সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তরে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ০০:০৮ , ডিসেম্বর ০৮ , ২০১৭

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

কম্বোডিয়া সফর সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণও দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ সফর নিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকদের তেমন কোনও প্রশ্ন করতে দেখা যায়নি। বরং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কী ভাবছেন তা জানার আগ্রহ ছিল সবার মধ্যে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যু ও জেরুজালেমে ইসরায়েলের রাজধানী প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি এসবও উঠে আসে এই আলোচনায়। জাতিসংঘ সফরের পর অসুস্থতাজনিত কারণে প্রধানমন্ত্রী কোনও সংবাদ সম্মেলন না করায় বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের মুখোমুখি হতে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করেন একুশে টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুরুল আহসান বুলবুল। কম্বোডিয়া সফরে সে দেশের সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনও কথা হয়েছে কিনা প্রধানমন্ত্রীকে এমন প্রশ্ন করেন তিনি। সেই সঙ্গে জানতে চান, সম্প্রতি খালেদা জিয়া আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন- এমন একটি মন্তব্য করেছেন আদালতে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যও জানতে চান তিনি।

এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা যথেষ্ট সহায়তা পাচ্ছি। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে আমরা অনুরোধ করেছি। তিনি বলেছেন, আশিয়ান দেশগুলো যাতে সমর্থন দেয়, সে ব্যাপারে তিনি কথা বলবেন। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে ইতোমধ্যে আশিয়ান সদস্যভুক্ত দেশগুলো  চাপ দিচ্ছে। মোটামোটি একটা সমর্থন আমরা পাচ্ছি। কেউ প্রকাশ্যে না বললেও তারা এতো রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আসাকে ভালো চোখে দেখেন নি। তারা সবাই বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা সবাই চান, মিয়ানমারের নাগরিক মিয়ানমারে দ্রুত ফেরত যাক এবং মিয়ানমার ফেরত নিক।’ 

বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’-এ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যে স্মারক সই হয়েছে, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়েছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেছেন; তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে মিয়ানমারের। তারা (মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিরা) স্বীকার করেছেন, তাদের নাগরিকদের ফেরত নিয়ে যাবেন বলেছেন। একটি জয়েন্ট কমিটি করা হবে। কমিটির মাধ্যমেই এদের (রোহিঙ্গা) ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এ কাজগুলো এখন চলছে।’ 

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘যেহেতেু মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ, সব সময় চাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব থাকুক। মিয়ানমারে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেটা গ্রহণযোগ্য না, অনভিপ্রেত ঘটনা। মানবিক কারণে এদের (রোহিঙ্গাদের) আশ্রয় দিয়েছি। তবে অবশ্যই মিয়ানমারের নাগারিক তাদের দেশে ফেরত যাবে, এটাই আমাদের আশা।’ 

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা

খালেদা জিয়া আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এ বিষয়ে মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুল প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘উনি কিসের ক্ষমা করলেন? আমাকে যে হত্যার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল, গ্রেনেড মেরেছিল, বেঁচে গেছি, সেই কথা বলেছেন, নাকি ক্ষমা করেছেন বা চাচ্ছেন সেটা স্পষ্ট না। কারণ তার কাছে ক্ষমাটা চাইবে কে? কেনো ক্ষমা চাইতে যাবো। আমি কি এমন অপরাধ করেছি যে ক্ষমা চাইবো। তার উচিত দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আপনারা জানেন- কিবরিয়া এমপিকে হত্যা, আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপিকে হত্যা, এমনকি তাদের বিষয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা পর্যন্ত করতে দেয়নি। নিশ্চয় আপনাদের মনে থাকার কথা।’ 

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরকম একটি ঘটনা ঘটলো, আইভি চাচিসহ এতোগুলো মানুষ গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুবরণ করলেন, তখনও পর্লামেন্টে এ বিষয়ে একটি কথাও বলতে দেয়নি। তাদের পক্ষ থেকে একেকটি বক্তব্য আসে, তারপর একেকটা ঘটনা ঘটে। কখনও বলে আরেকটা ১৫ আগস্ট হবে; কখনও বলে প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা জীবনেও বিরোধী দলের নেতা হতে পারবো না। তারপর কিন্তু কোটালিপাড়ায় সেই ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে রাখা- আপনার ঘটনাগুলো চিন্তা করেন।’ 

