Vision  ad on bangla Tribune

সব সাপ শাপ নয়!

উদিসা ইসলাম ১৮:৪১ , জুলাই ১৭ , ২০১৭

পটুয়াখালীতে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা একটি সাপের খামারনানা প্রজাতির সাপের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিষধর সাপ শঙ্খচূড়ও বাংলাদেশের সুন্দরবনে আছে। ইংরেজি নাম কোবরা হলেও এটা গোখরা সাপ নয়। ৫.৬ মিটার লম্বা এই সাপ বিষধর সাপদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। যে পরিমাণ বিষ এরা থলিতে জমা রাখে, তাতে মানুষ মুহূর্তেই মারা যায়, তবে এ সাপ সংখ্যায় কতগুলো আছে সে নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেনি বনবিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শঙ্খচূড় প্রজাতির নাম অফিওফাগাস, যার আক্ষরিক অর্থ— যে সাপ খায়। এই সাপ অন্য সাপদের খেয়ে খাদ্য চাহিদা মেটায় বলেই এমন নামকরণ।
শুধু শঙ্খচূড়ই নয়, বাংলাদশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে এমন অনেক সাপ আছে আমাদের স্থল-বন-জলে। কিন্তু সাপের পরিমাণ কখনই সঠিকভাবে বলা যায় না। কারণ হিসেবে বনবিভাগ বলছে, চলাচল করতে গিয়ে সাপ অনেক সময় ভারতীয় সীমান্তে চলে যায়। আর সামুদ্রিক সাপের হিসাব নেই বললেই চলে। এরা সীমানা অতিক্রম করে যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকে। তবে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর ও বিষহীন সাপ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে প্রচারণা দরকার বলে মনে করেন প্রাণিবিজ্ঞানীরা। আর গবেষকরা বলছেন, পরিবেশের জন্য উপকারী ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় এই প্রাণীকে দেখামাত্র মেরে ফেলা ঠিক না— এটা মানুষকে বোঝাতে হবে।
এ বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধরা পড়ছে গোখরা সাপ, রাজশাহীতে তোলা ছবিকোন সাপ কখন শাপ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭০ প্রজাতির সাপ আছে। এর মধ্যে বিষধর প্রজাতি ২৭টি। এই বিষধর প্রজাতির মধ্যে ১২ প্রজাতি থাকে বঙ্গোপসাগরে। বাকি ১৫ প্রজাতি দেশের সবখানে কম-বেশি রয়েছে। বিষধর গোখরা সাপের বিষ অতি মূল্যবান। এই বিষে পটাসিয়াম সায়ানাইডের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। গবেষকরা বলছেন, সাপ দেখলেই মানুষ ভয় পায়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সাপ নিজে ভয় না পেলে আক্রমণ করে না। সে দেখতে পারে না, কিন্তু প্রাণের অস্তিত্ব টের পায়। সাপের সামনে বস্তু যদি না নড়ে বা কোনও শব্দ তৈরি না করে, তাহলে সাপ ওই বস্তুকে ক্ষতিকর মনে করে না এবং কামড়ায় না। আর রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গোখরা বেশি পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের বন-জঙ্গলে, গ্রামাঞ্চলে, ফসলের ক্ষেতে কিংবা বসতবাড়ির আশপাশে সবচেয়ে বেশি বিষধর যে সাপ দেখা যায় তার নাম গোখরা। গোখরার তিনটি প্রজাতি রয়েছে— গোখরা, খইয়া গোখরা ও রাজ গোখরা। গোখরার বাইরে বিষধর সাপের মধ্যে আছে শঙ্খচূড় পরিবারের পাতি কাল কেউটে, ডোরা কাটা কেউটে, ছোট কাল কেউটে, কালো কাল কেউটে, সরু প্রবাল সাপ, কালো-হলুদ বলয়ী সামদ্রিক সাপ, মোহনা, ক্যান্টরের সরু মাথা সামুদ্রিক সাপ, বইঠা-টেবি, কাকরাভূক পাইন্না, লাল গলা সাপ ও মুখোসী পাইন্না সাপ।
সাপ মানুষের কাছে মূর্তিমান সরীসৃপ হলেও সব সাপকে অভিশাপ বা শাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কিছু সাপ আছে যেগুলো খামারের মাধ্যমে প্রজনন করে বিষ সংগ্রহের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। ওয়াইল্ড লাইফ গবেষকরা বলছেন, সাপের সঙ্গে যেন মানুষের চিরকালের শত্রুতা। একবারও চিন্তা করা হয় না সাপটি বিষধর নাকি নির্বিষ। সঠিক জ্ঞানের অভাবে নির্বিচারে সাপ মারা ও এদের আবাসস্থল নষ্ট করা অপরাধ।
কুষ্টিয়ায় বসতবাড়িতে ধরা পড়েছিল ৪৮টি গোখরাকেন সব সাপ শাপ নয়?
আমাদের দেশে কয়েক প্রজাতির বিষধর সাপ দেখা গেলেও নির্বিষ সাপের সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীতে কত প্রজাতির সাপ আছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব জানা প্রায় অসম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাপ আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিষধর সাপ ইঁদুর ও ইঁদুর জাতীয় প্রাণী খেয়ে ফসলি জমি রক্ষা করে। সব সাপ যেমন সব স্থানে পাওয়া যায় না, তেমনি স্থান বিশেষে সাপের উপস্থিতি বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখে।’
অধ্যাপক ফিরোজ আরও বলেন, ‘এই যে ইঁদুর কীট-পতঙ্গ খেয়ে ফেলছে, এতে খাদ্যশৃঙ্খলে সুস্থতা থাকে। এক প্রাণী আরেক প্রাণীকে খায়। এটাই বাস্তুবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ নীতি। এ নীতিতে ব্যত্যয় ঘটলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।’
সাতক্ষীরার দুই উপজেলার দুইটি বাড়িতে ধরা পড়ে ৭৬টি সাপকরণীয় কী?
যেহেতু সাপের বিষ মূল্যবান, সেহেতু একটা স্নেক গার্ডেন থাকা জরুরি মনে করছেন প্রাণিবিজ্ঞানীরা। কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে খামার করতে চেয়ে অনুমতি পাননি বনবিভাগ থেকে। অধ্যাপক ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে যারা খামার করছেন তাদের উদ্দেশ্য ভালো না হওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর বনবিভাগ বলছে, আইন না করে বৈধতা দেওয়া যাবে না। আইন তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন।’
বন বিভাগের উপ-বন সংরক্ষক শাহাব উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কেউ ব্যাক্তিগতভাবে খামার করতে চাইলেও পারবে না, বনবিভাগ অনুমতি দেবে না। অবশ্য, ছোট পরিসরে কেউ কেউ কাজ করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাপ গৃহপালিত কোনও প্রাণী নয়, কেউ খামার করতে চাইলে নিশ্চয় সেটির বাণিজ্যিক কোনও উদ্দেশ্য থাকবে এবং তার জন্য অবশ্যই বনবিভাগের অনুমতি নিতে হবে।’
শাহাব উদ্দিন আরও বলেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে সাপ পালন ও বিষ সংগ্রহের বিষয়ে আইন তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন। এটা হলেই অনুমতি দেওয়া সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুন-

সাপের বিষ রফতানি করতে চান রাজ্জাক

বিষধর সাপেও হতে পারে অর্থনৈতিক লাভ!

/এনআই/টিএন/

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x