‘আর নেপাল যাবো না, এবারই শেষ’

রশিদ আল রুহানী ১৭:৪৯ , মার্চ ১৪ , ২০১৮

 

মাহমুদুর-হরমান-ও-সানজিদা-আফরিন-ঝর্ণানেপাল যাওয়ার আগের দিন রবিবার (১১ মার্চ) দিবাগত রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে বাসায় এসেছিলেন রানার অটোমোবাইলস লিমিটেডের হেড অব সার্ভিস মাহমুদুর রহমান। পরদিনই আবার নেপাল যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। একদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে ফিরেই পরদিন নেপাল যাবেন শুনে বাধা দেন স্ত্রী সানজিদা আফরিন ঝর্ণা। স্ত্রীর কথা শুনে মাহমুদ বলেছিলেন, ‘তুমি তো কখনও নিষেধ করো না, এবার এত নিষেধ করছো কেন? ওকে ঠিক আছে, আর নেপাল যাবো না, এবারই শেষ যাওয়া’। বুধবার (১৪ মার্চ) রাজধানীর ‍নিকুঞ্জ-২-এ নিজ বাসায়  বাংলা ট্রিবিউনের কাছে কথাগুলো বলছিলেন গত সোমবার নেপালে ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় নিহত মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী সানজিদা আফরিন ঝর্ণা।   

২০০৫ সালে মাহমুদুর রহমান ও সানজিদা আফরিন ঝর্ণার পরিচয়, পরিচয় থেকে প্রেম। এরপর ২০১১ সালে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে নিকুঞ্জ-২-এর ছোট্ট একটি বাসায় সংসার গুছিয়ে নিয়েছিলেন তারা। বুধবার দুপুরে বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ঝর্ণা বসে আছেন। প্রতিবেশীরা ঘিরে রেখেছেন তাকে। আর ঝর্ণা ১৪ বছরের স্মৃতিচারণ করছেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমাদের সাত বছরের সংসার হলেও মনে হচ্ছে সাতটা দিনও ওর সঙ্গে কাটানো হয়নি। ওকে আমি ভালো করে কাছেই পেলাম না, আমার বুকে হাহাকার রেখেই চলে গেলো মাহমুদ।’

ঝর্ণা বলেন, ‘অফিসের কাজে কয়েকদিনের জন্য চট্টগ্রাম গিয়েছিল মাহমুদ। ঢাকায় ফিরেছে রবিবার সন্ধ্যায় ৬টায়। এসে বাসায় না ফিরে গেছে অফিসে। আমাকে ফোন করে বলেছে, তোমাকে ক’টা দিন দেখি না, খুব মিস করছি। অফিসে চলে আসো, একসঙ্গে বাসায় যাবো। তখন আমি রেডি হয়ে ওর অফিসে গেছি, বাসায় আসতে আসতে রাত দশটা বেজেছে। পরদিনই আবার নেপাল যাবে শুনে আমি নিষেধ করেছিলাম। বলেছিলাম, আমার ভালো লাগছে না। তুমি এলে মাত্র চট্টগ্রাম থেকে, ক’টা দিন পর যাও। তখন বলেছিল, ‘কথা দিলাম, আর নেপাল যাবো না, এবারই শেষ যাওয়া।’ এরপর আমি আর কিছু বলিনি, জোর করিনি। ওইদিন ভোর চারটার দিকে আমাদের ঘুম ভেঙেছে। আর ঘুম আসেনি। সকাল না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনেক কথা বললাম। সকালে ওর ব্যাগ গুছিয়ে দিলাম। ও বিমানবন্দরে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে ফোন করে বললো, ‘ঝর্ণা আমার পাসপোর্ট রেখে এসেছি। একটু এয়ারপোর্টে নিয়ে এসো।’ আমি নিয়ে গেলাম। ওকে বিদায় দিলাম। এখন মনে হচ্ছে, কেন সেদিন পাসপোর্ট নিয়ে গেলাম? কেন ছিঁড়ে ফেললাম না? যদি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলতাম, তাহলে মাহমুদ তখন হয়তো বকা দিতো কিন্তু পরে ঠিকই বুকে জড়িয়ে নিতো। ও না গেলে তো আজ আমি একা হয়ে যেতাম না!’স্বামীর-মৃত্যু-সংবাদ-শোনার-পর-কান্নায়-ভেঙ্গে-পড়েন

