অপুর ছেলে

কামরুন নাহার শীলা ১৯:১৩ , নভেম্বর ০২ , ২০১৯

বাবা আরেকটা বিয়ে করে দূরে চলে গেলেই এতিম হওয়া যায় না, এতিম হতে হলে বাবাকে মরে যেতে হয়—এ-কথাটি অপুর ছেলে ততদিন বোঝেনি যতদিন তাদের পাড়ায় অপু নামের তারই সমবয়সী আরেকটি শিশু সপরিবারে ভাড়া থাকতে আসেনি। শিশু অপুর বাবা ট্রাক-দুর্ঘটনায় মৃত আর আমাদের অপু না মরেও তার স্ত্রী-পুত্রের কাছে আরেকটা বিয়ে করার অপরাধে মৃত। নিজের ছেলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কখনো-সখনো মিঠে সুরে কথা বললেও ছেলের মায়ের সঙ্গে কখনো কথা বলে না অপু। এ-নিয়ে অর্ণবের প্রশ্নের জবাবে প্রায়ই বিব্রতবোধ করে তার মা।

অপুর ছেলের নাম অর্ণব। যত আদর করে অপু তার ছেলের নাম রেখেছিলো তত আদরের সুরে অপু আজও ছেলের সঙ্গে কথা বলে মাঝে মাঝে। শুধু ছেলেকে দেখতে আসে না। পাঁচ বছর অর্ণব তার বাবাকে দেখে না। তার মা তার বাবার সকল ছবি লুকিয়ে ফেলায় অর্ণব তার বাবার চেহারাও ভুলে যাচ্ছিল। তবে এখনকার ব্যাপারটা অবশ্য ভিন্ন। অপু নামের পিচ্চিটা যেদিন পাড়ায় এলো সেদিন থেকে পাড়াপড়শির কাণ্ডকারখানাতেই অর্ণবের বাবাকে মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। একদিন তো বিকেলের খেলাশেষে বিরক্ত অর্ণব ঘরে ফিরে বলেই বসল, ‘আচ্ছা মা, এতিম হতে হলে বাবাদের মরতেই কেন হয়?’

