কবির ‘বকুল ভেজা পথঘাট’

আলেক সিকানা ১৭:৪৮ , সেপ্টেম্বর ২৫ , ২০১৯

'সভ্যতার জমিন জুড়ে অন্ধ করতালি/তুমি দাও সময়/আমি ঠেকাই ভাঙনের কূল'—শ্লোগানের কবি নাজমুল হক নজীর এমন আহবানে তার 'বকুল ভেজা পথঘাট' লিখলেন পাথর-সময়কে রুখে দেওয়ার জন্য, আলোর আঘাতে ম্রিয়মাণ স্বপ্নকে জাগ্রত রাখার জন্য, সকল ভণিতা উপেক্ষায় করে কাঙ্ক্ষিত গোলাপ ফোঁটানোর জন্য। অবলীলায় জানালেন, 'গোলাপের চাষ করে/ঘরে তুলবো বসন্তকাল।’

'বকুল ভেজা পথঘাট' কাব্যগ্রন্থের পঙক্তিমালায় কবি মানুষের বিভিন্নমুখী আবেগ-অনুভূতি ও অনুষঙ্গকে শিল্প সৌন্দর্যে প্রকাশ করেছেন। 'বাইশ বসন্ত পর' কবিতায় সময়ের রূঢ় বাস্তবতাকে নিখুঁতভাবে খোদিত করেছেন। আশ্চর্য অনুভবে বলে উঠেছেন, 'এখন আর কোথাও কেউ নেই/এখন আর আমার জন্য কেউ নেই।’

কিংবা

'আমি শুধু তোমার মাঝেই বিলিন/যেমন গোধূলি মিলিয়ে দেয়/দিনের আলো আর রাতের নীরবতাকে।' (সাগর আকাঙ্ক্ষা)

কখনো কখনো অবাক বিস্ময়ে 'ভাগ্যহীন সুদর্শনে' বলে উঠেন—

'তাহলে আমিই কি দুর্ভাগা একমাত্র অসহায়

গানগুলি মিছিল হয়ে ফিরে আসে

দেয়ালের পোস্টার আমারই কথা কয়

চাবুকের দাগ চিরকালই তো মিলাবে ক্রীতদাসে।'

'বিপন্ন তবু বর্তমান'—স্বপ্নেই বেঁচে আছি' কবিতায় কবি বিপন্ন সময়, বিপন্ন সমাজ, বিষণ্ন বর্তমানের বার্তা দিলেন, জানান দিলেন অস্বস্তি নিয়ে অস্তিত্বের সংকটের কথা। হানাহানি অবক্ষয়ের অন্ধকার কোলাহল কী থামবার নয় শেষ হবার নয়, না কি বিশ্বকে বিপন্ন করেই থামবে খাণ্ডব দাহন! এই উন্মুক্ত প্রশ্ন রেখে কবি এমন আশঙ্কার মাঝেও স্বপ্নে বাঁচার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

কবিতা স্বপ্নীল ডানায় ভর করে সত্যকে নির্মোহভাবে আবিষ্কার করে, উন্মোচন করে। কবি কারও বহির্জগৎ শাসনে অনুগামী নন; সেটা কবির কাজও নয়—কবি মানবের মনোজগৎ নিয়ে খেলা করেন। কবি নজীরের কবিতা স্বার্থক, শাশ্বত ও সুন্দর; ফলে পাঠক হৃদয়কে স্পর্শে স্পন্দিত করে প্রবলভাবে।

কবি নজীর তার 'বকুল ভেজা পথঘাট' কাব্যগ্রন্থে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা সৃজন করেছেন সুগভীর আবেগ দিয়ে, আত্মকথনের মতো কবিতায় লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা। কবির বিদগ্ধ চিন্তনে রয়েছে চেতনায় ভাস্বর মহান মুক্তিযুদ্ধ আর সংগ্রামী মানুষের কথকতা। আবার তিনি চারপাশের ষড়যন্ত্রের আবহে ক্ষুব্ধ হন, স্বাধীনতা অর্জনের ফল বিনষ্টকারীদের আঘাতে মর্মাহত হন, যে উদ্দেশ্যে হাতে তুলে নিয়েছিলেন রাইফেল, 'আমি কোমর বেঁধে আছি/অমর পঙক্তিমালা নিঃশ্বাসের মতো প্রিয়/প্রত্যহ সাহস জোগায় মুজিব সড়ক/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'—শুনে  ছুটে গিয়েছিলেন বসন্ত ছিনিয়ে আনতে এবং তা অর্জিত হবার পরে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম জুড়ে দালাল ফড়িয়া লুটেরা মীর জাফরদের সীমাহীন শকুনী আচারণে সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। দ্বিধাহীন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করেন—

'মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকারের লাইন প্রায় সমান সমান

শুধু মীর জাফরদের লাইন

বড় হতে হতে চলে গেছে মাঠের প্রান্ত সীমানায়।'

তার ক্ষুরধার লেখনীতে গোটা সমাজের নানা চরিত্রের মানুষ ভিড় করেছে; মুক্তিযোদ্ধা থেকে মীর জাফর, রাজনীতিবিদ থেকে রাজাকার, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত, কেরানি, আমলা, ডাক্তার, সুখেন-কান্ত, শিক্ষক, সমাজসেবক, দালাল, কিংবা কিংবদন্তি সীতানাথ বসাক অথবা 'রাজনীতির কবি' মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। মানবজীবনকে কেন্দ্র করেই তার ভাব ও ভাবনাগুলো প্রকাশ পেয়েছে, আবর্তিত হয়েছে মহাকালের নক্ষত্ররথে।

কবি নজীরের দৃঢ আত্মপ্রত্যয়, একনিষ্ঠ অভিপ্রায়, মানুষের প্রতি অপরিমেয় ভালোবাসা, সুন্দর সততার সঙ্গে সৃষ্টিশীল সঙ্গ, বাস্তব সত্যের বেদীমূলে বসে তার রূপমূর্তি অঙ্কনের ফলেই তিনি বারবার স্বপ্নের কাছে ফিরে যান, আশ্রয়ী হন আশায়; বলেন, 'আমি তো একজন বাঙ্গালী/আমি তো নবাব সিরাজের বংশধর/সালাম, বরকত, সূর্যসেনের ভাই।' (আবেদন)

'তুমি আর খোঁজ নিলে না নন্দিনী/থাকি কোথায়/কেমন করে কাটছে সময়/যাচ্ছে বয়ে দিন রজনী।'/(দিন রজনী)

'কান্ত, কোথায় চলছো তুমি/প্রেম দিয়ে যাও, ভালোবাসা দিয়ে যাও'/(কান্ত সংলাপ)

'আমি মেঘের মতো উড়ে যেতে যেতে/তোমাকে দেখি। দেখি প্রিয় মুখ/আমি জোছনায় স্বচ্ছ হাতে/তোমাতে স্পর্শ রাখি, সুখ।' (স্বপ্নে চলাচল)

'স্বপ্ন পোড়ালে কখনো ছাঁই হয় না'—কবি নজীরের এই উক্তির মতো করে যেন বকুল ভেজা পথঘাটে স্বপ্ন আশা ছড়িয়ে আছে। অন্যদিকে আছে না পাওয়ার বেদনা, অবহেলার নীরব স্পর্শ 'শুধু সমাধিভূমির নির্জন বিষণ্নতা নয়, গভীর রাত্রির বুকে জেগে উঠা হাহাকার নয়, নশ্বরজীবনের তুচ্ছতায় নৈরাজ্যের বেদনা নয়, রোমান্টিক কল্পনা' শ্লোগানের কবি'র হাত ধরে আরও সুদূরে প্রসারিত হয়েছে। মানুষের জীবনের আচার-আচরণ, ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কার পরিবর্তনের পাল্লায় কবি সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন এবং 'দ্রৌপদী বস্ত্র হরণের মতো কেড়ে নেয়/আমার স্বপ্ন আমার যুবক সময়... ঘড়ির কাঁটায় বসে ইবলিস/...ভোট বাক্সে সাপ'

তারপর

'এই তো দাঁড়ালাম রূপায়ণের কূলে/...আমি ভেঙে

দেবো সমন্ত তালা/মানুষ পৃথক করার জাদুর প্রাচীর।'—এইসব বলিষ্ঠ উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে তা স্পষ্ট করেছেন।

কবি নজীর তার প্রস্থানের আহবান এমনভাবে এঁকেছেন যে, 'বকুল ভেজা পথঘাট' কাব্যগ্রন্থের 'ফাল্গুন সংবাদ' কবিতা না উন্মোচিত হলে আড়ালে থেকে যেত কোনো এক রহস্য।

বকুল ভেজা পথঘাট, নাজমুল হক নজীর, প্রচ্ছদ- রাজিব রায়, প্রকাশকাল- ২০১৭, প্রকাশক- কবি নজীর একাডেমি

//জেডএস//

x