খালেদা জিয়ার নামে মামলার ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, ‘আর তার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে যে মামলা, আমাদের সরকার তো তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়নি। বরং আমার বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজনের মতো মামলা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। শুধু আমি নই; আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনি তখন ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের হাই কমিশনার হিসেবে ছিলেন, আমরা সবাই কিন্তু খালেদা জিয়ার মামলার আসামি। তারপর তত্ত্বাবধায়। তত্ত্বাবধায় কারা? তারা প্রত্যেকেই তার (খালেদা জিয়া) নিজের পছন্দের লোক। ৯ জনকে ডিঙিয়ে তিনি মঈন উদ্দিনকে বানিয়েছিলেন সেনাপ্রধান। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে চাকরি করছিলেন ফখরুদ্দিন সাহেব। তাকে নিয়ে এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করেছিলেন। ইয়াজউদ্দিন, উনারই ইয়েস উদ্দিন ছিলেন। এরা সবাই উনার নিজের লোক। আবার তারাই ছিলেন তত্ত্বাবধায়কের ক্ষমতায়, আর তাদের আমলে করা মামলা ওগুলো। সেই মামলা থেকেই তার পলায়নপর মনোবৃত্তি, সেটা আপনারা নিজেরা দেখেছেন। বাইশ-তেইশবার রিট করেছেন। কেনো ? কোর্টে যাওয়া নিয়ে যে তাণ্ডব, কোর্টে যাওয়ার পরেই একেকটা গোলমাল করেন।’

খালেদা জিয়ার ক্ষা চাওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের মনে রাখা উচিত, আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস, তার গাড়িতে আগুন দেওয়া হলো, সেখানে মানুষ মারলো। এর আগে মোটরসাইকেলে আগুন দিলো। ২০১৪ সালের কথা মনে করেন। পুড়িয়ে পুড়িয়ে কিভাবে মানুষ মারলেন। ২০১৩ সালের কথা মনে করেন, মসজিদে আগুন দেওয়া থেকে কুরআন শরীফ পোড়ানো কোনও কাজই বাদ দেয়নি। কাজেই ক্ষমাটা উনার জাতির কাছে চাওয়া উচিত।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে বিশাল শপিং মল, সম্পদ পাওয়া গেছে, এটা আমরা কিছু করিনি। বিদেশ থেকেই সংবাদ এসেছে। আমি আপনাদের একটা প্রশ্ন করি- আপনার এখানে অনেকেই সংবাদপত্রের মালিক-সম্পাদকরা আছেন, অনেকে বিভিন্ন চ্যানেলে আছেন, কই আপনাদের তো এই নিউজটা দেওয়ার আগ্রহ দেখলাম না। আপনারা কি বিনা পয়সায় কেউ শপিং করার কার্ড পেয়েছেন? এই নিউজটাই দিতে পারলেন না। আপনাদের একটা প্রশ্ন করি, এই নিউজটাই যদি আমার বা আমার পরিবারের ব্যাপারে হতো, তাহলে তো আপনারাই হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। আমাদের অপরাধ কী? আমাদের অপরাধ- আমরা মুক্তিযুদ্ধের শক্তি, আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। আর খালেদা জিয়া সব কিছুতেই মাফ পায় কেনো? জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছেন, জাতির জনকের খুনিদের এমপি বানিয়েছেন, খুনিদের মদদ দিয়েছেন, সেজন্য কি তাদের সাতখুন মাফ? আমি কোনও পত্রিকাকেই দেখলাম না এটা নিয়ে কোনও উচ্চ-বাচ্য করতে। বিষয়টা কী? দুইটা মাত্র চ্যানেল আর দুইটি মাত্র পত্রিকা নিউজ দিয়েছে। বাকিদের ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখতে হয়। এটা হলো বাস্তবতা। এতো দুর্বলতা কেনো? কিসের জন্য?’

