আলোচনা-সমালোচনায় মৃণাল হকের ভাস্কর্য

উদিসা ইসলাম ২১:৫২ , মে ৩০ , ২০১৭

 

মৃণাল হকসুপ্রিম কোর্টের সামনে গ্রিক দেবী থেমিসের অনুকরণে ভাস্কর্য স্থাপন করে এই মুহূর্তে সমালোচনার মুখে রয়েছেন ভাস্কর মৃণাল হক। গ্রিক দেবী ছাড়াও রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য রয়েছে তার। তিনি নানা জায়গায় গিয়ে নিজ উদ্যোগে ভাস্কর্য তৈরির কাজ করেছেন। প্রায় সময়ই তিনি বলে থাকেন, ‘নিজ খরচেই ভাস্কর্য তৈরি করি।’
যদিও তার কাজের শিল্পমান নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকরা বলে থাকেন, ভাস্কর্য নির্মাণে তিনি মনোযোগী নন এবং তার কাজে কিছু অবাস্তব দিক থেকে যায়, অসাবধানতার কারণেই। বিনা পয়সায় ভাস্কর্য তৈরি করে দিলেই শিল্পমানহীন ভাস্কর্য উপস্থাপন ঠিক কিনা, সে প্রশ্ন উত্থাপনও জরুরি বলে মনে করছেন সমালোচকরা। তবে রূচিশীল শিল্পোত্তীর্ণ ভাস্কর্য থাকাটাও জরুরি বলে মত দেন তারা।

নতুন করে এসব কথা ওঠে গত কয়েক মাস ধরে সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরানোর বিষয়টি সামনে আসায়। সর্বশেষ গত ১১ এপ্রিল হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে একদল ওলামা গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্যটি সরাতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

ভাস্কর্যটি সরানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে এর নান্দনিক ত্রুটির পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ঈদগাহের অবস্থানের কথা বলেন শেখ হাসিনা। গ্রিক দেবীকে শাড়ি পরানো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এই ভাস্কর্যটি ছাড়াও রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ‘রত্নদ্বীপ’, হোটেল শেরাটনের সামনে ‘রাজসিক’, পরীবাগ মোড়ে ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’, ইস্কাটনে ‘কোতোয়াল’, সাতরাস্তায় ‘ময়ূর’, মতিঝিলের ‘বক’, এয়ারপোর্ট গোল চত্বরের ভাস্কর্য, নৌ সদর দফতরের সামনে ‘অতলান্তিকে বসতি’, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের ভাস্কর্য, বঙ্গবাজারে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন শিল্পকর্মের নির্মাতা তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্কও ঘিরে আছে তার শিল্পকর্ম নিয়ে।

রাজসিক (ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত)শিল্প সমালোচকরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ‘রত্নদ্বীপ’ নামে ২০০৮ সালে নির্মিত মৃণাল হকের যে ভাস্কর্যটি রয়েছে তাতে যে ঝিনুকটি দেখা যায়, তা আমাদের দেশীয় কোনও প্রজাতির ঝিনুক নয়।

রাজধানীতে রূপসী বাংলা হোটেলের (শেরাটন) সামনে স্থাপিত মৃণাল হকের আরেকটি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যের নাম ‘রাজসিক’। এ ভাস্কর্যটিতে দু’টি ঘোড়া একটা গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কোচোয়ান বসে আছেন সামনে, গাড়ির পেছনে একজন প্রহরী। আর গাড়িতে আছেন নবাব সলিমুল্লাহ, যিনি সপরিবারে নগরীর হালচাল দেখতে বের হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভেতরে যে নবাব বসে আছেন, সেটি মোটেও দৃশ্যমান নয়।

পরীবাগ মোড়ে হাতের বামে নজরে পড়বে খুব সম্প্রতি একুশ নিয়ে মৃণালের স্থাপিত ভাস্কর্য ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’ । এতে দেখা যায়, মায়ের কোলে শহীদ সন্তান। কিন্তু মায়ের মুখের অভিব্যক্তিতে কান্না নাকি ক্ষোভ জমে আছে, তা বোঝা যায় না। বরং মনোযোগ না দিয়ে দেখলে হুট করে মনে হতে পারে শহীদমাতার মুখে এক চিলতে হাসি।