সোমবার স্বামীকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায় জানানোর প্রসঙ্গ টেনে কাঁদতে কাঁদতে ঝর্ণা বলেন, ‘কোনও এক ইশারা হয়তো ছিল, ওকে বাধা দেওয়ার। না হলে পাসপোর্ট ভুলে রেখে যাওয়ার তো কথা নয়। কারণ, অনেকবার সে বিদেশে গেছে, কখনোই পাসপোর্ট ফেলে যায়নি। কারণ, বিদেশ যেতে হলে এটাই সবচেয়ে বেশি দরকার, এটা ফেলে রেখে যাওয়ার ভুল হওয়ার কথা নয়।’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেন, ‘‘প্লেনে উঠেই আমাকে মেসেজ দিয়েছে, আমি প্লেনে উঠেছি। তখন আমি ওকে লিখেছিলাম, ‘তুমি এত ট্যুর করেছো কিন্তু কখনও এত খারাপ লাগেনি। জানি না, কেন তোমাকে হারানোর ভয় ঢুকে গেছে, সাবধানে থেকো, ভালো থেকো।’ এই মেসেজটি দেখার কিছুক্ষণ পরই সে তার নেপালের ফোন নম্বরটি আমাকে মেসেজ করে দেয়।’ দুর্ঘটনার অাধঘণ্টা পরই আমি জানতে পারি, নেপালে প্লেন ক্রাশ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ওর নেপালি ফোন নম্বরে কল করি। ও ফোন ধরেই ‘হ্যালো’ বলেছিল। আমি স্পষ্ট শুনেছিলাম। এরপরই লাইনটা কেটে যায়। ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি, কথা হয়নি।’’

দাম্পত্য জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঝর্ণা বলেন, ‘‘আমাকে এই বছরের শুরুর দিন থেকেই শুধু সারপ্রাইজ দিচ্ছে সে। হুট করে আমাকে আইফোন কিনে দিয়েছে। ক’দিন আগে নিজে নিজেই প্ল্যান করেছে দুজন মিলে শিমলা ঘুরতে যাবো। আমাকে না জানিয়েই টিকেট কেটেছে। ফেসবুকের ইনবক্সে টিকিটের ছবি পাঠিয়ে সারপ্রাইজ দিয়েছে। কিন্তু এবার এ কেমন সারপ্রাইজ দিলো আমার মাহমুদ! যাওয়ার আগে বলে গেলো, ‘আর নেপাল যাবো না।’ আর এবার এমনভাবেই গেলো, আর কখনো ফিরেই আসবে না। ও আমাকে বলতো, স্বামীর সুপারিশে নাকি স্ত্রী বেহেশতে যায়। আমাকে বলতো, ‘তোমাকে ছাড়া আমি দোজখেও থাকবো না। বেহেশতে গেলে তোমাকে নিয়ে যাবো।’ ঝর্ণা বলেন, ‘আমার মাহমুদকে সরকার যেন দ্রুত দেশে এনে দেয়। ওকে শেষবারের মতো একটুখানি ছুঁয়ে দেখবো, একটুখানি আদর করবো।'

ইনবক্স

এদিকে, নিহত মাহমুদুর রহমানের ফুফাতো ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত মঙ্গলবার সকালে মাহমুদুর রহমানের দুলাভাই বাবু আহমেদ নেপাল গেছেন। তিনি এখনও মাহমুদের লাশ দেখতে পাননি। কারণ, দেখতে দেওয়া হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মাহমুদকে যেন শনাক্ত করতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন রকম তথ্য নিয়েছে।’

/এমএনএইচ/ চেক-এমওএফ/

x