বুদাপেস্টকে আঘাত করে || নো ভায়োলেট বুলাওয়ায়ো

অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী ০১:৫৯ , সেপ্টেম্বর ০৯ , ২০১৯

[ভূমিকা ও লেখক পরিচিতি: 'নো ভায়োলেট বুলাওয়ায়ো' লেখকের ছদ্মনাম। তার প্রকৃত নাম এলিজাবেথ জান্ডিল টেশেলে। তিনি ১৯৮১ সালের ১২ অক্টোবর জিম্বাবুয়ের শলোতসো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ‘ভায়োলেট’ লেখকের মায়ের নাম আর জিম্বাবুয়ের লোকভাষায় ‘নো’ অর্থ ‘সঙ্গে’। লেখক তার ছদ্মনাম গ্রহণ করার সময় মা ভায়োলেটের নাম নিয়ে এটাও জানিয়ে দেন যে, তিনি প্রয়াত ভায়োলেটের সঙ্গে আছেন। আর ‘বুলাওয়ে’ জিম্বাবুয়ের সেই শহর যেখানে তিনি বড় হয়ে ওঠেন।

বুলাওয়ে তার অল্প বয়সেই পরিবারের অনেক নিকটজনের এইডস রোগে মৃত্যু হতে দেখেছেন। স্বল্প বয়সেই অনেক মৃত্যুতে প্রচুর স্বজন হারানো ও ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের অভিশাপে পীড়িত জিম্বাবুয়েতে বড় হওয়া এই লেখক তাই তার আখ্যান রচনা করেন একদমই অলঙ্কারবর্জিত, ছিপছিপে ও নির্মেদ এক ভাষায়। অথচ, তারই পরতে পরতে এক ধরনের কালো রহস্যময়তা ও খুব নির্মেদ ভাষাতেই কোনো কোনো শব্দ ব্যবহারে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে পাঠককে দেন অতীন্দ্রিয়তার আস্বাদ।

যেমন ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ গল্পটির কথাই ধরা যাক—গল্পে বুলাওয়ে শহরের কয়েকটি ছেলে ও মেয়েশিশু অভিজাতপাড়া ‘বুদাপেস্ট’-এ যাচ্ছে খাবার চুরি করতে। শিশুদের কারো নাম ‘বেজন্মা (বাস্টার্ড),’ কারো নাম ‘খোদা জানে (গড নোজ)’ আবার কারো নাম ‘প্রিয়া (ডার্লিং)’। বেজন্মার ছোট বোনের নাম আবার ‘ভগ্নাংশ (ফ্র্যাকশন)’। আছে আমাদের দেশেও, সমাজের দরিদ্র শ্রেণিতেই ‘মরা’, ‘পচা’ এমন নানা নাম শিশুদের রাখা হয়। আছে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত নাম ‘স্টিনো’ আবার নিখাদ আফ্রিকীয় নাম ‘চিপো’ বা ‘সবহো।’ এই ছ’টি ছেলে ও মেয়ে শিশু ‘স্বর্গ’ (প্যারাডাইস) নামক তাদের বস্তিতে মায়েদের চোখের সামনে থেকে বেরিয়েই দূরে শহরের বিত্তশালী বা অভিজাত এলাকায় যাচ্ছে খাবার খুঁজতে। যেহেতু  মায়েরা চুল আঁচড়ানোয় আর কথা বলায় ব্যস্ত থাকে তাই তারা বাচ্চাদের খেয়াল করে না । বাচ্চাদের খেয়াল করে না জাকারান্দা গাছের নিচে দাঁড়ানো বস্তির বয়সী পুরুষেরাও। তাদের চোখ তাস খেলাতেই আটকে থাকে। আর সেই ফাঁকে বস্তির বাচ্চারা ছুটছে অভিজাত এলাকা ‘বুদাপেস্ট’-এ খাবার চুরির আশায়। আমাদের ‘গুলশান-বনানী-উত্তরা-বারিধারা’র মতই জিম্বাবুয়ের বুলাওয়ে শহরের অভিজাত এলাকা ‘বুদাপেস্ট’। বুদাপেস্ট কেমন? বস্তির মতোতো নয় একেবারেই। দুগ্ধ ফেননিভ সব বিশাল বাড়ি, কংক্রিটের দেয়াল আর কাঁচের জানালা, বাড়িগুলোর সামনে অনেক ফল বা ফুলের গাছ। তবে বুদাপেস্টে ঢুকলে মনে হয় যেন এক বিরাণ বা শূন্য এলাকা। এখানকার মানুষেরা সব যেন পাসপোর্ট হাতে বিদেশ চলে গেছে। হ্যাঁ, আফ্রিকার বিত্তশালীরা তো আমাদের বিত্তশালীদের মতোই আরো নিরাপদে থাকতে উন্নত পশ্চিমে পাড়ি জমায়। বাচ্চাগুলো বিত্তশালীদের বাড়ির পেয়ারা চুরি করে খায়। পেয়ারা খেয়েই পেট ভরে যায় ওদের। এই বাচ্চাদের কারোর ‘সুজন কাকা (আঙ্কল পোলাইট)’ বিদেশে গিয়ে শুরুতে এটা-সেটা পাঠালেও এখন আর চিঠিও লেখে না। কারো বয়স্কা কোনো আত্মীয়া আমেরিকায় কাজ করে। চিপো নামের দশ বছরের মেয়েটি তার পিতামহের হাতেই গর্ভবতী হয়েছে বলে আগের মতো সেরা দৌড়বিদ আর নেই এই শিশুদের ভেতর। তবু, সে-ও বের হয়েছে পেয়ারা চুরির অভিযানে। পেট ভরে পেয়ারা খাবার পর বস্তির পাশের কবরখানার পেছনে এক ঝোপের আড়ালে শিশুগুলো দ্যাখে এক নারীর লাশ। শিশুগুলোর দলপতি ‘বেজন্মা’ নামের ছেলেটি মৃতার হাতের ঘড়ি চুরি করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে একটি বা দেড়টি রুটি পাওয়া যেতে পারে বলে জানায়।...সব বলে দিলাম নাকি? অনুনকরণীয় ক্রোধ ও রহস্যে লেখা এই গল্পটি ২০১১ সালে ‘আফ্রিকার ম্যানবুকার প্রাইজ’ হিসেবে পরিচিত ‘কেইন প্রাইজ ফর আফ্রিকান রাইটিং’ পুরস্কার অর্জন করে।

