‘উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে’: পথিক রবীন্দ্রনাথ

কুমার চক্রবর্তী ১৭:৫০ , নভেম্বর ০৪ , ২০১৯

‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারে লাগে ভালো’, বা ‘গোলাপ বলে, ওগো বাতাস, প্রলাপ তোমার বুঝতে কে বা পারে’—এই এমন অসংখ্য যে-কথা বা আত্মলব্ধবোধ, এর মধ্যে কি শুধু মুগ্ধ-আর্তি প্রকাশ পেল, নাকি ব্যক্ত হলো কোনো পারাপারের আকাঙ্ক্ষা, যা স্বতশ্চল হতে চায় অবাধ মনশ্চারণায়! অথবা ‘চৈত্ররাতের চামেলি’র যে-রূপ মনে হয় প্রতিভাত, তা কি একান্তই অনুভব না কি তার কাছে যাবার এবং তাকে পাবার ব্যাকুলিত স্পৃহা! ফুল তুলতে বনে গিয়ে দু’নয়নে জল নিয়ে ফিরে আসা, বা রাতে বিছানায় শুয়ে মুখ ঢেকে অন্ধকারকে অনুভব করে কালো নদীর দু-ধারকে মনে করা আর তার ভেতর দিয়ে রাতের নৌকার চলাচলকে কল্পনা করা—এই যে আপাত কার্যকারণহীনতা, যা-ই হোক না কেন, এটা যে মনোভ্রমণ, এটা যে মনশ্চারণ তাতে কোনো জড়তা নেই। ভাব যখন মনকে নাড়ায়, সত্তা তখন ভ্রামণিক, আর ব্যক্তি তখন চিন্তা বা কল্পনারসে চিরপথিক। স্থিরতার মধ্যে এক অসম্ভব অস্থিরতা তাকে অবিরত এবং অনবরত দোল দিতে থাকে, কেননা জীবনের অন্বেষণ আর উদ্যাপন তো প্রথমে শুরু হয় মনের উসকানি এবং উহ্যমানতায়। মন—যা কবির সম্বল, মন—যা পথিকের চালনশক্তি, মন—যা সত্তার আলোর ঝলকানি।

আমরা যখন গান শুনি, বা কিছু পড়ি, বা লিখি, বা দেখি চিত্র বা শিল্পরূপ—তখন বস্তুত ভ্রমণ করতে থাকি, হই মনোভ্রামণিক। মুহূর্ত তখন মহাকাল হয়ে ওঠে, প্রতিটি অনুভূতির কম্প্রমাধুরি তখন গতি পায়, এগিয়ে চলে নিজ খেয়ালে। শিল্প বা চিন্তার মাঝে থাকা মানে এক ভ্রমণে থাকা, কেননা শিল্প আগাগোড়াই মনকে ভ্রমণে রাখে। শরীর ভ্রমণ করে না, মন করে, শরীর তাকে অনুসরণ করে সমর্থন দেয় কখনও কখনও; আবার শরীরের সমর্থন ছাড়াও মন ভ্রমণ করে, শরীর বিগড়ে গেলে কখনো-বা মন আরও দ্রুতগামী হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মাঝে অসীমের আনাগোনা, সময়ের পল ধরে মনের অসম্ভব সঞ্চরমানতাকে টের পেতে থাকা তাই ভ্রামণিক সত্তার নিয়তি। বেরিয়ে আসে বোধিত দৃশ্য, স্ফুট হয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা। সুর-শব্দ-রূপের স্বগত পথরেখা ধরে এগোয় একা একা, যেন নিঃসঙ্গ পথিকের অভিযান। উতল মন উত্তাল হয় বায়ুপ্রবাহের মতো। ধীরে স্পষ্ট হয় পথিকের অন্তর্ভেদী জাদুঘর। পথিক সেই অনশ্বর ও অনন্ত জাদুঘরের বিস্ময়মানব, যে দেখে মন দিয়ে, হাঁটে সত্তার শাশ্বত পরিক্রমণে।