‘টাকা পাচার, মানি লন্ডারিং, এটো তো বিএনপি ও খালেদা জিয়ার ছেলেরা করেছে, এটা তো আমরা বের করিনি। একটা বেরিয়েছে আমেরিকা থেকে, আরেকটা সিঙ্গাপুর থেকে। টাকা আমরা ফেরতও এনেছি। এটাও তো মিথ্যা না।’

সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের মনে রাখা উচিৎ, একবার পত্রিকায় নিউজ আসলো- সৌদিতে দেড়শ’ স্যুটকেস নিয়ে গেছেন তারা। আপনার সেটা ভুলে গেলেন। বেশিরভাগ পত্রিকার পরমিশন কিন্তু আমিই দিয়েছি। কিন্তু কোনও পত্রিকার সাহস হলো না নিউজগুলো দেওয়ার। কোনও সরকার বেসরকারি চ্যানেলের পারমিশন দেওয়ার সাহস পায়নি। আমি দিয়েছি। ৪৪টা চ্যানেলের মধ্যে ২৩টা চ্যানেল তো চলছে। মাত্র দুইটা চ্যানেল নিউজ দিলো, বাকিরা দিলো না কেনো? তারা জানে, কিভাবে মুখ বন্ধ করতে হয়। সবার মুখে সেরকম কিছু রসগোল্লা ঢুকিয়ে দিয়েছে, যার জন্য সবাই মুখ বন্ধ করে বসে আছে। আপনাদের প্রশ্নের আর কী জবাব দেবো বলেন আমাকে। এতোটুকু সৎসাহস যদি না থাকে, তাহলে আপনাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার তো আর কোনও প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ 

আগাম নির্বাচনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এমন কোনও দৈন্যদশায় পড়িনি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে। ডেভেলপমেন্টের কাজগুলো যা আমরা করে যাচ্ছি- আমি চাই উন্নয়নের কাজগুলো আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে। আমরা না থাকলে উন্নয়নের কাজের যে কি দশা হয়, তা জানি। ৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত যে কাজগুলো করে গিয়েছিলাম, এরপর সেগুলো আর সচল ছিল না। ২০০৮ এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ এ সরকার গঠনের পর ২০১৭ পর্যন্ত যে উন্নয়ন আমরা করেছি, আমি চ্যালেঞ্জ দিতে পারি যে, এতো অল্প সময়ের মধ্যে অবকাঠামো ও বিদ্যুৎসহ যেদিকেই তাকান প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে যতো উন্নয়ন আমরা করে দিতে পেরেছি, এতো উন্নয়ন আর কেউ করতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের যে দুর্নীতির অভিযোগ, সেটাকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো সাহসও আমাদের আছে। সৎ সাহস আমাদের আছে। বহু জ্ঞানী গুণী অনেকেই তো কথা বলেছেন, দুর্নীতিবাজ বানাতে চেয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বে অন্তত তিন জন নেতার মধ্যে তো আমার একটা নাম এসেছে। আপনাদের সম্মান বেড়েছে কিনা? আর এ অঞ্চলেরই তিনজনের মধ্যে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন আরেক জন আছেন। ওদিকেই যেনো আপনাদের ঝোঁকটা বেশি।   

সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে সমকালের সম্পাদক গোলাম সরওয়ার বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে অনেক প্রার্থী রয়েছেন।’ তাদের মনোনয়ন দেওয়া না-দেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন গোলাম সরওয়ার। জবাবে

এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ প্রসঙ্গে একটিই কথা। শত ফুল ফুটতে দিন। অনেক প্রার্থী হোক, এটি তো ভাল কথা। এটা তো সবার রাজনৈতিক অধিকার। কেনো সবাই প্রার্থী হতে পারবে না। আমরা শত ফুলের মধ্যে কোন ফুল সব থেকে ভাল ও সুন্দর, সেটা বেছে নেবো। সময় আসলে আপনার দেখতে পাবেন কিভাবে বেছে নেবো। সেটা সময় বলে দেবে। আর নির্বাচনের হাওয়া তো ভাল কথা। গণতন্ত্র শক্তিশালী, মজবুত হবে; গণতান্ত্রিক অনুশীলনটা বাংলাদেশে হচ্ছে, মানুষের মধ্যে সেই চেতনাটা আছে সেটাই তো প্রমাণ করে।’  

