মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ত্রুটির খোঁজে দুই সিটি

শাহেদ শফিক ২১:২০ , অক্টোবর ০৯ , ২০১৮

 

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার -৩যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার দুই বছরেরও বেশি সময় পর রাজধানীর মগবাজার মৌচাক ফ্লাইওভারের ত্রুটির খোঁজে মাঠে নেমেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সংস্থা দু’টি বলছে, এরই মধ্যে ফ্লাইওভারটির বেশ কিছু ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও অনেক ত্রুটি রয়েছে। এদিকে, নির্মাণ শেষে ফ্লাইওভারটি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করতে চায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। এজন্য স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, ফ্লাইওভারের যেসব ত্রুটি চিহ্নিত করা হবে, সেগুলো সারিয়ে দিলে তাদের মধ্যে যেকোনও একটি প্রতিষ্ঠান তার দায়িত্ব নিতে রাজি।

দুই সিটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, নকশা অনুমোদনের পর থেকেই মগবাজার মৌচাক-ফ্লাইওভার নিয়ে নানা ত্রুটি দেখা দেয়। এরমধ্যে ফ্লাইওভারে ট্রাফিক সিগন্যাল, বৈদ্যুতিক বাতি নষ্ট, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, বাম দিকে স্টিয়ারিং, যানজট লেগে থাকা, ওঠা-নামার র‌্যাম্প জটিলতাসহ নামার লুপে যানজট লেগেই থাকে। বিষয়গুলো বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। তারা ফ্লাইওভারটিকে ঢাকার ‘বোঝা’ আখ্যা দিয়েছেন। এই ‘বোঝা’র দায়িত্ব নিতে চায় না কোনও সিটি করপোরেশনই। এছাড়া দিনদিন আরও ত্রুটি ধরা পড়ছে। ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও জনবলের প্রয়োজন রয়েছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে এসব সমস্যা সমাধান করে দিতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই সিটি করপোরেশনের একাধিক প্রকৌশলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ফ্লাইওভার নিয়ে এরইমধ্যে নানা জাটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন যানজটের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেই চিত্রই বলে দিচ্ছে, এই ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে কোনও ভূমিকা রাখছে না। বরং যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এরইমধ্যে নকশাত্রুটির কুফলসহ নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটি এখন সড়কের ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সামান্য বৃষ্টি হলে ফ্লাইওভারের ওপরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।’’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্মাণ শেষে এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। কিন্তু পরিকল্পনায় ত্রুটি, লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতাসহ নানা কারণ দেখিয়ে ফ্লাইওভারটির দায়িত্ব নিতে দীর্ঘদিন ধরে অনীহা দেখিয়ে আসছে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন। তবে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কাছে চিঠি আসার পর এর ত্রুটির খোঁজে মাঠে নেমেছে সংস্থা দু’টি।

মগবাজার-মৌচাক ফ্রাইওভার-১

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর এ ত্রুটি খুঁজতে ডিএসসিসি আন্তঃবিভাগীয় সাতটি কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, সম্পত্তি বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কমিটিগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে পুরো ফ্লাইওভার পরিদর্শন করে এরমধ্যে যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিবেদন আকারে সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা। এর আগে গত ২৩ জুলাই ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলালের সভাপতিত্বে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও নকশা বিভাগ) তানভীর আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা কয়েকটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে। প্রতিটি কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে প্রতিবেদন দেবে। এরপর এসব কমিটির প্রতিবেদনে এতসঙ্গে ‍যুক্ত করে মন্ত্রণালয়কে একটি পত্র দেওয়া হবে। যদি এর মধ্যে কোনও ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে সেগুলো মেরামত করে দেওয়ার জন্য বলা হবে।’

জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ সার্কেল) জাফর আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎ বিভাগের কমিটি বেশ কয়েকটি ত্রুটি চিহ্নিত করেছে। এরমধ্যে বৈদ্যুতিক পুল, বাতি ও সংযোগে নানা ত্রুটি রয়েছে। অনেক  পুলে তার নেই। রাতে পুরো ফ্লাইওভার অন্ধকারে থাকে। আমরা এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছি।’

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফ্লাইওভারের ওপরে ও নিচে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করছি। অনেক সময় দেখা যায়, ফ্লাইওভারের ওপরে ধুলাবালিসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকে। ধুলায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলো অপসারণ করার জন্য কর্মী প্রয়োজন। এছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। আমরা সে বিষয়ে সুপারিশ করবো।’

ফ্লাইওভারটি দুই সিটি করপোরেশনে পড়েছে। এ অবস্থায় সংস্থা দু’টির কাছে মন্ত্রণালয় থেকে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ভারপ্রাপ্ত মেয়র (প্যানেল মেয়র-২) মো. জামাল মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বলে দিয়েছি, ফ্লাইওভারটি দুই সংস্থা নয়, একটি সংস্থাকে দেওয়া হোক। হয় আমাদের দেওয়া হোক, না হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হোক। তাহলে এর ব্যবস্থাপনা ভালো হবে। আমরা চাই জনগণ এর সেবা পাক।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফ্লাইওভার নিয়ে বিভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে। অনেক সমস্যাও রয়েছে। এগুলো ঠিক করে দিয়ে একহাতে নিয়ন্ত্রণ করা ভালো হবে। আমি আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানিয়ে দিয়েছি, তারা যেন বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন।’মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ফ্লাইওভারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুই সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।’

উল্লেখ্য,২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিন স্তরবিশিষ্ট চার লেনের এই ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ হাজার ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর প্রতি মিটারে খরচ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা।

ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ করা হয়েছে তিন ভাগে। প্রথম অংশ সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত। এই অংশটি ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করেন। এই ফ্লাইওভারটির দ্বিতীয় অংশ হলো, বাংলামোটর-মগবাজার-মৌচাক-রাজারবাগ পর্যন্ত। এই অংশটি যান চলাচলের জন্য গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর উন্মুক্ত করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ফ্লাইওভারটির তৃতীয় অংশ রামপুরা চৌধুরীপাড়া-মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর অংশ ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

/এমএনএইচ/

x