অর্ণবের বয়স বারো বছর। এই বয়সেই সে বেশ বুঝে গেছে, তার বাবা তাদের পছন্দ করে না, তাই তাদের সঙ্গে থাকে না। তার ওপর গত ইদে নানু তাকে চুপিচুপি বলেও দিয়েছে যে, তার বাবা তাদের ভুলে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করে দিব্যি আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে। বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে, অর্ণবদের কথা একটুও তার ভাবনায় ছিল না কিংবা নেই—এই ব্যাপারগুলো অর্ণব যেদিন নিশ্চিত হয়েছে, সেদিন থেকেই মায়া আর ঘৃণার এক জটিল জালে আটকা পড়ে গেছে সে। ‘বাবা তাদের ছেড়ে কীভাবে চলে যেতে পারল!’ এই ভাবনায় সে যতবারই বাবাকে ঘৃণা করেছে, বাবা আর কোনোদিন তাকে বুকে নিয়ে ঘুমাবে না, আর কখনো ‘‘ভূতের মতো চেহারা, নির্বোধ অতি ঘোর/যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন, ‘কেষ্টা ব্যাটাই চোর’!’’ ছড়া কাটতে কাটতে তাকে ভাত খাওয়াবে না—এই হাহাকারে ভাত মাখাতে মাখাতে কতবার যে চোখের জল মুছেছে সে! এত ঘৃণ্য কাজ করলেও বাবাকে কেন এত ঘৃণা করা যাচ্ছে না—এই নিয়ে নিজের উপরেই খ্যাপা ছিল সে। বহুদিন ধরে বাবার সহচর্যহীনতায় অর্ণব অভ্যস্ত হয়ে গেলেও, কোনো শিশু বাবার আদর পাচ্ছে—এমন দেখলে প্রথমে তার মন খারাপ হতো। তারপর লাগত রাগ। পৃথিবীতে সব শিশুর বাবা থাকবে কিংবা কোনো শিশুরই বাবা থাকবে না—এমন সহজ হিসেবে পৃথিবী চলে না কেন, তা নিয়ে আহ্লাদি পিতা-শিশুর উপস্থিতিতেই ভাবতে শুরু করে দিত সে। কিন্তু পাড়ায় নতুন আসা অপুর সৌভাগ্যে তার সমস্ত চিন্তায় জট লেগে যায়। নতুন অপুর আসা আর পুরোনো অপুর চলে যাওয়া—এই দুই অপুর আসা-যাওয়া অপুর ছেলের ক্ষুদ্র চিত্তের স্থির পুকুরে বিশাল ঝড়ের অনুরণন জাগায়। ছোট্ট অর্ণবের অতটুকু মগজ কুলিয়ে উঠতে পারে না আর। ‘বাবা-মা একসঙ্গে থাকলেই কেবল জীবন আনন্দের হয়’—এমন সিদ্ধান্তে স্বস্তি পাওয়া অর্ণবকে আবার গোড়া থেকে ভাবতে বসতে হয় বন্ধু অপুর কারণে। বাবা না থাকলেও যে জীবন আনন্দের হতে পারে তা সে উপলব্ধি করে দাদা-দাদি, নানা-নানি আর মামা-খালাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত বন্ধু অপুকে দেখে। অপুর মা একা থাকলেও আত্মীয়স্বজনদের নিয়মিত আসা-যাওয়ার কারণে অপুকে ঘিরে আহ্লাদের সীমা-পরিসীমা নেই। আবার বাবার মরে যাওয়াই কেবল বাবাহীন অবস্থার বিশেষত্ব নির্ভর করে, বাবার চলে যাওয়ার মধ্যে নয়—জটিল এই গ্রন্থির মোচন তার সেদিনই ঘটেছিল যেদিন সে অপুকে ‘এতিম’ হওয়ার কারণে পাড়ার আন্টিদেরও আদর পেতে দেখেছিল। সেদিন তার মনে হয়েছিল বাবা না থেকেও অপু কত সুখী! অপুর সৌভাগ্যে অর্ণব সেদিন নিদারুণ ঈর্ষার গ্যাঁড়াকলে পড়ে ভীষণ বিব্রত হয়েছিল!

