শোক দিবসকে কেন্দ্র করে সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

নুরুজ্জামান লাবু ১৯:৫২ , আগস্ট ১৪ , ২০১৯

শোক দিবসকে সামনে রেখে পুলিশের বাড়তি নজরদারি

ঘটনাবহুল ও শোকের মাস আগস্টকে কেন্দ্রে করে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র, জঙ্গি গোষ্ঠী, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল নাশকতা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, ১৭ আগস্ট সারাদেশে জঙ্গিদের সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কারণে এই মাসকে জঙ্গিরা নাশকতার জন্য বেছে নিতে পারে। সম্প্রতি পুলিশের বিশেষ শাখা- এসবি’র পক্ষ থেকে নাশকতার আশঙ্কার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কাছে। একারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করেছে। বিভিন্ন এলাকায় চলছে ব্লক রেইড। বাড়ানো হয়েছে তল্লাশি চেক পোস্ট। চলছে অধিকতর গোয়েন্দ নজরদারি। রাজধানী ঢাকার বাইরেও সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বুধবার (১৪ আগস্ট) বলেছেন, শোক দিবস ও শোকের মাসকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরজুড়ে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি ‘শোকের মাস আগস্টকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র, জঙ্গি গোষ্ঠী, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক সহিংস কর্মকাণ্ড ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন’ শিরোনামে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে ডিএমপি কমিশনারের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের মধ্যে পাঁচ জনের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু এখনও পলাতক খুনিদের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে  আওয়ামী লীগের জনসভায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এছাড়া, বর্তমানে জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিগত চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ওই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে জঙ্গিবাদের ভয়াবহ উত্থান ঘটে। ২০০৫ সালের আগস্ট মাসের ১৭ তারিখে সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে জেএমবি নামক জঙ্গি সংগঠন তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে। নবম জাতীয় সংসদ থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় লাভ করায় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি তাদের গাত্রদাহের কারণ হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জঙ্গিদের দমন করা সম্ভব হলেও তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি, নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হুজিবি, হিযবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম-এর সদস্যরা ধর্মান্ধতা ও ধর্মের অপব্যাখ্যায় পথভ্রষ্ট হয়ে পুনরায় নিজেদেরকে সংগঠিত করার এবং সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে ‘লোন উলফ’ অ্যাটাকের জন্য তারা সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস সিরিয়ায় সর্বশেষ অবস্থান হারানোর পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রশিক্ষিত সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস -এর মদতে দেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠীর পলাতক সদস্য ঘটনাবহুল আগস্ট মাসকে টার্গেট করে তাদের শক্তিমত্তা জানান দিতে যেকোনও ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে।

এছাড়া, প্রতিবেদনে বন্যা, ডেঙ্গু ও পদ্মা সেতুতে শিশুদের মাথা লাগবে ইত্যাদি গুজব ছড়িয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে বলেও সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অংশে বলা হয়েছে, ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদৎবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে এবং সরকারিভাবে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু হয়েছে। বিগত সময়ে আগস্ট মাসে সংঘটিত ঘটনাবলী বিবেচনায় এমাসের সব অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাসহ দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় জঙ্গিরা দেশের অভ্যন্তরে যে ধরনের প্রভাব বিস্তার ও বিদেশে যে ধরনের প্রচারণা পাবে বলে আশা করেছিল, সেক্ষেত্রে তাদের সফলতা আসেনি। উপরন্তু, যেসব দেশের নাগরিকরা নিহত হয়েছেন, সেই দেশগুলোও বাংলাদেশের সঙ্গে কোনোরূপ বৈরী সম্পর্ক ছাড়াই একযোগে জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করে যাচ্ছে, যা জঙ্গিদের অনুকূল হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত ও কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা কষ্টসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ হবে বলে তাদের মধ্যে হাতাশা কাজ করছে। স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী অপশক্তি বিপন্ন পরিস্থিতির দ্বারপ্রান্তে। এরূপ পরিস্থিতিতে মরণ কামড় দিতে এ আগস্ট মাসে জঙ্গি হামলা, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে  সহিংস কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে কিছু সুপারিশও করা হয়। এগুলো হলো— জাতীয় শোক দিবস, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা দিবস ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবস উপলক্ষে ঢাকা মহানগর এলাকায় আয়োজিত মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি চলাকালে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ঢাকা মহানগর এলাকায় জঙ্গি আস্তানা, মেস, ছাত্রাবাস, হোটেল, বস্তি এবং আবাসিক এলাকায় সন্দেহজনক ভাড়াটিয়াদের বাসায় অনুসন্ধান ও তল্লাশিসহ জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখা। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবন, হজ ক্যাম্প, বিদেশি নাগরিক, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শপিং মল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা ও আবাসস্থল, বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বিমানবন্দর, উপাসনালয়, সিনেমা হল, হোটেল, বিদেশি সংস্থা ও তাদের অর্থে পরিচালিত এনজিও, বার, রেস্টুরেন্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আইন-শৃঙ্খলার কাজে নিযুক্ত সদস্যদেরকে এবং নিরাপত্তার কাজে নিযুক্ত সদস্যদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা প্রদান। ঢাকা মহানগরে অধিক সতর্ক থাকার সুযোগে যাতে দেশের অন্যান্য মহানগর, জেলা ও উপজেলায় হামলা না করতে পারে, সেজন্য অন্যান্য এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা প্রদান। ঢাকা মহানগর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহজনক যানবাহন ও সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের অনগার্ড পজিশনে তল্লাশি করা। ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর (কেপিআই) নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। গুলশান বনানী এবং বারিধারা ও দেশের যে সব স্থানে কূটনীতিকদের দফতর ও আবাসিক এলাকা রয়েছে, সে সব স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সরকারের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত অসংখ্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, কারিগর, শ্রমিকদের নিরাপত্তা জোরদার করা। একইসঙ্গে অগ্রিম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত নজরদারি বৃদ্ধি করা।

ডিএমপি ও পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা গত কয়েকদিন ধরেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড পরিচালনা করে আসছেন। এছাড়া, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর ইন্টারনাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও নজর রাখা হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, থ্রেট যে একেবারেই নেই তা নয়। ছোটখাটো থ্রেট রয়েছে। জঙ্গিরা আগস্ট মাসে হামলা করে নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দেবার চেষ্টা করছে। এছাড়া, সরকারবিরোধী চক্রও রয়েছে। আমরা থ্রেট অ্যানালাইসিস করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। ওই কর্মকর্তা বলেন, কয়েকদিন আগে বিমানবন্দর এলাকায় হামলার একটা থ্রেট ছিল। একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা থ্রেটের বিষয়টি জানিয়েছিল। আমরা কড়া নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা জোরদার করায়  দুষ্কৃতিকারীরা কিছু করতে পারেনি।

/এপিএইচ/

x