সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : বাবুল সিরাজী ০১:৫৬ , সেপ্টেম্বর ০৭ , ২০১৯

মেঘে ঢাকা দিনটা হঠাৎ করে যেন রোদ ঝলমলে করে উঠল। সে কি আবহাওয়ার জন্য? না কি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন প্যারিসের রোদ সুইডেনের স্টকহোমে? ১৯৮৫ সালের পয়লা নভেম্বর বিকেল তিনটার দিকে তার আসার কথা। একঘণ্টা লেট হয়ে চারটা বাজল। শেষে প্লেন ল্যান্ড করল উনিও এলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘সুনীলদা কি এই রোদ সঙ্গে করে নিয়ে এলেন?’

উনি মৃদু হাসলেন। আন্তরিকতার রোদে আমরাও আশ্বস্ত হলাম। আমরা বলতে আমার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মিহির বিশ্বাস। কয়েক মিনিটেই সুনীলদা আমাদের আপন হয়ে উঠলেন। ভিতরে-বাইরে তার ছড়ানো-ছিটানো অকৃত্রিম বাঙালি স্বভাবসুলভ আত্মীয়তা—মানুষকে আপন করে কাছে টেনে নেয়ার ক্ষমতা—এ একজন জাত সাহিত্যিকের গভীর অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ।

প্লেন থেকে নেমে একটু বসতে না বসতেই ছুটতে হল কালচার হাউসে’র দিকে।

স্টকহোমের কালচার হাউসের অনুষ্ঠানে তিনি সাহিত্য সম্বন্ধে তার ধ্যানধারণার কথা বললেন। তার বলার ভঙ্গি এবং সহজসরল ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করে দিল। নিচের তলার লাইব্রেরিয়ান ভদ্রমহিলা এসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে বলল, ‘আমার লাইব্রেরিতে আপনার বই আছে। আপনিই তো সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? আপনাকে দেখতে এলাম।’ ভদ্রমহিলার চোখেমুখে বিস্ময় ও ভক্তির ছটা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লাজুক হেসে বললেন, ‘জ্বি, হ্যাঁ।’ বাকি সব আমরাই বললাম। জানি, সুনীলদা আত্মপ্রচার ভালোবাসেন না। কিন্তু প্রবাসের মাটিতে বিদেশিদের সামনে আমাদের সাহিত্য বা সাহিত্যিকদের তুলে ধরতে আনন্দ লাগে আমাদের। আর সুনীলদা বা অন্য যেকোনোও সাহিত্যিক সম্বন্ধে আমরা প্রশংসা করে যখন বিদেশিদের কাছে বলি, তখনতো মানুষটিকে নয়, তার নিরলস পরিশ্রমের ফসল তার সাহিত্যকীর্তিকেই স্বীকৃতি জানান হয়। এবং জাতি হিসেবে তেমন কৃতিত্ব আমাদের কি-ই বা তেমন আছে সাহিত্য বাদ দিয়ে? সেই রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সমকালীন সাহিত্যিকদের এই সৃষ্টির যে কৃতিত্ব ও গৌরব তার মধ্যেই বাঙালি জাতির অনেক গর্ব আর কীর্তি। বাকি অন্যান্য সব ক্ষেত্র—তবু দুয়েকটা উল্লেখ করছি, যেমন রাষ্ট্রশাসন, সেখানে অনেকটাই ভরাডুবি। বাংলাদেশে সামরিক সরকার আর ভারতে বাঙালিদের বিপন্ন অবস্থাই এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

বিষয় থেকে দূরে চলে এসেছি। আবার ফিরে যাই সেই ক্ষেত্রে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বাঙালিরা সফল হতে পারবে। সেই সাহিত্যের কথাই আপাতত হোক। একথা স্বীকার করতেই হবে যে, সাহিত্যরসিক ও সাহিত্যমোদীদের জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই সুইডেন আগমন ছিল সত্যি প্রেরণা আর উৎসাহব্যাঞ্জক। স্মরণীয় হয়ে থাকবে স্মৃতিতে বহুদিন।

বিদেশিদের কাছে ভারতীয় সাহিত্য মানেই রবীন্দ্রনাথ। ঐ পর্যন্তই। অথচ ভারতীয় সাহিত্য বলতে তেমন কিছু নেই। কারণ সাহিত্য হয় ভাষাভিত্তিক। ভারতীয় ভাষা তো নেই। আছে বাঙালি, পাঞ্জাবি গুজরাটি, আরো কত শত। তাই বরং বাংলা সাহিত্যের লেখক হিসেবে আমি বাংলা সাহিত্যের কথাই বলি। এই সহজ চিরসত্যটুকু তিনি সুইডিশদের সামনে তুলে ধরলেন পরের আরো একটি অনুষ্ঠানে দ্বিতীয়বার। সেটা ছিল বিদেশি সাহিত্যিকদের একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান। এবং রবীন্দ্রনাথের প্রভাব  কাটিয়ে বাংলা সাহিত্যে আজও সৃষ্টি হচ্ছে অজস্র গল্প কবিতা উপন্যাস নাটক এই কথাটুকুও তিনি সুন্দরভাবে তুলে ধরলেন সবার সামনে। বাংলা সাহিত্য বসে নেই। সে চলছে। বেশ ভালোভাবেই চলছে। এই কথাটুকু আরও একবার প্রতিধ্বনিত হল তার মুখে।

আরেকটি জিনিস যেটা তিনি তুলে ধরলেন বিদেশিদের সামনে, তা হল: ভারতবর্ষ বলতেই সাপ-খোপ, বাঘ-ভাল্লুক, জ্বিনপরী, ফকির-সন্ন্যাসী, কলেরা-বসন্ত, ম্যালেরিয়া, যাদুটোনা, পানিপড়া, বর্বর অশিক্ষিত অভুক্ত মানুষ ইত্যাদি যা তারা বোঝে, তা ঠিক নয়। তেমনি ঠিক নয় ভারতবর্ষ সম্বন্ধে রূপকথার সব বর্ণনা : গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, অতল দীঘির জলে রাজকন্যার স্নান, রাজপুত্রদের মৃগয়া, মহারাজাদের সেইসব প্রেম আর ধনসম্পদের বাড়াবাড়ি। ভারতবর্ষ—ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ হচ্ছে অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতোই উন্নয়নশীল। প্রাচ্যে মিস্ট্রি যেমন আছে, তেমনি আছে পাশ্চাত্যের বাস্তবতা, সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে শিল্প-সাহিত্যের জয়যাত্রা। এবং সবচেয়ে বড় কথা নির্মম জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি রসে বর্ণে গন্ধে ভরপুর একটি জীবনধারাও এখানে অব্যাহত। সাহিত্যের উপজীব্যও এই আবহমান জীবন ও তার সংঘাত। আমরা মরে যাইনি। এখনো বেঁচে আছি। এই ছোট্ট অথচ দারুণ দরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই তিনি পরিষ্কার করে দিলেন সবার কাছে। এজন্য তিনি আমাদের প্রবাসী বাঙালিদের কাছে ধন্যবাদের পাত্র। হা-ভাতে বাঙালি হলেও আমরা ঐহিত্য আর জীবনের মহান উত্তরাধিকারী, অন্তত এইটুকু সুইডিশরা বেশ ভালোভাবেই বুঝল। এবং সেখানেই কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অবদান। আর মানুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে বসতে হল আমাদের সামনে। যেন কতগুলো চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র আমরা। কেটে-কুটে বের করে নিলাম তার মনের আর হৃদয়ের সব কথা। যা তার জীবন ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বেশ একটা ধারনার জন্ম দেয়। মোট তিনটি পত্রিকার জন্য তাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য সময় দিতে হয়েছে।