জিম্বাবুয়েতে জন্ম নেওয়া ও বড় হওয়া এই লেখক নজুবে হাইস্কুলে পড়াশোনা করার পর মিজিলকাজি হাইস্কুলে এ লেভেল পড়তে যান। মিজিলকাজি সড়কের নাম এই অনূদিত গল্পে আছে। মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে কলেজের পড়া শেষ করে তিনি কালামাজু ভ্যালি কম্যুনিটি কলেজে ভর্তি হন এবং ইংরেজিতে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে টেক্সাসের এ এ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি কমার্স ও সাউদার্ন মিডল-ইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০১০ সালে তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে ‘মাস্টার অফ ফাইন আর্টস’ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানে তাকে ট্রুম্যান কাপোটে ফেলোশিপ দেয়া হয়। ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ গল্পটিই তার ‘উই নিড নিউ নেমস’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। উপন্যাসটি ২০১৩ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য শর্ট-লিস্টেড হয়েছিল। এছাড়াও তিনি এতিসালাত প্রাইজ ফর লিটারেচার ও হেমিংওয়ে ফাউন্ডেশন/পেন এওয়ার্ড পেয়েছেন)। জিম্বাবুয়ের এই লেখক স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টেগনের ফেলো (২০১২-১৪)। ২০১২ সালে ‘দ্য ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন’ তাকে ৩৫ জন সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকাভুক্ত করে।]

আমরা বুদাপেস্ট যাবার পথে চলেছি: ‘বেজন্মা’ এবং ‘চিপো’ আর ‘খোদা জানে’ ও ‘সবহো’ আর ‘স্টিনা’ এবং ‘আমি।’ আমরা তো রাস্তায় হেঁটে চলেছি যদিও এমনকি মিজিলিকাজি সড়ক পার হবারও অনুমতি নেই আমাদের, যদিও কিনা বেজন্মার দায়িত্ব হলো ওর ছোট বোন ভগ্নাংশকে দেখে রাখা, আরযদিও মা আমাকে বাইরে বের হতে দেখলে খুন করবে; তবু আমরা চলেছি। বুদাপেস্টে চুরি করার জন্য প্রচুর পেয়ারা আছে আর ঠিক এক্ষণি পেয়ারার জন্য আমি মারা যাবো, অথবা পেয়ারার জন্য দরকারী এমন যে কোনো কিছুর জন্য। পেটের ভেতরটা এমন করছে যেন কেউ বেলচা দিয়ে খুঁড়ে নাড়ি-ভুড়ি সব বার করে এনেছে।

‘স্বর্গ’ থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন নয় যেহেতু আমাদের মায়েরা এখন তাদের চুল ঠিক করা আরকথা বলায় ব্যস্ত। আমরা তাদের পাশ দিয়ে আসার সময় তারা আমাদের একবার দেখে নিয়ে আবার দূরে তাকায়। জাকারান্দা গাছের নিচে দাঁড়ানো পুরুষেরা অবশ্য আমাদের দিকে তাকায় না এবং তাদের চোখ কখনোই তাস খেলা থেকে অন্য দিকে সরে না। শুধুমাত্র বস্তির একদম গেঁড়ি বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে তাকায় এবং আমাদের পিছু পিছু ওরা আসতেও চায়, কিন্তু বেজন্মা শুধু সামনের উলঙ্গ বাচ্চাটির মাথায় তার মুঠি দিয়ে একটি ঘা বসায় আর তারপর বাচ্চারা সবাই পিঠ ফিরিয়ে দৌঁড় দেয়।

এই ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করতে করতে আমরা ছুটে চলেছি; বেজন্মা সবার সামনে যেহেতু সে আজখেলায় জিতেছে আর ও মনে করছে ওর হাতেই সব ক্ষমতা, আর তারপর আমি আর খোদা জানে, স্টিনা এবং সবার শেষে আসে চিপো যে আগে ‘স্বর্গ’-এ দৌড়ে সবার সেরা হতো তবে ওর দাদাজান ওকে গর্ভবতী করার পর থেকে আর পারে না।

মিজিলিকাজি সড়ক পার হবার পর আমরা আর একটি ঝোপের ভেতর দিয়ে হড়কাতে হড়কাতে চলি, বিশাল স্টেডিয়ামের পাশে আশা সড়কের কাছ থেকে জোরে ছুটি যেখানে কিনা আবছা আলোয় সব বেঞ্চি পাতা যদিও আমরা সেসব বেঞ্চিতে কখনো বসবো না। চিপোর বিশ্রামের জন্য আমাদের একবার থামতে হবে।

‘তোমার বাচ্চাটা কখন হবে?’ বেজন্মা জিজ্ঞাসা করে। চিপোর জন্য আমাদের থামতে হলে বেজন্মা একদম পছন্দ করে না। আমরা যেন ওর সাথে একদমইনা খেলি, সে চেষ্টাও সে করেছে।

‘হবে একদিন।’

‘কবে? কাল? বৃহস্পতিবার? আগামী সপ্তায়?’

‘আহা দেখতে পাচ্ছিস না ওর পেট এখনো ছোট? বাচ্চাটাকে আগে তো বাড়তে হবে।’

‘বাচ্চা তো পাকস্থলীর বাইরেই বাড়ে। সেজন্যই তারা জন্ম নেয়। সেজন্যই তাদের জন্ম হয়।’

‘ঠিক আছে, এখনো সময় হয়নি। সেজন্যই এখনো ওর পেট বড় হয়নি।’      

‘এটা কী ছেলে না মেয়ে হবে?’

‘ছেলে। প্রথম বাচ্চা ত’ ছেলেই হয়।’

‘কিন্তু তুমি তো মেয়ে। তুমি তো তোমার মা’র প্রথম বাচ্চা।’

‘আমি বলেছি আর কি ধরো তেমনটা হতে পারে।’

‘উফ্ মুখটা বন্ধ করো, এ যেন তোমার নিজের পেট নয়।’

‘আমার মনে হয় এটি একটি মেয়ে। আমার পেটের ভেতর কোনো লাথি তো পাই না।’

‘ছেলেরা পেটের ভেতর লাথি মারে, ঘুষি মারে আর মাথা দিয়ে গুঁতোয়।’

‘তুমি কি ছেলে চাও?’

‘না। মানে হ্যাঁ। কি জানি হতে পারে।জানি না আসলে।’

‘বাচ্চা ঠিক কোথা থেকে আসে শুনি?’

‘যেভাবে এটা পেটের ভেতর ঢোকে।’

‘ঠিক কিভাবে এটা পেটের ভেতরে ঢোকে?’

‘প্রথমত, খোদাকে সেখানে বাচ্চা রাখতে হয়।’

‘না, কোনো খোদা না। একটি পুরুষকেই সেখানে বাচ্চা রাখতে হয়। আমার খালাতো ভাই মুসা আমাকে বলেছে। তোমার দাদাজানই কি তোমার পেটে বাচ্চা রাখেননি, চিপো?’

চিপো এবার মাথা নেড়ে মেনে নেয়।

‘তারপর একটি পুরুষ যদি সেখানে বাচ্চা জন্মই দেয়, সে কেনো সেটি বের করে নেয় না?’