আগামী জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে কয়েক দফা জরিপ করেছেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে কতজন ডেঞ্জার জোনে আছে, সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘রেড জোনে কেউ নেই। আর জরিপ তো করতেই হবে। কে কিভাবে কাজ করছে, কার কি পজিশন, জনগণের কাছে কার কতটা গ্রহণযোগ্যতা, সেই খোঁজ তো আমাকে নিতে হবে। তবে এখন সেটা পাবলিকলি বলার বিষয় না। আমি পাবলিকলি বলবো না। যখন কারও কোনও দুর্বলতা দেখি, সঙ্গে সঙ্গে আমি তাকে সতর্ক করি, কাজেই একেবারে খুব খারাপ অবস্থায় যে কেউ আছে, তা না। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, যারা সার্বিকভাবে উন্নয়টা করে যাচ্ছে। এই উন্নয়নটা সুষম উন্নয়ন সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী। সবাই এর সুফলটা ভোগ করছে। দেশের মানুষ যদি সত্যিই উন্নয়নটা চায়, তাহলে নিশ্চয় তারা আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বেছে নেবে। আরও নতুন নতুন সিট আমরা পাবো এটাও আশা করি। আর যেখানে পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে অবশ্যই পরিবর্তন করবো। পরিবর্তন নির্ভর করছে.. এখনও বহু সময় বাকি, অন্তত আরও এক বছর পর নির্বাচন, তার তিন মাস আগে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু। কাজেই যেখানে যেখানে দুর্বলতা দেখি সেখানে পরিবর্তন হবে সেটাতো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে এটুকু বলতে পারি ডেঞ্জার জোন আমাদের সৃষ্টি হয়নি।’

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের রাজনীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। সাড়ে তিন বছরের মধ্যে যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ তিনি গড়ে তুলেছিলেন এবং দেশটিকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সাত ভাগ প্রবৃদ্ধি জাতির পিতা করে গিয়েছেন। তার পরে আর কেউ পারেনি। আওয়ামী লীগ আসার পর আবার আমরা করলাম। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিরাট একটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল। কিন্তু করে গিয়েছিলেন। তারপর এলো পঁচাত্তর। হিসেব করেন, পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই- একুশ বছর। এরপর ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত, একুশ আর আট যোগ দেন, এই ২৯ বছর- বলতে গেলে ৩০টা বছর, স্বাধীনতার পর ৩০টা বছর জনগণ অবহেলিত। রাতে কারফিউ, একটার পর একটা ক্যু, হত্য, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ, বাংলা ভাই আর ভোট কারচুপি- এটাই তো ইতিহাস। সকাল হলেই কোন একজন ক্ষমতা নিয়েই বলবে- আসসালামু আলাইকুম, আমি এখন রাষ্ট্রপতি হলাম। ‘হলাম রাষ্ট্রপতিরা’ এসেই- রাজনীতি খারাপ, সবাই খারাপ, সব দুর্নীতি বলে নিজেরাই দুর্নীতি করলো, উর্দি খুলেই রাজনৈতিক নেতা হয়ে গেলেন। তারপরে দেশে লুটপাট।’

‘দেশের অর্থ পাচার, মানি লন্ডারিং.. এটা কারা করে? ক্ষমতা দখলকারীরাই করেছে এবং মানুষকেও দুর্নীতিবাজ করা হয়েছে। ঋণ খেলাপি কালচার তো আমাদের সময় ছিল না। ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রপতি হওয়া, এসব তারাই তো করে যাচ্ছে একটার পর একটা। ত্রিশটা বছর মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা হচ্ছে। মানুষ উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে কখন? যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন হয়েছে। তার কারণ একটাই, আমরা জাতির পিতার নেতৃত্বে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছি। যুদ্ধ করে এদেশের বিজয় অর্জন করেছি, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের একটা আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকে, ক্ষমতাটা আমাদের কাছে জনতার সেবা করা। জনগণের জন্য কাজ করা, জনগণকে কিছু দেওয়া, দেশের উন্নত করা।’

যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী আর খুনিদের নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এটাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র করতে চাই না। কিন্তু এটাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র তারাই করতে চায় যাদের স্বাধীনতাবিরোধী, খুনি, যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায় বসায়। তারা কখনও চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক, বাংলাদেশ সুন্দরভাবে চলুক, বাংলাদেশ সফল হোক, আন্তর্জাতিকভাবে সম্মান পাক। আজ সারা বিশ্বে যান, এক সময় ছিল, বাংলাদেশ গেলে মনে করতো ভিক্ষা চাইতে এসেছে। এখন সমীহ করে চলে। আগে যেখানে ছিল ভিক্ষুক জাতি এখন সেখানে উন্নয়নের রোল মডেল। অন্তত এই জায়গাটা আপনাদের এনে দিতে পেরেছি। বাংলাদেশটাকে এই জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি। এটা হয়তো সবাই উপলদ্ধি করবেন না।’