অপুর মা অপুকে নিয়ে একাই থাকে, অর্ণবের মা-ও। কিন্তু অপুর মা তার বিধবাবস্থার জোরে যে-অনুকম্পা পাচ্ছে এলাকাবাসীর, অর্ণবদের তার তিল পরিমাণ পাওয়ারও সুযোগ নেই। অর্ণবের বাবার ব্যাপারটায় এলাকাবাসীর স্পষ্টত কোনও ধারণা না থাকলেও তারা বেশ বুঝতে পারে ‘ভিত্রে-ভিত্রে কোনো জব্বর ঘটনা আছে!’ তবে অর্ণবদের বাড়ির মালিক ব্যাপারটা জানেন বলে অর্ণবের বাবার এতদিন ধরে ‘বিদেশ থাকা’র এই কানামাছি খেলাটিকে তারা মেনে নিয়েছেন। বাড়িওয়ালি বাকি প্রতিবেশীদের কী বলেছেন কে জানে, অর্ণবের মাকে তেমন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি কখনো। এর একমাত্র কারণ অবশ্য কোনো-না-কোনোভাবে এলাকাবাসীর কৌতূহল নিবৃত্ত হওয়ার মধ্যে অন্তরীণ নয়। কৌতূহল মেটার আগে-পরে পাড়ার মানুষের সঙ্গে অর্ণবের মায়ের কোনো অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠেনি বলেও। তবে অর্ণবের মা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে প্রতিবেশীদের ঘরকন্না দেখে। তাদের ঝগড়া-বিবাদের ফাঁকেও স্বামী-স্ত্রী সন্তান-সন্ততি নিয়ে যে-পারিবারগুলো তামান্না দেখে সেগুলোও প্রায়শই তার দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়। সেদিন বাড়িভাড়ার টাকা দিতে  গেলে বাড়িওয়ালি নিজের স্বামীর নামে অনুযোগ করে বলেছিলেন, ‘দেখেন না ভাবি! দুই কেজি গুড়ামাছ আনছে আপনের ভাই, ক্যামনে কাটি এগুলা এখন!’ এই অনুযোগের মধ্যে অম্লমধুর রসটি তামান্নার নজর এড়ায় না। সে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে হাসে। সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সহকর্মী দীপা বলছিল, সেকেন্ড হানিমুনে যাচ্ছে কক্সবাজার। ‘মানুষ তাদের রোমান্টিকতার খবর জানাতে আমাকেই কেন বেছে নেয়!’ বিরক্ত হয়েছিল তামান্না মনে-মনে। কিন্তু মনে পড়ে গিয়েছিল স্বামীসহ তার প্রথম কক্সবাজার যাওয়ার কথা। বিয়ের পরপরই যাওয়া। মজার ব্যাপার, দুদিন ছিল তারা অথচ একবারও সাগর দেখাতে নিয়ে যায়নি অপু। লজ্জায় সে বলতেও পারেনি, ‘কক্সবাজার এসে আমরা সাগর কেন দেখছি না?’ তিনমাসের প্রেমের মাথায় হুট করেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় অপু। তামান্না তখন ঘোরের ভিতর, জানার চেষ্টাও করেনি, এত তাড়াহুড়ো কেন ছিল অপুর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই পরিবারের অজান্তে বিয়ে করে ফেলে তারা। ভার্সিটির হলে থাকত তামান্না। বাবা-মাকে না জানিয়ে তখনই বাসা নেওয়ার সাহস করেনি অপু, কিন্তু শারীরিক খিদেও অস্বীকার করতে পারছিল না। তখন না বুঝলেও এখন হিসেব মেলে তামান্নার। প্রকৃতপক্ষে অপু তাকে কক্সবাজার নিয়েছিল তার সঙ্গ নয়, সঙ্গম উপভোগ করতে। এরপর অবশ্য আরো একবার যাওয়া হয়েছিল তাদের। তখন অর্ণবের বয়স পাঁচ বছর। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনও ছিল। সেবার সাগর দেখা হলেও অপুর মেজাজ-মর্জির ঠিক ছিল না। তামান্না না কি আত্মীয়স্বজনের মন রেখে চলতে পারছিল না। অথচ কারো মন না রাখতে পারার মতো এমন কিছুই ঘটেনি। আপা-দুলাভাইয়ের আচরণেও কিছু বোঝা যায়নি। তারপরও ভুলগুলো কী, বারবার জানতে চাইলেও কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি অপু। ধীরে-ধীরে তামান্না বুঝেছিল, মনের মিলহীন মানুষের সঙ্গে মানসিক অন্তরঙ্গতা দুর্লভ।

অর্ণবদের বর্তমান বাসার অবস্থান চমৎকার এক জায়গায়। এক-টুকরো উঠান আছে, অনেকগুলো শিশু আছে, পাশের টিনের বাড়িতে একটা গোয়ালঘরে গরুর হাম্বা আছে, হাঁস-মুরগির প্যাকপ্যাক-কককক থেকে শুরু করে ছাগলের ম্যাঁ-ম্যাঁ-ও আছে দেখে প্রথম দর্শনেই তামান্নার বাড়িখানা পছন্দ হয়ে যায়। এলাকাটা সৌদি-নিবাসী নব্য বড়োলোকদের হলেও বাসিন্দারা বেশিরভাগই স্বল্পশিক্ষিত। কিন্তু শহরে শিক্ষিত মানুষের ভিড়ে, ইট-কাঠের বন্দিশালার হাঁপধরা অবস্থার বাইরে অশিক্ষিতদের এই গেঁয়ো এলাকাটাকেই তখন স্বর্গপুরী মনে হয়েছিল তার। তার মায়ের মফস্বলের পোস্টিং-এ অর্ণবের নানা-নানুর মন খারাপ হলেও তামান্না যারপরনাই খুশি হয়েছিল ছেলের কথা ভেবে। বদ্ধ খাঁচা থেকে মুক্তি মিলছে অর্ণবের। অর্ণবও দারুণ খুশি! দস্তুরমতো কিছু বন্ধুও জুটিয়ে ফেলেছিল দুদিনের মধ্যেই। বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হয়, আবার মিটেও যায়। কখনো-কখনো তামান্নাকেও অংশগ্রহণ করতে হয় মান-ভাঙানো যজ্ঞে।