যৌবনের স্বপ্নতাড়িত রোমান্টিকতা থেকে বয়স্কের অস্তিত্বতাড়িত রোমান্টিকতা, বা যুবকের অস্তিত্বভাবনা থেকে প্রবীণের অস্তিত্বভাবনা, বা নবীন প্রেম থেকে প্রবীণ প্রেমের খেলা, খেয়া এবং পারাপার—সবই তার লেখায় উদ্ভাসিত, এমনভাবে যে তা অভিসন্ধিত বোধ ও অর্থময়তাকে হাজির করতে মহাতৎপর। সমগ্র জীবনের অবস্থান ও অন্বেষণে যেন তিনি কবিতা লিখেছেন, যা স্থানবদল করেও নিজ স্থানে ফিরে যায় বারবার। অর্ধস্বর বা অনুস্বর সৃষ্টি তার কবিতার অপ্রতিম বিশিষ্টতা। হয়তো পুরো কবিতা নয়, কেননা কবিতার সমগ্রতা একটি আপতিক বিষয়, তার অতলান্ত অর্ধস্বরগুলো—যা সচকিত এবং খনিতে হঠাৎ উঠে আসা উদ্ভাসিত হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিমান—এখনো কাঁপিয়ে দেয় মানুষের কবি-মনকে, যারা অন্তত শাশ্বতের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে চায় কবিতাকে। পৃথিবী, তার সমগ্রবোধ এ কথাই বলে যে, তিনি হলেন পৃথিবীর কবি। এ পৃথিবী যদি কবিতা পড়তে চায়, ঈশ্বর যদি কবিতা পড়তে চান, তবে পড়তে হবে তার কবিতা। ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ভাব দিয়ে নতুন সৃষ্টি করেছেন তিনি, পাঠককেও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ‘তিনিও কবি’। সৃষ্টিকে ভাব দিয়ে ভূমা যদি দেখতে চায় নিজেকে, তবে নিজ প্রতিরূপ খুঁজে পাবে তার কবিতায়। সারাজীবন তিনি যেন এক নাছোড় স্মৃতিই নির্মাণ করেছেন, যে-স্মৃতি সাহিত্য-শিল্প-সংগীতে প্রতিধ্বনি তুলে চলেছে।

২.

কবিরা—সেই ব্যতিক্রমী কবিরা—দ্বিজ: এক জন্মেই আরেকটি জন্ম ঘটান, যে জন্ম তার আকুলিত বাসনাকে রূপদান করে চলে। একটি হলো প্রাকৃতিক জন্ম যা ঘটে অন্যের ইচ্ছায়, আর অন্যটি আত্মজন্ম যা ব্যক্তি নিজেই ঘটান। একটি শারীরিক জন্ম, অন্যটি মানসিক পুনর্জন্ম। উইলিয়াম জেমস একে পার্থক্য করেছেন যে, অধিকাংশই একবার জন্মে আর কেউ কেউ দ্বিতীয় জন্মের অন্বেষণে থাকেন এবং জন্মান্তরিত হন, হয়ে তাদের ব্যক্তিক শক্তির অভ্যাসগত কেন্দ্রিয়তার রূপান্তর ঘটান।

