খাদ্যপণ্যের বাজার-রেস্তোরাঁয় বেড়েছে ভেজালবিরোধী অভিযান

সাদ্দিফ অভি ২১:১৩ , মে ১৭ , ২০১৮

 

ক্যামিক্যাল যুক্ত আম (5)রোজার মাস এলেই ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারে সয়লাব হয়ে যায় খাদ্যপণ্যের বাজার ও রেস্তোরাঁগুলো। এ কারণে এবার রোজা উপলক্ষে খাদ্যপণ্যের এসব বাজার-রেস্তোরাঁয় ভেজালবিরোধী অভিযান বাড়ানো হয়েছে। যেন সারাদিন রোজা রেখে সাধারণ মানুষ নিরাপদ খাবার খেতে পারে, সেই লক্ষ্যে রোজার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।  

রোজা শুরুর আগেই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিএসটিআইকে সঙ্গে নিয়ে খাবারে ভেজাল রোধে অভিজানে নেমেছে। সম্প্রতি কাওরানবাজারে আড়তে অভিযান চালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে প্রায় ৪০০ মণ আম। এসব আম নির্ধারিত সময়ের আগেই ইথোফেন দিয়ে পাকিয়ে বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। কাওরানবাজারের বিভিন্ন আমের আড়তে কৃত্রিম উপায়ে কাঁচা আম পাকানোর অপরাধে ৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দিয়েছেন র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার  (১৫ মে) সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত কাওরান বাজারের বিভিন্ন আমের আড়তে ও পাইকারি দোকানে অভিযান চালান র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এতে সহযোগিতা করে র‍্যাব-২, বিএসটিআই, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘আমে কেমিক্যাল যুক্ত করে পাকানোর অপরাধে আটটি প্রতিষ্ঠানের আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের দোষ স্বীকার করেছেন।’

সাজাপ্রাপ্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, সোনার বাংলা বাণিজ্যালয়, ফরহাদ ট্রেডার্স, মুক্তা ফার্ম, পদ্মা এন্টারপ্রাইজ, স্বদেশ ফার্ম, সাকিল এন্টারপ্রাইজ, তেজগাঁও ফার্ম, মৌসুমী বাণিজ্যালয় ও অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কোনও নাম নেই। তবে সেটির মালিককে সাজা দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম আরও বলেন, ‘দেখতে হলুদ হলেও জব্দ করা আমগুলোর আঁটিও ছিল কাঁচা। বেশি লাভের আশায় অপরিপক্ব আম ক্ষতিকর পদার্থ দিয়ে পাকানোর পর বিক্রি করা হচ্ছিল। অপরিপক্ব আম বিক্রির অভিযোগে আট ব্যক্তিকে দুই থেকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জব্দ করা আম নষ্ট করে ফেলা হয়।’ 

ক্যামিক্যাল যুক্ত আম (6)

এর আগে গত ১০ মে রাজধানীর সদরঘাট এলাকার বাদামতলীতে অভিযান চালিয়ে ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যাব-৩ ও বিএসটিআইয়ের যৌথ সহযোগিতায় বাদামতলীতে এ অভিযান চালানো হয়। বিক্রির জন্য পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর মজুদ করার অভিযোগে এ জরিমানা করা হয় বলে জানিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।তিনি বলেন, ‘ওই সময় ৬০ মণ খেজুর ও ইথোফেন দিয়ে পাকানো ২১ কেজি আম ধ্বংস করা হয়। অভিযানের সময় আমরা দেখতে পাই রোজায়  বিক্রির জন্য পচা, ইঁদুরে খাওয়া ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর মদিনা হিমাগারে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া হিমাগারের পরিবেশও ছিল খুব নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানাসহ ৬০ মণ পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। এছাড়া প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগে অপরিপক্ব আম ইথোফেন দিয়ে পাকানোর কারণে ২১ মণ আম জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।’

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৭ মে) আসাদগেট, কল্যাণপুর ও গাবতলীতে বিভিন্ন খাবার হোটেল এবং রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে  ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে। এপিবিএন-১১-এর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক  মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নির্দেশনায় অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর। এ সময় সহকারী পরিচালক রজবী নাহার রজনী ৬টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা আরোপ করে। জরিমানার অর্থ আদায় করে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো প্যারাডাইস সুইটস, মুসলিম সুইটস, আলিফ রেস্তোরাঁ, নিউ আপ্পায়ন হোটেল, জাবির হোটেল ও নিউ ধানসিঁড়ি। এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ এর ৪৩ ও ৩৭ ধারায়  জরিমানা করা হয় বলে জানান রজবী নাহার রজনী।

অন্যদিকে, বিএসটিআই’র নিয়ম অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের দায়ে রাজধানীর সোয়ারীঘাট এলাকায় পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা ও একটি প্রতিষ্ঠানকে সিল মেরে দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৃহস্পতিবার (১৭ মে) দুপুর ১ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত চকবাজার থানাধীন সোওয়ারীঘাট এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জানতে চাইলে ডিএমপি’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মশিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিএসটিআই-এর নিয়ম না মেনে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছিল। এই কারণে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়।’ রাজধানীতে যেন কেউ ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও জনমানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে, সেজন্য ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

রোজার মাসকে ঘিরে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (তদন্ত) মাসুম আরেফিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোজার মাসে সপ্তাহে সাতদিনই মনিটরিং করা হবে। আগে শুক্রবার ও শনিবার ছুটি থাকলেও এবার ওই দুই দিনও টিম কাজ করবে। খাবারের ভেজাল, মান ও ভোক্তার সঙ্গে খাদ্যপণ্য নিয়ে প্রতারণা করার প্রমাণ পাওয়া গেলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে রমজান মাসে খাবারের ভেজালবিরোধী অভিযান চলবে। খাবারের কেমিক্যাল, রঙ, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সবকিছু নিয়েই কাজ করবে টিম। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য ও যুগ্ম সচিব মাহবুব কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো মাসে কাজ করবো আমরা। কাউকে ছাড় দেবো না। খাবারে কোনও ধরনের ভেজাল করা যাবে না। যেখানেই দেখবো সেখানেই ব্যবস্থা।’

 

/এমএনএইচ/

x