দুর্যোগে জানমাল রক্ষায় আবার ‘মুজিব কিল্লা’

শফিকুল ইসলাম ১৭:৪২ , অক্টোবর ১১ , ২০১৮

মুজিব কেল্লার প্রস্তাবিত নকশাযেকোনও দুর্যোগে, বিশেষ করে বন্যায় জানমাল রক্ষায় আবার ব্যবহার হবে মুজিব কিল্লা। অন্য সময় মুজিব কিল্লাগুলো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা হবে। ব্যবহার করা যাবে খেলার মাঠ ও হাট-বাজার হিসেবেও। সেখানে আয়োজন করা যাবে গ্রাম ও ইউনিয়ন কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানও। আয়োজন করা যাবে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কমিউনিটি উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈঠক বা সভা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় অনুষ্ঠিতব্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সর্বোপরি দুর্যোগ পূর্ববর্তী, দুর্যোগকালীন বা দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে এই মুজিব কিল্লা। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দীর্ঘদিন অযত্ন, অবহেলা এবং সংরক্ষণের অভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা ও উদ্যোগে গড়ে তোলা মুজিব কিল্লাগুলো ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে এসব মুজিব কিল্লা সংস্কার ও উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ও কয়েক লাখ প্রাণী মারা যায়। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার হাত থেকে জানমাল রক্ষার্থে বহু মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে এগুলো নির্মিত হওয়ায় সর্বসাধারণের কাছে তা ‘মুজিব কিল্লা’ নামে পরিচিতি পায়। সেই সময় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষকে দুর্যোগ সহনশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মিত ‘মুজিব কিল্লা’গুলো ক্ষতিগ্রস্ত ও বেদখল হয়ে যায়। বর্তমান সরকার সেগুলো সংস্কার ও উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

অতীতের দুর্যোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৬৯ জন মানুষ নিহত হন। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হন ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে নিহত হন ৩ হাজার ৩৬৩ জন এবং ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা’য় নিহত হন ১৯০ জন। এছাড়া ২০১৩ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মহাসেন, ২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় কোমেন, ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু-তে উপকূলীয় জেলাসমূহে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০০ এবং ২০০৪ সালের বন্যায় দেশের ৩৯ জেলার ২৬৫টি উপজেলায় জানমালের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এসব দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৫১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এছাড়া ২০১৬-২০১৯ মেয়াদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরও ২২০টি বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগগুলো উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনের ঝুঁকি হ্রাস করেছে এবং সেই সঙ্গে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু বিদ্যমান ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বাস্তবতা বিবেচনায় অপর্যাপ্ত। যে কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ইতোপূর্বে নির্মিত মুজিব কিল্লাগুলো সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে দুর্যোগ ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের নেওয়া প্রকল্পের আওতায় ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ১৮৬টি মুজিব কিল্লা রয়েছে। এরমধ্যে আপাতত ৫৫টি বিদ্যমান মুজিব কিল্লা পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করা হবে। আর ১৩১টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ১৭১টি মুজিব কিল্লা রয়েছে। এরমধ্যে ৬৩টি বিদ্যমান মুজিব কিল্লা পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কার করা হবে। ১০৮টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ১৯৩টি মুজিব কিল্লা রয়েছে। এরমধ্যে ৫৪টি বিদ্যমান মুজিব কিল্লা পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করা হবে এবং ১৩৯টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। কিল্লার আশপাশে বীজ ও উদ্যান (বনায়ন) করা হবে। এছাড়াও কিল্লার কাজে ব্যবহারের জন্য অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম কেনা হবে ৫৭৯টি।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। যার পুরোটাই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে। প্রকল্পটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর বাস্তবায়ন করবে। ২০২১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল।

তিনি জানিয়েছেন, ‘দেশের ৮টি বিভাগের ৩৮টি জেলার ১৪৮টি উপজেলা (ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ১৬টি জেলার ৬৪টি উপজেলা এবং বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙন এলাকায় ১২টি জেলার ৮৪টি উপজেলায়) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। এসব স্থানে আগে থেকেই মুজিব কিল্লা নির্মাণ করা হয়েছিল।’

/এফএস/এমওএফ/

x