পত্রিকার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর পত্রিকা মানেই হচ্ছে, সরকারের বিরুদ্ধে না লিখলে নাকি পত্রিকা চলেই না। পত্রিকা চালানো আর ব্যবসা মনে আছে, কিন্তু দেশের যে উন্নয়ন সেটা চোখে দেখেও দেখেন না। এতে তো আমাদের কিছু করার নেই। আর আমি তো পত্রিকা পড়ে দেশ চালাই না। দেশ চালাই দেশকে ভালবেসে, দেশের মানুষকে ভালবেসে, আর যা বাবার কাছ থেকে শিখেছি, দেশের উন্নয়ন কিভাবে করতে হবে, সেই চিন্তা থেকেই দেশ চালাই। সেজন্য সফলতাও আছে দেশের। আজ বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই মর্যাদাটা ধরে রাখবেন, নাকি ওই মানি লন্ডারিং শপিং মলের মালিক, অথবা খুন খারাপি করা, বোমাবাজ, আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারা, তাদের নেবেন। এটা তো জনগণের ওপর নির্ভর করে। এখানে আমার কিছু নেই। আমার একটাই চাওয়া- দেশটাকে আমরা স্বাধীন করেছি, এখন দেশটাকে উন্নত করবো, সমৃদ্ধশালী করবো, স্বাধীনতার যে চেতনা সেই চেতনায় বাংলাদেশকে গড়বো, সেটাই লক্ষ্য। ওই একটা লক্ষ নিয়ে দেশ চালাচ্ছি, এভাবেই চালাতে থাকবো।’

ভোটের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের ইচ্ছা, যাকে খুশি ভোট দেবে। কারণ আমি নিজেই তো স্লোগান দিয়েছি, আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো। আমি সেই নীতিতেই বিশ্বাস করি। ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই। না দিলে আফসোসও থাকবে না। কারণ সুযোগ পেয়েছি কাজ করেছি, এখানেই আমার সেটিসফেকশন।’

সংবাদ সম্মেলনের এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। তিনি বলেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগের বিগত কাউন্সিলে বলেছিলেন ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন চান না, আপনি বলেছিলেন সকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চান এবার।’

এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কি বলেছিলাম ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন চাই না। কোথায় বলেছিলাম, মনে হয় না। পজিটিভ বলেছিলাম, নেগেটিভ বলিনি। ৭১ বছর বয়সেও স্মরণ শক্তি একটু আছে।’

এসময় শ্যামল দত্ত বলেন, ‘সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের কথা বলেছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সকল দলের অংশগ্রহণ চেয়েছি, রাইট।’

এরপর শ্যামল দত্ত বলেন, ‘সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে চ্যালেঞ্জটা এখন, বিএনপি বলছে আপনার অধীনে তারা কোনও নির্বাচনে যাবে না। এখন তারা একটা নির্দলীয় সরকার চায়। একটি সহায়ক সরকারে রূপরেখা দেওয়ার কথা তাদের, যা আমরা এখনও জানি না। এখন সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য, যদি বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে হয়, তাহলে কোনও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন কিনা। সেক্ষেত্রে কি চিন্তা ভাবনা করছেন আপনি। আপনার সরকারে পক্ষ থেকে আলোচনার কোন উদ্যোগ নেবেন কিনা?

এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কার সঙ্গে আলোচনা। আমাকে সেই প্রশ্নটা করেন।’

শ্যামল দত্ত বলেন, ‘আপনি ২০১৪ সালে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  ‘প্রস্তাব দিয়েছিলাম, ফোন করেছিলাম। তারপর তার (খালেদা জিয়ার) যে ঝাড়ি খেয়েছিলাম, আমার ওই রকম আর অপমানিত হওয়া ইচ্ছা নাই। পরিষ্কার কথা। দ্বিতীয়ত, কথা হচ্ছে-  যাদের মধ্যে এতটুকু ভদ্রতা জ্ঞান নেই, তাদের সাথে কথা বলার কোনও প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মারা গেলো,  আমি আর যাই হোক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তো। আমার অফিস ফোন করেছে, যোগাযোগ করেছে, সময় ঠিক করেছে, আমি গিয়েছি। দরজার কাছে যাওয়ার সাথে সাথে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, তালা দিয়েছে, আমাকে ঢুকতে দেয়নি। মেইন গেট খোলা যাবে না, আমার গাড়ি আটকে রেখেছে। তাও বলেছি- ঠিক আছে, যেহেতু ছেলেহারা মা, তাকে একটু স্বান্তনা দেবো, তাই আমি ছোট গেট দিয়েই ঢুকবো। আমি গাড়ি থেকে নেমে গেট পর্যন্ত যেতে পারিনি, দেখি দরজায় তালা দেওয়া। ভেতরে বিএনপির সমস্ত নেতারা দাঁড়ানো। অথচ গেটে তালা, আমাকে ঢুকতে দেয়নি। এ ধরণের ছোটলোকিপনা যারা করে, তাদের সাথে কথা বলার কথা আপনার বলেন কোন মুখে, বলেন আমাকে। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মেয়ে দেখে গিয়েছিলাম, না হলে যাওয়ার কথা না।’

