ঢালচরই কি চরডেমপিয়ার?

শাহেদ শফিক, ঢালচর থেকে ফিরে ২১:২৩ , ফেব্রুয়ারি ১২ , ২০১৯

ঢালচরের কান্না পর্ব ০৫

জলবায়ুর পরিবর্তন আর মেঘনার করাল গ্রাসে সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবছর উদ্বাস্তু হচ্ছেন নদীপারের হাজার হাজার মানুষ। এসব ভাসমান মানুষের বেশিরভাগেরই ঠিকানা এখন মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন চরবেড়িবাঁধ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে। এমনই একটি চরের নাম ঢালচর। তবে এই চরে আশ্রয় নিলেও তাদের জীবনে স্বস্তি নেইঅর্ধশতাব্দী ধরে তাদের লড়াই করতে হচ্ছে দস্যুলুটেরাভূমিখেকোদের সঙ্গে। নোয়াখালী ও ভোলার মাঝামাঝি মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এই চরে নেই প্রশাসনের সরাসরি তদারকি। নামমাত্র পুলিশ ক্যাম্প থাকলেও প্রভাবশালীদের ইচ্ছায় চলে এখানকার আইন-কানুন। চরটি সরেজমিন ঘুরে করা ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ পড়ুন পঞ্চম পর্ব।

ঢালচর

১৯৫০ সালে বাতিল হয় জমিদারি প্রজাস্বত্ব আইন। ক্ষমতা হারান জমিদাররা। তাদের তথাকথিত প্রজারা হয়ে যান ব্রিটিশ সরকারের স্বাধীন নাগরিক। কাউকে জমি দান করা বা জমিদারির অংশ বিশেষ বিক্রি করার ক্ষমতাও এই আইন বাতিল হয়ে যায়। অথচ এই আইন দিয়েই ১৯৫৫ সালে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার জমিদারের কাছ থেকে চরডেমপিয়ার বা ঢালচরের একাংশ কিনে নিয়েছেন বলে দাবি মনপুরার কামাল উদ্দিন চৌধুরীর। তিনি দাবি করেন, তার পিতা আবু আল ফাতাহ চৌধুরী কলকাতা প্রবাসী রাজা রমনী কান্ত রায়ের ছেলে রাজেশ কান্ত রায়ের কাছ থেকে চার বছর মেয়াদি গৌরকাটি ইজারা দলিলে কেনেন। যদিও আদালতে এই দাবির অসারতা প্রমাণ হয়েছে। আর জেলা প্রশাসন বলছে চরডেমপিয়ার বলে আদৌ কোনও চরের অস্তিত্ব নেই। ফলে ঢালচরকে চরডেমপিয়ার বলারও সুযোগ নেই। ফলে চরডেমপিয়ার ওরফে ঢালচর লিখলেই কেউ ঢালচরের জমির মালিকানা দাবি করতে পারে না।  

কামাল চৌধুরীর পরিবারের দাবি, জমিদারের কাছ থেকে জমির দখল পেয়ে ১৯৫৬ সালে ‘ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্ম লিমিটেড’ নামে একটি লিমিটেড কোম্পানি চালু করেন কামাল উদ্দিন চৌধুরী। কোম্পানির ৯০০টি শেয়ারের মধ্যে ৬০০ শেয়ার কামাল উদ্দিন চৌধুরীর, তার চাচাতো ভাই এনায়েতে রাব্বীর ৫০টি এবং সাবেক সচিব নাজিম উদ্দিনের বাবা বসরত উল্যাহর (কামাল উদ্দিনের ভাই) ২৫০টি শেয়ার ছিল। পরবর্তীতে বসরত উল্যাহ’র শেয়ারগুলোসহ আরও ৫০টি শেয়ার নাজিম উদ্দিন নিয়ে নেন। কামাল উদ্দিনের অভিযোগ, তারই ভাতিজা সাবেক সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী তার ফার্মের এক তৃতীয়াংশের মালিক হলেও বর্তমানে তার প্রায় ৮০ শতাংশই দখল করে ভোগ করছেন। এই কোম্পানির মালিকানা সংক্রান্ত একটি মামলা আদালতে দায়েরের পর তা আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ঢালচর এর একটি অংশ

২০০৭ সালে মনপুরা সহকারী জজ আদালতে জমা দেওয়া এক মামলায় সরকার পক্ষের লিখিত জবাবে বলা হয়, মনপুরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওই দলিলগুলোকে ভুয়া বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান সরকার থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা ঢালচরে এই কোম্পানির দখলে থাকা জমিগুলোকে জবরদখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এমন চিত্র বেরিয়ে এসেছে। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চল্লিশ দশকের দিকে মেঘনার বুকে নতুন করে চরটি জেগে ওঠার পর একটি লিমিডেট কোম্পানির নামে ঢালচরের একটি অংশ দাবি করে বসেন মনপুরা উপজেলার কামাল উদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু চরটি জেগে ওঠার পর মালিকানা দ্বন্দ্বে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় মামলা, বৈঠক, জরিপ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তাতে দেখা গেছে, চরটির বিগত ৬৩ বছর বয়সে এর কিঞ্চিত জমির মালিকানার বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে মালিকানা স্বত্বের প্রমাণ দেখাতে পারেনি কেউ। পাশাপাশি এমন কোনও দলিলপত্রও সরকারের কোনও অফিস-আদালতে নেই।

