বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ আগামী বছর

শেখ শাহরিয়ার জামান ২৩:১৬ , মে ২৪ , ২০১৯

শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি ফাইল ছবিভারতের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো জয়ী হয়েছে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ-জোট। তবে, এককভাবে বিজেপি ২৭২টিরও বেশি আসনে জয়ী হয়েছে। যা সরকার গঠন করতে দলটির জন্য যথেষ্ট। ভারতে একটি শক্তিশালী সরকার গঠনকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ভাবছেন কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও পানিবিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সাহসী সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, এমন বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারতের জন্য আগামী একবছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে উভয় দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলেও তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ ও ভারত দর কষাকষি করে যেমন স্থল ও সুমদ্র সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা নিষ্পত্তি করতে পারলেও  পানিবণ্টন-সংক্রান্ত জটিলতা বা সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা বন্ধ হয়নি। বাণিজ্য ক্ষেত্রে অসম অবস্থান কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এখনপর্যন্ত বাংলাদেশি বিভিন্ন পণ্য অশুল্ক বাধার শিকার।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চীনে দায়িত্বপালনকারী বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমেদ বলেন, ‘ভারতে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সেই অর্থে একটি শক্তিশালী সরকার হিসাবে দলটির পক্ষে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হবে।’

প্রসঙ্গত, দুই দেশ অনেক কিছু অর্জন করেছে আবার অনেক বিষয় আছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিলতায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হবে বলেও মনে করেন সাবেক এই কূটনীতিক।

অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান ও নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মুনশি ফায়েজ আহমেদ বলেন, ‘ভারতে হানিমুন পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’

একই মত পোষণ করেন পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের পর প্রথম একবছর সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসক দল অনেকটা নিশ্চিন্তে থাকে। কারণ তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘একবছর পর হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। রাজনৈতিক দল আবার জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে জানতে চায়। এই একবছর সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়।’

ভারতে রাজ্যসভার নির্বাচন কয়েক বছর পরে হবে উল্লেখ করে আইনুন নিশাত বলেন, ‘এরআগে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য জরুরিভাবে কূটনৈতিক প্রয়াস চালানো দরকার।’ তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেছেন। এবার নরেন্দ্র মোদির ঢাকা আসার কথা। এজন্য এখন থেকেই উদ্যোগী হয়ে যত দ্রুত সম্ভব, তাকে বাংলাদেশের আনার ব্যবস্থা করা উচিত।’

বাংলাদেশের পানি সমস্যা নিয়ে ওই বিশেষজ্ঞ বলেন. ‘ভারতের রাজ্য সরকারকে আমলে নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কাজ করে থাকে। বর্তমানে পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হলেও সেখানে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আছেন।’ তিনি বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে দর কষাকষিতে কেন্দ্রীয় সরকার কতটা ঝুঁকি নেবে তার ওপর বিষয়টা নির্ভর করছে।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে।  এর একটি বড় অংশ পশ্চিম বঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। বাংলাদেশের সঙ্গে যেকোনও পানি নিয়ে সমাধান সাধারণত রাজ্য সরকারের সঙ্গে মিলে কেন্দ্রীয় সরকার করে।

দুই দেশের মধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হলেও কয়েকটি বড় সমস্যার সমাধান হয়নি উল্লেখ করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ-উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনও সমস্যা নিয়ে দর কষাকষির আগে বাংলাদেশের উচিত হবে ওই বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা।’

উদাহরণ হিসেবে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত পাটের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। এই ক্ষেত্রে আলোচনায় বসার আগে বাংলাদেশের উচিত হবে, এ বিষয়ে সম্পূর্ণ স্টাডি করা, বাংলাদেশ যেন পরিপূর্ণভাবে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে মন কষাকষি না করে আমাদের বক্তব্য যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করা জরুরি।’

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত যদি আমাদের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তবে আমরা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে শুল্ক আরোপ করলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। কারণ আমরা ওই দেশ থেকে কাঁচামাল বা মূলধনী যন্ত্রপাতি আনি। ফলে আমরা শুল্ক আরোপ করলে আমাদেরই উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য পার্থক্য অনেক বেশি। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ভারত সব শুল্ক প্রত্যাহার করে নিলেও অন্যান্য বাধার কারণে বাংলাদেশের রফতানি সেভাবে বাড়েনি।

উল্লেখ্য, সাত দফায় অনুষ্ঠিত ১৭ তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনা হয় গত ২৩ মে। এদিন নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ফল অনুযায়ী ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৫১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-জোট। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট এগিয়ে রয়েছে  ৯১টি আসনে। এরইমধ্যে পরাজয় স্বীকার করে বিজেপি নেতা মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।

/এমএনএইচ/

x