যান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের কাজকর্ম খুব বিরক্তিকর মনে করতেন। পরিবারের চাহিদা মেটাতে নিজেকে এক ক্লীবে নামিয়ে এনেছেন, যার এবসার্ড রূপ দেখি পোকায় রূপান্তরিত হওয়ায়। এই এক অস্তিত্ববাদী সমস্যা। এই নভেলায় আমরা কেন্দ্রীয় চরিত্রের এক জাদুকরী রূপান্তর দেখতে পাই এক অমানবিক রূপকে। এর অর্থ কী? পরিবর্তন সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা দেখতে সামসাকে সাহায্য করে। প্রকৃত যোগাযোগের অভাবই মূল সমস্যা। গ্রেগরের রূপান্তর মানুষের আমলাতন্ত্র ও অস্তিত্বের লড়াইয়ে হেরে যাবার রূপকমাত্র। গ্রেগর ক্রমশ মানুষ থেকে বড়ো একটি পোকায় রূপান্তরিত হয়ে বুঝতে পারলো স্বতঃসিদ্ধ মানবিক সম্পর্কগুলো আসলে ফানুসমাত্র। শুধু যুবক গ্রেগর রূপান্তরিত হয়নি, তার বোন গ্রেটে, বাবা ও মমতাময়ী মা-সবাই পাল্টে গেছে। যখন গ্রেগর না খেয়ে মারা গেলো ততদিনে পরিবারের বাকি সদস্যরা গ্রেগর থেকে অনেক বিচ্ছিন্ন। সবাই তাকে ভুলে গিয়ে শান্তি পেয়ে গেছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদই এই নভেলার মূল সুর।

কাফকা দারুণভাবে দস্তয়েভস্কি প্রভাবিত। দস্তয়েভস্কিকে এমনকি নিজের রক্ত-সম্পর্কের ভাই মনে করতেন তিনি। তার উপন্যাসে যে ত্রাস ও গ্রোটেস্ক জগতের ছবি দেখি, তা অনেকটাই দস্তয়েভস্কির উপন্যাসেও দেখি। কাফকার জগৎ এক ত্রাস ও ভয়ের পৃথিবী। ইংরেজি ভাষায় একটি শব্দ রয়েছে : ‘kafkaesque’ বা ‘কাফকার মতো’। দুঃস্বপ্ন আর আত্মরতির ভয়ানক (গ্রোটেস্ক) জগৎ কাফকাকে আর দশটা লেখকের চেয়ে আলাদা করেছে। কাফকার বর্ণনারীতি এতোটাই আলাদা যে ‘এনকার্টা বিশ্বকোষ’ ‘কাফকায়েস্ক’-এর মতো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সামাজিক অবস্থা বা সাহিত্যে তাদের চিকিৎসা নির্ধারণ করেছে। এই বিশেষণটি একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্র, ব্যুরোক্রেসি এবং অমানবিক সামাজিক অবস্থাকে ইঙ্গিত করে।

ভাবা যায় বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক কাফকা তার ৯০ ভাগ অপ্রকাশিত লেখা পুড়িয়ে ফেলেছেন? যে উঠতি লেখক মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুর আগেও দ্বিধাগ্রস্ত নিজের লেখার মান নিয়ে; যিনি সব পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন; তিনিই কি না সাহিত্যে নতুন ধারার সূত্রপাত করলেন।

‘মেটামরফোসিস’ বা ‘রূপান্তর’র জনপ্রিয়তা আমাদের বিস্মিত করে। এই কি সেই উপন্যাস যার আঁতুড় ঘরেই মৃত্যুর কথা ছিল যদি ম্যাক্স ব্রড বন্ধুকে দেয়া কথা ঠিক ঠিক রাখতো। আমাদের মনে পড়তে পারে সুররিয়ালিজমের চর্চাকারী এক বঙ্গীয় কবির মৃত্যুর পরে ট্রাংক ভর্তি গল্প, উপন্যাস, কবিতা বের হলো বা কয়েকটি ট্রাংক হারিয়েও গেলো। তবু ঐসব লেখা থেকে কি অসম্ভব সৃষ্টি! তো সেই কবির ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সঙ্গে ‘মেটামরফোসিস’-এর কি খুব বেশি পার্থক্য? আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতাকে এতো নির্মমভাবে কাফকা ছাড়া আর কে বুঝতে পেরেছে?

গ্রেগরের আস্তে আস্তে নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন আর থেতলে যাওয়া জীবনের সঙ্গে আমাদের কি কোনো মিল আছে? এক বাক্যে যদি বলতে পারতাম না নেই, তাহলে সবার চেয়ে আমি বেশি খুশী হতাম। পরস্পরের নিজস্ব বৃত্তে বন্দী আমরাও কি গ্রেগর সামসার মতো এক অনিকেত ভোরে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করি না আমরা সবার থেকে কতোটাই আলাদা। কাফকা তার নভেলার স্বল্প আয়তনে আমাদের চেতনায় কত বড় ঝাঁকুনি দিয়ে গেলেন! 

//জেডএস//

x