কালো আফ্রিকার ইংরেজি

অমল চক্রবর্তী ০০:৫০ , অক্টোবর ২৯ , ২০১৯

ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটলেও ইংরেজি সাহিত্যের প্রতাপ বেড়েই চলেছে। তবে সেই ইংরেজি কতুটুকু খাঁটি ইংরেজি তা নিয়ে প্রশ্ন এখনো চলছে। বর্তমান বিশ্বে ইংরেজির শব্দ, উচ্চারণ আর ব্যাকরণ এতো বৈচিত্রপূর্ণ যে, রানীর ইংরেজি বলে আর কিছুই চেনার নেই এখন। আর কালো আফ্রিকার ইংরেজি তো কত আলাদা! নাইজেরিয়ার তিন লেখক: আমোস টুটুওলা, চিনুয়া আচেবে ও ওলে সোয়িঙ্কার ইংরেজি সেই ইঙ্গিতই দেয়।

শুরুটা করেছিলেন আমোস টুটুওলা তার উপন্যাস ‘দ্য পাম-ওয়াইন ড্রিঙ্কার্ড’-এর মাধ্যমে, সেই ১৯৫২ সালে। ইংরেজি ভাষার প্রচলিত ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমোস টুটুওলা ইংরেজি  ভাষা, ব্যাকরণ ও বয়ান আফ্রিকার মাটির কাছে নিয়ে গেলেন। ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশংসিত হলেও মাতৃভূমি নাইজেরিয়াতে বেশ নিন্দিত হয়েছিল তার ‘ভাঙা ইংলিশ’ এবং আদিম স্টাইলের ইংরেজি। অনেকে মনে করে টুটুওলার ইংরেজির মধ্যে একধরণের অশিক্ষিত, বন্য ও অসাংস্কৃতিক আফ্রিকার ‘স্টেরিওটাইপ’ লুকিয়ে আছে। কিন্তু উত্তর ঔপনিবেশিক তত্ত্বে আস্থাশীলদের মতটা ভিন্ন। এই ভিন্ন ইংরেজির মধ্যে তারা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখেন। তাবান ও লিয়াং তাদের একজন। তিনি বলেন:

Is he ungrammatical?Yes. But James Joyce is more ungrammatical than Tutuola—Let Tutuola writes ‘no grammar’ and the hyenas and jackals whine and growl

ইওরোবা লোককাহিনী-ভিত্তিক এই অনুসন্ধান কাহিনীটি পরবর্তীতে ইওরোবা ইংলিশ বা পিডগিন ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। উপন্যাসটি বিতর্কিত, তবে আফ্রিকার সাহিত্যিক ক্যাননের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে, গ্রন্থটি এক ডজনেরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। উপন্যাসের কথক নিজের সম্পর্কে বলছে—দশ বছর বয়স থেকেই তাড়ি খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ সে করেনি। তার জন্য তার বাবা এক তাড়ি রস সংগ্রহকারী ঠিক করে দেয়; কিন্তু একদিন গাছ থেকে পড়ে গিয়ে সে মরে যায়—তাড়িখোর কথক তাড়ি সংগ্রহকারীর জীবন ফিরিয়ে আনার জন্য মৃত্যুদেবের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এক সময় তাড়িখোর দেখে ‘মৃত্যুদেব নিজ বাড়িতে ছিল না, কারণ সে ছিলো ইয়াম বাগানে। এই অনুসন্ধান-যাত্রা জন বানিয়ানের ‘The Pilgrim Progress’ উপন্যাসের খ্রিস্টান কথকের ভ্রমণের মতবহুমাত্রিক অর্থ ইঙ্গিত করে। ‘পাম-ওয়াইন ড্রিংকার্ড’ এবং তার পরবর্তী উপন্যাসগুলিতে টুটুওলা ইওরোবা পৌরাণিক কাহিনী ও কিংবদন্তিগুলোকে একীভূতভাবে নির্মিত গদ্য মহাকাব্যগুলিতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যা ইওরোবা লোককাহিনী থেকে নেওয়া ঐতিহ্যবাহী বিষয়গুলোকে মনে করায়। টুটুওলাকে অবশ্যই গুরুত্ত্বের সঙ্গে নিতে হবে, কারণ তিনি ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক জীবনকে সমন্বিত করেছেন।

