বাস্তবতা না বুঝে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন: প্রধানমন্ত্রী

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ২৩:৩৪ , জুলাই ১১ , ২০১৯



প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাগ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা প্রকৃত অবস্থা চিন্তা করছেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘৭৫ শতাংশ বাড়ানোর দরকার হলেও ২৩ দশমিক ৮০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। যারা বিরোধিতা করছেন, বাস্তবতা না বুঝেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন।’ বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন গ্যাস ছিল না, তখন গ্যাসের জন্য হাহাকার। আমাদের অনেক ব্যবসায়ী বলেছিলেন, যত দাম লাগে আমরা দেবো, আপনি গ্যাস এনে দিন।আমরা সেটাই করেছি। বিরাট অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দিয়ে আমরা গ্যাস সরবরাহ করছি। বিদ্যুৎও সরবরাহ করছি। জনগণের ওপর চাপ দিচ্ছি না।’

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্যাসের মূল্য নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কেন মূল্যবৃদ্ধির দরকার হলো, তা তুলে ধরতে চাই। আমাদের নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের চাহিদা ছিল ৩৭০০ এমএমসিএফটি কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছিল মাত্রা ২৬০০ এমএমসিএফটি। এই ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এলএনজি আমাদানির সিদ্ধান্ত নেই। এর অংশ হিসেবে ১০০০ এমএমসিএফটি এলএনজি গ্যাস আমদানি শুরু করেছি। আমাদের নিজস্ব যে প্রকৃতিক গ্যাস রয়েছে, তার প্রতিঘনমিটারে উৎপাদন খরচ হয় ৭ দশমিক ৫০ টাকা। সেখানে আমদানি করা এলএনজির খরচ পড়ে ৩৩ দশমিক ৭৫ টাকা। এজন্য প্রতিবছর আমাদের ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমাদের ৭৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। আমাদের প্রতি ঘনমিটারের এলএনজি আমদানির মূল্য পড়ছে ৬১ দশমিক ১২ টাকা। কিন্তু সেখানে আমরা নিচ্ছি ৯ দশমিক ৮০ টাকা। অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৩২ টাকা আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে। ফলে এর জন্য ১৯ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এটাও আবার সব ধরনের ট্যাক্স আর শুল্ক বাদ দিয়ে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্যাসের বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য পেট্রোবাংলা ১০২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি প্রস্তাব করেছিল। কারণ এলএনজি আমাদানি খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তার মূল্যায়নে বলেছে, বর্ধিত ব্যয় নির্বাহে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল। সেখানে আমরা কতটুকু বাড়িয়েছে? গ্রাহকদের আর্থিক চাপ বিবেচনা করে কমিশন মাত্র ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের চাহিদা বিবেচনায় মিনিমাম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গ্যাস ব্যবহারের হিসাব নির্দিষ্ট রাখতে ইবিসি মিটার দেওয়া হবে। এতে বিল পরিশোধ সহজ হবে।’

গত ১০ বছরে সরকার এক হাজার ২৫০ এমএমসিএফটি গ্যাস নতুন করে জাতীয় পাইপলাইনে যুক্ত করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে কোনও উদ্যোগ নেইনি বলে যে কথা বলা হচ্ছে, তা মোটেও ঠিক নয়। আমরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছি। ৪, ৯, ১২ ও ১২ নম্বর ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য পৃথক চুক্তি হয়েছে। ভোলায় নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। সেখানে উত্তোলনও শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্য আমরা এলএনজি আমদানি করছি। আমাদের শিল্পায়ন হচ্ছে। শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। সেই পরিমাণ গ্যাস কিন্তু আমাদের দেশে নেই। আমরা কূপ খনন করছি। গ্যাসের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তা উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশাল সমুদ্রসীমা আমরা অর্জন করছি। সেখানেও গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা যেটা করছি, তা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য। কোনও উন্নয়ন জ্বালানি ছাড়া হয় না। আমরা ৯৩ ভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিচ্ছি। আমরা ২০২৪ সালের মধ্যে ডাবল ডিজিটে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই। এজন্য আমাদের জ্বালানি দরকার। এলএনজি আমদানির কারণে জনজীবনে বাড়তি চাপ যেন না পড়ে, সেজন্য দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রিত করে জাতীয় পাইনলাইনে সরবরাহ করছে। এক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র প্রতি ঘনমিটারে ১২ দশমিক ৬০ টাকা।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যদি আমাদের জ্বালানির মূল্য আর যদি জ্বালালি না থাকে তার মূল্য কত বেশি, তা আমাদের ভাবতে হবে। যদি এনার্জি না থাকে তাহলে জীবনমান কতটুকু উন্নতি হবে, তা ভাবতে হবে। আমাদের খরচটা তো বিবেচনায় নিতে হবে।’

সংসদে রওশন এরশাদের দেওয়া বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতা (রওশন এরশাদ) বললেন, ভারতে গ্যাসের মূল্য নাকি কমানো হয়েছে। এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশের গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের  থেকে অনেক কম। যারা বলেছেন ভারত মূল্য কমিয়েছে সেটা কিন্তু সঠিক নয়।’

এ সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে গ্যাসের মূল্য তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গৃহস্থালীতে বাংলাদেশে ১২.৬০ টাকা, ভারতে ৩০.৩৭ রুপি, শিল্পে বাংলাদেশে ১০.৭০, ভারতে ৪০ থেকে ৪২ রুপি। সিএনজি বাংলাদেশে ৪৩ টাকা, ভারতে ৪৪ রুপি আর বাণিজ্যিক বাংলাদেশে ২৩ টাকা এবং ভারতে ৫৮-৬৫ রুপি। তাহলে ভারত কমালো কী করে? প্রতিটি ক্ষেত্রে তো বেশি আর তাদের রুপিতে তো আরও বেশি।’

কৃষিখাতের সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী  বলেন, ‘কৃষি শ্রমের মূল্য বেড়ে গেছে। এজন্য আমরা যন্ত্রের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। কৃষকদের  কৃষিযন্ত্র কেনায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছি। কৃষকরা যেন ফসল উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করেছি।’  তিনি বলেন, আমরা কৃষির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছি। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। যেখানে-সেখানে শিল্প নয়, এই শিল্পাঞ্চলেই শিল্প করতে হবে।’ চাষ-উপযোগী কৃষিজমি যেন নষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ রেখেই এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

/ইএইচএস/এমএনএইচ/

x