তেজগাঁও সাত রাস্তার মোড়ে ছিল মৃণালের ময়ূরের ভাস্কর্য। লোহা-লক্করের তৈরি। ওই ভাস্কর্যে ময়ূরী নয়, পেখম তোলা ময়ূরকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বর্ষারানী’। এ নিয়ে নাগরিকরা মুখ টিপে হেসেছেন। যদিও ফ্লাইওভারের কাজের জন্য বর্তমানে তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জননী ও গর্বিত বর্ণমালা (ছবি- অনলাইন থেকে সংগ্রহীত)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন মনে করেন, ঢাকার ৯০ শতাংশ ভাস্কর্য কুরুচিপূর্ণ। শহরে ভাস্কর্য থাকতে হবে উল্লেখ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিল্পের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে এই ভাস্কর্যগুলো সরিয়ে নেওয়া উচিত। ভাস্কর্য যারা বোঝেন তাদের পরামর্শ নিয়ে যথাযথ ভাস্কর্য স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। চলতি পথে, সড়ক দ্বীপে চাইলাম আর কিছু একটা বানিয়ে ফেললাম, এতে শহরের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার সিদ্ধান্ত নেবে ঠিকই, কিন্তু সেটা অবশ্যই হতে হবে শিল্পের বিচারে। সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে যেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার তীব্র প্রতিবাদ করি।আবার কে কিভাবে এই ভাস্কর্যটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে তাও আমাদের জানা নেই।’

কলামিস্ট ও সুশীল শ্রেণীর প্রতিনিধি সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রায়ই রাজধানীর ভাস্কর্যগুলো নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘ভাস্কর্য বসিয়ে আবার উঠিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? আর এর জন্য মৃণাল হককে একা দোষারোপই বা কেন করা হবে? ভাস্কর্য বেশিরভাগই দেখতে ভালো না। কিন্তু যারা এসব ভাস্কর্যের পেছনে কর্তৃপক্ষ হিসেবে আছেন, তারা কি সঠিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেন না?’

রাজধানীজুড়ে বেশ কিছু ভাস্কর্যের কোনও অর্থ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন আমাদের ভাষা, চেতনা, ঐতিহ্য, ইতিহাসের প্রশ্ন; তখন অবশ্যই সেই সম্পর্কিত ব্যক্তিদের গবেষণালব্ধ একটা ফলাফল ভাস্কর্যের মধ্যদিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে হাজির করা উচিত। তা না হলে এমন অনেক জিনিস তৈরি হয়ে যাবে, যেগুলোতে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের কোনও যোগসূত্র খুঁজে পাবে না।’

সমালোচনা বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ভাস্কর মৃণাল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমিতো এদেশের মানুষকে ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। অনেকে আমাকে দেখতে পারেন না। কিন্তু বিনা পয়সায় কাজ করার এই প্রতিদান? আমি নিজ খরচে অনেক ভাস্কর্য করে দিয়েছি, যাতে মানুষ ভাস্কর্য বিষয়টা বুঝতে শেখে।’

এর আগে বিমানবন্দরে মৃণাল হকের তৈরি লালনের ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বারবার তার তৈরি করা ভাস্কর্য নিয়ে এ ধরনের সমস্যার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারাই ভালো বলতে পারবেন। আমি কাজ করে চলেছি- এটাই সত্য।’

মৃণাল হক ১৯৯৫ সালে আমেরিকাতে পাড়ি জমান এবং সেখানে প্রথম ভাস্কর্যের কাজ শুরু করেন। ২০০২ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দেশে ফিরে নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করেন মতিঝিলের ‘বক’ ভাস্কর্যটি। ২০০৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নির্মিত গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার তারই শিল্পকর্ম।

/এসএমএ/ এপিএইচ/টিএন/

 

x