বিদেশি সাহিত্যিকগোষ্ঠীর একটি পত্রিকার জন্য তিনি যে ইন্টারভিউ দেন সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। নলিনী নামক একজন ভারতীয় মেয়ে বহু প্রশ্ন করেছিলেন। তবে সাহিত্যের চেয়ে রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই তার উৎসাহ বেশি। সেই সাক্ষাৎকারের একটি কথা আমার মনে আজও ঘুরপাক খায়, তা হচ্ছে: সুনীলদার সহজ স্বীকার ‘সমাজের এই অসাম্য আমিও চাই না। কিছুদিন আগে জন্মালে আমিও হয়ত নকশাল হয়ে যেতাম। যেহেতু আমি শিল্পী, সাহিত্য সৃষ্টিই আমার উপাসনা তাইতো সমস্ত কিছুর পরও রস আর সৌন্দর্য, জীবনের উষ্ণতা আর আশা এ সবই আমাকে নিমগ্ন করে রাখে সমস্যাজর্জর পৃথিবীতে।’

এক ভরসন্ধ্যায় ভার্কস্টাড গাটানের এক দোতলার ফ্ল্যাটে বসলাম। দেয়ালে কয়েকটা ছবি, ছোট্ট টেবিলের সামনে মাইক্রোফোন। সোফায় পাঞ্জাবি গায়ে বসলেন সুনীলদা। শুরু হল আমাদের মনে জমে থাকা রকমারী প্রশ্নের বৃষ্টি—সে বৃষ্টিতে ভিজে সৃষ্টি হল এই সাক্ষাৎকার।

প্রশ্ন : আপনার জন্ম, শৈশব-কৈশোর এবং সাহিত্যিক জীবনের সূচনা সম্পর্কে জানতে চাই।

সুনীল : আমার জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুরে। বাবা কলকাতায় শিক্ষকতা করতেন। ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ হচ্ছে আমার জন্ম তারিখ। তেমন প্রাচুর্য ছিল না সংসারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মন্বন্তরের সময় আমরা গ্রামেই ছিলাম। চালের বড় অভাব ছিল সে সময়। স্কুলে আমরা আলুসিদ্ধ খেতাম। রাতে বেশ ভয় করত। চারদিকে থমথমে অন্ধকার। দেশ বিভাগের আগে কলকাতা চলে আসি। শৈশব স্মৃতি তেমন স্পষ্ট মনে নেই, তবে সবুজ গাছপালা, আড়িয়াল খাঁ নদী, এসব বেশ মনে পড়ে। স্বপ্নের মতো লাগে সেসব দিন।

সাহিত্যিক জীবনের সূচনার কথা বলতে গেলে মনে পড়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরের কথা। হাতে অঢেল সময়। বাবা চাইতেন ঘরে আটকে রাখতে। টেনিসনের কালেকটেড ওয়ার্কস থেকে প্রতিদিন দু'টি করে কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে বাবাকে দেখানো, এইছিল আমার প্রতি নির্দেশ। তেমন মিলিয়ে দেখতেন না বাবা। প্রথমদিকে আমি ডিকশনারি দেখে বেশ কষ্ট করে অনুবাদ করতাম। পরে দেখলাম বাবা ইংরেজি কবিতার লাইনসংখ্যা দেখে নিয়ে তা বাংলা অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে টিকচিহ্ন মেরে ছেড়ে দেন। তখন আমিও আর অনুবাদে না গিয়ে ইচ্ছেমতো বানিয়ে কবিতা লিখে দিতাম। এরমধ্যে আমি একটি মেয়ের প্রেমে পড়ি। চিঠি দিয়ে প্রেম নিবেদন করা বহু মুশকিল। তাই একটি কবিতা লিখলাম, 'একটি চিঠি' নাম দিয়ে। যাকে উদ্দেশ্য করে এই প্রেম নিবেদন সে বুঝবে অবশ্য। অন্য কেউ নয়। লেখাটা দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলাম। চারমাস পরে বাদামী খামে চিঠি এলো আমার নামে। বুক দুরদুর করছে। আমাকে আবার চিঠি দিতে যাবে কে? তাও এতবড় ভারী চিঠি। শঙ্কিত মনে খুলে দেখি দেশ পত্রিকার একটি কপি। আমার কবিতাটি ছাপা হয়েছে। সবাই দেখে কিন্তু শেষমেষ বিশ্বাস করতে চায় না। বলে, ওরে, তোর নামে নাম কোনো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ওটা লিখেছে। কারো সঙ্গে নাম মিলে গেছে। আর সুনীল নামটা খুবই কমন। বাড়ির চাকরবাকর থেকে শুরু করে অনেকের নামই হতো সুনীল। কবিতাটি যে আমার, তা সেই প্রেমিকাও বিশ্বাস করতে চায় না। বড়বড় সন্দেহের চোখে তাকায়, যার অর্থ হচ্ছে অন্য কোনো সুনীল লিখেছে বোধহয়।

সে যাই হোক, তখন ১৯৫০ সাল। নাহ্ ভুল বললাম। শ্যামল কান্তি খুঁজে বের করেছে ১৯৫১ সাল। ঐ সময় দীপক মজুমদার নামে আমাদের এক বন্ধু ছিল। তাকে এখন কেউ চেনে-টেনে না। অল্প বয়সে তার খুব নাম-ডাক ছিল।

কবিতা-টবিতা লিখত। বহু পত্রপত্রিকায় ছাপা হত। বড়বড় সব সাহিত্যিকদের সঙ্গে ওঠাবসা করত। সবাই বেশ দাম দিত। আমার খুব রাগ লাগত। কবিতা লেখা আর এমন কী? লিখে ফেললেই হল। আমিও বসে লিখে ফেললাম দু'চারটে। এইতো এভাবেই শুরু।

ছোটোবেলায় স্বপ্ন দেখতাম, জাহাজে চাকরি নিয়ে নাবিক হব, ঘুড়ির দোকান দেব, এত এত ঘুড়ি ওড়াব। সাহিত্যিক হব ভাবিনি কোনোদিন। পাকেচক্রে হয়ে গেলুম।

সেই প্রথম কবিতাটি আমার কোনো বইয়ে নেই। পরে সে কবিতা এত দুর্বল মনে হয়েছে যে, কোনো বইয়ে রাখা হয়নি।

আমার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা বের হয় দু'টি চটি পত্রিকায়। অগ্রণী ও শতভিষা’য়। বুদ্ধদের বসুর বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় আমার চতুর্থ কবিতা প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পরে।

তখনকার দিনে ‘দেশ’ পত্রিকার এত নাম ছিল না। আমিতো জানতাম না। হাতের কাছে দেশ পত্রিকার ঠিকানা ছিল, তাই ওখানেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম প্রথম কবিতা। কলেজে উঠে বুঝলাম ‘কবিতা’ পত্রিকা হচ্ছে কবিদের পত্রিকা। ওখানে লেখা প্রকাশিত হলেই কবি হিসেবে স্বীকৃতি হয়। নামী-দামী কবিরাই ওখানে লিখতেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে কথা যখন উঠলই, তখন একটা কথা বলে নিই, সম্পাদক হিসেবে তার একটি বিরাট গুণ ছিল। আমি বহু সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক দেখেছি, নিজেও সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলাম। স্বীকার করতেই হবে, আমার নিজেরও সে গুণ ছিল না। বুদ্ধদেব বসু লেখা পাওয়ার দু’তিন দিনের মধ্যেই উত্তর দিয়ে দিতেন। এমনটি আর কারুর মধ্যে দেখিনি। কবিতাটির নাম ভুলে গেছি। পরবর্তীকালে আবু সয়ীদ আইয়ুবের সংকলিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ বইয়ে স্থান পেয়েছিলো। বিজ্ঞাপনে লেখা হত ‘রবীন্দ্রনাথ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত’। দেখে বেশ আনন্দ লাগত।

 

প্রশ্ন : কোনো কবি বা সাহিত্যিকের প্রভাব পড়েছে কি আপনার জীবনে বা লেখায়? অথবা কোনো কবি বা সাহিত্যিক থেকে কি কোন প্রেরণা পেয়েছেন?

