আমি আমার শিকড়ের সন্ধান করেছি : রিজিয়া রহমান

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শ্যামল চন্দ্র নাথ। ১০:২৪ , সেপ্টেম্বর ০৫ , ২০১৯

বাংলাদেশের খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক রিজিয়া রহমান। ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্য লিখতে শুরু করেন। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অগ্নি স্বাক্ষরা’। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, ‘ঘর ভাঙা ঘর’, ‘উত্তর পুরুষ’, ‘রক্তের অক্ষর’, ‘বং থেকে বাংলা’। লিখেছেন ‘অভিবাসী আমি’ ও ‘নদী নিরবধি’ নামে দু’টি আত্মজীবনী। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক।

২৮ ডিসেম্বর ১৯৩৯ সালে কলকাতার ভবানীপুরে রিজিয়া রহমানের জন্ম, মৃত্যু  ১৬ আগস্ট ২০১৯ ঢাকায়।  ২০১৩ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়।

আপনার জন্ম, শৈশব-কৈশোর ও বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাইআপনারা তো কলকাতায় থাকতেনদেশভাগের পরে ফরিদপুর চলে এলেন?

রিজিয়া রহমান : আমার জন্ম হয়েছিল কলকাতার ভবানীপুরে। কিন্তু আমাদের বাড়ি ছিল কলকাতার কাশিপুর থানার নওবাদ গ্রামে। এরপরে বাবার বদলির চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কেটেছে শৈশবের অনেকটা সময়। আমাদের পরিবারের ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যাবে যে, পরিবারটি বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করেছে। তারা একটার পর একটা অভিবাসন তৈরি করেছে। আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ফরিদপুরে। আমার বাবা সেখানে চাকরি করতেন। আমরাও স্বপরিবারে সেখানেই থাকতাম। কিন্তু ১৯৫২ সালে আমার বাবা মারা যাওয়ার পরে আমরা ঢাকার শাইনপুকুরে নানা বাড়িতে চলে আসি। তখন আমার এক মামা চাকরি করতেন চাঁদপুরে। আমাকে চাঁদপুরের একটি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি করা হলো। সেখানে আমি নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু মামাদের পরিবারের কনজারভেটিভ আচরণের জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য এরপরে এক বছরের মধ্যেই প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্টিক পাশ করে ফেলি।

 

আপনার রক্তের অক্ষরউপন্যাসটি পতিতাপল্লির পটভূমিতে রচিত। এটি লেখার প্রেরণা ও উপাদান কীভাবে পেয়েছিলেন?

রিজিয়া রহমান : ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাসের ভাবনাটি আমি পেয়েছিলাম শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত বিচিত্রার মাধ্যমে। পত্রিকাটি একবার পতিতাদের নিয়ে একটি কভার স্টোরি করেছিল। তখন সেখানে কাজ করতো শাহরিয়ার কবির, আনু মুহাম্মদ, শামীম আজাদ এরা। আমি পত্রিকায় নিউজটা পড়ে সম্পাদকের কাছে গিয়ে বললাম, স্টোরিটা আমার ভালো লেগেছে। তখন তিনি আমাকে বললেন, আপনি এই বিষয়টি নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে পারেন। আমি বললাম, এই বিষয়ে আমি কী করে লিখবো? তখন তিনি আমাকে বললেন, আমাদের কাছে এই কভার স্টোরি করার জন্য যতো ইনফরমেশন ছিল সব আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। দরকার হলে আমাদের রিপোর্টার আপনাকে সাহায্য করবে। এইভাবে শুরু হলো ‘রক্তের অক্ষর’ লেখা।

 

আপনাদের পারিবারিক সংস্কৃতি কেমন ছিল?

রিজিয়া রহমান : আমাদের পরিবারে একটা সাংস্কৃতিক আবহ ছিল শুরু থেকেই। দাদার লেখাপড়ার অভ্যাস ছিল। দাদার ঘরে সেলফ ভর্তি বিভিন্ন বই ছিল। সেদিক থেকে আমাদের পরিবার খুবই উদার ঘরানার পরিবার ছিল বলতে হবে। তবে বাবা মারা যাওয়ার পরে মামাদের পরিবারে এসে লোকজনের কথায় আমাকে বোরখা পরতে হয়েছিল। তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

 

আপনার বাবা-মা সম্পর্কে জানতে চাই।

রিজিয়া রহমান : আমার বাবার নাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ সিদ্দিক। তিনি পেশায় ডাক্তার ছিলেন। বাবা খুব সংগীতের অনুরাগী ছিলেন। বাবা এস্রাজ বাজাতেন। মাঝে মাঝে বাঁশিও বাজাতেন। বাবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন। সেসব তখন আমার মাথায় কিছুই ঢুকতো না। আমার মায়েরও গান শোনার শখ ছিল, তবে মা বাবার মতো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন না। মা শুনতেন সায়গল, জগন্ময় মিত্রের গান। মায়ের পছন্দের শিল্পী ছিলেন কানন বালা। মা নিজে গিয়ে দোকান থেকে হিন্দি আর বাংলা গানের রেকর্ড কিনে আনতেন। মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে আমিও যেতাম।

 

লেখালেখির শুরুর দিককার কথা শুনতে চাই। কীভাবে লেখালেখিতে এলেন?

