পাবলো নেরুদা প্রেম ও বিপ্লবের কবি

অমল চক্রবর্তী ১৪:৪২ , অক্টোবর ০১ , ২০১৯

বিশ বছর বয়সেই তিনি লিখেছেন তার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। বিশ বছর বয়স—দ্রোহের, প্রেমের না সৃজনের? তার ক্ষেত্রে তিনটিই। তিনি মানে ‘রিকার্দো এলিয়েছার নেতালি রেইএস বাসোয়ালতো’। পাবলো নেরুদা নামে যিনি সারা জগৎ জুড়ে পরিচিত—চিলির কবি-কূটনীতিক এবং রাজনীতিবিদ। মূলত, তীব্র আবেগ ও দ্রোহের পরাবাস্তববাদী কবিতা, রাজনৈতিক ইশতেহার, আত্মজীবনী এবং সংবেদনশীল প্রেমের কবিতার জন্য তিনি বিখ্যাত।


১৯৭১ সালে সাহিত্যের নোবেল বিজয়ী নেরুদা চিলির জাতীয় কবি হিসেবে বিবেচিত। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাকে ‘যে কোনো ভাষায় বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি’ বলে অভিহিত করেছেন। হ্যারল্ড ব্লুম তার ‘দ্য ওয়েস্টার্ন ক্যানন’ গ্রন্থে নেরুদাকে পশ্চিমা ঐতিহ্যের কেন্দ্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

কেন যেন স্প্যানিশ ভাষার আর সব মহান কবিদের তুলনায় নেরুদাকে বেশি কাছের মনে হয়! তার দ্রোহ ও চরম আত্মনিবেদনের কবিতা তাকে বাঙালি মননের খুব আপনজন করে তুলেছে।

১৯২৩ সালে চিলির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এদিসিওনেস ক্লারিদাদ তার প্রথম গ্রন্থ ‘Crepusculario’ (বাংলায় : গোধূলি) প্রকাশ করে।  

১৯২৪ সালে সান্তিয়াগোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এডিটোরিয়াল ন্যাসিমেন্টো প্রকাশ করে তার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘ভিন্তে পোয়েমাস দি আমোর ইউনাক্যানসিওন দেসেসপেরেদা’ (কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান)। প্রেমের কবিতাগুলো উদ্দামতা ও বেআব্রু শব্দচিত্রের জন্য বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, বিশেষত লেখকের বয়স বিবেচনা করে। এরপর কয়েক দশকে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ভিন্তে পোয়েমাস দি আমোর ইউনাক্যানসিওন দেসেসপেরেদা’ কয়েক মিলিয়ন কপি বিক্রি হওয়ায় সেটি নেরুদার সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা হয়ে ওঠে। প্রায় একশ বছর পরেও কাব্যগ্রন্থটি স্প্যানিশ ভাষায় সর্বাধিক বিক্রি হওয়া কাব্যগ্রন্থের রেকর্ড ধরে রেখেছে। আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে ডেভিড পি গ্যালাগার লিখেছিলেন, ‘ভিন্তে পোয়েমাস দি আমোর ইউনাক্যানসিওন দেসেসপেরেদা’-তে নেরুদা একটি আদর্শ বন্দরের সন্ধানে প্রতীকীভাবে সমুদ্রের ওপারে ভ্রমণ করেছেন’।

গ্রন্থটি পাবলো নেরুদা যখন বের করলেন তার বয়স তখন মাত্র বিশ। পরবর্তীকালে এই কাব্যগ্রন্থটি মিলিয়নের বেশি বিক্রি হল, এমনকি এখনো হচ্ছে। কী আছে এই রোমান্টিক কবিতার সংকলনে? এক সদ্য যুবকের তীব্র আত্মরতি, অসম প্রেম, প্রেমের অব্যক্ত প্রকাশ ও আবেগের অসঙ্গতি, সবই। তার এই বিশুদ্ধ রোমান্টিকতা পাঠক হৃদয়ও সহজেই স্পর্শ করে; হয়তো চল্লিশোত্তর বয়সে ‘কান্ট জেনেরেল’-এ নেরুদার রাজনৈতিক কবিতাগুলো এখন আবেদনহীন; কিন্তু অজস্র প্রেমের সনেট এখনো পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটছে।
নিউ ইয়র্কারে নেরুদার জীবন ও কর্মের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে মার্ক স্ট্র্যান্ড মন্তব্য করেছিলেন, ‘তার আবেগের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং প্রত্যক্ষতা তাকে অন্যান্য কবিদের থেকে পৃথক করে তুলেছিল। তার ভাষার তাৎক্ষণিকতার কারণে তা ভেসে ওঠা কঠিন নয় এবং বিশেষত তাই, যখন সে বয়ে গেছে বলে মনে হয়।’