সুনীল : আমার ওপর কার প্রভাব পড়েছে বা আছে, তা হয়ত আমার চেয়ে অন্যরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে প্রেরণার কথা বলা যেতে পারে।

আমি নিজেকে নিজে তৈরি করেছি। পথ দেখিয়েছি। তেমন কোনো অভিভাবক ছিল না এ ব্যাপারে। আমার মা গল্পের বই পড়তে ভালোবাসতেন। পাড়ার লাইব্রেরি থেকে সপ্তাহে দু'খানা করে বই নিয়ে আসতাম। ফেরৎ দেওয়ার আগে নিজেও একবার পড়ে ফেলতাম। বড়দের বই বা ছোটদের বই এসব বোঝাবুঝির ধারে কাছে যেতাম না। পড়ার নেশা ছিল। পড়ে ফেলতাম। পরে কলেজে উঠে লাইব্রেরি থেকে প্রিয় লেখক বেছে নিয়ে তার সমস্ত বই পড়ে ফেলতাম। বহু বই পড়েছি এভাবে। অল্প বয়েসে কবিতা তেমন পড়িনি। তখনও রুচি তৈরি হয়নি। তবে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কারণে রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা মুখস্ত করে পড়া হয়ে যেত। আধুনিক কবি, যেমন জীবনানন্দ দাশ—এদের পাই বহু পরে, কলেজ জীবনের দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষে।

 

প্রশ্ন নিজের কোন লেখা আপনার প্রিয়?

সুনীল : আমি যে উত্তরটা দেব সেটা অনেকেই বিনয় ভাবতে পারেন, কিন্তু কথাটা সত্যি, নিজের কোনো লেখাই আমার প্রিয় না। কোনো লেখা লিখেই তৃপ্তি পাই নি, অন্তত সম্পূর্ণভাবে। লেখার চেষ্টা করেছি মাত্র। মনে হয় ভবিষ্যতে সত্যি কোনো ভালো লেখা হয়ত লিখতে পারব।

 

প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার মতামত বা ধারণা কী?

সুনীল : রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক সময় বহু বাজে বাজে কথা বলতাম। আমার একটা কবিতার লাইন আছে : ‘তিনজোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোশে’। বহু নিন্দে সহ্য করতে হয়েছে এজন্য। আসলে ব্যাপারটি ছিল অন্যরকম। তারাপদ রায় ছিল আমাদের বন্ধু। ও ছিল অবিবাহিত। রাত হয়ে গেলে প্রায়ই ওর বাড়িতে থেকে যেতুম। শুতে খুব অসুবিধে হত। চারদিকে রবীন্দ্ররচনাবলীতে ভর্তি। তাই লাথি মেরে জায়গা করে নিতুম। ওটা একটা স্টাইল হিসেবে লেখা। চারদিকে রবীন্দ্রভক্তি দেখে দেখে আর তার নাম শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। গা জ্বলে যেত। বিরক্ত হতাম খুব। যার ফলে বহু কটুক্তি করেছি। তবে রবীন্দ্রনাথ পড়েছি। অনেকে তার রচনাবলী না পড়েই সমালোচনা করেন। আমি তেমনটি করিনি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার ধারণা বহু আগেই পাল্টে গেছে। বলা যায় ভাবনাচিন্তার উত্থান পতন। আমি মনে করি তিনি নিঃসন্দেহে উঁচু দরের লেখক। খুবই উঁচু দরের। বিশ্বসাহিত্য পড়ে আমার যা ধারণা হয়েছে তাতে বলা যেতে পারে, ইদার্নিংকালে তার মতো অতবড় লেখক আর জন্মায়নি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কোনো লেখাই তার নিম্নমানের নয়।তার কবিতা হয়ত পড়তে তেমন আর ভাল লাগে না আমার, কিন্তু গান আছে, আছে ছোটগল্প, প্রবন্ধ, যা আমার আজও খুব ভালো লাগে। মোটকথা, তার বহু জিনিস আছে যার আজও আবেদন আছে।

 

প্রশ্ন নজরুল সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

সুনীল : একসময় খুব বিরোধী ছিলাম।তাকে নিয়ে সবাই এত মাতামাতি করে দেখে রাগ হয়েছিল। অল্পবয়সে অমন হয়। খুব ভালোভাবে তার সম্পর্কে চিন্তা করলে বলা যায়, কবি হিসেবে উনি ইউনিক বা অনন্য। আমি তাদেরই ইউনিক বলব যারা হচ্ছেন পাইওনিয়ার বা পথিকৃৎ, যারা নতুন ভাষা এনে দেন। রবীন্দ্রযুগে সবাই যখন রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ করছে, অনুকরণ করছে, ঠিক তখন উল্কার মতো এসে তিনি সব তছনছ করে দিলেন। দুমদাম করে যা খুশি ভাষায় যা খুশি শব্দ ব্যবহার করে সব ওলটপালট করে দিলেন। এই যে দুরন্ত বালকের মতো প্রাণচাঞ্চল্য, এটা আমার খুব পছন্দ। নজরুল সম্পর্কে আমাদের বিচারটা মোটেও ঠিক নয়। তাকে বলা হয় বিদ্রোহের কবি। সাম্যবাদের কবি। অথচ তিনি যত না বিদ্রোহের কবিতা লিখেছেন, তার থেকে বেশি লিখেছেন প্রেমের কবিতা। তার অজস্র গান আর গজল প্রেমকে নিয়েই তো। আমার মনে হয়, প্রেমিক কবি হিসেবেই উনি অনেক বেশি সার্থক।

 

প্রশ্ন জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আপনার কী মত?

সুনীল : যদি নিতান্তই চেপে ধর আমাকে, তবে বলব জীবনানন্দ দাশ কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের থেকেও বড়। কবিতার যে সুক্ষ্ম রস, তা জীবনানন্দের কবিতা ছাড়া অন্য কোথাও পাই না। রবীন্দ্রনাথে নয়, এমনকি আজকের পৃথিবীর অন্য কোনো কবিতার মধ্যেই তা পাই নি। কবি হিসেবে তাই তাকে খুব উঁচু এবং বড় মনে করি। আমরা যখন লেখা-টেখা শুরু করি তখন তার তেমন নামটাম ছিল না। ‘কৃত্তিবাসে’ আমরাই তাকে নিয়ে হৈচৈ শুরু করি। বুদ্ধদেব বসুই তাকে নিয়ে প্রথম লেখেন। তিরিশ বছর বয়সে ‘প্রগতি’তে এটা ঘটে। একই বয়সের সমসাময়িক কবিকে নিয়ে এরকম কেউ খুব একটা লেখে না। এজন্য বুদ্ধদেব বসুর প্রশংসা করতে হয়। উনি জীবনানন্দকে চিনতে পেরেছিলেন। আজকে সেইসব বিখ্যাত কবি বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী এরা সব তলিয়ে গেলেন আর মুখচোরা লাজুক সেই জীবনানন্দ দাশই আলোর কেন্দ্রে চলে আসলেন।

 

প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা জীবনানন্দ দাশকে দেখেছেন বা তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

