আহমদ শফীর বক্তব্য সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও শঙ্কার

উদিসা ইসলাম ও চৌধুরী আকবর হোসেন ২২:৪১ , জানুয়ারি ১২ , ২০১৯

আল্লামা শাহ আহমদ শফী (ফাইল ছবি)

হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ‘মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না, যদি দেনও ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়াবেন’ বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ মন্তব্য মানবাধিকারকর্মী, নারীনেত্রী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন,শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে খাটো করা মানে হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে খাটো করা। নারীনেত্রী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা মনে করেন আহমদ শফির ওই বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত,নারী অধিকারের যে অঙ্গীকারগুলো রয়েছে তার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই বক্তব্য মেয়ে শিশু ও তাদের অভিভাবকদের মনে শঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে। নারীশিক্ষাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এধরনের নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধে রাষ্ট্রকেই আইন অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এদিকে, হেফাজতে ইসলামের নেতাদের দাবি,আহমদ শফির বক্তব্য সঠিকভাবে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়নি। তবে হেফাজতের আমিরের অভিমত তার ব্যক্তিগত বলে মন্তব্য করেছেন সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বিষয়টি নিয়ে অন্য রাজনীতিবিদরাও মুখ খুলতে চাননি। 

গতকাল শুক্রবার (১১ জানুয়ারি)সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের হাটহাজারীস্থ আল-জামিআতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার ১১৮তম বার্ষিক মাহফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, ‘আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। যদি দেনও ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়াবেন। এর বেশি পড়ালেখা করালে আপনার মেয়েকে পর-পুরুষে টানাটানি করে নিয়ে যাবে।’ এ বক্তব্যের পর মেয়েদের স্কুল-কলেজে না দিতে ওয়াদাবদ্ধ হওয়ার জন্য উপস্থিত মুসল্লিদের ওয়াদাও নেন আল্লামা শফী।

হেফাজতে ইসলামের নেতাদের দাবি,বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে তাতে আহমদ শফীর বক্তব্য সঠিকভাবে উপস্থিত হয়নি। গতকাল শুক্রবারের অনুষ্ঠানে নারীর জীবন ও সম্ভ্রমহানি যেন না ঘটে এজন্য তিনি উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি নারীর শিক্ষা বন্ধের কথা বলেননি।  

আল্লামা শফী কোন পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের ফোর ফাইভ পর্যন্ত শিক্ষার কথা বলেছেন জানতে কথা হয় ওইদিন মাহফিলে উপস্থিত হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাঈনুদ্দিন রুহীর সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হুজুর বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে ওয়াজ করছিলেন। সেখানে তিনি নারীদের লাঞ্ছনার কারণগুলো তুলে ধরেন। ওই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি মেয়েদের কম পড়ানোর বিষয়টি বলেছেন।তিনি আরও বলেন, ‘হুজুর বলেছেন প্রাইমারিতে পড়ানো নিয়ে কোনও অসুবিধে নেই। প্রাইমারিতে পড়ানো দরকার। যদি এর চেয়ে বেশি পড়াতে হয়, তবে মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকা দরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা থাকলে মেয়েদের ইজ্জত আবরু এসব হেফাজত থাকবে। আজ  স্কুল, কলেজে ছেলে-মেয়েরা পড়তে গিয়ে মেলামেশার কারণে মেয়েরা অত্যাচারিত হচ্ছে,  ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। মহিলারা নির্যাতিত হচ্ছে।’ মাঈনুদ্দিন রুহী আরও বলেন, ‘হুজুর এও বলেছেন মেয়েদের চাকরি করতে কোনও অসুবিধে নেই যদি তাদের ইজ্জত আবরু হেফাজত হয়। যদি তাদের ইজ্জত আবরু সংরক্ষণ হয় তাহলে মেয়েরা ব্যাংক, বীমা, গার্মেন্টসসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবে।’

হাত তুলে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন,‘হুজুর তার বক্তব্যে যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছেন ওইগুলো মেনে চলার জন্য সবার কাছে প্রতিশ্রুতি নেন। ওয়াজ মাহফিলের শেষ দিকে তিনি অধিকাংশ সময়ই উপস্থিত মুসল্লিদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে থাকেন। কালও একইভাবে নিয়েছেন।’

একই বক্তব্য দিয়েছেন মাহফিলে থাকা স্থানীয় যুবক আবু সাইয়্যেদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হুজুর কাল প্রায় দেড়ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যের শেষের দিকে তিনি মেয়েদের পড়াশুনা নিয়ে কথা বলেন। মূলত ছেলেমেয়েরা যেন অবাধ মেলামেশা করতে না পারে সেজন্য তিনি মেয়েদের কম পড়ালেখা করানোর উপদেশ দিয়েছেন।’