‘কারণ মেয়েরাই বাচ্চার জন্ম দেয়, মোটা মাথা কোথাকার। এজন্যই ওদের বুক থাকে যাতে বাচ্চারা দুধ খেতে পারে।’

‘কিন্তু চিপোর বুক এখনো ছোট। পাথরের মতো।’

‘বাচ্চা এলেই বড় হয়ে যাবে। তাই না চিপো?’

‘আমি চাই না আমার বুক বড় হোক। আমি বাচ্চা চাই না। আমি অন্য কিছু চাই না, শুধু পেয়ারা খেতে চাই,’ চিপো বলে এবং আবার ছোটা শুরু করে।আমরা ওর পিছ পিছ দৌড়াই।দৌড়াতে দৌড়াতে বুদাপেস্ট শহরের মাঝামাঝি এসে আমরা থামি। বুদাপেস্ট যেন একটি আলাদা দেশ।এমন একটি দেশ যেখানে এমন মানুষেরা থাকে যারা ঠিক আমাদের মতো না।

তবে এই দেশটি আরদশটা সাধারণ দেশের মতোও নয়—দেখে মনে হয় যেন কোনো একদিন এই দেশের সবাই ঘুম থেকে উঠে তাদের ফটক, দরজা, জানালা সব বন্ধ করে, পাসপোর্ট হাতে নিয়ে আরো ভালো কোনো দেশে চলে গেছে। এমনকি বাতাসও কেমন ফাঁকা; কিছু পুড়ছে না, রান্না করা খাবারের কোনো গন্ধ নেই বা কোনো কিছু পচছেও না, শুধু সাদা বাতাস যেখানে আরকিচ্ছুটি নেই।

বুদাপেস্ট বড়, নুড়ি বিছানো যত উঠোন আর দীর্ঘ যত বেড়া এবং কংক্রিটের নানা দেয়াল আর ফুল ও সবুজ গাছে ভরা, গাছগুলো ফলে ভরা যারা কিনা ঠিক আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে যেহেতু এখানে আশপাশের কেউই বোধ করি জানে না যে ফল কি কাজে লাগে।এই ফলগুলোই আমাদের সাহস দেয়, নয়ত আমরা এখানে আসার সাহসই করতাম না। মনে হচ্ছে এই না বুঝি এখানকার রাস্তাগুলো থুতু মেরে আমাদের আবার বস্তিতেই ফিরে যেতে বলে।

আমরা চিপোর চাচার গাছ থেকে ফল চুরি করতাম, তবে সেই চুরি যেন ঠিক চুরি ছিলনা। চিপোর চাচার গাছের সব ফল চুরি করার পর আমরা অন্য অপরিচিত মানুষদের গাছের ফল চুরি করা শুরু করলাম।এত সব বাড়ির গাছ থেকে আমরা ফল চুরি করেছি যে আমি সব গুণতেও পারবো না। আমাদের ভেতর খোদা জানে এই সিদ্ধান্ত নিল যে আমরা নির্দিষ্ট যে কোনো একটি রাস্তা বেছে নেবো এবং সেই সড়কের প্রতিটি বাড়ি দেখা শেষ করে তবেই আমরা অন্য পথে যাবো। যেন আমরা গুলিয়ে না ফেলি যে কোথায় ছিলাম এবং কোথায় যাবো। এটা একটা কৌশল আরখোদা জানে বলে এভাবেই কেবল আমরা আরো ভালোভাবে চুরি করতে পারবো।

আজআমরা আরএকটি নতুন সড়কধরেছি এবং তাই সতর্কতার সাথে চারপাশ খুঁটিয়ে দেখছি। আমরা অতিক্রম করলাম এসএডিস সড়ক, যেখানে কিনা সপ্তাহ দুই আগে আমরা প্রতিটা পেয়ারা গাছ থেকে ফল চুরি করেছি। আমরা দেখতে পাই যে সাদা পর্দা সরে যায় এবং মাখনের মতো যে বাড়িটায় একটি ডানাঅলা, তবে প্রশ্রাব করতে থাকা, বালকের মূর্তি আছে, সেই বাড়ির জানালা থেকে একটি মুখ দেখা যায়। আমরা দাঁড়াই এবং তাকিয়ে থাকি, অপেক্ষা করি এই মুখটি কি করবে যখন কিনা জানালাটি খুলে যায় এবং আমাদের দিকে একটি ক্ষীণ কণ্ঠের চেঁচানি শোনার জন্য প্রতীক্ষা করি। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। এজন্য নয় যে জানালার পাশের মুখটি আমাদের থামতে বলেছে। কারণ আমাদের কেউই এখনো দৌড় শুরু করিনি। কারণ গলার স্বরটি অত বিপজ্জনক শোনায় না। জানালা থেকে সঙ্গীত গলিয়ে সড়কে চুঁইয়ে পড়ছে; এটা কাইতো নাচের গান নয়, কোনো নাচের হলঘর নয়, আমাদের জানা-শোনার পরিধির ভেতর কিছু নয়।

এক দীর্ঘকায়া, ক্ষীণাঙ্গী নারী দরজা খোলেন এবং ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি কিছু খাচ্ছেন এবং আমাদের দিকে যেন ঢেউ তুলে এগিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে মহিলার ভয়ানক রুগ্ন স্বাস্থ্য দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা এমনকি দৌড়ও দেব না। আমরা মহিলার জন্য অপেক্ষা করি, যাতে আমরা দেখতে পাই যে তিনি কেনো আমাদের দিকে বা আদৌ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন কিনা; ‘স্বর্গ’-এ কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসে না। শুধুমাত্র হাড়ের মা ছাড়া যিনি কিনা সবার দিকেই তাকিয়ে হাসেন। মহিলা ফটকের পাশে থামেন; এটা তালা দেয়া এবং তিনি তার সাথে এটা খোলার চাবি আনেননি।

‘জিজ, আমি এত গরম সইতে পারছি না। পায়ের নিচে মাটি কি শক্ত, তোমরা বাবা কিভাবে যে সব সও?’ অ-বিপজ্জনক কণ্ঠস্বরে মহিলা বলেন।তার হাতের খাবারটিতে একটি কামড় দিয়ে তিনি হাসেন। একটি সুন্দর, গোলাপী রঙের ক্যামেরা তার গলা থেকে ঝুলছে। দীর্ঘ স্কার্টের নিচ থেকে বের হয়ে আসা ভদ্রমহিলার পা জোড়ার দিকে আমরা তাকাই। শিশুর পায়ের মতো পরিষ্কার ও সুন্দর এক জোড়া পা। তিনি তার পায়ের আঙুলগুলো নাড়াচ্ছেন। আমি মনে করতে পারি না যে আমার পা কখনো অমন সুন্দর দেখিয়েছিল কিনা। হতে পারে যখন আমি জন্মেছিলাম, তখন আমার পা জোড়াও অমন সুন্দর ছিল।