সুনীল : মানিকতলার একটি দোতলা বাড়িতে দাঁড়িয়েছিলাম। স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। আমার বয়স তখন পাঁচ কি ছয় বছর। রাস্তা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের শব নিয়ে গেল। ঐটুকুই। নজরুল সম্পর্কে আনন্দবাজারে একটি ফিচার লিখেছিলাম ‘যদি নিরব কবির জ্ঞান ফিরে আসে’। ওখানে নজরুলের সম্পর্কে লিখেছিলাম সেই রিপ ভ্যান উংকেলের মতো, হঠাৎ যদি তার জ্ঞান ফিরে আসে তাহলে কেমন হবে, তাতে আমি লিখেছিলাম নজরুলের যেন জ্ঞান এসেছে, তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলছেন, কই, কী হল, ওরা সব কোথায় গেল। মানে নতুন পরিবেশে তার কেমন রকম মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তার একটি বিবরণ। এ লেখা পড়ে নজরুলের ছেলে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যায় ওদের বাসায়। ওখানেই নজরুলকে দেখি। উনি অসুস্থ ছিলেন। কথা বলার প্রশ্নই আসে না।

আর জীবনানন্দের সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয় ল্যান্সডাউন রোডে। ভাড়া থাকতেন একটি বাড়িতে। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার জন্য লেখা চাইতে গিয়েছিলাম। বেল টিপলে একজন মুদি দোকানের লোকের মতো লোক দরজা খুলে দিলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, জীবনানন্দ দাশ বাড়ি আছেন? উত্তর এল, ‘আমিই জীবনানন্দ দাশ।’ আমরা ভেবেছিলাম ফতুয়াপরা অমন চেহারার কালিঝুলি মাখা লোকটা নিশ্চয়ই তার বাড়ির চাকর-বাকর হবে। তা যা হোক, ভেতরে ঢুকে দেখি অবাক কাণ্ড। বাড়ির মধ্যে একটি চাতাল মতো ছিল। সেখানে রাজ্যের পুরোনো খবরের কাগজ ছড়ানো ছিটানো। পনের বিশ বছরের পুরোনো খবরের কাগজ। মনযোগ সহকারে উনি তাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছেন। লেখা চাইলাম। তেমন একটা পাত্তা দিলেন না। বলে দিলেন, দেব। ব্যস্ত ভেবে আমরাও চলে গেলাম। দ্বিতীয়বার তাকে দেখি সিনেট হলে। কবি সম্মেলন হয়েছিল ওখানে। এটা ছিল এক ঐতিহাসিক কবি সম্মেলন। সিগনেট প্রেসের দিলীপ ওপ্ত এটা আয়োজন করেছিলেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এর বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের পর থেকে আরম্ভ করে একেবারে আধুনিক কবিদের ডেকে সে এক বিশাল কবিতা পাঠের আসর। আধুনিক কবিতা চলবে কি চলবে না, তখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। তবে প্রচুর লোক হয়েছিল। অনেক বড় হল তবু তিল পরিমাণ জায়গা ছিল না। বহুলোক বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। দর্শকদের মধ্যে আমিও ছিলাম। জীবনানন্দ দাশ ওখানে কবিতা পাঠ করেন। সে কি ঝড়ের বেগে! কারও দিকে না তাকিয়ে না থেমে, এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেলেন। বড় লাজুক লোক ছিলেন। স্রোতারা আরেকটা পড়ুন, আরেকটা পড়ুন বলে ডাক দিল, চেঁচিয়ে উঠল, কিন্তু উনি ততক্ষণে চলে গেছেন। তৃতীয়বার অবশ্য উনি খাটে শুয়ে ছিলেন। আমরা তাকে শ্মাশানে নিয়ে যাচ্ছিলাম।

 

প্রশ্ন বিদেশি লেখকদের মধ্যে কার প্রভাব আপনার লেখায় আছে বা কোন লেখককে আপনার ভালো লাগে?

সুনীল : প্রভাবের কথা বলতে পারব না। তবে দস্তয়ভস্কির লেখা পড়ে দারুণ মনে হয়েছিল। মুগ্ধ হয়েছিলাম। সাতশো পৃষ্ঠার এতবড় বই অথচ লেখকের কি মুন্সিয়ানা। ধীরভাবে আস্তে আস্তে এগিয়েছেন। ঘটনার ঘনঘটা নেই। অথচ জীবনের কি গভীর ব্যাপ্তি। আশ্চর্যভাবে মুগ্ধ হয়েছি। পরে অবশ্য জেনেছি সেটি তার তেমন কোনো বিখ্যাত বই নয়। দস্তয়ভস্কির সবই এরপর পড়েছি। বহুবার পড়েছি। প্রতিবারই মুগ্ধ হয়েছি। ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’ বইটা আমার কাছে মনে হয়েছে বেদের মতো অবশ্যপাঠ্য। বেদ যেমন হিন্দুদের জন্য, ঐ বইটা ঠিক তেমনই ভক্তির ছিল আমার জন্য। বন্ধুবান্ধবদের ধরে ধরে বলতাম, পড়েছিস? পড়িসনি। পড়ে নে। সাহিত্যিক হতে হলে অবশ্যই ওটা পড়া দরকার।

আর আমার একটা অদ্ভুত ধারণা হয়েছিল শেক্সপীয়রকে বুঝতে হবে। এত নাম-ডাক, নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে। কবি হতে হলে তার কবিতা পড়তে হবে।

তার ইংরেজি পড়ে তো বোঝা যায় না। নিচে সব নোটস-ফোটস থাকে। ঐসব ধরে ধরে পড়তাম। সুবিধে হয়েছিল এই যে, আমার একটা বন্ধু ছিল যার ইংরেজি জ্ঞান ছিল আমার চেয়েও কম। ও আমাকে বলে, তুমি আমাকে শেক্সপীয়র পড়াবে? যদি পড়াও তবে তোমাকে সিগরেট খাওয়াব। সিগরেট খাওয়া তখন আমার কাছে বিলাসিতার কাজ। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ঐসব নোটস-ফোটস থেকে ওকে শেক্সপীয়র বোঝাবার চেষ্টা করুতম। নিশ্চয়ই তাকে অনেক ভুলভাল বুঝিয়েছি। নিজেই কি সব বুঝেছি?

 

প্রশ্ন সমকালীন বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আপনার কী মত?

সুনীল : আমি বলব সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অবস্থা মোটেই খারাপ নয়। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বহু লোক লিখছে। জীবনের নানা দিক সাহিত্যে উপজীব্য হচ্ছে। আমি বিশেষ কোনো লেখকের নাম করব না। বিপদ আছে। কারও নাম করব, কারও করব না তাতে ঝামেলা। গদ্যের তুলনায় কবিতার ক্ষেত্রে অবস্থাটা আরও ভালো। বাংলাদেশেও বেশ ভালো কবিতা হচ্ছে।

 

প্রশ্ন বাংলা গান সম্পর্কে আপনার মতামত?

সুনীল : আধুনিক বাংলা গান একেবারেই যাচ্ছেতাই। এখনও সবাই রবীন্দ্রসংগীত গাইছে। যদি তেমন ভালো আধুনিক গান থাকত, তবে কেউ কি শতাব্দীর পুরোনো গান গাইত? আধুনিক বাংলা গান একেবারেই নিম্নমানের।

 

প্রশ্ন সুইডেন ও সুইডিশ সাহিত্য সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য?