এরপরেও ঢালচরকে চর ডেমপিয়ার আখ্যা দিয়ে তাতে কামাল উদ্দিন চৌধুরীর জমি আছে দাবি করে সেই জমি বুঝে পাওয়ার জন্য ২০০৪ সালে মনপুরা সাব জজ আদালতে একটি মামলা করেন নাজিম উদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু, পরে মামলাগুলো খারিজ হয়। তারপরও কামাল উদ্দিন চৌধুরী ও তার ভাতিজা নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর আত্মীয়-স্বজনরা নামে-বেনামে ৭০০ একর জমি ‘দখল’ করে রেখেছেন।  

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০২ সালে কামাল উদ্দিন চৌধুরীর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাতিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজাউল করিম জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো এক লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, ‘বাকেরগঞ্জ ২য় সাব জজ কোর্টে ১৮৮৫ সালে দায়ের করা ৯০ নম্বর মামলা ও বাকেরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে ১৯১৮ সালে দায়ের করা ৬ নম্বর মামলার রায়ে ‘চর ডেমপিয়ার’, ‘চর বোথাম’, ‘চর হরি কিশোর’ বলতে যা বোঝানো হয়েছে তা পয়স্তি হিসাবে জমিদারদের বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তা দক্ষিণ সাহাবাজপুরে অবস্থিত-যা বাকেরগঞ্জ তথা বরিশাল জেলার অন্তর্গত। বর্ণিত মামলাগুলোর কোথাও চর ডেমপিয়ারকে পরিচিত করানোর জন্য ওরফে ঢালচর উল্লেখ করা হয় নাই। কারণ,তখন ঢালচরের অস্তিত্বই ছিল না। বরং ১৯৪০ এর দশকের দিকে ঢালচর একটি সম্পূর্ণ নতুন চর হিসেবে মেঘনার বুকে নোয়াখালী জেলার সীমারেখার মধ্যে জেগে উঠে। 

ঢালচরে ভূমিহীন কৃষকদের বাড়ি

১৯৬০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বোর্ড অব রেভিনিউর অতিরিক্ত সচিব এন আহমেদ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের পরিচালককে লেখা এক অফিস আদেশে বলেছেন, ঢালচর নোয়াখালী জেলার সীমানায় নতুন জেগে ওঠা একটি চর এবং এটি নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মনপুরা বাকেরগঞ্জ জেলার একটি থানা। তিনি নোয়াখালী ও তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার মধ্যে সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে এই অফিস আদেশ জারি করেন।

একই বছরের ১১ মে পূর্ব পাকিস্তান বোর্ড অব রেভিনিউর সদস্য (বিশেষ) এস বি হ্যাচ বার্নওয়াল এক অফিস আদেশে ঢালচর সম্পর্কে বলেন, এটি নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত একটি নতুন চর। একই অফিস আদেশে নোয়াখালী জেলা কালেক্টরের পক্ষ থেকে ঢালচরে সেটেলমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬০-৬১ সালে ঢালচর ৫১নং তৌজি হিসাবে এক হাজার ১৫৩টি বন্দোবস্ত নথির প্রত্যেক বন্দোবস্তের অনুকূলে দুই দশমিক ৫০ একর জমি জমাবন্দি করা হয়। ৪৪৬ জন বন্দোবস্তকারীর কাছ হতে কবুলিয়াত গ্রহণ করা হয়।

তার এমন আদেশের বিরুদ্ধে জমিদার রাজেশ কান্ত রায় চৌধুরী বরিশালের দ্বিতীয় সাব জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করে এতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দাবি করলে আদালত ১৯৬০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢালচরে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। 

এদিকে ঢালচরকে ‘ঢালচর ওরফে চরডেমপিয়া’ আখ্যা দিয়ে চরটি ভোলার মনপুরা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত দাবি করে একে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে বসেন মনপুরা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন চৌধুরী। একপর্যায়ে তিনি তার ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের পক্ষে রেভিনিউ বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বরিশালের দ্বিতীয় সাব জজ আদালতে একটি মামলা করেন। এ মামলায় আদালত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন।

ঢালচরে সাবেক সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর অট্টালিকা। যদিও তাদের দখলে রাখা জমিগুলোর মালিকানার সুরাহা হয়নি এখনও।