তারপর আমি মহিলার লাল আর কিছু একটা চিবুতে থাকা মুখের দিকে তাকালাম। তার গলার পাশের শিরা আর যেমনভাবে তিনি তার বড় ঠোঁটগুলো চাটছিলেন, তাতেই বুঝতে পেরেছিলাম যে তিনি যা খাচ্ছেন তা’ সত্যিই মজাদার।

আমি তার হাতের দিকে তাকালাম, দেখতে চাইলাম তিনি ঠিক কি খাচ্ছেন। এটা সমতল তবে বাইরের দিকটা শক্ত। উপরের দিকটা আবার মাখনের মতো নরম এবং এর উপর মুদ্রার মতো কিছু একটা, গাঢ় গোলাপী যেন পুড়ে যাওয়া কোনো ক্ষতস্থান। আমি দেখলাম খাবারটির উপরে লাল, সবুজ ও হলুদের কিছু ছিটা আর সবার শেষে আছে সেই ফুস্কুড়ির মতো বাদামী রঙা কি একটা যেন।

‘ওটা কি?’ চিপো মহিলার হাতে ধরা জিনিষটির দিকে এক হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে আর এক হাতে তার পেট ঘষতে থাকে। পেটে বাচ্চা আসার পর থেকে চিপো কথা বলার সময় পেটে হাত ঘষে খেলতে ভালোবাসে। ওর পেটটি ঠিক যেন একটি ফুটবলের মতো, খুব বড় না। আমরা সবাই মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং শুনতে চেষ্টা করি যে তিনি কি বলেন আমাদের।

‘ওহ, এটা? এটা তো একটা ক্যামেরা,’ মহিলাটি বলেন যা আমরা জানি।

স্কার্টের উপর হাত মুছে ভদ্রমহিলা ক্যামেরায় মৃদু চাপড় মারেন। তারপর তার হাতের খাবারের বাকি অংশটুকু দরজার পাশের ময়লা রাখা ঝুড়িটার দিকে ছুঁড়ে মারেন,কিন্তু খাবারটা ঝুড়িতে পড়েনি। তিনি হাসেন।তবে আমি বুঝতে পারি না যে এতে মজার কি আছে। ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে তাকান। হতে পারে যে তিনি চান যে আমরাও হাসি যেহেতু তিনি হাসছেন, তবে আমরা তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে যাবার আগে উড়তে থাকা মৃত পাখির মতো খাবারটির দিকে তাকিয়ে থাকি। আমরা এর আগে কাউকে এভাবে খাবার ছুঁড়তে দেখিনি। আমি চিপোর দিকে তাকাই।

‘তোমার বয়স কত?’ মহিলা চিপোকে জিজ্ঞাসা করেন। ওর পেটের দিকে এমনভাবে তাকান যেন তিনি এর আগে কোনো গর্ভবতী মেয়েকে দেখেনি। কিন্তু চিপো শুনছেও না, সে মাটির উপরে পড়ে থাকা বস্তাটির দিকে তাকাতেই ব্যস্ত।

‘ওর বয়স দশ,’ খোদা জানে চিপোর হয়ে উত্তর করে, ‘আমাদের নয় বছর, ‘যমজ বোনের মতো একই বয়স আমাদের,’ খোদা জানে আমাকে দেখিয়ে বলে, ‘আর বেজন্মার বয়স এগারো, সবহোর আট এবং স্টিনার বয়স আমি ঠিক জানি না।’ 

‘ওহ,’ মহিলাটি বলেন, হাতের ক্যামেরাটি নাড়া-চাড়া করতে করতেই।

‘আর তোমার কত বয়স?’ খোদা জানে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করে। ‘আর কোথা থেকে এসেছ তুমি?” আমি ভাবছিলাম খোদা জানে কত কথাই না বলে।

‘আমি?আমার বয়স হচ্ছে ৩৩, আমি লন্ডন থেকে এসেছি। এই প্রথম আমি আমার বাবার দেশ ঘুরতে এসেছি।’

‘আমি একবার লন্ডন থেকে আনা কিছু মিষ্টি খেয়েছিলাম। সুজন কাকা যখন প্রথম সেখানে যান তখন মিষ্টিগুলো পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে অনেক দিন আগের কথা।এখন উনি একটা চিঠিও পাঠান না,’ খোদা জানে বলে। তার পাকানো মুখ এখন চিবুনো বন্ধ করে। আমি যেন মহিলার সাথে সমান তালেই ঢোক গিলি।

‘তোমাকে তো পনেরোর বাচ্চার মতো দেখায়,’ খোদা জানে বলে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে বকবকানি খোদা জানেকে মহিলা না একটা চড় মারে! উত্তরে ভদ্রমহিলা বরং শুধু হাসেন। যে হাসিতে মনে হয় যে তাকে গর্ব বোধ করার মতো কিছু বলা হয়েছে।

‘ধন্যবাদ,’ মহিলা বলেন।আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবি যে এতে ধন্যবাদ দেবার কি আছে? অন্যদের দিকেও তাকাই। আমি জানি ওরাও আমার মতো মহিলাকে একটু বিচিত্রই ভাবছে। মহিলা তার মাথার চুলে হাতবোলান যা কিনা জটা ধরা ও ময়লা দেখতে; আমি যদি বুদাপেস্টে থাকতাম তবে আমি প্রতিদিন আমার পুরো শরীর ধুতাম এবং সুন্দর করে আমার চুল আঁচড়াতাম। গোটা পৃথিবীকে দেখাতাম যে আমি সত্যিকারের জায়গায় থাকা এক সত্যিকার মানুষ।

‘বাচ্চারা—তোমরা কিছু মনে করবে না তো যদি আমি তোমাদের একটা ছবি তুলি?’