‘যারা আমাদের বাড়িতে এসে অন্তত সপ্তাহে একদিন বা মাসে দুই দিন এসে তো বসে থাকতো।  মোড়া পেতে বসে থাকতো। মেজর থেকে মেজর জেনারেল জিয়াকে কে বানিয়েছে, আমার বাবা বানিয়েছে। জিয়া বউ নিয়ে এসে ঘুরঘুর করতো।  নিজে বারান্দায় এসে বসে থাকতো বেতের চেয়ারে। ঠিক আছে, আপনারা তাদের নেতা বানিয়েছেন। খুনি এবং খুনের সাথে জড়িত, আজকে বাংলাদেশের দুরাবস্থার জন্য কে দায়ী। ১৯টা ক্যু হয়েছে। সেনাবাহিনীর হাজার সৈনিক, অফিসারদের হত্যা করছে ঐ জিয়াউর রহমান। আমার বাবা-মা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজনকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার করা যাবে না মর্মে ইমডেমনিটি অর্ডিন্যান্স দিয়ে তাদের বিচার হতে মুক্তি দিয়ে, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনেকে বলে জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছে। তার বহুদলীয় গণতন্ত্রটা কি, সকল যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো, সেই যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটাকে বলে বহুদলীয় গণতন্ত্র। নইলে যে কারফিউ দিয়ে দেশ চালায়, সেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার থাকে কিভাবে। তারপরও সবাই গাল ভরে বলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছে। আমি তো দেখি বহুদলীয় গণতন্ত্র মানে যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ। যে সমস্ত রাজাকার, আল বদর, যুদ্ধাপরাধী- যাদের ভোটের অধিকার নিষিদ্ধ ছিল, সংবিধানের ৩৮ এর অংশ বিশেষ সংশোধন করে সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের ভোট দেওয়ার অধিকার দিয়েছে জিয়াউর রহমান। ১২ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করে দিয়ে এসব যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার, দল গঠন করার সুযোগ দিয়েছে। এই বহুদলীয় গণতন্ত্র জিয়া দিয়ে গেছে। তারপরও  দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে যতটা সহনশীল হতে হয়, সব সহ্য করে চেষ্টা করেছি। তারপরও এত অপমান, আপনারা কোন মুখে বলেন..।’

বিএনপির নির্বঅচনে আসার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনি এক বাসায় গেলে তারা আপনার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, আপনি কি আর যাবেন? আপনারা কয়জন যাবেন। তাহলে আমার ওপর কেন এত জুলুম করেন আপনারা? হ্যাঁ, কেন এত জুলুম করেন। আর এখানে মাল্টিপার্টি সিস্টেম, কোন পার্টি ইলেকশন করবে, কোন পার্টি করবে না, এটা তাদের পার্টির সিদ্ধান্ত। তারা যদি নির্বাচনে আসতে চায় আসবে, এটা তাদের  সিদ্ধান্ত। আর যদি করতে না চায় এটাও তাদের পার্টির সিদ্ধান্ত। এখানে আমাদের কোনও কিছু বলার দরকার নাই। তারা যদি সত্যি নির্বাচন করতে চায়, তারা নির্বাচনে আসবে। তাদের সিদ্ধান্ত যদি হয় নির্বঅচন করবে না, তো করবে না।  এত সাধাসাধি দরকারটা কি হলো আমি বুঝতে পারলাম না। তবে গতবার তারা  যে ভুল করেছে, এবার তা করবে না। এবার নাকে খত দিয়ে হলেও নির্বাচনে আসবে, এটাই মনে হচ্ছে। তারপরও তো এতিমের টাকা মেরে খাওয়া, মানি লন্ডারিং, সৌদিতে এত সম্পদ, এগুলোরও তো বিচার হবে। বিচারের হাত থেকে ভেগে যাওয়ার জন্য যদি এখন আবার তারা জ্বালাও-পোড়াও করে এবার কিন্তু জনগণ ছাড়বে না। এবার জনগণই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। জনগণকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মারা, এটা কেউই বরদাস্ত করবে না।