সুনীল : সুইডিশ সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান হচ্ছে সবসময়ই পঞ্চাশ বছরের পুরনো। যেমন ধর স্ট্রিন্ডবার্গের লেখা পড়েছি। আধুনিক সুইডেন বা এদেশিয় শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান হচ্ছে বার্গম্যানের ফিল্ম। তার ফিল্ম যেহেতু উচ্চাঙ্গের শিল্প, সেহেতু আমরা দেখি। দেখে আনন্দ পাই। তার ভিতর দিয়েই পরিচয় পাই আধুনিক সুইডেনের। এর বেশি কিছু পাওয়া যায় না। যোগাযোগের অভাবই এর জন্য দায়ী। আমার যদ্দূর মনে হয়।

সুইডেন সম্পর্কে দূর থেকে অন্যরকম ধারণা হয়। কিছুদিন আগেও সুইডেনের মাথাপিছু আয় ছিল পৃথিবীর মধ্যে প্রায় সবচেয়ে বেশি। ইদানিং আরবের কুয়েত-টুয়েতের চেয়েও বেশি। তা আমার ধারণা ছিল সুইডেন হচ্ছে ধনীদের দেশ।

প্রত্যেকটি লোক বিরাট বড়লোক। দারুণ কায়দায় থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও এদেশে এক ধরনের সোশ্যালিজম চালু আছে, সেটা আমি জানতাম। এখানকার প্রধানমন্ত্রী পাতাল রেলে যাতায়াত করেন, নিজ হাতে বাজার করেন, এমনকি মিছিলে অংশগ্রহণ করেন, এসব খবর আমার কাছে নুতন কোনো কিছু নয়। তবুও ধনসম্পদ সম্পর্কে একটি ভীতিকর ছবি ছিল আমাদের মনে। এখন এখানে আসার পর দেখলাম, না, ভয় পাবার কিছু নেই, আসলে সুইডেন হচ্ছে একটি উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের দেশ। এখানে সোশ্যালিজমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। জানিনা সেটা কতটুকু সার্থক হবে।

 

প্রশ্ন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা আপনার মনে আছে?

সুনীল : স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় আমি স্কুলের ছাত্র ছিলাম। বয়স ছিল অল্প। আমি কিন্তু খুব আদর্শবাদী ছিলাম। বয়স যদি হত তবে ঠিকই স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতাম। লাঠিগুতোও খেতাম। তাতে সন্দেহ নেই। তখন ছেচল্লিশ সন। কী একটা দিবস হয়েছিল! রশিদ আলী দিবস খুব সম্ভবত। স্কুল থেকে লাইন করে বেড়িয়েছিলাম। কি গুলিটুলি চলেছিল সব। আরেকবার হাতীবাগানের কাছে থাকতাম তখন। রাস্তায় মিছিল যাচ্ছে; আমি উঁকি মেরে দেখতে গিয়েছি। হঠাৎ একটা ইংরেজ পুলিশ মুখের কাছে মেরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় আমাকে। ঘৃণাতো ছিলই, তখন আরও বেড়ে যায় ইংরেজদের প্রতি আমার ঘৃণা। ঠিক সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার বয়সটা পাইনি।

 

প্রশ্ন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রাম সম্পর্কে আপনার মতামত ও ভূমিকা বিষয়ে কিছু বলুন। মানে আপনার অনুভূতিটা কেমন হয়েছিল?

সুনীল : আমি এ ব্যাপারে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলত, বাড়াবাড়ি। বলত এটা ইউফোরিয়া। বাংলাদেশের প্রতি স্বভাবতই আমার টান বেশি। ওখানকার স্মৃতি আছে। লড়াইটা প্রথমে শুরু হয়েছিল ভাষাকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ নয় মাসের কখনো মনে হত কী যে হবে। মাঝেমধ্যে খারাপ খবর আসলে খুবই খারাপ লাগত। অনেক সময় বেরিয়ে পড়তাম। বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে যেতাম। মোটকথা, খুব বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।

 

প্রশ্ন শেখ মুজিব হত্যার পরে আপনার মনোভাব?

সুনীল : তার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছি খুব। তার ছোটছেলে রাসেলকে নিয়ে আমার একটি কবিতা আছে। রাসেল অবোধ শিশু। ঠিক মনে নেই লাইনগুলো। শেখ মুজিব বড় নেতা, বিপ্লবী বা আন্দোলনকারী ছিলেন। কথাটা শুনে বিশ্বাসই করতে পারিনি প্রথমে। বড় ব্যথা পেয়েছিলাম সেই ভোরবেলা সংবাদটা শুনে। এখন বলতে আপত্তি নেই, আমি তার একজন সমর্থক ছিলাম। একজন জাতীয় নেতা হিসেবে আমি তার আজও সমর্থক।

 

প্রশ্ন তার সঙ্গে আপনার কখোনো সাক্ষাৎ হয়েছিল?

সুনীল : হ্যাঁ। মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। কলকাতা থেকে একটা ডেলিগেশনের সদস্য হয়ে ঢাকা গিয়েছিলাম। গণভবনে তার অভ্যর্থনাটা ছিল খুবই আন্তরিক। খুবই উষ্ণ। সবে লন্ডন থেকে ফিরেছেন। খুবই ব্যস্ত। দেশি-বিদেশি দুতাবাসের নানান কমচারি ও রিপোর্টারদের জ্বালায় উনি ব্যস্ত। তার মধ্যেও তিনি আমাদের সঙ্গে সময় করে কথা বলেছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আরে আপনিতো আমার ফরিদপুরের লোক। হ্যাঁ, উনি মানুষকে কাছে টানতে পারতেন। উচ্চপদ ও ক্ষমতায় গেলে মানুষকে যেমন অনেকেই ভুলে যায়, দূরে সরিয়ে দেয়, উনি তেমন ছিলেন না।

 

প্রশ্ন আপনার প্রিয় কিছু জিনিষ সম্পর্কে বলুন, যেমন প্রিয় রং প্রিয় খাবার ইত্যাদি।

সুনীল : প্রিয় রং নেই। তবে নীল রংটা পছন্দ করি। নাম সুনীল বলে নয় কিন্তু। নীল রংটা আমার পছন্দ, নামটা কিন্তু নয়। প্রিয় খাবার বলতে কিছু নেই। সবই খাই। মাংসের চেয়ে মাছটা বেশি পছন্দ করি। খেতে বসলে কাঁচালঙ্কা হলে ভালো হয়। হাতির মাংসও খেয়েছি। ছবি দেখতে ভালোবাসি। ইউরোপিয় চিত্রকলার ইমপ্রেসনিস্ট আর্ট দেখতে আমার ভালো লাগে। লেনিনগ্রাদের হারমিতেজে ঐ ধরনের বহু কালেকশন আছে। ওখানে গিয়ে তা দেখেছি। আমেরিকার মিউজিয়ামগুলোতেও বহু দেখেছি ওসব। ক্ল্যাসিক চিত্রকলা দেখতে আমার ভালো লাগে না তেমন, আর একেবারে মডার্ন অমুক তমুকের কারুকাজও আমার ভালো লাগে না। দস্তয়ভস্কি প্রিয় লেখক। তবে প্রিয় বই বলতে কিছু নেই। শুনলে হয়ত অনেকেই হতাশ হবে। হাতের কাছে যা পাই, তাই পড়ি। একসময় খুব ডিটেকটিভ বই পড়তাম। রাজ্যের খুন জখম, রক্তারক্তি সব লোমহর্ষক কাহিনি। এক ফ্রেঞ্চ লেখক জর্জ সিমনোনের একটি ডিটেকটিভ বই পড়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে খুঁজে খুঁজে তার বই পড়তে শুরু করে দিলাম। এখন দেখছি ওর প্রায় দু'শো আড়াইশোর মতো বই আছে। ফ্রি টাইমে বই ছাড়া চলে না। ছেলের রুমে ঢুকে তার টেক্সট বই কিংবা কমিকস-টমিকস কত যে পড়ে ফেলি তার ইয়াত্তা নেই। আমার পড়াটা হচ্ছে বর্বরের মতো। কোনো বাছবিচার নেই।

 

প্রশ্ন প্রবাসী বাঙালিদের কী করা উচিত, যাতে বাংলা সাহিত্যের প্রচার ও সমৃদ্ধি ঘটে?