আমরা একথার উত্তর করি না। কারণ প্রাপ্তবয়ষ্করা কোনো কিছুর জন্য আমাদের কাছে অনুমতি চাইবে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের নেই।

আমরা দেখলাম মহিলা মাত্র কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন, আমরা দেখলাম তার তেজি চুলের গোছা, হাঁটার সময় মাটি ঝাড়-দিয়ে চলা তার লম্বা স্কার্ট, সুন্দর চীনে পা, বড় বড় গয়না, বড় বড় চোখ আর তার মসৃণ বাদামী ত্বক যেখানে কিনা একটি ক্ষত চিহ্নও নেই যাতে কিনা বোঝা যেত যে সে একজন জীবন্ত ব্যক্তি।তার নাকে একটি নথ ছিল অবশ্য। গায়ের টি-শার্টে লেখা ‘সেভ দার্ফুর।’

‘বাচ্চারা—এদিকে এসো—বলো—চীজ, চীজ, চীইইইইইইইইইইজ,’ মহিলা উদ্দীপনা যোগান আর সবাই বলতে থাকে, ‘চীইইইজ।’ আমি অবশ্য ঠিক বলি না কারণ আমি মনে করার চেষ্টা করি যে ‘চীজ’ অর্থ ঠিক কি এবং আমার মনে পড়ে না।  গতকাল হাড়ের মা আমাকে বলেছে ডুডু পাখির গল্প।সেই পাখি যে কিনা একটি নতুন গান শিখেছিল এবং গেয়েছিল একটি নতুন গান যার শব্দগুলোর অর্থ সে পুরো জানে না এবং পাখিটাকে পরে ধরা হয়, মেরে ফেলা হয় আর রাতের খাবারের জন্য রান্না করা হয়। কারণ গানটিতে পাখিটি আসলে তাকে মেরে না ফেলা এবং রান্না না করার জন্য অনুরোধ করছিল। মহিলা আবার আমার দিকে আঙুল বাড়ান, মাথা নাড়ান এবং আমাকে আবার ‘চীইইইইইইইইইইজ’ বলতে বলেন এবং আমি তাই করি যেহেতু তিনি অনেক দিনের পরিচিতার মতো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

আমি প্রথম আস্তে বলা শুরু করি, বলি, ‘চীজ’ এবং ‘চীজ,’ এবং তারপর বলতেই থাকি ‘চীইইইইইইইইইইজ’ এবং সবাই বলছে ‘চীইইইইইইইইইইজ’ এবং আমরা সবাই গান গাইছি আর ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক ক্লিক করছে তো করছেই। এরপরই স্টিনা, যে কখনো কোনো কথা বলে না, সহসা হাঁটা শুরু করে। মহিলা এবার ছবি তোলা বন্ধ করেন এবং কথা বলেন, ‘তুমি ঠিক আছ?’ কিন্তু স্টিনা থামে না। এরপর চিপো স্টিনার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। ওর পেট ঘষতে ঘষতেই। তারপর আমাদের সবাই তার পিছু পিছু হাঁটে। ছবি তোলারত মহিলাকে রেখে আমরা সামনে এগোই বেজন্মা এসএডিসি সড়কের এক কোণে থামে এবং মহিলার দিকে গালি দেয়া শুরু করে। এবং তখন আমার সেই খাবারের টুকরোটির কথা মনে পড়ে যায় যা আমরা খেতে চাই কিনা এমনটা জিজ্ঞাসা না করেই মহিলা ছুঁড়ে ফেলেছিলেন এবং তখন আমিও স্টিনার সাথে মিলে চেঁচানো শুরু করি, এবং সবাই এই চেঁচানোয় যোগ দেয়। আমরা চেঁচাই এবং চেঁচাই এবং চেঁচাই; মহিলা যা খেয়েছিলেন আমরা সেটা খেতে চাই, আমরা বুদাপেস্টে আওয়াজ তুলতে চাই, আমরা চাই আমাদের পেটে যেন আর খিদে না থাকে। মহিলা আমাদের চেঁচানোয় বিভ্রান্ত হয়ে তাড়াহুড়ো করে ঘরে ঢুকে গেলেন এবং আমরা তার দিকে চেঁচাতেই থাকলাম।

আমরা কর্কশভাবে চেঁচাতেই থাকি। আমাদের গলা চুলকাতে থাকে। মহিলা যখন তার বাড়ির দরজা আটকে অদৃশ্য হয়ে যান, আমরা চেঁচানো থামাই এবং পেয়ারা খুঁজতে যাই।

বেজন্মা বলে যে আমরা যখন বড় হব তখন আমরা পেয়ারা চুরি থামাবো এবং বড়লোকদের বাড়ির ভেতরে আরো বড় জিনিষ চুরিতে হাত দেব। তবে তেমন সময় আসতে আসতে আমার হয়ত এখানে আর আসা হবে না; আমি তখন আমেরিকায় ফস্টালিনা আন্টির কাছে থাকব, আরো ভালো নানা কাজ করব।কিন্তু এখনকার কাজ হল পেয়ারা চুরি করা। আমরা আইএমএফ সড়কে যাবার কথা ঠিক করি। সেখানে একটি সাদা রঙের বাড়ি।এত বড় যে পাহাড়ের মতো লাগে দেখতে। সামনে একটি বিশাল সুইমিং পুল, তার চারপাশে অনেকগুলো ফাঁকা চেয়ার পাতা। এই সুন্দর বাসাটির ভালো দিক হল বাড়ির উঠোনের অনেক পেছনে পাহাড় এবং আমাদের হাতের কাছে পেয়ারা গাছ। যেন বা পেয়ারাগুলো জানত যে আমরা আসছি আর সেটা শুনে ওরা দৌড়ে আমাদের কাছে ছুটে এসেছে।

কংক্রিটের দেয়ালের উপর উঠতে আসলে খুব বেশি সময় লাগে না। সময় লাগে না গাছের উপর উঠে, প্লাস্টিক ব্যাগে পেয়ারা ভরতে। এই পেয়ারাগুলো বড়, মানুষের হাতের মুঠির সমান এবং নিয়মিত পেয়ারার মতো হলুদ হয়ে পাকে না; বাইরে থেকে তাদের সবুজ দেখায় ও ভেতরে গোলাপী ও তুলতুলে। এই পেয়ারাগুলো খেতে এতই ভালো যে আমি বলে বোঝাতে পারবো না।

*****

‘স্বর্গ’-এ ফিরে আমরা আর দৌড়াই না। আমরা খুব ভালোভাবে হাঁটি যেন বুদাপেস্ট এখন আমাদের নতুন দেশ, পেয়ারা খেয়ে এবং সারা পথে পেয়ারার খোসা ছড়িয়ে সেখানে আমরা পথ নোংরা করে রাখব। এইউ সড়কের পাশে এসে চিপোর বমির জন্য আমাদের থামতে হয়। আজতার বমি দেখাচ্ছে প্রস্রাবের মতো, তবে গাঢ়তর। আমরা সেই বমি না ঢেকেই সেখানে রেখে আসি।

‘একদিন আমি এখানে থাকবো, এমন একটা বাসায়,’ একটি শক্ত পেয়ারা চিবুতে চিবুতে সবহো বলে। সে বাম দিকে তাকায় এবং একটি বড় নীল বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখায় যেখানে আছে প্রচুর সিঁড়ি এবং বাড়িটার চারপাশে অনেক ফুল। সবহোর গলা শুনে মনে হয় সে জানে যে সে কি নিয়ে কথা বলছে।

‘তুমি এটা কিভাবে করবে?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

সবহো রাস্তায় পেয়ারার খোসা ছাড়ায় আর ওর বড় দুই চোখ মেলে বলে, ‘আমি এটা জানি।’

