ডুবে যাওয়া কার্গো উদ্ধারে আসছে দুই উদ্ধারকারী জাহাজ, পানির নমুনা সংগ্রহ

এস এম সামছুর রহমান, বাগেরহাট ১৫:০৫ , এপ্রিল ১৬ , ২০১৮

কার্গোডুবি
মোংলা বন্দর চ্যানেলের পশুর নদীর হারবাড়িয়া এলাকায় ডুবে যাওয়া ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লাবোঝাই লাইটার জাহাজ উদ্ধারের জন্য দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে আনা হচ্ছে। এই জাহাজ দুটি কাজ শুরু করলে আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যে কার্গোটি টেনে তোলা সম্ভব হবে। মোংলা বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার অলিউল্লাহ ও বাংলাদেশ জাহাজী শ্রমিক সংঘের সভাপতি মো. দুলাল সোমবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। এদিকে সোমবার দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মোংলা বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার ওলিইল্লাহ বলেন, ‘কার্গো জাহাজটির মালিকপক্ষ দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে পাঠাচ্ছেন। তারা প্রথমে ডুবে যাওয়া কার্গো থেকে কয়লা তুলে এরপর কার্গো জাহাজটি উত্তোলন করবেন।’

তিনি আরও বলেন, “রবিবার দুপুরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ পশুর নদীতে ডুবে যাওয়া স্থানে ডুবুরি নামিয়ে জাহাজটিতে ‘মার্কিং বয়া’ স্থাপন করেছে। এখন এই মার্কিং বয়ার কারণে মোংলা বন্দরে আসা দেশি-বিদেশি জাহাজগুলো দুর্ঘটনাস্থল এড়িয়ে চলাচল করতে পারছে। মোংলা বন্দর চ্যানেলে কয়লাবোঝাই লাইটার ডুবির পর বন্দরের কার্যক্রম ও চ্যানেলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।’

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদ হাসান সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল থেকে মুঠোফোনে জানান, ডুবে যাওয়া কার্গো জাহাজটি এখন জোয়ারের পানির নিচে রয়েছে। এর কোনও অংশই দেখা যাচ্ছে না। তিনি ও তদন্ত কমিটির প্রধান চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শাহিন কবির ঘটনাস্থলে এসে সার্বিক দিক পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিবেশ অধিদফতরের একটি টিম ঘটনাস্থলে এসে নমুনা সংগ্রহ করেছে। যত দ্রুত সম্ভব ডুবে যাওয়া কার্গোটি তুলে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্টদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে চাপ অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে রওনা দিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন বলে জানান।

ঘটনাস্থল থেকে মুঠোফোনে বাগেরহাট পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ইমদাদুল হক জানান, ঘটনাস্থলে ভাটার সময় পনির গভীরতা ছিল ১২ ফুট। সেখান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি খুলনা ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিস্তারিত জানা যাবে।

কয়লার মালিক পক্ষ চট্টগ্রামের সাহারা এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার ( অপারেশন) লালন হাওলাদারের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ডুবে যাওয়া কার্গো থেকে কয়লা বাইরে বের হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই। আজ সোমবার আমাদের উদ্ধারকারী টিম প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ রওনা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হবে।’ তিন সদস্যের এই পরিদর্শন টিমে পরিবেশ অধিদফতরের খুলনার উপপরিচালক মো. ইকবাল হোসেন ও সিনিয়র কেমিস্ট কামরুজ্জামান ছিলেন বলে তিনি জানান।

সুন্দরবনের হারবাড়িয়া এলাকার ৬ নম্বর অ্যাংকোরেজে থাকা লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি অবজারভার’ ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা নিয়ে মোংলা বন্দরে আসে। জাহাজটি থেকে রবিবার (১৫ এপিল) ভোরে কয়লা নেওয়া হয় ঢাকার ইস্টার্ন ক্যারিয়ার নেভিগেশনের মো. সোহেল আহম্মদের ‘এমভি বিলাস’ কার্গো জাহাজে। খুলনার দুলাল এন্টারপ্রাইজের জন্য ইটভাটা ও সিরামিক কারখানাগুলোর জন্য আমদানি করা কয়লা নিয়ে তা রাজধানীর উদ্দেশে রওনা দেয়। কিছু দূর এগোলেই ডুবোচরে ধাক্কা লেগে তলা ফেটে এটি ডুবে যায়। এ সময় কার্গোতে থাকা সাত কর্মচারী সাঁতরে তীরে উঠে আসেন।

সুন্দরবনের মধ্যে পশুর নদীতে লাইটার জাহাজ ডুবির ঘটনায় সুন্দরবনের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হবে তা নিরূপণ করতে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বন বিভাগ।

অপরদিকে রবিবার দুপুরে কয়লার মালিকপক্ষে চট্টগ্রামের সাহারা এন্টারপ্রাইজের অপারেশন ম্যানেজার লালন হাওলাদার মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডিতে তিনি দাবি করেছেন, দুর্ঘটনায় কোম্পানির ১ কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে ডুবে যাওয়া লাইটার কার্গোর মাস্টার ফরিদ মিয়া দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করে মোংলা থানায় অপর একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন ডুবে যায়। ২০১৫ সালের ৩ মে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবে যায় সারবোঝাই কার্গো জাহাজ এমবি জাবালে নূর। ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবতে-ডুবতে অন্য কার্গোর সহায়তায় মোংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় আরেকটি কয়লাবোঝাই কার্গো। ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সুন্দরবনের পশুর নদীতে ৫১০ মেট্রিক টন কয়লাবাহী এমভি জিয়া রাজ কার্গো ডুবি হয়। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর ‘হরিণটানা’ বন টহল ফাঁড়ির কাছে ১২৩৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ‘এমভি সি হর্স-১’ ডুবে যায়। ২০১৭ সালের ৪ জুন দিনগত রাতে হারবাড়িয়া চ্যানেলে ৮২৫ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালসহ ‘এমভি সেবা’ নামে একটি কার্গো তলা ফেটে ডুবে যায়।

 আরও পড়ুন- 



মোংলায় সাড়ে সাতশ’ টন কয়লাসহ কার্গোডুবি

মোংলার পশুর নদীতে কার্গো ডুবির ঘটনায় দুটি জিডি

মোংলায় কার্গোডুবি: জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে না

/এফএস/চেক-এমওএফ/

x