সুনীল : দেশেও যেমন বিদেশেও তেমন। সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপারে চিরদিনই খুব কমসংখ্যক লোক জড়িত থাকে। বেশিরভাগ লোকই বিদেশে আসে রোজগারের জন্য। সংসার আছে। নানা ঝামেলা আছে। তবে প্রবাসে যাদের সংগতি আছে তারা যদি শিল্প-সাহিত্যের জন্য কিছু করেন, তবে তারা যে এই সভ্যতার অংশীদার এটাই প্রমাণ করবেন। মানুষের একধরনের জৈবিক ব্যাপার আছে। বাঁচতে হবে, টাকা কামাতে হবে, খেতে হবে, বৌকে খুশী করতে হবে, ছেলেপেলে মানুষ করতে হবে। আরেকটা হচ্ছে, সভ্যতার ব্যাপার। সাহিত্য, সংস্কৃতি সংগীত, শিল্প, সেখানেও অংশগ্রহণ করা উচিৎ সভ্য মানুষদের। এবং তা যদি সবাই করে, তো খুবই ভালো কথা। 

প্রশ্ন দুই বাংলার মৈত্রীর ব্যাপারে কী করা উচিত?

সুনীল : দুই বাংলার মৈত্রীর ব্যাপারে খুবই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা হয়। এখানে সেখানে। এতে কোনো নতুনত্ব নেই। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি এস্টেট। কেন্দ্রে এক সরকার, কলকাতায় আরেক। কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে কি করবে বা করছে, তার উপরে আমাদের কোনো হাত নেই। বাংলাদেশের সরকার কিভাবে কী করে, তার উপর জনগণের কোনো হাত নেই। রাজনৈতিক ব্যাপারে আমাদের তেমন কিছু করার নেই। তবু সামাজিকভাবে হয়ত কিছু করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তো অন্যকোনো তফাৎ নেই, একই ভাষা, একই সংস্কৃতি ও সাহিত্য, শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই যা বিভেদ। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক একধর্মে বিশ্বাস করে, পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা অন্যধর্মে বিশ্বাস করে। তা ধর্মটা যদি যার যার ঘরে থাকে, তবেই ঝামেলা মিটে যায়। আমার তাই মনে হয়।

 

প্রশ্ন প্রবাসে দুই বাংলার বাঙালিরা কীভাবে মৈত্রীর ব্যাপারে অবদান রাখতে পারে?

সুনীল : অপপ্রচারের ফলেই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। বিদেশে রাজনৈতিক প্রচারণার কারণটা তুচ্ছ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে একটা গল্প বলি। মার্লেন ডিয়েট্রিচকে যে এরিক মারিয়া রেমার্ক বিয়ে করার জন্য খেপে ছিলেন, তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল। রেমা, তুমি আমেরিকানদের পছন্দ কর? না। উত্তরে বললেন। তুমি ব্রিটিশদের পছন্দ কর? না। তুমি জার্মানদের পছন্দ কর? না। তাহলে তুমি কাকে পছন্দ কর? আই লাইক মাই ফ্রেন্ডস। আমি আমার বন্ধুদের পছন্দ করি। তার উত্তরটি কত সুন্দর।

 

প্রশ্ন : জন্ম মৃত্যু ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার মত জানতে চাই।

সুনীল : জীবনটাতো মানুষ সহজে শেষ করতে চায় না। তাই তো মিশরীয়রা পিরামিডে মমি করে রেখে দিত শরীর। চাকর বাকর সোনাদানা সব রাখত সঙ্গে। যদি বেঁচে ওঠে, সবতো দরকার হবে। বিভিন্ন ধর্মেও মৃত্যুর পর একটা ব্যাপার আছে। স্বর্গ-নরক। দুঃখের বিষয়, এর কোনোটাতেই আমি বিশ্বাস করি না। শেষ নিঃশ্বাসটুকু ফেলব, ওখানেই ফুরিয়ে যাব। তারপর কেউ কেউ ছবি হয়ে কিছুদিন ঝুলাবে, কেউ কেউ ঝুলাবে না। এই যা পার্থক্য। জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তিতর্ক দিয়ে এটুকুই বুঝি, জীবনের পর মৃত্যু। তারপর শেষ। কয়েকদিনের খেলামাত্র।

 

প্রশ্ন অনেকে জীবদ্দশায় খ্যাতি পান না, মৃত্যুর পরে বিখ্যাত হন। তারা কী পান জীবনের কাছ থেকে?

সুনীল : তাঁদাল, বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ সাহিত্যিক, জীবিতকালে কোনো দাম পাননি। ফ্রানৎস কাফকার লেখা কেউ পড়েনি জীবিতকালে। অথচ আজ অতি বিখ্যাত নাম। পাওয়া না পাওয়ার ব্যাপারটা আছে বলেইতো জীবনটা ইন্টারেস্টিং।

একটা ঘটনার কথা বলি। জাঁ জেনে ফ্রেঞ্চ লেখক। তিনি ছিলেন চোর, গুন্ডা ও খুনী। জেলে বসে আত্মজীবনী লেখেন। একবার পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে গেলে দ্বিতীয়বার লেখেন। এওকি সম্ভব? পরে সেটা কোনাক্রমে বাইরে চলে যায়। প্রকাশিত হয়। জাঁ পল সার্ত্রে তাকে নিয়ে বই লিখে আখ্যা দিলেন: 'সেইন্ট'। জীবিত লোককে সেইন্ট আখ্যা দিলেন পাশ্চাত্য জগতের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী। বইয়ে সার্ত্র লিখলেন ‘এই একটা বিরাট রহস্যের কাছাকাছি যাচ্ছি আমরা। মানুষ কেনো লেখে। এই লোকটা যে নাকি যাবজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সাহিত্যিক খ্যাতির কথা জানে না, বোঝে না, এ জিনিস যে প্রকাশিত হবে তাও সে কোনোদিন জানত না, তাও সে লিখল। একবার নয়, দু’বার। নিশ্চয়ই অদ্ভুত এক প্রেরণা কাজ করেছিল তার মধ্যে। যাকে চিরাচরিত নিয়ম কানুনের ছকে ফেলে বিচার করা যায় না। পরে অবশ্য সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের আবেদনে তার মুক্তি হয়। পরে আরও লিখলেন। উনি ফ্রেঞ্চ সাহিত্যের একটি স্তম্ভ। কেনো যে লেখে মানুষ, সেটা একটা আশ্চর্যের ব্যাপার।

কলকাতায় সোনাগাছি বলে একটা জায়গা আছে। মদ খাওয়ার জন্য ওখানে যেতাম। ১৫ টাকা দিয়ে একটা ঘর পাওয়া যেত, আরও পাওয়া যেত একটি মেয়ে। আমাদের কিংবা বন্ধুদের ঘরে মদ খাওয়াটা ছিল রিস্কের ব্যাপার। মেয়েটা আমাদের জল কিংবা গ্লাস এগিয়ে দিত। আমরা কবিতা নিয়ে গল্প করতাম। আড্ডা দিতাম। হঠাৎ ও একদিন বলে ‘তোমরা বুঝি কবিতা লেখ, আমিও লিখি।’ এই বলে মাচার ওপর থেকে টেনে বের করল খাতা। একটি নয়। দশ দশটি খাতা। আশ্চর্যের ব্যাপার। একটি বেশ্যা মেয়ে লিখছে কবিতা। তাও আবার দশখানা খাতা ভর্তি। যখন আমার খারাপ লাগে তখন লিখি, মেয়েটি বলল। এ এক আশ্চর্যের ব্যাপার। মানুষ কেনো লেখে। অডেনের কবিতাটি মনে আছে কি না তোমাদের : Those who are true christians ought to write prose, because poetry is magic.

 

প্রশ্ন কোনো স্মরণীয় ঘটনা? শৈশবের?

