জেমকন তরুণ কবিতা পুরস্কার ২০১৯ বারবার নিজেকেই নির্মাণ করি : রফিকুজ্জামান রণি

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অনন্য মুশফিক ১৭:১০ , নভেম্বর ০৭ , ২০১৯

রফিকুজ্জামান রণি তরুণ কবি। বসবাস করেন চাঁদপুরে। তিনি এ বছর জেমকন তরুণ কবিতা পুরস্কার পেয়েছেন।

বাংলা ট্রিবিউন : পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাই।

রফিকুজ্জামান রণি : পুরস্কার পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। আপাতদৃষ্টিতে পুরস্কারের চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে এবং বিজ্ঞ বিচারকমণ্ডলীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁদের এ মূল্যায়ন আমাকে নতুনভাবে পথ দেখাবে।

 

বাংলা ট্রিবিউন : পুরস্কার পেয়ে কি বিশেষ কিছু মনে হচ্ছে?

রফিকুজ্জামান রণি : হ্যাঁ। পুরস্কার আমার কাছে সবসময়ই বিশেষ কিছু। লেখককে বিশেষ সময়ের দিকে নিয়ে যায় পুরস্কার। আমি মনে করি, ভালো কাজ অবশ্যই পুরস্কৃত হওয়া উচিত। পুরস্কারের কারণে কখনো কখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পাঠক পরিচিত হয়ে ওঠেন, আবার পুরস্কৃত না হওয়ায় অনেক ভালো লেখাও আলোতে আসতে পারে না। পুরস্কার আশা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে পুরস্কারের পিছনে ছোটাছুটি করাটাই হচ্ছে বোকামি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : 'ধোঁয়াশার তামাটে রঙ' লিখতে শুরু করেছিলেন কবে?

রফিকুজ্জামান রণি : আমার সারাজীবনের কাব্যসঞ্চয় হচ্ছে 'ধোঁয়াশার তামাটে রঙ'। এখানে প্রথমদিকের কিছু কবিতা স্থান পেলেও মূলত ২০১১ সালের পর থেকেই এ পাণ্ডুলিপির প্রস্তুতি চলছিলো। গত তিন-চার বছর ধরে লেখা কবিতাগুলো এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কবিতায় আগ্রহী হলেন কীভাবে?

রফিকুজ্জামান রণি : কৈশোরে কবি জসীমউদদীনের 'নিমন্ত্রণ' কবিতার আবৃত্তি শোনার পর কবিতার প্রতি অন্যরকম টান অনুভব করি। কবিতা পড়ার ঝোঁক চলে আসে নিজের ভিতরে। অদূরেই খুঁজে পেলাম পৌর-পাঠাগার! প্রতিদিন বিকেলে গিয়ে বই পড়তাম। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খাতির জমিয়ে পল্লীকবির প্রায় সব রচনাই পড়ে ফেললাম। কবিতার টান বাড়তে লাগলো। সে টান পরিচয় করিয়ে দিলো জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে! আর পিছু তাকাতে হয়নি। আমি ভালো পাঠক হয়ে গেলাম। শুরু করলাম লিখতে। কাগজেও লেখা বেরুতে শুরু করলো। হৈচৈ পড়ে গেলো বন্ধুমহলে। সেই যে শুরু হলো, এখনো চলছে!

 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার কবিতার বোধ ও নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাই।

রফিকুজ্জামান রণি : আমি নিজেই আমার কবিতা। আমি বারবার নিজেকেই নির্মাণ করি—ভিন্ন কোনো নামে, ভিন্ন কোনো রূপে; ভিন্ন কোনো উপকথায়...

 

বাংলা ট্রিবিউন : কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কতটা নিজের জগৎ নির্মাণ জরুরি? জরুরি হলে আপনার ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতিটা ঠিক কেমন?

রফিকুজ্জামান রণি : কবিকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, নিজের পথেই হাঁটতে হয়। অন্যের দেহে ভর করে কিংবা দুর্বল পথে পা ফেলে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। নিজের একটা আলাদা জগৎ না থাকলে কখনো কবি হওয়া যায় না। আমি সবসময় একটু ভিন্নভাবে চলার চেষ্টা করেছি, নতুন জগৎ নির্মাণের চেষ্টা করেছি। শব্দে, উপমায় কিংবা বিন্যাসে সবার চেয়ে আলাদা থাকার চেষ্টা করেছি। অতিকথন, মিথপুরাণের আধিক্য এবং প্রচলিত ঘেরাটোপ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে কবিতা জিনিসটাকে নতুনভাবে পরিচয় করানোর চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে কতটা সফল হয়েছি, আপনারাই সঠিক বিচার করতে পারবেন। তবে অগ্রজদের কবিতা আমাকে প্রেরণা দিয়েছে প্রতিমুহূর্তে, কিন্তু প্রভাবিত করতে পারেনি কখনো।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কখন লেখেন, কীভাবে লেখেন?

রফিকুজ্জামান রণি : নির্ধারিত সময় মেনে আজ পর্যন্ত লেখা হয়ে ওঠেনি কিছু। আমি এসবে একেবারেই অদক্ষ। সাধারণত যখনই নিজের মধ্যে লেখার একটা অদম্য তাড়না বোধ করি ঠিক তখনই সুযোগ পেলে লিখে ফেলি। সবসময় আমার রক্তের ভিতরে লেখালেখির তীব্র একটা স্রোতধারা প্রবাহমান, ফলে সবকিছুর মধ্যেই সাহিত্যের রস খোঁজা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সুযোগ পেলেই কখনো কাগজে, কখনো মোবাইলের বাটন চেপে কবিতার আদতে আমি আমাকেই আঁকতে শুরু করি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : লিখতে পরিবারের সদস্যরা উৎসাহ দেয়?

রফিকুজ্জামান রণি : পরিবারের সবাই আমার সাহিত্যকর্মকে অনেক সম্মান করে। এটা আমার অনেক বড় প্রাপ্তি। পুরস্কারের সংবাদ জানার পর আনন্দে আমার গা কাঁপছিলো। সেইসঙ্গে বেদনায় হাহাকার করে উঠেছিলো আমার পৃথিবী! আনন্দের সংবাদ পেয়েও কান্না রুখতে পারিনি। কারণ, আমার শ্রদ্ধেয় পিতা কামরুজ্জামান খোকা আজ পৃথিবীতে নাই! তিনি বেঁচে থাকলে এমন সংবাদ শুনে আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করতেন। পুরস্কারের খবর বিদ্যুৎগতিতে এলাকায় ছড়িয়ে দিতেন। তাঁর জীবদ্দশায়, কোনো কাগজে আমার লেখা বেরিয়েছে শুনলেই হতো। সেটা কিনে নিয়ে আসতেন এবং সবাইকে পড়ে পড়ে শোনাতেন। তখন আমি বিব্রত বোধ করলেও, এখন বুঝি জীবনের নান্দনিক একটা মুহূর্ত আজকাল বড্ড বেশি মিস করছি আমরা।

//জেডএস//

x