‘সে স্বপ্নে সেই বাসায় থাকবে,’ বেজন্মা সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে এবং সবহোর কল্পনার সেই ভবিষ্যত বাড়ির দিকে একটি পেয়ারা ছুঁড়ে মারে। পেয়ারাটা ফেটে গিয়ে বাড়িটার দেয়াল গোলাপী হয়ে যায়। আমি একটি মিষ্টি পেয়ারায় কামড় দিই। তবে এই গোলাপী পেয়ারার বীজ আবার শক্ত যা চিবুতে আমার ভালো লাগে না এবং অনেক সময়ও নেয়। কাজেই আমি ধীর-স্থিরভাবে পেয়ারা চিবুতে থাকি এবং মাঝে মাঝে আস্ত পেয়ারাই গিলে ফেলি যদিও জানি এর পর কি হবে।

‘তুমি এমনটা করলে কেনো?’ সবহো তার কল্পনার আগামী দিনেবাড়িটার এই মূহূর্তে ময়লা হয়ে যাওয়া কংক্রিটের দেয়ালের দিকে তাকায়। তারপরই তাকায় বেজন্মার দিকে।

বেজন্মা হাসে, আর একটা পেয়ারা ছুঁড়ে মারে। কংক্রিটের দেয়ালে ধাক্কা না খেলেও বাড়ির দরজায় পেয়ারাটা লাগে। দরজাটি কোনো শব্দ করে না যেমনটা সাধারণত: কোনো দরজায় কিছু একটা ঠোক্কর লাগলে হয়।

‘কারণ আমি পারি।কেননা আমি যা করতে চাই, তাকরতে পারি। এছাড়া এটা আরএমন কী?’

‘কারণ তুমি আমাকে বলতে শুনেছিলে যে আমি বাড়িটা পছন্দ করি, কাজেই এই বাড়িটার কোনো ক্ষতি তোমার করা উচিত নয়। অন্যকোনো বাড়িতে পেয়ারা ছোঁড়ো না যেটার বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই?’

‘ভালো কথা, তাই বলে এটা তোমার বাড়ি না, তাই না?’ বেজন্মা একটি কালো রঙের ট্রাক স্যুট পরেছেযা ও কখনো গা থেকে খোলে না, এছাড়াও ওর গায়ে একটি কমলা রঙের টি-শার্ট যেখানে লেখা ‘কর্নেল’। বেজন্মা তার কর্নেল টি-শার্টটি গা থেকে খুলে মাথার উপর বেঁধে ফেলে এবং আমি জানি না কিসে তাকে কদর্য বা সুন্দর দেখায়, তাকে সত্যিই নারী বা পুরুষের মতো দেখায়। বেজন্মা ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে ফিরে হাঁটতে থাকে যাতে সে সবহোর দিকে মুখ করে হাঁটতে পারে।সে সবসময়ই যার সাথে ঝগড়া করবে তার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে পছন্দ করে। সে স্টিনা ছাড়া আমাদের সবাইকেই পিটিয়েছে।

‘এছাড়াও বুদাপেস্ট কোনো বাথরুম নয় যে এখানে যে কেউই ঢুকে হাঁটতে পারবে। তুমি এখানে কোনোদিনই বাস করতে পারবে না।’

‘আমি বুদাপেস্টের কোনো পুরুষকে বিয়ে করবো। সে আমাকে স্বর্গ থেকে নিয়ে যাবে, আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাবে এইসব খুপড়ি ঘর এবং স্বর্গপথ ও ফামবেকি নামের সব বস্তি আর এই সব কিছু থেকে,’ সবহো বলে।

‘হা হা। তোমার মনে হয় কোনো পুরুষ তোমার মতো একফোকলা দেঁতো মেয়েকে বিয়ে করবে? এমনকি আমিই তো তোমাকে বিয়ে করব না,’ খোদা জানে বলে। গলার স্বর চড়িয়ে। সে আর চিপো এবং স্টিনা আমাদের সামনে থেকে হাঁটে বা হেঁটে যায়। আমি খোদা জানের শার্টের দিকে তাকাই, পিঠের দিকে ছেঁড়া আর তার আলকাতরার মতো কালো পাছা সূতির সাদা, ময়লা প্যান্টের ভেতর থেকে এক জোড়া অবাক চোখের মতো যেন তাকিয়ে আছে।

‘আমি তোমার সাথে কথা বলছি না মাথা মোটা!’ সবহো খোদা জানের দিকে তাকিয়ে চেঁচায়, ‘এছাড়া, আমার দাঁত তো আবার হবে। মা বলেছে তখন আমি দেখতে আরো সুন্দর হবো।’

খোদা জানে এবার তার হাত ছুঁড়ে এবং ‘যাহোক’ ভঙ্গিতে হাত নাচায়। কারণ এবিষয়ে তার কিছুই বলার নেই।

সবাই জানে যে সবহো দেখতে সুন্দর, সুন্দর আমাদের সবার চেয়ে, ‘স্বর্গের সব শিশুর থেকেই সবহো সুন্দর।মাঝে মাঝে আমরা ওর সাথে খেলতে রাজি হই না যতক্ষণ না ও এসব কথা বলা বন্ধ করে যা আমরা সবাই জানি।

‘যাক, আমি এসব নিয়ে ভাবি না। আমি এদেশ থেকে দ্রুতই বের হয়ে যাব। আমি অনেক টাকা বানাবো এবং দেশে ফিরে আসব আর বুদাপেস্ট অথবা লস এ্যাঞ্জেলসে বা এমনকি প্যারিসেও একটি বাড়ি কিনবো,’ বেজন্মা বলে।

‘আমরা যখন স্কুলে যেতাম, তখন আমাদের শিক্ষক মিস্টার গোনো বলতেন যে টাকা আয়ের জন্য শিক্ষা দরকার, এটাই তিনি বলতেন, আমার নিজের শিক্ষক।’ চিপে তার পেটে হাত বুলাতে বুলাতে এমনভাবে বলে যেন মিস্টার গোনো তার নিজের বাবা।যেন বা মিস্টার গোনো বিশেষ কেউ, যেন বা মিস্টার গোনোই তার পেটের ভেতর রয়েছে।

‘কিন্তু এখন তুমি কিভাবে টাকা বানাবে যখন আমরা আর স্কুলে যাচ্ছি না?’ চিপো বলে।

‘টাকা বানাতে স্কুলে যাওয়া লাগে না।কোন বাইবেলে পড়েছ যে টাকা বানাতে স্কুলে যেতে হয়?’ বেজন্মা চিপোর দিকে তাকিয়ে চেঁচায় আর নিজের মুখটা চিপোর মুখের এত কাছে আনে যেন ওর নাকটা ছিঁড়েই ফেলবে।