মূলত দ্বিধা আর অপূর্ণতাবোধই পাবলো নেরুদার প্রেমের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। একটি হতাশার গান (A Song Of Despair) কবিতায় তিনি এই অপ্রাপ্তি ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন এইভাবে:

আহ্ নারী তুমি আমাকে কীভাবে ধারণ করতে পারলে আমি জানি না
তোমার আত্মার পৃথিবীতে, তোমার বাহুতে!
আমার আকাঙ্ক্ষা তোমার কাছে কত ভয়ানক এবং সংক্ষিপ্ত ছিল!
কতটা কঠিন ও মাতাল, কতটা উত্তেজনা আর ব্যগ্রতা!
প্রেমের কবিতায় নেরুদা প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করেননি। এক ধরণের প্রেম, যাতনা, কামুকতা ও দেহজ আনন্দে তিনি ভেসে যেতে চেয়েছেন। ‘বডি অফ ওম্যান’ কবিতায় নারীর পুঙ্খানুপুঙ্খ সঙ্গ নিয়ে তিনি দেহাতীত প্রেমে পৌঁছে হয়তো জন ডানের মতো বলতে চেয়েছেন 'দেহ একটি গ্রন্থ, যা পাঠের মধ্য দিয়েই মন পর্যন্ত যেতে হয়'। এই কবিতা যদি শুধু দেহের মধ্যেই শেষ হত তবে শতবর্ষ পরে এই আলোচনার মূল্য থাকতো না। যেমন:
নারী দেহ, আমি তোমার মাধুর্যের মাঝে বেঁচে থাকব।
আমার তৃষ্ণা, আমার অসীম ইচ্ছা, আমার দোদুল্যমান রাস্তা!
অন্ধকার নদীর বিছানার নিচে অনন্ত তৃষ্ণা প্রবাহিত,
এবং ক্লান্তি প্রবাহিত, এবং তীরহীন তীব্র শোক।
নামকরণে ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ থাকলেও প্রথম সংকলনের প্রতিটি কবিতা যুগপৎ প্রেম, বেদনা, হতাশা ও আত্মরতির মিশ্রণ। বেদনা ও অশেষ প্রেমের অভিপ্রায়, দুটোই কবিকে প্রভাবিত করেছে।

নেরুদার প্রেমের কবিতায় আন্টি-থিসিস সদা উপস্থিত; আনন্দ-ক্লান্ত, সাফল্য-ব্যর্থতা; প্রশান্তি ও শোক। তাতে মার্ক্সিস্ট দ্বান্দ্বিকতাও প্রবাহিত।

নেরুদার প্রেমের কবিতা নিচু স্বরের নয়, বরং সরাসরি ও ইন্দ্রিয়প্রবণ, যা তার কবিতাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
১৯৪১ সালে নেরুদা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনের শীর্ষে পৌঁছে তিনি রাষ্ট্রপতির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।

নেরুদার জনপ্রিয়তা এমন ছিলো যে, সশস্ত্র বাহিনী সমর্থিত পিনোশেট সরকার নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে সর্বজনীন অনুষ্ঠানের অনুমতি না দিলে হাজার হাজার শোকাহত চিলিয়ান কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় ভিড় করেছিল।

নেরুদা কবিতা লিখে বিপদের মুখেও পড়েছেন, ১৯৪২ সালে তিনি স্ট্যালিনগ্রাদ নিয়ে একটি অসাধারণ কবিতা লিখে মেক্সিকো থেকে বহিস্কৃত হন। কবিতার শুরুটা এমন:

আমি সময় এবং জল সম্পর্কে লিখেছিলাম,
এর শোক এবং বেগুনি ধাতু লিখেছিলাম,
আমি আকাশ এবং আপেল সম্পর্কে লিখেছিলাম,
এখন আমি স্ট্যালিনগ্রাদ সম্পর্কে লিখছি।
কনে ইতোমধ্যে তার রুমাল মধ্যে রেখে দিল
প্রেমে আমার ভালোবাসার রশ্মি,
এখন আমার হৃদয় মাটিতে আছে,
স্ট্যালিনগ্রাদের ধোঁয়া এবং আলোতে।
এই কবিতায় সহজেই প্রতিভাত হয়, রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যেও নেরুদা তার শৈলী ধরে রেখেছেন। এমনকি সরাসরি লেখা রাজনৈতিক কবিতাও প্রেম বিবর্জিত নয়। নেরুদা তার প্রিয়তমাকে উপহার দেবে একটি গ্রেনেড যার নাম ‘স্ট্যালিনগ্রাদের জন্য প্রেমগাথা’:
তোমার মাটি থেকে শস্যের আনা লাল শীষে,
যদি কোনও সন্দেহ থাকে, জেনে নাও নিশ্চিত
আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং তুমি আমাকে,
আর যদি তোমার কোমরে লড়াই না করতাম
রেখেছি তোমার সম্মানে এই কালো গ্রেনেড,
স্ট্যালিনগ্রাদের জন্য ভালোবাসার এই গান।
এই দীর্ঘ কবিতাটি নেরুদা গান গেয়েও শুনিয়েছেন। আসলে নেরুদার কাছে বিপ্লবের অপর নাম প্রেম। নেরুদা সবসময় সবুজ কালি দিয়ে লিখতেন, এটি ছিল তার কাছে আশাবাদের রং। বিপ্লব তার কাছে আশার প্রতীক। লোরকা, অক্টাভিও পাজ, লোপে দা ভেগা, হিমেনিস, লুইস বোর্হেস, ওসি মার্তিসহ অন্যান্য স্প্যানিশ মহান কবিদের সঙ্গে নেরুদার নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। রাজনৈতিক কবি নয়, মূলত অশান্ত, উত্তাল, আবেগে বেগবান কবি হিসেবে তিনি অমর। অতি সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ‘মি-টু হ্যাশ ট্যাগ’ আন্দোলনে পাবলো নেরুদা, মার্ক্স-সহ আরো অনেক লেখক ও কবিকে জড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে শুধু এটাই বলা শ্রেয়, নেরুদার মতো প্রথাবিরোধী একজন কবির ব্যক্তিজীবন ও কবি-জীবনকে এক করার চেষ্টা না করাই শ্রেয়। আর তার যে প্রাণোচ্ছলতা, মানসিক উদ্বেলতা, এবং যে জটিলতার মধ্য দিয়ে তিনি গিয়েছেন, তা ২০১৯ সালের আবহাওয়ায় বিচার করা কতটুকু সঙ্গত?

মাত্র ২০ বছর বয়সে কবিতার অনিশ্চিত পথে ঘর ছেড়েছেন পাবলো নেরুদা। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে প্রগতির যুদ্ধে আশান্বিত করেছে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে তার প্রেমিক সত্তা আমাদের স্পর্শ করে। সব প্রেমিকই বিপ্লবী হন না; কিন্তু সব সত্যিকারের বিপ্লবীই প্রেমিক। কথাটি যাকে নিয়ে তিনি একাধারে দুটোই। বা কে জানে শুধু প্রেমিকই কিনা; কেননা তীব্র মানবপ্রেমই তো তাকে বিপ্লবী করেছিলো। তিনি সেই কবি যিনি প্রেমের ও দ্রোহের ভাষায় জাতীয় আবেগকে ধারণ করেছিলেন। দেখা যাবে সুদীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে পাবলো নেরুদা প্রেম, রাজনীতি ও স্বদেশ নিয়ে অনেক কবিতা লিখলেও শেষ পর্যন্ত ছন্নছাড়া প্রেমের জন্য তাকে আমরা চিনি। 

//জেডএস//

x