অর্ণবদের পরিবার এলাকাবাসীর নানা উপকারে আসে। কারো হয়তো এক হাজার টাকা ধার লাগবে, খোঁজো অর্ণবের মাকে। কোরবানির মাংস রাখার জায়গা নেই, অর্ণবদের ডিপ ফ্রিজ আছে না! একটা ডিম, দুটি আলু, চারটি পেঁয়াজ—এমন বহুবিধ জিনিস নিরন্তর সাপ্লাই দিয়েও এলাকাবাসীর মন পায়নি অর্ণবেরা। পাড়ার মানুষ তাদের সহজাত প্রবৃত্তি বশেই অর্ণবদের দেখতে পারে না। তাদের হিতে এত কাজে লেগেও তাদের হৃদয়ে স্থান না পাওয়ার কারণ হয়তো অর্ণবের মায়ের স্বাধীনতা। রাত একটায় ঘরে ফিরলেও তাকে কেউ কিচ্ছু বলবে না। অর্ণবের মায়ের এই স্বাধীনতা বল্লার হুল ফোটায় পাড়ার মহিলাদের। এই যাতনায় তারা অর্ণবের মাকে তালাবদ্ধ করে রাখতেও পারে না। যেখানে তারা সংসারের জন্য খাটতে খাটতে হাড় কালি করে ফেলছে, তারপরো মনমতো সব হচ্ছে না, সেখানে ‘এই বেটি তার নিজের পোলাটারেও ক্যামনে বুয়ার হাতের রান্ধন খাওয়ায়!’ তারা অবাক হতেও ভুলে যায়। এ নিয়ে মাঝে মাঝে অর্ণবকে খোঁচাও দেয় তারা। অর্ণবেরও তখন খেয়াল হয়, ‘ঠিকই তো, তার মা তো বন্ধুদের মায়ের মতো করে তার যত্ন নেয় না!’ তখন সে অনুযোগের সুরে বলে, ‘মা, তুমি কিন্তু আমার একটুও খেয়াল করো না!’ অর্ণবের মায়ের তখন মনে পড়ে যায় প্রাক্তন স্বামীর কথা। বুয়ার হাতে রান্না চিংড়ির ঝোল দিয়ে ভাত মাখাতে মাখাতে অপু বলেছিলো, ‘আজকাল সংসারে তোমার একদম মন নেই। তুমি রান্নাবান্না কেন ছেড়ে দিলে?’

‘তুমি কী করে ভাবো যে এখনও আমি তোমাকে তোমার মায়ের মতোই চিংড়ি-ভুনা খাওয়াব, ছোটোমাছের চচ্চড়ি করব? সেই স্বামী কী তুমি আছো?’

অপু চুপ করে গিয়েছিল। একটু পরেই বলেছিল, ‘আমার জন্য না হয়, ছেলের জন্যও তো মাঝেমধ্যে রাঁধতে পারো।’