মেয়েদের শিক্ষা নিয়ন্ত্রণে এভাবে কেউ প্রস্তাব দিতে পারেন কী না জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি আল্লামা শফীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই,শিক্ষা অর্জনের অধিকার হলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। ধর্মজ্ঞানও শিক্ষার একটি অংশ। তাই এটার মাঝে কোনও বিভেদ বা বৈষম্য থাকতে পারে না। ধর্ম এবং শিক্ষা রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সব নাগরিকের জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করেছে। এটাকে সঙ্কুচিত করার ক্ষমতা কারও নেই।’ তিনি আরও বলেন,‘শিক্ষার অধিকার আমাদের সংবিধানেও সুরক্ষিত আছে এবং এই মৌলিক অধিকারকে খাটো করা মানে হচ্ছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে খাটো করা। তাই এ ধরনের উক্তি আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

হেফাজতে ইসলাম প্রধান আহমদ শফির এই মন্তব্যকে নারীবিরোধী ও সংবিধানের পরিপন্থী বলে মনে করেন নারী নেত্রীরাও।

বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল এ বিষয়ে বলেন,‘এটি একদমই সংবিধানবিরোধী কথা এবং নারী অধিকারের যে অঙ্গীকারগুলো রয়েছে সেগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আমাদের বর্তমান যে সরকার নারীর ক্ষমতায়নের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় গেছেন। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা,সংবিধানবিরোধী কথা বললে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ নেওয়ার যে নীতিমালা রয়েছে সেই নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্র যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।’

বিভিন্ন লেনদেন ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখায় তারা রাজনৈতিক সাহস পাচ্ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে নারীবিরোধী ধর্মব্যবহারকারী সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা দীর্ঘসময় ধরে রাষ্ট্রের সহযোগিতায় অনেক ক্ষমতা অর্জন করেছে,নিজেদের শক্তিশালী করেছে।যেহেতু তাদের আদর্শ জানার পরও নানা সমীকরণে তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক হচ্ছে এতে তারা রাজনৈতিক সাহস পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন,যে দেশে আমরা বাল্যবিবাহ বন্ধ, নারী-পুরুষ সমতা, যৌন হয়রানি বন্ধের জন্য নানাভাবে কাজ করছি সেখানে আবারও এসব কথাবার্তা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক বলেন,‘বিষয়টি শঙ্কার, কারণ এসব বক্তব্য নারীদের ওপরে জুলুম উস্কে দেবে। সেহেতু এসব প্রচারণা দ্রুত বন্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তার এই বক্তব্য সমাজে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলবে তা নয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে। এই ওয়াজকে অবলম্বন করে গ্রামে-গঞ্জে আরও ওয়াজ হবে একই বক্তব্য বলা হবে–যা নারীশিক্ষাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করা জরুরি।

মানবাধিকারকর্মী জাহিদ হোসেন বলেন,মেয়ের বাবা হিসেবে এ পরিস্থিতি আমার জন্য আশঙ্কাজনক, উদ্বেগজনক। একইসঙ্গে মনে হচ্ছে এরকম কথা তারা বহুবার বলেছেন কিন্তু আমাদের মেয়েরা এগিয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস মেয়েরা এসব কথা শুনবেন না, মেয়ের বাবারাও শুনবেন না।তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের দিকে যেতে গেলে এধরনের কথা বন্ধ করা দরকার। যদিও আমি মনে করি এধরনের কথা খুব যে টিকে যায় তা নয়, কিন্তু এটা বহাল থাকলে সাংষ্কৃতিক অবক্ষয় ঘটার আশঙ্কা থাকে। যারা শপথ নিয়েছেন তাদের একজনের মেয়েও যদি ক্ষতির শিকার হয় তাহলে সেটিও জাতীয় ক্ষতির একটা অংশ।

তবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্য সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি বলে দাবি করেছেন হেফাজতে ইসলাম চট্টগ্রাম মহানগরের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আ ন ম আহমদ উল্লাহ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘হুজুরের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল,বর্তমান সময়ে নারীদের প্রতি যে সহিংসতা ও নির্যাতন চলছে সেটি আলোকপাত করা। নারীদের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষ,শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।’

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ বলেন, তিনি বড় আলেম,একইসঙ্গে পীরও। তার মুরিদদের উদ্দেশে তিনি কিছু কথা বলেছেন। তার মুরিদদের স্ত্রী, বোন, কন্যার চরিত্র যেন কলুষিত না হয়, সম্ভ্রমহানি না ঘটে তার মুক্তির উপায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি এ আহ্বান জানিয়েছেন।

মুফতি মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ আরও বলেন,আল্লামা শফী তার  বক্তব্যে নারীর শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। নারীর উন্নয়ন না হলে মানব জাতির উন্নয়ন হবে না, সেগুলোও বলেছেন।  গতকালের অনুষ্ঠানে নারীর জীবন ও সম্ভ্রমহানি যেন না ঘটে এজন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। মুফতি মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ’র দাবি, আল্লামা আহমদ শফী নারীর শিক্ষা বন্ধের কথা বলেননি।

এদিকে, চট্টগ্রামের চশমা হিল এলাকায় নিজ বাসায় আজ শনিবার (১২ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সদ্য দায়িত্বভার গ্রহণ করা শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল মন্তব্য করেছেন ‘মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পড়ানো নিয়ে হেফাজত আমিরের বক্তব্য একান্তই তার ব্যক্তিগত অভিমত। রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে তার বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারও ব্যক্তিগত অভিমত নারীর অগ্রযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারবে না।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

/সিএ/ইউআই/টিএন/

x