আফ্রিকার ইংরেজি সাহিত্য বললেই যার নাম মনে আসে সেই চিনুয়া আচেবে আরো বেশি সংযত ভাষা ব্যবহারে, কিন্তু চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিষয় ও বয়ানে। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এর মাধ্যমে আচেবে উত্তম ইংরেজিতেই ঔপনিবেশিক বয়ান ও মানসকে একহাত দেখে নিয়েছেন। সেই পঞ্চাশের দশকে, তখনো সাদা চামড়ার শাসন ও শোষণের দাগ লেগেছিলো আফ্রিকার কালো মাটিতে আর মানুষের দেহে। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ আফ্রিকার নাইজেরিয়ার ইবো জাতির ভাষা ও সাংষ্কৃতিক বৈচিত্রকে তুলে এনেছে। জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’ উপন্যাসে কালো কঙ্গোর মানুষদের নিতান্তই উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু চিনুয়া আচেবে আফ্রিকার মানুষের প্রতিবাদকে সামনে এনেছেন। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসে তিনি ইবো উপজাতির নেতা ওকোনকুওর উত্থান ও পতনের বর্ণনার মাধ্যমে পুরো নাইজেরিয়ার নিজস্ব সাংস্কৃতিক অতীতকে বয়ান করেছেন। গার্ডিয়ান পত্রিকায় আচেবে সম্পর্কে বলা হয়েছে: তিনিই আফ্রিকান সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যে উন্নীত করেছেন। ‘থিংস ফল আপার্ট’ ছাড়াও আরো চারটি উপন্যাসে চিনুয়া আচেবে ওকোনকোর পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা, উত্তর নাইজেরিয়ার সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা দেখিয়েছেন। ভাষা ইংরেজি হলেও তার উপন্যাসগুলো পরিষ্কারভাবে ইবো জাতি ও দক্ষিণ নাইজেরিয়ার লোকজ বয়ানে নতুনভাবে নিম্নবর্গের ইতিহাসকেই উঠিয়ে এনেছে।

ওলে সোয়িঙ্কা আফ্রিকার(নাইজেরিয়ান) আরেক মহান লেখক। প্রথম আফ্রিকান লেখক হিসেবে ১৯৮৬ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত সোয়িঙ্কা নাইজেরীয় মিথ, কিংবদন্তি ও লোকজ বিশ্বাসকে তার সাহিত্যেমুখ্য করে তুলেছেন। তুলনামূলক সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে তিনি পড়িয়েছেন আমেরিকার নানা বিশ্ববিদ্যলয়ে; অক্সফোর্ডসহ বেশ কিছু ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়েও। প্রসিদ্ধ সমালোচক Reed Way Dasenbrock মন্তব্য করেছেন, সোয়িঙ্কাকে পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি ঔপনিবেশিক আফ্রিকার মাটি থেকে উঠে আসা আফ্রিকার নিউ-লিটারেচার বা নতুন সাহিত্য আন্দোলনকেই স্বীকৃতি দিল। নাটক, উপন্যাস এবং কবিতা মিলিয়ে সোয়িঙ্কা প্রায় ২০টি রচনা প্রকাশ করেছেন। তিনি ইংরেজিতে লেখেন এবং তার সাহিত্যিক-ভাষা ঐশ্বর্যমণ্ডিত। নাট্যকার হিসেবে সোয়িঙ্কা, বিশেষ করে আইরিশ লেখকজে.এম.সিঞ্জ দ্বারা বেশ প্রভাবিত। তার লেখায় নিজের উপজাতি-ইওরোবা-লৌহ ও যুদ্ধের দেবতা ওগুনের সাথে পৌরাণিক কাহিনী উঠে এসেছে। ‘The lion and the Jewel’ নাটকটি তার একটি উত্তর ঔপনিবেশিক নাটক যেখানে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে বর্তমানের সংকটকে তুলে ধরেছেন অনেকটা কমেডির ভাষায়। এই নাটকে বারোকা, সিংহ, সিডিকে বিয়ে করার অধিকার নিয়ে আধুনিক লাকুনেলের সঙ্গে সংগঠিত লড়াই বর্ণিত হয়েছে, লাকুনলেকে বারোকার সভ্য-বিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং একতরফাভাবে তার সম্প্রদায়কে আধুনিকীকরণ এবং তার সামাজিক রীতিগুলোকে পরিবর্তনের জন্যকোনোকারণ ছাড়াই বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এই প্রসঙ্গে কেনিয়ার সাহিত্যিক নগুইর কথা আসে। কেনিয়ার এই প্রথাবিরোধী লেখক ইংরেজিতে লিখলেও একসময় শেকড়ের সন্ধানে স্থানীয় গিকুয়্যুভাষায় লেখা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করেন, ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেন এবং জেমস নগুইর নামপরিবর্তন করে এনজিও ওয়া থিওঙ্গো রেখেছিলেন, পাশাপাশি মাতৃভাষা জিকুয়ু এবং সোয়াহিলি ভাষায় লিখতে শুরু করেন। এ যেন অনেকটা উত্তর ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক ফ্রাঞ্জ ফানোঁর থিওরীর অনুসরণ। তার ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘A Grain of Wheat’ মার্কসবাদ প্রভাবিত। নাইরোবি বিশ্ববিদ্যলয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান থাকার সময় বিভাগের নাম পরিবর্তন করে এবং এর সঙ্গে অন্যান্য স্থানীয় ভাষাকে যুক্ত করে তিনি ঔপনিবেশিক প্রথা রদ করার চেষ্টা করেন। নিজের লেখা উপন্যাসকে আগে গিকুয়্যু ভাষায় লিখে, পরে ইংরেজিতে নিজেই অনুবাদ করা শুরু করেন।