সুনীল : দারিদ্র্যে কেটেছে। এক দোলের সময় একখানি জামা ছিল বলে সকালবেলা বের হইনি। বিকেলবেলা বেরানোর পর হঠাৎ একটি ছেলে প্যাচ করে জামায় রং দিয়ে দিল। আমার রাগ হল। চড় দিলাম ওকে। ছেলেটা হতভম্ভ হয়ে কেঁদে দিল, বলল, 'মারলে কেনো, মারলে কেনো, আমিতো ম্যাজিক কালার দিয়েছি'। আমিতো জানতুম না। আসলে রংটা একটু পরেই উঠে যাবে। তেমন সিরিয়াস ছাত্র ছিলাম না। বাবার কাছে আমার শর্ত ছিল পাশ করতে হবে, ব্যস। এর বেশি কিছু না।

 

প্রশ্ন আপনাকে যদি মৃত্যুর পর আবার জীবন ফিরিয়ে দেয়া হয়, তবে কি আবারও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন ফিরে পেতে চাইবেন?

সুনীল : না, তা চাইবো না। মেয়েদের জীবন চাইবো। কারণ ও জীবনটা আমার ভালো করে জানা নেই, তাই।(হাসি) জানতো মহাভারতে একটা গল্প আছে। যদিও আজকের যুগে গল্পটা ইরেলেভান্ট হয়ে গেছে। সেই যে একজন রাজা মেয়ে হয়ে গিয়েছিলেন। যুধিষ্ঠীর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ছেলে আর মেয়ের মধ্যে যৌন আনন্দ কে বেশি পায়? এটা বলা খুব শক্ত। ভীস্ম বললেন, ‘দ্যাখো এক রাজা ছিলেন।শিকার করতে গিয়ে পুকুরে স্নান করার সময় মেয়ে হয়ে যায়। মেয়ে হওয়ার পর তার বিয়ে হয়। তার গর্ভে বাচ্চাটাচ্চা হয়। অনেকদিন পরে সে খবর পায় তার শাপমুক্তি হবে, সে আবার পুরুষ হয়ে যাবে। তাকে বলা হয়, সে যেন আবার তার রাজ্যে ফিরে যায়। শুনে রাজা বললেন, না, বাবা, আমি আর ফিরে যেতে চাই না। এ জীবনে যে আনন্দ পেয়েছি, তা ওখানে গিয়ে আর পাব না। এই গল্পটা আমার মনে স্ট্রাইক করে। যুধিষ্ঠীরটা কী বোকা। সে এই প্রশ্নটা করেছে কাকে? না ভীস্মকে। যে জীবনে কোনদিন মেয়েকেই জানলনা।

 

প্রশ্ন : আপনার জীবনে কোনো ক্ষোভ বা ব্যর্থতা রয়ে গেল?

সুনীল : উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। ক্ষোভও নেই তাই। যা পেয়েছি, বেশ ভালোই পেয়েছি। অনেক সময়ই মনে হয় এটাতো পাওয়ার কথা ছিল না। এই যে সুইডেন ঘুরে গেলাম। এটাই কি ঠিক ছিল আগে থেকে? ফলে যাই-ই পাই, মনে হয়, ভালোই হল। বেশতো।

 

প্রশ্ন আপনি তাহলে সুখী?

সুনীল : হ্যাঁ, সুখী তবে তৃপ্ত নই। মানুষ হিসেবেই আমি অতৃপ্ত। শিল্পী মানসের অতৃপ্তি নয়।

 

প্রশ্ন : প্রেম বিষয়ে অতৃপ্তি নাকি অন্য কিছু?

সুনীল : না প্রেম নয়। অন্যকিছু। মনে হয় আরো উঁচু ও ভালো মানুষ কেনো হতে পারলাম না। কাউকে পাঁচ টাকা ভিক্ষা দিলাম। পরমুহূর্তেই মনে হল, দশ টাকা কেনো দিলাম না। ততক্ষণে লোকটা চলে গেছে। এই যে মনের ক্ষুদ্রতা, কেনো আরও উদার হতে পারলাম না। মহৎ হতে পারলাম না। প্রথমেই কেন দশ টাকা দিলাম না।

 

প্রশ্ন দুই হাজার সালে বাঙালি জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃথিবীর প্রথম সারির দেশগুলোর সমপর্যায়ে আসতে পারবে?

সুনীল : বাঙালিদের সবই আছে। বিদ্যা ও বুদ্ধি। জ্ঞান ও মানসিকতা। তবে অধিক জনসংখ্যার কারণে সবাই ভালোভাবে সুযোগ সুবিধে পাচ্ছে না। এর পরিবর্তন অবশ্যই হবে।

 

প্রশ্ন : আপনি কি এমন বাংলার স্বপ্ন দেখেন, যেখানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না?

সুনীল : হ্যাঁ, অবশ্যই। মাথায় আমার একটা স্বপ্ন ঘোরে। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রনায়করা যদি ঠিক করত, কাল থেকে আর অস্ত্র বানাব না। কি ভালো হত। কেউ কারো রাষ্ট্র দখল করতে পারে না এই বিংশ শতাব্দীতে। তবু শুধু শুধু অস্ত্র কিনে বর্ডার ফোর্স বাড়িয়ে কী লাভ? কিই বা লাভ সৈন্যবাহিনী তৈরি করে? বোকামী শুধুই বোকামি। এদের কমনসেন্স নেই। যাদের আছে সেই সাধারণ মানুষ তুমি আমি, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে  আমরাতো অনেক দূরে বসে আছি । এই হচ্ছে ট্র্যাজেডি। একটা মিসাইলের খরচ দিয়ে তেরলক্ষ শিশুর এক বছরের খাবার হয়। মানুষতো সব জীবজন্তুকেই মেরেছে। কব্জা করেছে। বাকি আছে নিজেরাই শুধু এখন নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করবে। আর তারই জন্য এত জোগাড়যন্ত। দুঃখ লাগে ভাবলে। সত্যি দুঃখ লাগে।

 

প্রশ্ন : আপনি কী আপনাকে কবি বলে মনে করেন না কি ঔপন্যাসিক অথবা দুটোই?

সুনীল : লিখিতো সবই। তবু যখন একলা থাকি একান্তভাবেই নিজের মধ্যে নিজে, তখন নিজেকে একজন কবিতা লেখক বলেই মনে করি। এবং কবিতা আমি ভালোবাসি। রাস্তায় বেরুলে কেউ যখন ডেকে বলে, অমুক লেখাটার কি হল, বা অন্যকিছু, তখন হুট করে মনে পড়ে যায় ওহো, আমিতো গল্পও লিখি। আমি নিজেকে কবি বলে মনে করি না। কবিতা লেখক। কবি হয়ত এখনও হতে পারিনি।

 

প্রশ্ন : বিশ পঁচিশ বছর পর কবিতার রূপ কি খুবই বদলে যাবে?

সুনীল : এরকম কথা আগেও বহুবার উঠেছে। ‘শিল্প সাহিত্য বেশিদিন আর টিকিবে না।’ কিন্তু টিকেতো গেছে। টিকেতো আছে। ইদার্নিং কম্পিউটার মেশিনের কথা সবাই বলছে, উনি নাকি সংগীত সাহিত্য সব হটিয়ে দেবে। তবে আমার বিশ্বাস, আর্ট বা শিল্প বলতে আমরা যা বুঝি, তার ক্ষুধা মানুষের মধ্যে চিরদিনই থেকে যাবে। যেমন ধর, মানুষ যত কিছুই করুক, যত কম্পিউটারই নাড়ুক চাড়ুক, বাড়িতে এসে ঘুমালে সে স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্নতো বাস্তবের কিছু নয়। যুক্তিরও কোনো ব্যাপার নয়। স্বপ্ন যে দ্যাখে না সে না কি পাগল হয়ে যায়। ধনীরাও স্বপ্ন দেখে। গরীবরাও স্বপ্ন দেখে। আমার মনে হয় শিল্পটার সঙ্গে স্বপ্নটার, আর স্বপ্নটার সঙ্গে শিল্পটার বেশ যোগাযোগ আছে। স্বপ্ন বাদ দিলে যেমন মানুষ চলতে পারে না। তেমনি শিল্পটাও তার মানসিক ভারসাম্য বজায় রেখে জীবনের পথে চলার প্রেরণা যোগায়।

 

প্রশ্ন : কিন্তু সে শিল্পের রূপ কি আর এমন থাকবে?