রিজিয়া রহমান : ছোটবেলায় অনেকটা শখের বশেই কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম।  কবিতা লিখে লিখে খাতা ভরিয়ে ফেলতাম। কবিতা লিখে বাড়ির কাউকে দেখালে তারা হাসতেন। বলতেন, আমি অন্য কারো কবিতা দেখে নকল করে লিখেছি! কিন্তু বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে তখন বলতেন, তোর কবিতার খাতাটা নিয়ে আয়তো। তখন আমাকে লুকিয়ে রাখা কবিতার খাতাটি এনে বাড়ির অতিথির সামনে তুলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। সেটি কিন্তু আমার কাছে মোটেও ভালো লাগতো না।

 

ছাপার অক্ষরে প্রথম লেখা প্রকাশের অনুভূতি কেমন ছিল?

রিজিয়া রহমান : প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘টারজান’। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমার বয়স এগারো বছরের মতো। গল্পটি সত্যযুগ পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ছাপা হয়েছিল। গল্পটি ছাপা হওয়ার পরে পরিবারের সবাই অনেক প্রশংসা করেছিল। কবিতা লেখা নিয়ে যারা হাসাহাসি করতো তারাও এবার আমাকে উৎসাহ দিতে শুরু করলো।

 

আপনার প্রথম বই গল্পের, ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’। কিন্তু আপনি গল্প বেশি না লিখে উপন্যাসের দিকেই বেশি ঝুঁকলেন, কেনো?

রিজিয়া রহমান : ঠিক। আমার প্রথম বইটি গল্পের। ঐ সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’। লেখালেখির একেবারে শুরুর দিকে শৈশবে সাহিত্য না বুঝেই কবিতা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। এরপরে বড়দের জন্য প্রথম গল্প লিখে লেখালেখি শুরু। এরপর হঠাৎ করেই উপন্যাসে প্রবেশ।  তারপর যখন দেখলাম আমার যা বলার, কিংবা যেসব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি তা গল্পে পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়। এজন্য কিছুটা বড় পরিসর বা বড় ক্যানভাস প্রয়োজন। সে জন্যই পরবর্তীকালে উপন্যাস বেশি লেখা হয়েছে।

 

‘বং থেকে বাংলা’ লিখলেন কি ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থেকে, না কি এর তথ্য-উপাত্ত পাওয়া সহজ বলে?

রিজিয়া রহমান : ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটি লিখেছি বাঙালির ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য। বাংলাদেশের জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তন নিয়ে উপন্যাসটির ব্যাপ্তি। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি। বাংলার সাধারণ মানুষ সব সময়ই অবহেলিত, নির্যাতিত এবং উপেক্ষিত। তারা কোনোদিনই অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক মুক্তি পায়নি। এখানে আমি একইসঙ্গে ইতিহাস এবং একটি জাতি কিভাবে স্বাধীনতার মর্যাদায় এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখাতে চেয়েছি। এতে আমি আমার শিকড়ের সন্ধান করেছি বলতে পারো।

 

নারী বলে কি পারিবারিক-সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মূখিন হয়েছেন?

রিজিয়া রহমান : আমি যখন লেখালেখি শুরু করেছি, তখন নারীবাদ বা নারী সাহিত্যিক বিষয়গুলো এত প্রকটভাবে ছিল না। আর প্রতিবন্ধকতা কেবল সাহিত্যে নয়, সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। তবে এমন কোনো প্রতিবন্ধকতার ভেতরে আমি পড়িনি। লেখার মধ্যে মানুষের কথা বলতে চেষ্টা করেছি, তিনি নারী না পুরুষ, ধনী না গরিব তা নিয়ে কখনোও ভাবিনি। যা কিছু আমাকে আকৃষ্ট করেছে, তা নিয়েই লিখেছি। বিয়ের আগে বা পরে আমি সহযোগিতা দুই পরিবারেই পেয়েছি।

 

রক্তের অক্ষরউপন্যাসের ইয়াসমিনকে কি আপনি সত্যি সত্যি দেখেছিলেন?