বুকার বিজয়ী বেন ওকরি নাইজেরিয়ার ইবাডিনে জন্ম নেয়া আফ্রিকান কবি ও ঔপন্যাসিক। পড়ান ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যলয়ে। তার বিখ্যাত কবিতা ‘An African Elegy’ থেকে উদ্ধৃতি দিলে আফ্রিকান সাহিত্যে ঔপনিবেশিক-বিরোধী সুর বোঝা যাবে :

‘ঈশ্বরের হাতে গড়া আমরা অলৌকিক

সময়ের তিক্ত ফল আমাদের জন্য।

আমরা মূল্যবান

এবং একদিন অবশ্যই আমাদের কষ্টগুলো

পৃথিবীর বিস্ময়ে রূপ নেবে।’

বেন ওকরির ভাষায় আফ্রিকানদের তীব্র আশাবাদ তাদের লড়াইয়ের সূত্র :

‘আমিও মৃতদের কথা শুনেছি

এবং তারা বলছে

জীবন সুন্দর

তারা বলছে ভালোভাবে বাঁচো

আগুন নিয়ে, বুকে সর্বদা প্রত্যাশারসঙ্গে...

এখানেই বিস্ময়।’

আফ্রিকানরা তাদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের কথা বলে ইংরেজিতে—তবে সেগুলো অবশ্যই জীবনের গল্প, প্রতিবাদের কবিতা।

উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘দা টেম্পেস্ট’ নাটকে, ‘ক্যালিবান’ নামের একটি চরিত্র আছে যার মার কাছ থেকে প্রসপেরো একটি দ্বীপ ছিনিয়ে নিয়েছিল। ক্যালিবানকে দিয়ে সব কঠিন কাজ করিয়ে নিত সে, আর বিনিময়ে কিছু খাবার দিত। প্রসপেরো ঠিক যেন এক কলোনিয়াল প্রভু। ‘দা টেম্পেস্ট’ নাটকের দ্বিতীয় অংকে দেখা যায়, প্রভু প্রসপেরো করুণা ও ঘৃণার সাথে বলে ‘ও তো একটা আস্ত বোকা-জানোয়ার, যাকে অনেক কষ্টে ভাষা শিখিয়েছি’। মুখ বুজে শাসন সহ্য করলেও ক্যালিবান সেই ভাষা ব্যবহার করে প্রতিবাদ করে। ‘ভাষা দিয়েছ, আমি তোমাকে অভিশাপ দেবো, গালি দেবো এই ভাষায়।’ অন্যভাবে বলতে গেলে,ক্যালিবানপ্রভু প্রসপেরোর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের ভাষাভিত্তিক প্রতিবাদ করছে। ইংরেজরা অনেক কষ্ট করে গ্রামার ও শব্দার্থের তালিকা করে আমাদেরকে একটি ইংরেজি দিয়েছে যাতে আমরা আমরা গদগদ কণ্ঠে তাদের স্তুতি করি। কিন্তু সাম্প্রতিককালের আফ্রিকার সাহিত্য সেই ইংরেজি ব্যবহার করে, করেছে তার উল্টোটা।

শেষকরা যাক চিনুয়া আচেবের ‘The African Writer and the English Language’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে: ‘I feel that the English language will be able to carry the weight of my African experience. But it will have to be a new English, still in full communion with its ancestral home but altered to suit its new African surroundings.

হোক ইংরেজি বা সোয়াহিলি, আফ্রিকার কালো লেখকদের লেখায় সবসময়েই উঠে এসেছে আফ্রিকার মাটি ও মানুষের ঘামের গন্ধ। ইংরেজিতেই যদিও তারা শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের ভাষা ব্যবহার করে উপন্যাস, কবিতা বা নাটক লিখছে, কিন্তু তাদের ভাষা স্তাবকদের ভাষা নয়; বরং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের রঙে তৈরি হওয়া ভিন্ন এক ইংরেজি।

//জেডএস//

x