উত্তর দেয়নি তামান্না। উঠে গিয়েছিল খাবার টেবিল থেকে। ভাত আর গলা দিয়ে নামছিল না। স্মৃতিপটে ভেসে উঠেছিল অপুর ইনবক্স। সেখানে অপু আর প্রমা নামের মেয়েটির প্রেম-মধুর রসালাপ। তামান্নাকে নিয়ে কত মিথ্যাচার ছিল অপুর! অবশ্য অপুকে ঠিক দোষও দিতে পারে না তামান্না। লিমনের চিঠিগুলো ফেলে দিলেই হতো। কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে কতবার হাতে পড়েছে। ফেলতে গিয়ে মায়া লেগেছে, ভালোও লেগেছে। একসময় তাকেও কেউ এমন অন্ধের মতো ভালোবাসত, আজকের ভালোবাসাহীন অপুর শিথিল আচরণের মধ্যে হুট করে বের হয়ে আসা চিঠিগুলো যেন তামান্নার তারুণ্য ফিরিয়ে আনে। কিন্তু এত বছর ধরে লুকিয়ে থাকা চিঠিগুলো যে আসলে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ছিল, তা টের পাওয়া গেল বাসাবদলের সময়। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়েই! চিঠির ভাষা স্পষ্ট। পছন্দের মানুষের প্রতি একজন প্রেমিক পুরুষের আকুতি। কিন্তু অপুকে কিছুতেই বোঝানো যায়নি ওটা একতরফা ছিল। সেই ঝাল খেতে খেতে জ্বলে যাওয়া তামান্না নিজের ভুল নিয়েই অপরাধে ভুগত। অপুর আচরণের পরিবর্তনে নিজেকেই দায়ী ভাবত। অপুর কারণে নিজের বাবার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিকেও সে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিল। বাবা মেয়ে-অন্তপ্রাণ ছিলেন না। মেয়ের জামাইয়ের কারণে চৌদ্দ লক্ষ টাকার আর্থিক দণ্ডের দুঃখকে তামান্না-অপুর ডিভোর্সের আগ পর্যন্ত মানতে পারেননি তিনি। শ্বশুরের সাপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না আর—এটা হজম করাও ছিল অপুর জন্য কষ্টের। প্রতিনিয়ত ব্যবসায়িক ধরা, পাওনাদারদের হুমকি, অপমান, যারা তামান্নার অফিসেও হামলা চালাত, তামান্নার নামে নেওয়া ব্যাংক লোন, লোন পরিশোধে তামান্নার নাকানি-চোবানি, পাওনাদারদের ভয়ে রাতের আঁধারে বাসা বদলানো... একেকটা দিন কাটত কালরাত্রির আতঙ্কে। ভাবলে এখনো শিউরে ওঠে তামান্না! শেষের দিকে তামান্না অপুর কাছে এসব ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মিনতি করত খুব। মুক্তি সে পেয়েছিল, কিন্তু সেটা ঠিক এভাবে মিলবে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি সে। অদ্ভুত! এই মুক্তির ঠিক আগে-আগেই তাদের সমস্যাগুলো মিটে যাচ্ছিল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে যাবে তামান্না, ঠিক তখনই বজ্রাঘাতের মতো আবির্ভাব হলো প্রমার। ‘অপু তার দুর্দিনে তামান্নাকে ইউজ করেছে, সুদিন আসা মাত্রই তাকে ল্যাং মেরেছে’—বাবা যখন এসব কথা বলে তখন প্রতিবাদ করতে গিয়েও তামান্না চুপ হয়ে যায়। বাবা কি খুব ভুল কিছু বলছে? তামান্না সন্দিহান থাকে।

‘ও মা, নাশতায় আজ কী!’ ছেলের কথায় সম্বিৎ ফেরে তামান্নার।

‘নুডুলস।’ ছোট্ট করে বলে।

‘এগেইন!’ বিরক্ত ঝরে অর্ণবের গলায়।

‘হুম, এগেইন!’ হেসে ফেলে তামান্নামা। কিন্তু অর্ণব ছাড় দেয় না। অভিমান করে বলে, ‘আরিফের মা তাকে কত মজার-মজার নাশতা বানিয়ে খাওয়ায়, তুমি আমাকে কিচ্ছু বানিয়ে দাও না।’