পরে এ মামলা ঢাকার ৫ম সাব জজ আদালতে স্থানান্তর হলে চলতে থাকে। এরই মধ্যে নোয়াখালীর কালেক্টর বিরোধপূর্ণ জমিকে ‘শত্রু সম্পত্তি’ দাবি করে টিএস মামলা (মেন্টেনেবল নং) চলার উপযুক্ত নয় দাবি করে আবেদন করেন এবং মূল মামলা খারিজ করে দেন। পরবর্তীতে ওই আদেশের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আপিল মামলাটির রায়ে ১৯৭৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আদালত আদেশ দেন বিরোধপূর্ণ জমি ‘শত্রু সম্পত্তি’ নয়, তাই টিএস মামলা চলবে। ওই রায়েও নোয়াখালী জেলার কালেক্টরকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মামলাটি ঢাকার তৃতীয় সাব জজ আদালতে চলমান থাকা অবস্থায় ১৯৯৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন চৌধুরী মোকদ্দমা নালিশের সকল কারণ বিলুপ্ত হওয়ায় মোকদ্দমাটি তুলে নেওয়ার আবেদন করেন। পরে ১৯৯৫ সালের ১৬ জুলাই আদালতের বিচারক মো. মাসদার হোসেন মামলাটি উঠিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। মামলা প্রত্যাহারের পর আর জমির মালিকানা থাকে না। 

এরপর ১৯৯৫ সালে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলমান মামলা উঠিয়ে নেওয়ার আগে ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই হঠাৎ করে চরডেমপিয়ারকে ভোলা জেলার অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের অনুকূলে অবমুক্ত ঘোষণা করে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ ঘোষণার বিরুদ্ধে মামলার বিবাদী বোর্ড অব রেভিনিউ ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে প্রতিবাদ জানান। তাদের দাবি, উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা থাকায় মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

ভোলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ৮৯ সালের ৩ আগস্ট ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের অনুকূলে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের জন্য মনপুরার সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) চিঠি দেন। ১৯৯১ সালের ৩ জুন মনপুরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফার্মের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে তফসিল সম্পত্তির পরিচিতি উল্লেখ করে কর পরিশোধের অনুরোধ করেন। সম্পত্তির তফসিলি মৌজা ডেমপিয়া। খতিয়ান নং ৩৩৫, দাগ নং ৬৪৮, ৬৫১ ও খতিয়ান নং ৪৩৫, দাগ নং ৮৭৪-৮৮১, ৯১২, ৯১৩ ও ৯১৪, মোট জমি ৫৬৭ দশমিক ৭৯ একর উল্লেখ করা হয়। 

কামাল উদ্দিন চৌধুরী ১৯৯২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তৌজি নং ৩১১ (ক) খতিয়ান নং ১৬৭-এর বিপরীতে দাগ নং ১৩৭৯-১৩৯৮ পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ৬৮৮ টাকা এবং বসরত উল্যাহ চৌধুরী অন্য একটি দাখিলায় ৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ২৮৫৪৪.৫০ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর জমা দেন। কথিত ১৬৭ নং খতিয়ানটি ৯২ সালে সৃজিত হয়। খতিয়ানে উপজেলা রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মনপুরার সিলে স্বাক্ষর অস্পষ্ট। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা রাজস্ব কর্মকর্তার পরিবর্তে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ সৃজিত হয় ১৯৮৮ সালে। কিন্তু ৯২ সালে সৃজিত ওই খতিয়ানে ৮৫ ইং সালে খাজনা আদায় করা হয় উপজেলা রাজস্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষরে। ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের চিঠিতে খতিয়ান নং ৩৩৫ ও ৪৩৫ রয়েছে। অথচ ফার্মের নামে সৃজিত খতিয়ান নম্বর ১৬৭। 

১৯৯৩ সালের ১৮ মার্চ কামাল উদ্দিন চৌধুরী তার ফার্মের জমি পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মনপুরার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে আবেদন করেন। মাত্র এক দিনের মধ্যে মনপুরা উপজেলা ভূমি অফিস তাকে সরেজমিন ৫৬৭ দশমিক ৭৯ একর জমি বুঝিয়ে দেন। এটি অসম্ভব ব্যাপার বলে হাতিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৫৬ সালে। অথচ ১৯৯৩ সালে কেন জমি বুঝিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে তা নিয়েও সন্দেহ সরকারের কর্মকর্তাদের। 

ঢালচর

১৯০০-০৪ সালে বাকেরগঞ্জ জেলা জরিপে চর ডেমপিয়ারের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। চল্লিশের দশকে চরটি নোয়াখালী জেলার সীমানায় একটি নতুন চর হিসেবে ঢালচর জেগে ওঠে। ফলে এটি ডেমপিয়ার ওরফে ঢালচর কখনোই ছিল না।

