নির্বাচনে অনিয়ম: চার কর্মকর্তাকে ডাকা হচ্ছে ইসিতে

এমরান হোসাইন শেখ ২৩:৫৪ , জুলাই ১০ , ২০১৮

নির্বাচন কমিশননির্বাচনে অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই অংশ হিসেবে সদ্য সমাপ্ত খুলনা সিটি করপোরেশনের স্থগিত তিনটি কেন্দ্র এবং ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়া দু’টি কেন্দ্রের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। একইভাবে গত মার্চে অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ ও ওই পৌরসভা নির্বাচনের অনিয়মের ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ইসি। এ দু’টি নির্বাচনে দায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এছাড়া ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার ব্যাখ্যা চেয়ে খুলনার পুলিশ কমিশনার ও ডিসি এবং সুনামগঞ্জের ডিসি ও এসপিকে তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৯টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিতের ঘটনায় তদন্ত করতে যাচ্ছে কমিশন। ইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, ‘নির্বাচনে নিরাপত্তা দিতে না পারায় খুলনা ও সুনামগঞ্জে একটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছিল। ওই সময় দায়িত্ব অবহেলার জন্য কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে না পারায় খুলনার পুলিশ কমিশনার, ডিসি, সুনামগঞ্জের ডিসি-এসপিকে ঢাকা ডেকে ব্যাখ্যা চাওযার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কিন্তু কবে তাদের ঢাকা ডাকা হবে তার সিদ্ধান্ত এখনও পাওয়া যায়নি।’

অবশ্য নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের কোনও তথ্য জানা নেই। এ ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত হলে তার আমার কথা।’

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় খুলনার পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবীর, জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল আহসান এবং ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জ পৌরসভার উপ-নির্বাচনে একই ধরনের অভিযোগে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাবেরুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহর কাছে কৈফিয়ত তলব করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের নিজস্ব তদন্তে খুলনা ও সুনামগঞ্জের নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট দু’টি নির্বাচনে কেন ও কী কারণে অনিয়ম হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে কমিশন।

প্রসঙ্গত, খুলনা সিটি নির্বাচনে জোরপূর্বক ব্যালট ছিনতাই ও অনিয়মের কারণে ৩টি ভোট কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। কেন্দ্রগুলো ছিল—ইকবালনগর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৩১ ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কার্যালয়। এছাড়া আরও তিনটি কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট পড়ার বিষয়টি ইসির নজরে এলে বিষয়টি নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত করে কমিশন। কেন্দ্র তিনটি হচ্ছে খালিশপুরের নয়াবাটী হাজী শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ (মাধ্যমিক)। এই কেন্দ্রে একজন বাদে সবাই ভোট দেন। এই কেন্দ্রে ৯৯ দশমিক ৯৪ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। খালিশপুরের মাওলানা ভাসানী বিদ্যাপীঠ (গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ) স্কুল ভবন কেন্দ্রে ভোট পড়ে ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খুলনার গগনবাবু রোডের নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পড়ে ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট। যেখানে খুলনা সিটিতে মোট ভোট পড়ে ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ সেখানে এই তিনটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের জন্য সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থগিত তিনটি কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা  নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইসি সূত্র।

অন্যদিকে, গত ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জ পৌরসভার উপ-নির্বাচনে উত্তর আরপিননগর পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে সকাল ১০ টা ১ মিনিটে ব্যালট পেপারের একটি বই ছিনিয়ে নেয় সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা। এখানে পুলিশ কোনও ভূমিকাই রাখেনি। এ ঘটনায় ইসির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোতালেবসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত ৬জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বরত ইনস্পেক্টরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ওঠে। বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছে ইসি। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে কমিশনে নিজেদের মধ্যেও কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে। আর সামনে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি নির্বাচন রয়েছে। এর আগে আগামী ২৫ জুলাই অর্ধশতাধিক ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচন সামনে রেখে বিগত নির্বাচনগুলোয় অনিয়ম ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অন্যদের জন্য ম্যাসেজ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে কমিশন।

 

/এমএনএইচ/

x