জন্মের পর থেকেই মুক্তি খুঁজছিলেন তিনি, চাইছিলেন দ্বিতীয় জন্ম। যিনি হবেন ভবিষ্যের ভাষা-মন-গান-প্রাণের মহান জাদুকর, তিনি যে মুক্তি চাইবেন, এ আর আশ্চর্যের কী! জীবন এক কারাগার, এই স্টোয়িক ধারণা দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত কিন্তু প্রচলিত যাপন যে মুক্তসত্তার জন্য বন্ধন, তা পথিকচিন্তার ফল। দর্শন না-জেনেও, শুধু হৃদয়সংবেদে যে-কেউ এ প্রতীতিতে স্থির হতে পারেন অনায়াসে। নানাভাবে ও বিভাবে বলেছেন মুক্ত হবার বাসনার কথা—কবিতায়, আত্মজীবনীতে, পত্রে বা স্বগতোক্তিতে। নিজেকে তিনি মাঝেমাঝেই ভেবে বসতেন ‘বন্দী’, আর এর উভয় অর্থেই তিনি বস্তুত তা-ই ছিলেন—বন্দনা করতেন জীবনের, জগতের, আর নিজেকে আবদ্ধ সত্তাও ভেবে বসতেন। কবিতায় তাই তিনি বলেন: স্বাধীন করিয়া দাও, বেঁধো না আমায়। তার একটি কবিতায় তিনি ফুলের দলে আবদ্ধ কুঁড়ির রূপকে বলেছেন নিজের কথা এভাবে: কুঁড়ির ভিতরে আকুল গন্ধ/ ভাবিছে বসে—/ ভাবিছে উদাসপারা,/ জীবন আমার কাহার দোষে/ এমন অর্থহারা। এক অসীমবোধ ও অজানার টান অনবরত অনুভব করতেন তিনি প্রাণে ও প্রাণনে, তাই দূরের আকাশের ডাক, বাঁশির আহ্বান শুনতেন তিনি, ফলে স্বগতোক্তি করতেন অবলীলায়: ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।’ সীমাহীনতার প্রতি মানুষের প্রবল আকর্ষণের কথা তিনি বলেছেন। বলেছেন, সেই আকর্ষণকে অবহেলা করে বসে থাকলে মঙ্গল নেই, ভূমাকে পাওয়াতেই সুখ। ‘চলিবার আনন্দটুকুই’ পাবেন বলেই বাহির হবার জন্য তিনি থাকতেন আকাঙ্ক্ষিত। ‘পথের শেষে’ কবিতায় তিনি বলছেন:

সেই অজানার দূত আজি মোরে নিয়ে যায় দূরে

অকূল সিন্ধুরে

নিবেদন করিতে প্রণাম।

মন তাই বলিতেছে, আমি চলিলাম।

এটা স্পষ্ট যে তিনি কর্মী হয়েও ছিলেন না ঠিক কর্মী, সংসারী হয়েও ঠিক ঠিক সংসারবিমুখ, অর্থাৎ নানাকাজে বিপুল কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত থেকেও কোথাও যেন ছিলেন অব্যবস্থিত, মনে মনে দলছুট, ও বেখাপ্পা। তিনি নিজেকে উদাস, বাউল, পিয়াসি, অলস, নির্জনাক্রান্ত এবং পান্থজন, পলাতক ইত্যাদি ভাবতে পছন্দ করতেন, বলতেন, ‘পথিক চলিল একা/ অচেতন অসংখ্যের মাঝে।’ বস্তু বা তার অবস্থান থেকে পালাতে, লোকালয় থেকে বেরিয়ে যেতে, শহর থেকে প্রকৃতিতীর্থে অবস্থান করতে তার আকাঙ্ক্ষা ও ঔৎসুক্য ছিল সারাজীবন ধরে অটুট। স্বাভাবিক জীবনে কোথাও-বা এক ধরনের হাঁসফাঁস, এক অস্বস্তি ও অনভ্যস্থতা যেন তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। নিজেকে ভাবতেন চঞ্চল, সুদূরের পিয়াসি, উন্মনা; কী এক অজানা বেগে উথলিত। ভাবতে চাইলেন নিজেকে আরব বেদুইন, চিরপথিক হিসেবে পথ চলাতেই হতে চাইলেন আনন্দিত। নিজের উদ্দেশ্য বলে বিবেচনা করলেন ‘বাহির হইয়া পড়া’কে, হতে চাইলেন যথাসম্ভব পৃথিবীর সাথে পরিচিত। বলেছেন নিজেকে—পথিক হয়ে জন্মাবার কথা, পথকে ভালোবাসার কথা। কবিতায় নিজেকে বলেছেন পথিকপরান: ‘গৃহহারা এই পথিকপরান।’ নিজেকে পথিকপরান ভাবতেন বলেই আরও ভাবতে ভালোবাসতেন উদাস বা পিয়াসি বলে। আবার নিজেকে বিচ্ছিন্ন এবং বিবিক্তও ভাবতেন, ভাবতেন, জন্মকাল থেকে ‘একখানা নির্জন নিঃসঙ্গতার কলার ভেলার মধ্যে’ তাকে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে, মিলতে পারছেন না কারও সঙ্গে। ১৯২৫ সালে এক চিঠিতেও তিনি নিজের সম্পর্কে এমনটা ভাবছেন: ‘জন্মকাল থেকে আমাকে একখানা নির্জন নিঃসঙ্গতার ভেলার মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তীরে দেখতে পাচ্ছি লোকালয়ের আলো, জনতার কোলাহল; ক্ষণে ক্ষণে ঘাটেও নামতে হয়েছে, কিন্তু কোনোখানে জমিয়ে বসতে পারিনি। বন্ধুরা ভাবে তাদের এড়িয়ে গেলুম; শত্রুরা ভাবে, অহংকারেই দূরে দূরে থাকি। যে-ভাগ্যদেবতা বরাবর আমাকে সরিয়ে সরিয়ে নিয়ে গেল, পাল গোটাতে সময় দিলে না, রশি যতবার ডাঙার খোঁটায় বেঁধেছি টান মেরে ছিঁড়ে দিয়েছে, সে কোনো কৈফিয়ত দিলে না।’ স্পষ্ট যে, আজীবন নিজেকে খাপছাড়া মনে করে গেছেন তিনি। বলা যায়, এই অমিল বা দূরত্ব তার আপন মুদ্রাদোষের ফল। এমনই এক কাব্যিক উচ্চারণ পরে আমরা পাব জীবনানন্দ দাশের লেখায় যেখানে তিনি নিজের মুদ্রাদোষে নিজের আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের এমন ভাবনা বা লেখকদের এমন ভাবনা শিল্প সৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কোনো দূরস্থিত অবস্থান-প্রয়োজনীয়তা কি না তা ভেবে দেখার যদিও বিষয় তবুও এটা ঠিক যে এই খাপ-না-খাওয়া চারিত্র্য সমাজসংসারের সাথে তাদের অব্যবস্থাপনাকেই মনে করিয়ে দেয়। ব্যাপক-বিশাল কর্মযজ্ঞে রবীন্দ্রনাথের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও এটা পরম সত্য যে, তিনি এসবের সাথে কিছু মাত্রায় হলেও অনভিযোজিত ছিলেন। অন্তত তার সাহিত্য তা-ই বলে।