২০০২ সালে হাতিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজাউল করিম জেলা প্রশাসকের দফতরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ঢালচর ও চরডেমপিয়ারের স্বত্ব পৃথক না একই তা নির্ধারণ করলেই সকল রহস্য উন্মোচিত হবে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ভোলা-নোয়াখালীর অন্তজেলা সীমানা পিলার স্থাপন করা যেতে পারে। ১৯৯৭ সালের ৯ জুলাই ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক সাফি উদ্দিনের সভাপতিত্বে চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত নোয়াখালী, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও চাঁদপুরের জেলা প্রশাসকদের সভায় ভোলার জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান সরেজমিন সীমানা পিলার স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে ছিলেন।

এতে তিনি উল্লেখ করেন, সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায় ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের নামে কোনও ফার্ম ঢালচরে অতীতে ছিল না, বর্তমানেও নেই। তবে মনপুরার কামাল উদ্দিন চৌধুরী ঢালচরের প্রায় ৭০০ একর কৃষি জমি জবরদখল করে আছেন, যা থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে আয় হয়। এ আয়ের অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং প্রতি বছর বণ্টন করা ডিভিডেন্ড ও শেয়ারহোল্ডারদের তালিকা ও সাধারণ সভার তারিখ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে অনুরোধ করা যেতে পারে। তবে এসবের কিছুই নেই এই ফার্মটির মালিকদের কাছে। 

তিনি উল্লেখ করেন, চরডেমপিয়ারের নামে ঢালচর গ্রাসের প্রক্রিয়া অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির মোড়কে আদালতের স্থিতাবস্থায় প্রায় শেষ করা হয়েছে। ঢালচরে ডেমপিয়ার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের নামে যে ভূমি জবরদখল করা হয়েছে তা থেকে ভূমিগ্রাসীকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে অবিলম্বে ১৯৭০ সালের উচ্ছেদ আইনের অধীনে মামলা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢালচরের ৭ হাজার ৫০০ একর লায়েক পতিত জমির মধ্যে নোয়াখালী বন বিভাগের নলচিরা রেঞ্জ বনায়নকৃত প্রায় দুই হাজার ৫০০ একর বনভূমি রয়েছে। ২০০২ সালের চরচা ম্যাপের আওতায় এক হাজার ৮০০ একর ভূমির মধ্যে এক হাজার ২০০ একর ভূমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম শেষ করে জমির দখলও বন্দোবস্তপ্রাপ্তদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। জবরদখল মুক্ত হলে অবশিষ্ট জমি ৬০-৬১ সালের বন্দোবস্তপ্রাপ্তদের বুঝিয়ে দিয়ে বাকি জমি নতুনভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া যেতে পারে। 

ঢালচর যাওয়ার একমাত্র বাহন নৌকা

২০০৮ সালের ৮ জুলাই নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক আবদুল হক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, মনপুরার কামাল উদ্দিন চৌধুরী ও তাদের পরিবার তথাকথিত জমিদারি প্রজাস্বত্বের দাবি করে চরডেমপিয়ার নামকরণে ধানকাটার মৌসুমে ঢালচরে আধিপত্য বিস্তার করে হাতিয়ার নিরীহ ভূমিহীন পরিবারগুলোকে প্রতারিত করে আসছে। প্রকৃত অর্থে চরডেমপিয়ার বলতে কোনও মৌজার অস্তিত্ব নেই। সর্বশেষ ২০১৭ বছরের শেষের দিকে একই পরিচালকের কাছে পাঠানো হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম আবারও বলেন, ঢালচর কখনও ‘ওরফে’ দ্বারা চিহ্নিত ছিল না। এছাড়া হাতিয়া সীমানায় চরডেমপিয়ার নামে কোনও চরের অস্তিত্ব কোনোকালে ছিল না এবং অদ্যাবধি নেই।

তবে কামাল উদ্দিন চৌধুরী এখনও দাবি করেন, ঢালচর কখনও ঢালচর আবার চরডেমপিয়ার হিসেবে ছিল। ঢালচরই চর ডেমপিয়ার এবং এই চরেই আমাদের জমির অবস্থান।

আগামীকাল পড়ুন: ঢালচর নোয়াখালীর না ভোলার?

ঢালচরের কান্না সিরিজের আগের পর্বগুলো পড়ুন: 

চতুর্থ পর্ব ঢালচরের কৃষকদের ধান যায় ‘লুটেরাদের’ গোলায়

তৃতীয় পর্ব ভূমিহীন উচ্ছেদে ‘সরকারি’ কৌশল!

দ্বিতীয় পর্ব ভূমিহীনের চরে সাবেক সচিবের অট্টালিকা!

প্রথম পর্ব ভূমিহারা মানুষের আশ্রয়ের আকুতি! (ভিডিও)

/টিএন/

x