ডিমের হালি ৪০ টাকা

শফিকুল ইসলাম ০৬:৫৫ , অক্টোবর ১০ , ২০১৮

ডিমরাজধানীর অধিকাংশ পাড়া-মহল্লায় প্রতি পিস লাল মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা দরে। সেই হিসেবে হালি ৪০ টাকা। ডজন ১২০ টাকা। ৩০ পিসের এক খাঁচি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা দরে। অনেক মহল্লায় এর চেয়েও বেশি দরে ডিম বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিন মাস আগে প্রতি পিস ডিম বিক্রি হয়েছে ৮ টাকা এবং ৩০ পিসের এক খাঁচি ডিম বিক্রি হয়েছে ২৩৫ থেকে ২৪০ টাকা দরে। আবার ৬ মাস আগে এই ডিম বিক্রি হয়েছে প্রতি পিস ৬ টাকা দরে। আর ৩০ পিসের এক খাঁচি ডিম বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকা দরে।
ডিমের দাম আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ জানতে চাইলে তারা জানিয়েছেন, গত বছর ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল। অনেকেই তখন লোকসান দিয়েছেন। সেই লোকসানের ঘানি টানতে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই খামার বন্ধ করে ডিম দেওয়া মুরগি যা ‘লেয়ার’ নামে পরিচিত সেই লেয়ার মুরগি বিক্রি করে দিয়েছিল। ফলে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু চাহিদা তো কমেনি। কারণ তখন রোজা চলছিল। রোজায় ডিমের চাহিদা কম থাকে। তাই রোজায় ডিমের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল।
মঙ্গলবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর কয়েকটি বাজারে ডিম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারে পিস প্রতি ডিমের দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৪ টাকা করে। অর্থাৎ হালি প্রতি ডিমের দাম বেড়েছে ১২ থেকে ১৩ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে সবজির দামও কম। এই মৌসুমে গুটি কয়েক সবজি পাওয়া যায়। নদ-নদীতে পানি বেশি থাকায় মাছের সরবরাহও কমে যায়। বর্তমানে ইলিশ মাছ ধরা ও বিক্রি বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে চাহিদা বেড়েছে ডিমের, তাই চাপ পড়েছে। এই সুযোগে বেশি মুনাফার দিকে ঝুঁকছেন মাংস ব্যবসায়ীরা। এই সময় গরুর মাংস ও সব ধরনের মুরগির দাম বেশি থাকায় ডিমের দাম ও চাহিদা বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, শুধু ডিম বিক্রি করেন এমন ব্যবসায়ীরা প্রতি ডজন ডিম ১১০ টাকায় বিক্রি করছেন। আর এক ডজনের কম নিলে প্রতি হালি ডিমের দাম রাখা হচ্ছে ৩৬ টাকা। অপরদিকে মুদি দোকানে প্রতি পিস ডিমের দাম রাখা হচ্ছে ১০ টাকা।
রাজধানীর মাতুয়াইল মুসলিম নগরের ডিম বিক্রেতা সামছু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, রোজার সময় একশ ডিম ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকায় কিনেছি। এখন সেই ডিম কিনতে হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকায়। এই দরে প্রতি পিস ডিমের দাম পড়ে সাড়ে ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন খরচ। পরিবহন করতে গিয়ে ভেঙেও যায় ডিম। তাই প্রতি পিস ডিম ১০ টাকার কমে বিক্রি করলে দোকানির লোকসান হয় বলে জানান তিনি।
সামছু মিয়া বলেন, ‘মনস্থির করেছিলাম আজ (মঙ্গলবার, ৯ অক্টোবর) ৫শ ডিম আনবো। কিন্তু দাম বেশি বলে মাত্র দেড়শ ডিম এনেছি। দোকান তো চালাতে হবে। বেশি না আনলে পরিবহন খরচ দিয়ে পোষানো যায় না। তাই দেড়শ ডিম এনেছি।’
বাজারে ডিমের এই মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্প্রতি গরমে ডিমের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে খামারিরাও চাপে আছে। তাই সরবরাহ কমেছে কিছুটা। একদিকে চাহিদা বেড়েছে, অপরদিকে সরবরাহ কমেছে। তাই দাম বাড়ানোটা খুবই স্বভাবিক বলে জানান তারা। দাম বাড়ানো কিংবা কমানোর ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতাদের কোনও ভূমিকা থাকে না বলেও জানান তারা।
কারওয়ান বাজারের ডিম ব্যবসায়ী হেদায়েত হোসেন জানিয়েছেন, ‘আমরা পাইকারি দরে ডিম কিনে আনি, আর খুচরা বিক্রি করি। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারে বাড়াতে হয় যা খুবই স্বভাবিক। আর পাইকারি বাজারে কমলে খুচরা বাজারেও কমে। যদি বাজারের তুলনায় দাম বেশি রাখি কাস্টমার অন্য দোকানে চলে যাবে। এক্ষেত্রে দাম বেশি রাখার তো কোনও সুযোগ নাই।’
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর এক হাজার ৬৯৪ কোটি ১৬ লাখ পিস ডিমের চাহিদা রয়েছে। আর ডিম উৎপাদন হয় এক হাজার ৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ পিস। এ হিসেব অনুসারে বছরে চাহিদার তুলনায় ২০০ কোটি ৮৫ লাখ পিস ডিমের ঘাটতি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গাজীপুরের খামারি শাহজাহান মৃধা বেনু বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, গরমে ডিম উৎপাদন কমে যায়। এই মৌসুমে বাজারে বা মাঠে সবজিও তেমন থাকে না। তাই মাছ ও মাংসের পাশাপাশি ডিমের ওপর চাপ পড়ে। মাছ মংসের দাম বেশি হওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষ ডিমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে চাহিদা সৃষ্টি হয়, তাই দাম বাড়ে।
তিনি আরও জানান, ডিমের উৎপাদন খরচও বেড়েছে আগের তুলনায়। বেড়েছে শ্রমিকের পারিশ্রমিকও। একই সঙ্গে বেড়েছে রোগ প্রতিরোধের ওষুধ ও মুরগি পালনের বিভিন্ন উপকরণের দাম। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে মুনাফা করতে ব্যর্থ হওয়ায় লোকসানের কবলে পড়েছে কয়েক হাজার খামারি। একপর্যায়ে তারা এই ব্যবসা বন্ধ করে দেন। এই খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন শাহাজান মৃধা বেনু।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পোল্ট্রি খামারিদের সংগঠনের কর্মকর্তা আবু জাফর বলেন, কৃষির উপখাত পোল্ট্রি ডেইরি তথা প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণে আমরা খুবই মর্মাহত। একটি ডিম থেকে একটি মুরগির বাচ্চার জন্মে- ডিমের মূল্য, বাচ্চা উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগের লাভসহ সর্বমোট উৎপাদন খরচ ২৪ টাকা থেকে ৩০ টাকা।’
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডিমের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিভিন্ন কাগজে দেখেছি। এই সময়ে ডিমের দাম এত বাড়ে না। এ বিষয়ে খোঁজ নেব। অযৌক্তিকভাবে কেউ যদি ডিমের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বা দাম বাড়ায় তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে সরকার।

/এসআই/ওআর/

x