চিপো ওর পেটের উপর হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বাকি পেয়ারাটা শান্তভাবে চিবোয়। সে আমাদের থেকে দ্রুতগতিতে হাঁটে।

‘আমি আমার আন্টি ফস্টালিনার সাথে থাকতে যাচ্ছি; খুব বেশি দিন নয়, তোমরা দেখতে পাবে,’ আমি বলি, গলা চড়িয়ে বলি যেন ওরা সবাই শুনতে পায়। আমি আর একটা নতুন পেয়ারা চিবুনো শুরু করেছি; এটা এত মিষ্টি যে আমি তিন কামড়েই শেষ করে ফেলি। এমনকি পেয়ারার বীচিগুলো চিবুনোরও আর চেষ্টা করি না।

‘আমেরিকা বহু দূরে,’ বেজন্মা বলে, সে বিরক্ত বোধ করছে। ‘আমি এত দূরে কোথাও যেতে চাই না যেখানে বিমানে করে যেতে হয়।যদি সেখানে গিয়ে তুমি আটকে যাও আর ফিরে আসতে না পারো? আমি গেলে ঐ দক্ষিণ আফ্রিকা আর বোতসোয়ানা পর্যন্ত যেতে চাই, এভাবে, যখন অবস্থা খারাপ হবে, আমি কারো সাথে কথা না বলেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাবো; যেখানেই যাও না কেনো, সেখান থেকে চাইলে সহজে ফিরে আসার রাস্তা যেন তোমার থাকে।’

আমি বেজন্মার দিকে আবার তাকাই এবং বুঝে উঠতে পারি না তাকে কি বলব। আমার মাড়ির পাশের একটি দাঁত ও মাড়ির ভেতরে আঠার মতো আটকে আছে একটি পেয়ারার বীজ। বীজটা ছাড়াতে শেষমেশ আমি আমার একটি আঙুল ব্যবহার করি। এটা কানের খইলের মতো লাগে।

‘আমেরিকা সত্যি অনেক দূর,’ চিপো বলে, বেজন্মার সাথে সে একমত।

চিপো এবার হাঁটা থামায়, তার হাত তার পেটের নিচে, যাতে আমরা তাকে ধরতে পারি। ‘কি হবে যদি তোমার প্লেনে কিছু হয়? যখন তুমি প্লেনের ভেতরে আছো, তখন সন্ত্রাসীদের সাথে তুমি কি করবে?’

আমার মনে হয় যে, সমতল মুখ, ফুটবলাকৃতি পেটের চিপো এসব কথা বলছে নিছকই বেজন্মাকে সুখী করতে যেহেতু কুচ্ছিত মুখের বেজন্মা একটু আগেই ওর দিকে চেঁচিয়েছে। আমি ওর দিকে কথাভরা চোখে তাকালেও আমার মুখ পেয়ারা চিবিয়েই চলে।

‘আমার কিছু যায় আসে না, আমি যাচ্ছি,’ আমি বলি এবং খোদা জানে আর স্টিনাকে ধরতে ছুট দেই। কারণ আমি জানি এসব কথার শেষ কোথায় যদি চিপো আর বেজন্মা আমার উপর চড়াও হয়।

‘ঠিক আছে, যাও, আমেরিকা যাও এবং নার্সিং হোমে গিয়ে কাজ করো আর রোগীদের পাছা ধুইয়ে দাও। তুমি মনে করো আমরা এসব গল্প জানি না?’ বেজন্মা আমার পিছন পিছন চেঁচায় তবে আমি হাঁটতেই থাকি।

আমি ভাবি ডান দিকে ফিরে বেজন্মাকে একটা মার লাগাই। আমার আমেরিকা সম্পর্কে ওভাবে বলার জন্য।আমি ওকে চড় মারবো, ওর বড় কপালে গুঁতো দিবো, তারপর আমার হাতের মুঠি ওর মুখের ভেতর জোরে ঢোকাবো এবং ওর দাঁত ওর থুতুর সাথে ফেলতে বাধ্য করবো।আমি ওর পেটে এমনভাবে মারবো যে ও যতটা পেয়ারা খেয়েছে তার সবটুকুই বমি করে ফেলে দেবে এবং তারপর ওকে মাটিতে ফেলে দেবো। ওর পিঠে আমার হাঁটু দিয়ে খোঁচা দেবো, ওর হাত জোড়া ওর পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধবো এবং তারপর ওর মাথা টেনে তুলবো যতক্ষণ না ও প্রাণ ভিক্ষা চায়। তবে আমি এসব কিছুই করি না আর চুপ করে হাঁটতে থাকি। আমি জানি ও হিংসা করছে।কারণ ওর আসলে আমেরিকায় কেউ নেই। কারণ আন্ট ফস্টালিনা ওর আন্ট নয়। কারণ সে বেজন্মা আরআমি প্রিয়া।

*****

যে সময় নাগাদ আমরা ‘স্বর্গ’-এ ফিরে আসি, ততক্ষণে আমাদের পেয়ারাগুলো খাওয়া শেষ এবং পেট এতটাই ভরা যে পারলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটি। রাতে আমরা শুধু পানি খাবো এবং হাড়ের মা আমাদের একটি গল্প বলবেন যা আমরা শুনবো এবং তারপর ঘুমোতে যাবে। আজ রাতে ঝোপের আড়ালে আর হাগু করবো না। করতে হলে খুব বেশি রাত হবার আগেই করতে হবে। নয়তো হাগু করতে যাবার সময় তোমার পাশে কে থাকবে? ঝোপের পাশে যেতে হলে তো ঐ কবরখানাটা পার হতে হয় আর সেখানে তোমার সাথে একটা ভূতের দেখা হয়ে যেতে পারে।

হাগু করার সময় আমরা সবাই ঝোপের আড়ালে ঠিক একটি জায়গা খুঁজে নিই, আর আমি, আমি একটি পাথরের পেছনে উবু হয়ে বসি।পেয়ারা খাওয়ার সবচেয়ে খারাপ দিক এইটিই। তুমি যখন খুব বেশি পেয়ারা খাও, তখন এর বীজগুলোর চাপে হাগু বন্ধ হয়ে আসে। তবু জোর করে হাগু হওয়াতে গেলে এত ব্যথা হয় যেন তুমি আস্ত একটা দেশ জন্ম দেবার কষ্ট করছো। মিনিটের পর মিনিটের পর মিনিট পার হয় অথচ কেউ একবার চেঁচিয়ে বলবে না, ‘আমার হয়ে গেছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।’