অর্ণবকে নিজের ব্যস্ততার কথা বোঝাতে পারে তামান্না, কিন্তু এলাকাবাসীকে বোঝানোর অবকাশ যে নেই। তাদের মনোভাবও তামান্নার অজানা থেকে যায়। তবে তাদের আর অর্ণবদের মধ্যকার পার্থক্যের ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারে, মহিলা একা-একা ছেলেকে বড়ো করছে কারো সাহায্য ছাড়াই, এ-কারণে তার উপর হয়তো ঈর্ষামিশ্রিত একটা শ্রদ্ধাবোধও কাজ করে তাদের মনে। তাদের এই দ্বিমুখী মানসিকতার দ্বন্দ্বে অবশ্য ঈর্ষারই জয় হয়। আর সেই জ্বলুনি লাঘব করতে তারা বেছে নেয় অর্ণবকে। অর্ণবের মায়ের অজান্তে তারা তাকে দিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করায়। দোকান থেকে আলু, পেঁয়াজ, তেল কিংবা বিশ টাকার রিচার্জ কার্ড আনা থেকে শুরু করে দশ-পনেরো মিনিটের জন্য তাদের বাচ্চাদের দেখাশোনার দায়িত্বও নির্দ্বিধায় তুলে দেয় অর্ণবের কাঁধে। অর্ণবের মা জানলেও কী, ‘বেটি একেবারেই ভ্যাড়ামার্কা!’ এতদিনে তারা নিশ্চিত হয়ে গেছে। অর্ণব হাসিমুখেই সব করে। প্রতিবেশীর উঠোনে একটু সময় ধরে খেললেই তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, অথচ বাকি শিশুদের তখনও খেলার অনুমতি থাকে। তাদের এমন আচরণে এতদিন সে মন খারাপ করলেও বাস্তবতা মেনে নিয়ে মনকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করছে আজকাল। বাস্তবতা হলো এই, স্থানীয়রা যত কম শিক্ষিত কিংবা দরিদ্রই হোক না কেন, এই এলাকায় তাদের অবস্থান ভাড়াটেদের ওপরে, সেই ভাড়াটে যত শিক্ষিত কিংবা উচ্চপদস্থ হোক না কেন। আর তাই গতদিনের অপমানের ইতিহাস ভুলে অর্ণব আবার খেলতে যায়, হয়তো নতুন কোনও ইতিহাস গড়তে।

এসব মাথায় রেখে অর্ণবের সব ঠিকঠাকই চলছিল এতদিন, শুধু অপুটা এসেই বাগড়া দিল। বাবার নামে বন্ধুর নাম, কথাটা যেদিন সে প্রথম জানল, সেদিনই বুকের মাঝখানটায় খালি-খালি লাগছিল তার এবং কী আশ্চর্য, অপুর মা এলাকার অন্যান্য মহিলাদের মতোও নয়! আন্টি অর্ণবকে দিয়ে কোনও ফালতু কাজ করায় না, অবেলায় বাসায় গেলেও ভাগিয়ে দেয় না। তবু অপুর উপস্থিতি অর্ণবের পুরোনো বেদনাবোধকেই খুঁচিয়ে যায়। অর্ণব কায়মনে প্রার্থনা করে, ‘হে আল্লা, এমন কোনও ম্যাজিক দাও যেন অপুরা এই বাসা ছেড়ে চলে যায়।’ ছেলের মনের এই উদ্বেল জানতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যায় তামান্নার। সে হয়তো কখনও জানতও না যদি না অর্ণব সেই সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে প্রশ্নটা করত, ‘এতিম হতে হলে বাবাদের মরতেই কেন হয়?’

‘ছি অর্ণব! এমন কথা বলে না।’

‘‘অপুর বাবা নেই বলে সবাই তাকে কত আদর করে! বাবলুর মা অপুকে ‘বাবা-বাবা’ বলে ডাকল আজ, কই আন্টি তো কোনোদিনও আমাকে ‘বাবা’ ডাকল না। আমারও তো বাবা নেই!’’

‘কে বলল তোমার বাবা নেই?’

‘কোথায় আমার বাবা? থাকলে অন্য সবার বাবার মতো আমাদের সঙ্গে থাকে না কেন? কেন এতদিন ধরে আমাকে দেখতেও আসে না?’