সুনীল : হয়ত বদলাবে। কিন্তু চট করে নয়। যা তাড়াতাড়ি বদলায় তা স্থায়ী হয় না। গ্রাহ্য করা হয় না। সংগীত যেমন বদলেছে। দ্রুত তালে পপ্ রক হচ্ছে। আগে ছিল ধীর স্থির সুরের গান। কিন্তু কবিতা বা উপন্যাসে এত দ্রুত পরিবর্তন সূচিত হবে বলে আমার মনে হয় না। কবিতার রূপ এখনও ধ্রুপদী বলেই ভালো লাগে।

 

প্রশ্ন : মানুষের জীবনে প্রথম প্রেমের স্থান কোথায়?

সুনীল : সে প্রেম যদি সত্যিকার প্রেম হয় তবে মানুষ তা ভুলতে পারে না। আমার প্রথম প্রেমের সে মেয়েটিকে আজো আমি ভুলতে পারিনি। সময়ের টানে সে কোথায় হারিয়ে গেছে, তাকে এখন দেখলেও হয়ত চিনতে পারব না, তবু তার ইমেজটা মানসপটে অক্ষয় হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের কথাই ধর না (ভেবো না তার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করছি)। তিনি তার বৌদি কাদম্বরী দেবীর প্রেমে পড়েন। তেইশ বছর বয়স যখন রবীন্দ্রনাথের, তখন কাদম্বরী দেবী মারা যান। তবু রবীন্দ্রনাথ সত্তর বছর বয়সেও তাকে নিয়ে কবিতা লেখেন। তার নাম চলে আসে কবিতায়। বিভিন্নভাবে মোট সাতখানা বই উনি উৎসর্গ করেছিলেন কাদম্বরী দেবীর নামে। প্রথম প্রেমটা কি স্ট্রং তার জীবনে, ভেবে দ্যাখো।

 

প্রশ্ন : প্রথম প্রেমটা কী হলে ভালো হয়? মিলনাত্মক? না কী...?

সুনীল : মিলনাত্মক হলেতো দ্বিতীয় প্রেম আর থাকল না। তবে প্রথম প্রেমটাই শেষ প্রেম হয়ে অমর হয়ে থাকে। এমনও হয়। মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকে। শুনেছি আমার প্রথম প্রেমিকা না কি লন্ডনে থাকে। কতবার লন্ডনে গেছি, কিন্তু তাকে খুঁজিনি। আমার স্ত্রীর ভয়ে বিরত থেকেছি তা কিন্তু নয়। বরং অন্য আরেকটি ভয়। আমার স্মৃতি আছেতো সেই স্বপ্নময় স্মৃতির সঙ্গে বাস্তবতো মিলবে না। এবং তাতে ব্যথাই পাব স্মৃতি ভঙ্গের নিদারুণ ব্যথা। ফরিদপুর আমার জন্মভূমি। বাংলাদেশে গেছি কিন্তু ওখানে যাইনি। স্মৃতি, সেই জাম্বুরা গাছ, আড়িয়াল খাঁ নদী, ধানক্ষেত। সেসবতো নেই। সেখানে হয়ত দালান উঠেছে। কত পরিবর্তন হয়েছে। ওটা এখন দেখলে বরং বেদনাই বাড়বে। লাভ কিছুই হবে না। স্মৃতি নিয়ে থাকা বরং অনেক ভালো। অনেক সুখের। দান্তের গল্পটা জান না? প্রেমিকাকে বহুদিন পর তিন বাচ্চাসহ দেখে তিনি হতাশ হয়ে গেলেন। ‘আমি আর ওকে দেখতে চাই না বাবা। আগে যা দেখেছি তাই অক্ষয় হয়ে থাক।’ এই বলে উঠেছিলেন। ‘স্মৃতি বরং বহু ভালো, বহু শ্রেয়।’ একটা মজার কথা বলি শোনো। সোভিয়েত ইউনিয়েনের উক্রাইনের রাজধানী কিয়েভ শহরে আমার এক বেশ নামী সাহিত্যিকের সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট ছিল। আমার সঙ্গে যে দোভাষী ছিল সে আমাকে বলল, ‘তোমার সঙ্গে যেতে পেরে আমি খুব সৌভাগ্যবান। ছোটবেলা এই সাহিত্যিকের কত বই পড়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। তার সঙ্গে দেখা হতে যাচ্ছে, এ আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা।’

সৌম্যমূর্তির সেই সাহিত্যিক আমাকে বললেন, ভালোই হল। বেঙ্গল থেকে আমার যে বইটা ইদার্নিং বেরিয়েছে, তাতে প্রথম পৃষ্ঠাতেই বেঙ্গল সম্পর্কে লেখা আছে। গল্পটা হচ্ছে একটি নার্স বেঙ্গল থেকে ফিরেছে। স্কুলের সব মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরেছে এবং নানা রকমের প্রশ্ন করছে। কেউ বলছে, বলো সেই বেঙ্গলের কথা যেখানে আমাদের সাইবেরিয়ার হাঁস উড়ে যায়। বলো আমাদের সেই বেঙ্গলের কথা যেখানে মেয়েরা কালো চুল খোলা রেখে বসে থাকে। কেউ বলছে, বলো সেই বেঙ্গলের কথা যেখানে মেয়েদের বড় বড় টানাটানা কাজল কালো চোখ, যেখানে পুকুরে পদ্মফুল ভাসে। ইত্যাদি।

আমিতো শুনে একদম থ খেয়ে গেছি। বলি, আপনি কি রূপকথা লিখেছেন মশাই? উক্রাইনি সাহিত্যিক মহাশয় মুচকি হেসে বললেন, না, না। এতো গেল প্রথম পৃষ্ঠা। স্মৃতির পৃষ্ঠা। এখানে আছে রূপকথার সেই বাংলা। সোনার বাংলা। ছোট্ট ছেলেমেয়েদের মনে যা আজও দোলা দেয়। পরের পৃষ্ঠায় আছে আজকের বাস্তব অবস্থা। নার্স মেয়েটি সবার প্রশ্নের উত্তরে বলল, আমি বেঙ্গলে গিয়েছিলাম। ওখানে এখন দারুণ বন্যা। চারদিকে শুধু জল আর জল। লোকজন সব হাত বাড়িয়ে আছে। খাবারের জন্য। লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে। খাবার চাই, খাবার চাই রব উঠেছে। এইতো হচ্ছে পার্থক্য। স্মৃতি আর বাস্তব। সম্পূর্ণ আলাদা। 


সাক্ষাৎকার এখানেই শেষ হয়েছিল। রাত তখন গভীর। চারদিকের ফ্ল্যাটে নিস্তব্ধতা। সেদিন আকাশটা ছিল মেঘহীন, নির্মল। বাতাস ছিল ঝিরিঝিরি। স্মৃতি আর স্বপ্ন দুচোখে আর হৃদয়ে ভরে নিয়ে ফিরে এলাম তার কাছ থেকে। সারাটা পথ পাতাল রেলে একা। তবু মনে হচ্ছিল এই অজস্র কথা তার সঙ্গে, এই আলোচনা, ওঠা বসা তার স্নেহ আর ভালোবাসা, দুর্লভ হীরের মতো উজ্জ্বল হয়ে রইল আমাদের এই প্রবাস জীবনে। এ যেন আরেক শৈশবস্মৃতি। আরেক আড়িয়াল খাঁ, আরেক অনবদ্য স্মৃতির সুবাস। যা চির অক্ষয় হয়ে থাকবে। 

বাবুল সিরাজী : সুইডেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক

//জেডএস//

x