সংবাদ সম্মেলনের এ পর্যায়ে দৈনিক আমাদের অর্থনীতির সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রীকে। তিনি বলেন, ‘আমি শ্যামল দত্তের প্রশ্নের ধারাবাহিকতায় বলবো, গত কয়েকমাস ধরে আমরা উপলব্ধি করছি যে, রাজনীতিটা বেশ সহজ। বিশেষ করে বিএনপিও বেশ সচ্ছন্দে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এই ধারাবাহিতায় আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনের পরে যে পার্লামেন্টটা হবে, ঐ পার্লামেন্ট ও সরকার বা ঐ সময়কালে আমাদের জাতির গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ইভেন্ট আছে। একটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী, আরেকটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সুর্বণজয়ন্তী। অসাধারণ যে লগ্ন আগামী ৫ বছরে আসছে আমাদের জীবনে। আপনি কেমন পার্লমেন্ট, কেমন সরকার, কেমন দেশ, কেমন রাজনৈতিক পরিবেশ ঐ পাঁচ বছরের জন্য চিন্তা করেন মাননীয় প্রধানন্ত্রী।’ 

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন,  ‘আপনার প্রশ্নের মধ্যে উত্তরটা আছে। নিশ্চয় আমি চাইবো যারা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি , জনগণের কল্যাণে কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক।  মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা দেশকে গড়ে তুলতে চায় তারাই ক্ষমতায় আসুক, তারা পার্লামেন্টে আসুক। এখানে যেন কোনও যুদ্ধাপরাধী, কোনও খুনির স্থান না হয়। তাহলে দেশটা আবারও ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। আপনি ঠিকই বলেছেন আমরা জাতির জনকের জন্ম-শতবার্ষিকী  উদযাপন করবো। আমাদের স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তী আমরা পালন করবো। আমাদের দেশের উন্নয়ন নতুন পর্যায়ে যাবে। আমরা ভিশন ২০২০ যেটা ঘোষণা দিয়েছি, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। দিন বদলের সনদ আমরা দিয়েছিলাম, আজকের দিনের বদল যে শুরু হয়েছে, মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হচ্ছে, দেশের সার্বিক উন্নতি হচ্ছে। উন্নয়নের গতিধারাটা অব্যাহত থাকুক। যারা এই গতি ধারাটা অব্যহত রাখতে পারবে, যারা দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে নিয়ে যাবে, দেশকে আবার পেছন দিকে টানবে না, যারা দেশের কল্যাণ চায়, তারাই নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করুক, তারাই পার্লামেন্টে আসুক।’

এরপর মাছরাঙা টেলিভিশনের সাংবাদিক মৌ প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ‘সৌদি আরবে গচ্ছিত ৫০০ কোটি টাকা ফেরত আনা হবে কিনা। খালেদা জিয়ার পরিবারকে বিচারের আওতায় আনা হবে কিনা, তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কিনা, আমেরিকা জেরুজালেমকে ইজরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে- সে আপনার মন্তব্য কী?’

এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানি লন্ডারিং করা টাকা ফেতর আনা হয়েছে এবং প্রক্রিয়া চলছে।যাদের সম্পত্তি রয়েছে সৌদি আরবে, তা খুঁজে বের করেছে সৌদি আরব। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে না কি করছে সেটা তাদের বিষয়, তারা জানে। তবে যদি জনগণের টাকা যদি কেউ এভাবে বাইরে নিয়ে গিয়ে শুধু বিলাস করে থাকে, তারা  দেশের মানুষকে বঞ্চিত করছে। দেশের মানুষ তাদের বিচার করবে। আর দেশের আইন অনুযায়ী মানি লন্ডারিংয়ে বাংলাদেশে তার বিচার হবে। এটা হওয়া উচিতও। কারণ এইভাবে দেশের উন্নয়ন না করে, দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে, দেশের মানুষকে কষ্ট দিয়ে, দেশের বাইরে এভাবে সম্পত্তি বড়ানোর কি অধিকার আছে? এটা আমারও প্রশ্ন। কাজেই এ ব্যাপারে আমি মনে করি, আপনাদের আরও সোচ্চার হওয়া উচিত। জনমত সৃষ্টি করা উচিত। অবশ্যই এর বিচার হবে এতে কোনও সন্দেহ নেই। আর তারেক রহমানের ব্যাপারে আপনারা জানেন যে, তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হচ্ছে। আজ হোক কাল হোক একদিন না একদিন তাকে আসতেই হবে এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। এতো কোনও সন্দেহ নেই। সেতো সাজাপ্রাপ্ত আসামি, সেটা নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি। আমরা জানি তার শাস্তি হয়েছে। সে সাজাপ্রাপ্ত আসামি। কাজেই আসামিকে ধরে আনার ব্যাপারে আমরা বৃটিশ সরকারের সঙ্গে সব সময় আলাপ আলোচনা করছি। আমাদের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘জেরুজালেমের ব্যাপারে আমি এইটুকু বলবো- আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নিজেই এ ঘোষণা দিয়েছেন, ইসলামি ওয়ার্ল্ডে কারও কাছে এটি গ্রহণযোগ্য না। কারণ জাতিসংঘের রেজ্যুলেশন এ ব্যাপারে বলা  রয়েছে। কাজেই জাতিসংঘের রেজ্যুলেশন অনুযায়ীই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। জাতিসংঘের রেজ্যুলেশনকে এভাবে অগ্রাহ্য করা কেউই মেনে নেবে না। এটাই আমার বক্তব্য। তাছাড়া আমরা মনে করি প্যালেস্টাইনের একটা অধিকার রয়েছে। তাদের একটা নিজস্ব রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।১৯৬৭ সালে প্যালেস্টাইনে যে ভূখণ্ডটা ছিল, ইস্ট জেরুজালেম, যেটা তাদের রাজধানী হওয়ার কথা এবং যেটি তাদেরই জায়গা, সেটাই থাকা উচিত। একতরফভাবে কিছু করা মানে সারা বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টি করা। শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল আমেরিকা, সেজন্য নোবেল প্রাইজও দেওয়া হলো, শান্তি প্রক্রিয়া নিজেরাই শুরু করলো, এখন এই ঘোষণায় শান্তি প্রক্রিয়া অশান্তির পথে ঠেলে দেওয়া হলো। এটা কোনদিনই কাম্য নয়। সকল মুসলিম দেশকে এক হতে আহ্বান করবো। প্যালেস্টাইন যেনো তাদের ন্যায্য অধিকার পায়, সে ব্যাপারে সকল মুসলিম দেশ যেন ঐক্যবদ্ধ হয়। এটা আমরা চাই।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তরের এ পর্যায়ে এটিএন বাংলার জ ই মামুন প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনার এই সংবাদ সম্মেলনে এলে  আমরা একটু কথা বলার সুযোগ পাই, তারচেয়ে বেশি  আপনার কথা শোনার সুযোগ পাই। কিন্তু আমাদের রিপোর্টার বন্ধুরা একটু হতাশ আজকে। কারণ বুলবুল ভাই, শ্যামল দাদা, মঞ্জু ভাই থেকে শুরু করে বারবারই যে প্রশ্ন করা হয়েছে আপনি সুকৌশলে এটি এড়িয়ে গেছেন। আমরা একটা হেডলাইন  চাই- সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের জন্য।  সেটি হচ্ছে নির্বাচন নিয়ে  যে প্রশ্নটি বারবার করছি- আগামী নির্বাচনটি যেন ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা  নির্বাচন  না হয়, সে ব্যাপরে আপনি কি উদ্যোগ নেবেন?

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  ‘আমি আবারও বলবো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনে  আসা প্রত্যেকটা দলেরই কর্তব্য।  আর যে দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, যে দল নিজের  দলে গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা নির্বাচন করবে কি করবে না এটা যার যার দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আমাদের কোন করণীয় নেই।  এটা হলো বাস্তবতা। যারা বিশ্বাস করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, তারা নির্বাচন করবে। আর যারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস করে না, যারা মনে করে ওপর থেকে কেউ  ফলটা ছিড়ে খাইয়ে দেবে, তারা হয়ত আসবে না। সেখানে আমাদের করণীয় কি আছে? বারবার বলে তো লাভ নেই। আপনাদের যদি এত দুঃখ থাকে তো ঐদিকে যান। তেলের টিন নিয়ে, ঘিয়ের টিন নিয়ে চলে যান, আর কি করবেন। আমি অপাত্রে ঘি ঢালবো না।’

 

 

 

 

 

 

 

 

/এসএমএ/সিএ/এএইচ/

x