‘তোমার বাবার অনেক ব্যস্ততা, তাই হয়তো সময় পায় না।’

‘ঘোড়ার ডিম!’ অর্ণব চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আমি সব জানি। বাবা আমাদের ভালোবাসে না আর, তাই আসে না। আন্টিরাও ঠিক বুঝতে পারে, বাবা যে আমাদের ভালোবাসে না। যে-বাচ্চাটার বাবা তাকে পছন্দ করে না বলে দূরে থাকে, সেই বাচ্চাটাও তো বাবাছাড়া। সেও তো এতিম। তাহলে কেন আন্টিরা আমাকে আদর করে না?’

‘এমন করে না বাবা! এই দেখো, তোমার জন্য চিজ স্যান্ডউইচ বানাচ্ছি।’ তামান্না অর্ণবের মনোযোগ ঘোরাতে চায়, কিন্তু প্রিয় স্যান্ডউইচ আজ মন গলাতে পারে না ছেলের। কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে ওঠে সে, ‘তুমি এমন কাজ করো যেন অপুরা চলে যায়!’ একটু থেমে এবার যেন আদেশ দেয়, ‘তুমি এমন কিছু করো যেন আমার বাবাও মরে যায়!’

‘এসব কী বলছ অর্ণব!’ ধমকে ওঠে তামান্না। কিন্তু সেদিকে কানই নেই ছেলের। স্বগতোক্তি করতে থাকে সে, ‘অপু নামটা এত বিশ্রী ক্যান?’ মায়ের দিকে তাকিয়ে এবার উঁচু গলায় কাটা-কাটা স্বরে বলে, ‘তুমি অপুদের চলে যেতে বলো। নয়তো চলো, এই এলাকা ছেড়ে আমরাই এমন কোথাও চলে যাই যেখানে অপু নামের কেউ নাই। যেখানে সবাই আমার মতো।’

‘যথেষ্ট হইছে অর্ণব! এবার হাতমুখ ধুয়ে নাশতা করতে আসো।’ ধমকে ওঠে তামান্না।

‘না, যথেষ্ট হয় নাই!’ পালটা ধমক দেয় অর্ণব, ‘তুমি আন্টিদের জানাও যে আমিও এতিম!’ চিৎকার করে ওঠে সে, ‘‘আন্টিরা আমাকেও একবার ‘বাবা’ ডাকুক।’’ হাঁপাতে থাকে সে।

স্যান্ডউইচের উপর টমেটো সস দিয়ে স্মাইলিং ফেইস আঁকছিল তামান্না। ছেলের আচরণে অসহায়বোধ করে। খাবার টেবিলের অপরপ্রান্ত থেকে সান্ত্বনা দেয় ছেলেকে, যেন নিজেকেও, ‘তুমি এতিম হতে যাবে কেন সোনা, তোমার বাবা বেঁচে আছে না!’ অর্ণব শান্ত হয় না। হাঁপানোর সঙ্গে সদ্য পাওয়া ফোঁপানিকে একত্র করে সে ক্রমাগত বলে যায়, ‘যে-বাবা বেঁচে থেকেও মরা মানুষের মতো থাকে, তার আর বেঁচে থেকে লাভ কী? সে মরে গেলেই তো ভালো! তাকে মরে গিয়ে ফাইনালি আমাকে এতিম করে দিতে বলো।’ কাঁদতে কাঁদতে যোগ করে অর্ণব, ‘আমি এতিম হলেই সবার আদর পাব।’ কান্নার দমকে হেঁচকি উঠতে থাকে তার।

‘বাবাকে ম’রে যেতে বলো!’ শেষ বাক্যটির গগনবিদারী আর মর্মভেদী চিৎকারে স্তম্ভিত তামান্না ঠিকঠাকমতো স্তম্ভাবস্থা উপভোগও করতে পারে না, অস্থির হয়ে তাকে ছুটে যেতে হয় অর্ণবের বুক আর পিঠ মালিশ করতে। ভীষণ রাগের উন্মত্ততায় অর্ণবের বরাবরের মতোই দম আটকানো অবস্থা হয়েছে।

//জেডএস//

x