লাশ ফেরত আসবে কবে

রাফসান জানি ১৯:০০ , মার্চ ১৪ , ২০১৮

নেপালে উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের লাশনেপালে ইউএস বাংলার একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের কবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা। লাশ হস্তান্তর নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার আশঙ্কা করছেন তারা। দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশগুলো শনাক্ত করে হস্তান্তরের দাবি উঠেছে তাদের পক্ষ থেকে।

হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে নেপালে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বুধবার (১৪ মার্চ) বিমানমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামাল বলেছেন, ‘ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ টেস্ট করে লাশ শনাক্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

ঠিক কতদিন সময় লাগবে এমন প্রশ্নে নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিধ্বস্তের ঘটনায় যাদের শনাক্ত করা গেছে তাদের লাশ ফেরত দিতে কমপক্ষে চার দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে ময়নাতদন্ত শেষ করতে প্রয়োজন তিন দিন। আর একদিন যাবে লাশ শনাক্ত করতে।’

নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে গত ১২ মার্চ থেকে নিহতদের ময়নাতদন্ত শুরু হয়েছে। নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামসের ভাষ্য, ‘ময়নাতদন্ত ও লাশ শনাক্তকরণে আরও চার দিন লাগবে। এরপর শুরু হবে হস্তান্তর প্রক্রিয়া।’

স্বজনদের আশঙ্কা, হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও অন্তত পাঁচ দিন থেকে এক সপ্তাহ চলে যাবে। লাশ ফেরত আনার জন্য প্রায় এক সপ্তাহ সময় অপেক্ষা করা খুবই কষ্টকর বলে উল্লেখ করেছেন তারা।

দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশ হস্তান্তর করার দাবি জানিয়েছেন নিহত ক্রু খাজা শফির বোন বাসিমাহ সাইফুল্লাহ। তার কথায়, ‘স্বজনদের আনাই হয়েছে লাশ শনাক্তকরণের জন্য। কিন্তু এখানে (হাসপাতাল) আমাদের একটি ফরম ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখনও কোনও লাশ দেখতে পারিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একই কথা— সবার ফরেনসিক টেস্ট শেষ হলে দেখতে দেওয়া হবে।’

বাংলাদেশি নিহতদের স্বজনদের পাশাপাশি লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ। বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা উল্লেখ করেন ইউএস বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ‘নেপালের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের বিমানমন্ত্রী সেখানে (নেপাল) আছেন। আমরা আশা করছি, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে আমরা তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

ইউএস বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) থেকে নেপালে লাশগুলোর ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে লাশ শনাক্তে কিছুটা জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ বেশিরভাগ লাশই আগুনে পুড়ে গেছে। তাই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ হতে পারে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, হাসপাতালে ১৫ পাতার একটি ফরম পূরণ করতে হয়। সেটি দেখে লাশ শনাক্ত করা না গেলে ডিএনএ টেস্ট প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির স্বজনের সেখানে উপস্থিত থাকা জরুরি। তা না হলে ডিএনএ টেস্টও সম্ভব হবে না। ফলে লাশ হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রিতার আশঙ্কা থাকছে।’

নিহতদের লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে বিমানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘নাম-পরিচয় দিয়ে স্বজনরা আমাদের দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ফরম পূরণ করে দেবেন। আমরা রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি এ ব্যাপারে তৎপর থাকবেন। যে লাশ আগে শনাক্ত হয়ে যাবে কিংবা যার চেহারা বোঝা যাবে, আমাদের রাষ্ট্রদূত সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ডিএনএ টেস্ট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চিকিৎসকদের নেপালে পাঠাবেন।’

এর আগে মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) বাংলা ট্রিবিউনকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. প্রমোদ শ্রেষ্ঠা। তিনি জানান, ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে স্বজনদের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখার পর শনাক্ত করা গেলেই লাশ হস্তান্তর করা হবে। এরপরও শনাক্ত করা না গেলে ডিএনএ পরীক্ষা করে লাশ হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেছেন, ‘বেশিরভাগ লাশ ঝলসে গেছে। শনাক্ত করা খুব কঠিন।’

ডা. প্রমোদ শ্রেষ্ঠার কথায়, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা স্বজনদের অ্যান্টিমর্টেম ফরম পূরণ করে দিতে বলেছি। পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তিদের বিষয়ে যে অ্যান্টিমর্টেম ডাটা দিয়েছেন, সেগুলো ধরে ধরে সংগ্রহ করছি। যেমন ধরুন— উচ্চতা, ওজন, চোখের রঙ, কোনও ব্যক্তিগত অলঙ্কার, ট্যাটু বা যেকোনও চিহ্ন। দাঁতের চিকিৎসা করানো থাকলেও ময়নাতদন্তে কাজে আসবে। আমরা ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার পর অ্যান্টিমর্টেম ডাটার সঙ্গে মেলানোর কাজটি করবো। যদি এটাতেও না হয় তাহলে ফিঙ্গার প্রিন্টের দিকে যাবো। এই প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়তো আরও তিন চারদিন লেগে যাবে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের সঙ্গে স্বজনদের তথ্য মিলিয়ে চিহ্নিত করা গেলে পুলিশকে জানানো হবে। এরপর বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।’

গত ১২ মার্চ চার ক্রু ও ৬৭ যাত্রীসহ ৭১ জন আরোহী নিয়ে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে পৌঁছায়। অবতরণের সময় এতে আগুন ধরে যায়। এরপর বিমানবন্দরের কাছেই একটি ফুটবল মাঠে সেটি বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫০ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক ২৬ জন। এছাড়া বেঁচে আছেন আরও ১০ বাংলাদেশি।

/আরজে/জেএইচ/

x