এ যেন এক অবস্থা-ভিন্নতা, এক প্রতীপমুখরতা। যেন খাপ-না-খাওয়া এক মন ও মানুষের স্মিত হাহাকার। কলিন উইলসন একেই বলেছেন বহিরাগততা, কখনো তা রোমান্টিক গোছের কখনো-বা আস্তিত্বিক। বহিরাগততা এক ব্যক্তিক স্বভাব যা সামাজিক অন্বয়ের এক অসমঞ্জসতা; বহিরাহত মানুষ গোপ্য, অব্যবস্থিত, যে পরিপার্শ্বের সাথে আছি-নাই খেলায় রত। নিজেকে নিয়ে রহস্যে মাতে, দোলনে দোল খায় তার মন। অন্তর্বৃত মন আটকে থাকে নিজ কল্পনার চক্রব্যূহে। ছুটি নিতে চায় দৈনন্দিনতার দুষ্টচক্র থেকে। তাদের গমনস্থল যেন অন্য কোথাও, তারা যেন ভুল করে এসে হাজির হয়েছে ধুলোমাটির এ পৃথিবীতে। দেহের ভেতরে প্রাণের সমুদ্রের কথা তিনি বলেছেন যে-সিন্ধু উচ্ছ্বাসে অন্তহীন, তিনি তাকে মুক্ত এবং বাঁধাহীন করতে চাইলেন। নিজের ভেতর বেজে ওঠা ‘সুখের মতো ব্যথা’র কথা তিনি বললেন, আর এসবই তাঁর ধ্যানরেখার সঙ্গে সমান্তরাল যা আমাদের বলে, তার ভাষায়, তিনটি জন্মভূমির কথা, যা একটি অন্যটির দিকে অনায়াসে ঢুকে যায় আবার বেরিয়েও আসে আয়াস-ছাড়া। তিনি মানুষের তিনটি জন্মভূমির কথা বলেছিলেন: পৃথিবী, স্মৃতিলোক আর আত্মিকলোক। যারা এই তিন লোকে গতায়াত করেন তারাই জীবনপথিক। চলবে

//জেডএস//

x