আমরা সবাই ওভাবেই উবু হয়ে বসে আছি, ভিন্ন ভিন্ন নানা জায়গায়, আর আমি আমার উরুতে একটা টান লাগায় হাতের মুঠি দিয়ে টান লাগার জায়গায় পেটাচ্ছি যেন ব্যথাটা কমে যায়। আর তখনি কে যেন চেঁচালো। চেঁচানোটা ঠিক সেই সময়ের না যখন তুমি নিজের তলপেটে নিজেই খুব চাপ দিচ্ছ হাগু হবার জন্য আর একটি পেয়ারার বীজ তোমার হাগু বের হবার রাস্তা দিয়ে বের হবে; বরং এটা বলছে, ‘এসো এবং দেখো,’ কাজেই আমি তলপেটে হাগু হবার জন্য ধাক্কা দেয়া বন্ধ করি, প্যান্টটা টেনে তুলে পাথরের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াই।

উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, খোদা জানে উবু হয়ে বসা অবস্থাতেই ভয়ানক চেঁচাচ্চে। সামনের ঘন গাছপালার দিকে আঙুল তুলে দেখায় এবং আমরা দেখি লম্বা কিছু একটা গাছ থেকে ঝুলছে।

‘কি ওটা?’ কেউ একজন, আমি জানিনা কে, ফিসফিস করে।

কেউ উত্তর করে না। তবে আমরা ইতোমধ্যেই দেখে ফেলেছি যে এটা কে? সবুজ একটি দড়ি থেকে এক মহিলা ঝুলছে। সন্ধ্যা নেমে আসার আগে ঠিক এই সময়টায় সূর্য যেন গাছের পাতার ফাঁক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে দেখা দিচ্ছে আর সবকিছুই একটি অদ্ভুত বর্ণ ধারণ করছে, যা কিনা নারীটির গায়ের চামড়ায় এমন এক আভা ছড়াচ্ছে যে মনে হচ্ছে তার ভেতরে টকটকে লাল কয়লা জ্বলছে।

মহিলার রোগা হাত দু’টো দু’পাশে নিস্তেজ হয়ে ঝুলছে, আর তার হাত ও পা দু’টো মাটিতে ঠেকেছে, যেন বা কেউ তাকে সেখানে টেনে নিয়েছে, বাতাসে একটি সরল রেখা ঝুলছে।

এই মহিলার চোখ জোড়া তার দেহের সবচেয়ে ভীতিকর অংশ। এত বেশি সাদা দেখতে যে বলার নয়, আর মুখটি হাঁ করে বের করা। মহিলা একটি হলুদ পোশাক পরে এবং তার জুতোর ডগায় ঘাস যেন চাটছে।

‘চল্ দৌড়াই.’ স্টিনা বলে। সেই দেশি খেলার পর থেকে এই প্রথম স্টিনা কোনো কথা বললো। স্টিনা যখন কোনো কথা বলে, তখন বুঝে নিতে হবে যে সত্যিই গুরুতর কিছু ঘটেছে এবং আমি দৌড় দেবার জন্য প্রস্তুত হই।

‘ভীতুর দল, দেখতে পাচ্ছ না যে মহিলা নিজেই নিজের গলায় দড়ি দিয়েছে আর এখন সে মৃত?” বেজন্মা একটি পাথর তুলে ছুঁড়ে মারে; এটা মহিলার উরুতে আঘাত করে। আমার মনে হলো কিছু একটা ঘটবে তবে কিছুই ঘটে না।মহিলা নড়েন-চড়েন না।

‘দ্যাখো, আমি তো তোমাকে বলেছিলাম যে উনি মারা গেছেন।’ বেজন্মা বলে, সে এখন সেই গলায় কথা বলছে যে গলায় কথা বলে সে মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের ভেতর কে দলনেতা।

‘এভাবে মরা মানুষের গায়ে পাথর ছুঁড়লে খোদা তোমাকে শাস্তি দেবে,’ খোদা জানে বলে।

বেজন্মা তবু আর একটি পাথর ছোঁড়ে। এটা মৃত মহিলার পায়ে ‘খু’ জাতীয় একটা শব্দ করে আঘাত করে। তবু মহিলার কোন নড়ন-চড়ন নেই।আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে; মনে হচ্ছে যেন মহিলা আমার দিকে তার সাদা, কোটর থেকে বেরিয়ে আসা চোখ জোড়া দিয়ে দেখছেন। তিনি যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছেন আর অপেক্ষা করছেন যেন আমি কিছু একটা করব! তবে আমি জানি না আমি কি করব।

‘খোদা এখানে থাকেন না, নির্বোধ কোথাকার,’ বেজন্মা বলে। সে আর একটি পাথর ছোঁড়ে যা মহিলার হলুদ পোশাকে গড়িয়ে পড়ে এবং আমি খুশি হই যে পাথরটি গড়িয়ে পড়ে যায়।

‘আমি এখন বাসায় যাব আরমা’কে সব বলবো,’ সবহো বলে, তার গলার স্বর কেমন যেন কান্না কান্না। স্টিনা চলে যাবার জন্য হাঁটা শুরু করে, তবে তার পেছন পেছন সবহো এবং খোদা জানেও হাঁটতে থাকে। বেজন্মা কিছুক্ষণের জন্য পিছিয়ে থাকলেও একটু পরেই আমার কাঁধের উপর থেকে তাকিয়ে দেখি সে ঠিক আমার পেছনে। আমি জানতাম যে সে ঐ ঝোপের আড়ালে একটি মৃতদেহের সাথে সারাজীবন থাকতে পারবে না যদিও সে হাব-ভাব করে যেন আমাদের ‘স্বর্গ’ নামক বস্তির সে রাষ্ট্রপতি। আমরা আবার একসাথে হাঁটা শুরু করি, কিন্তু তখন বেজন্মা ঠিক আমাদের সামনে যেন লাফ দিয়ে এলো।

‘একমিনিট, তোমরা কে কে রুটি খেতে চাও?’ বেজন্মা বলে, মাথার উপর তার ‘কর্নেল’ লেখা টি-শার্টটা সে শক্ত করে বাঁধে। বেজন্মার বুকের উপর ক্ষতটির দিকে চোখ গেল আমার, ওর বাঁ দিকের বুকের নিচেই।পেয়ারার ভেতর গোলাপী রঙের মতোই ওর এই ক্ষত।

‘রুটি কোথায় পাবো?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

‘শোনো, তুমি লক্ষ্য করোনি যে মহিলার জুতাজোড়া একদম প্রায় নতুন? জুতোজোড়া হাতাতে পারলে, বাজারে বিক্রি করে আমরা একটা রুটি বা এমনকি দেড়টা রুটিও কিনতে পারি। কি বলো?’

আমরা সবাই ঘুরে দাঁড়াই এবং বেজন্মার পিছু পিছু আবার ঝোপের ওখানে যাই যেখানে সেই লাশটা ঝুলছে।আমরা তখন ছুটছি, তারপর আবার দৌড়াচ্ছি, তারপর আবার দৌড়াচ্ছি আর হাসছি, আর হাসছি, আর হাসছি।

//জেডএস//

x