রিজিয়া রহমান : না, আসলে সে সুযোগ হয়নি। তবে তাদের জীবনকে সেভাবে দেখার কোনো উপায় ছিল না। তখন সবকিছু এত সহজ ছিল না। সমাজ আরও রক্ষণশীল ছিল, আমার বয়সও কম ছিল। তাই ওদের জীবন দেখার জন্য যেতে পারিনি। তবে ওদের সম্পর্কে জানতে হয়েছে। জানাটা নানাভাবেই করেছি। বিভিন্নভাবে তথ্য-উপাত্ত নিয়েছি। চরিত্র তৈরি করা বা সেট তৈরি করার জন্য অনেক তথ্য যেমন নিয়েছি, তেমনি কল্পনা করেও লিখেছি। আর লেখকদের ইনটেনশন থাকে, সেখান থেকে লেখক কিছু গ্রহণ করে। বাস্তবের সঙ্গে লেখকের ইনটেনশন অনেক মিলে যায়, তবে এই চিত্রকল্প বা ভিজ্যুয়ালাইজেশন বাস্তব থেকেই গ্রহণ করতে হয়। যেটা আমিও করেছিলাম। তাদের অনেক ছবি নিয়েছিলাম ফটোজার্নালিস্টের কাছ থেকে। বেশ বড় বড় করে আমাকে অনেক ছবি এনে দিয়েছিলেন। তারপর তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি। তারা কীভাবে থাকে, কীভাবে গল্প করে, কী ধরনের শব্দ ব্যবহার করে, সেখান থেকে চিত্র তৈরি করি।

 

‘রক্তের অক্ষরে’ লেখার ক্ষেত্রে বিষয় না আঙ্গিক কোনটা আপনাকে বেশি ভাবিয়েছে?

রিজিয়া রহমান : আমি ছক করে কখনো কোনো কিছু লিখিনি। আমার লেখার বিষয় হচ্ছে মানুষ। এদের যুগের পর যুগ এই ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ আবার এদের ঘৃণা করা হচ্ছে। এরাও যে মানুষ, এটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। অপরাধ, প্রতারণা, অভাব ও অশিক্ষার এই ব্যবসার মূলধন। এই যে এত নারী আন্দোলন, হিউম্যান রাইটস নিয়ে কথাবার্তা, মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে এত আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো কথা নেই। আমি মনে করি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে পতিতাবৃত্তি জিইয়ে রাখার মাধ্যমে।

 

আপনি কখনও কি প্রেমে পড়েছিলেন?

রিজিয়া রহমান : জীবন প্রেমময়। শুধু নারী-পুরুষের প্রেমকেই কি প্রেম বলবো?  প্রেমের ব্যাখ্যাটা অনেক অনেক বড়। পৃথিবীতে অনেক প্রেম আছে। আবেগের প্রেম। আমার কাছে মনে হয় স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির যে প্রেম সেটাই সবচেয়ে গভীর। আমার   প্রেম করার সময় হয়ে ওঠেনি, তার আগেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। বলতে গেলে স্বামীই আমার প্রেমিক।

 

আপনি কার কার লেখা পড়তে পছন্দ করেন? ছোটবেলায় কী কী পড়তেন?

রিজিয়া রহমান : ছোটবেলায় শিবরাম চক্রবর্তী, আরো ছোটবেলায় ঠাকুরমার ঝুলি পড়তাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব গল্প আমার পড়া। অসাধারণ গল্পকার তিনি! মানিক-শরৎ-এর কিছু কিছু গল্প ভালো লেগেছে। তারাশঙ্করের গল্প ভালো। বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের চেয়ে উপন্যাস আমাকে টেনেছে বেশি। সতীনাথ ভাদুড়ী, প্রমথ চৌধুরী ও বনফুলও আমার প্রিয় গল্পকার। প্রেমেন্দ্র, অচিন্ত্য, মতি নন্দী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এদের অনেক ভালো গল্প আছে। বুদ্ধদেব বসু ও সুনীলের একটি-দুটি গল্প খুব ভালো লেগেছে। বাংলাদেশে হাসান আজিজুল হকের সব গল্পই আমার ভালো লাগে। সৈয়দ শামসুল হকের নাম তো করতেই হয়। এরপর শওকত আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সেলিনা হোসেন, রাবেয়া খাতুন—এদের কিছু কিছু গল্প আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। খুব পছন্দ করতাম রাশিয়ান আর ফরাসি ছোটগল্প। পুশকিন, তলস্তয়, গোগল, মোপাসাঁ—এদের অধিকাংশ গল্পই সাংঘাতিক ভালো লাগে।

 

আপা, আমাকে সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

রিজিয়া রহমান : তোমাকেও। ভালো থেকো।

//জেডএস//

x