Vision  ad on bangla Tribune

জঙ্গি সংগঠনের বোমা বিশেষজ্ঞরা ‘স্কলার’!

আমানুর রহমান রনি ২০:২৪ , জুন ১৯ , ২০১৭

জেএমবি সদস্য মেরিন ইঞ্জিনিয়ার তামিম দ্বারী (মাঝখানে)দেশের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারীরা জঙ্গি সংগঠনের বোমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নাম লেখাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এই উচ্চশিক্ষিত জঙ্গিদের হাত ধরেই অল্পশিক্ষিত জঙ্গিরা বোমাবিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জিহাদের অপব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিরা এসব যুবককে তাদের দলে ভিড়িয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এসব যুবকের মধ্যে অধিকাংশকেই গ্রেফতার করা গেছে নাশকতার অনেক আগেই। আর এর মাধ্যমে তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।

গত ২০ মার্চ বুয়েট থেকে পাস করা দুই প্রকৌশলী অলিউজ্জামান ওরফে অলি ও আনোয়ারুল আলমসহ ৫ জনকে রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত অলি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করতো। ২০১২ সালে সে বুয়েট থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি নেয়। আর আনোয়ার পড়াশোনা করেছে বুয়েটের ক্যামিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে রাজধানীর উপকণ্ঠ দোহার ও মিরপুর থেকে আরও দশ জনকে গ্রেফতার কর হয়।

গত ২৬ এপ্রিল র‌্যাব-১০-এর একটি আভিযানিক দল রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে মুশফিকুর রহমান ওরফে মুশফিক মার্টিন ওরফে জেনি (৩০) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে। র‌্যাব জানিয়েছে, জেনি আইইডির (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। র‌্যাব জানায়, তার কাছে বিপুল পরিমাণ দূর নিয়ন্ত্রিত আইইডি এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। জেনি ২০০৫ সালে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হলেও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে আর ডিগ্রি শেষ করতে পারেনি। তবে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তার ছাত্রত্ব ছিল।

এদিকে, গত ২৮ এপ্রিল রাতে সাভারের রাজপুলবাড়িয়া এলাকার একটি বাস থেকে নব্য জেএমবির তিনজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতারকৃতরা হলো, ইসলাম ধর্মান্তরিত তামিম দ্বারী ওরফে আব্দুল্লাহ আল হাসান ওরফে আজিজুর রহমান ওরফে আব্দুল্লাহ আল জাফরি ওরফে আমীর হামযা ওরফে আল হুযাইফা ওরফে শ্রী গৌরাঙ্গ কুমার মণ্ডল, কামরুল হাসান ওরফে কাজল ওরফে নূরউদ্দিন ও মোস্তফা মজুমদার ওরফে শিহাব ওরফে হামজা। এরা নব্য জেএমবি’র নিহত সারোয়ার -তামিম গ্রুপের সদস্য।

র‌্যাব জানায়, তামিম দ্বারী জেএমবির অন্যতম নেতা তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ছিল। সে ধর্মান্তরিত মুসলিম ২০০৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। ২০০৫ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তামিম দ্বারী। এরপর মেরিন একাডেমি থেকে পাস করে ২০১০-২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ‘বাংলার কাকলী’সহ বিভিন্ন জাহাজে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করে। সমুদ্রপথে বিস্ফোরকে এনে নাশকতা পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

বোমা বিশেষজ্ঞ বুয়েট শিক্ষার্থী জেনির‌্যাবের তথ্যানুযায়ী, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ৮৬সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ৬ জন। এছাড়া জেএমবি সদস্য ৬৪ জন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৪ জন, হুজির ১৪ জন, হিযবুত তাহরীর ৩ জন, শহীদ হামজা বিগ্রেডের ১ জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
র‌্যাব-১০-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গিরা প্রথমে টার্গেট করে বন্ধুত্ব করে। আমরা যে বুয়েট শিক্ষার্থী জেনিকে গ্রেফতার করেছি, তার সঙ্গে প্রথমে সালমান, অলি নামে কয়েকজন জঙ্গির বন্ধুত্ব হয়। এরপর জেনি আইইডি তৈরিতে পারদর্শী ছিল। বন্ধুত্ব করে জেনিকে অলি কনভিন্স করে। জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে। জেনিকে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে তারা ডিভাইস তৈরির কৌশল এঁকে নিয়ে যায়। আমরা ওই নকশায় জেনির হাতের লেখা পেয়েছি। এভাবে অন্য জঙ্গিরাও বোমা তৈরি শিখছে।’

এরআগে, ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর জঙ্গি হামলার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জঙ্গিবিরোধী ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মিডিয়া শাখার প্রধান মোরশেদ আলমকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মোরশেদ ২০১১ সালে ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সাইন্সে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হয়। ওই বছরের ১১ নভেম্বর মিডিয়া শাখার অন্য সদস্য সিভিলি  ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ ওয়াদুদ জুম্মান ওরফে সাফুলকে। এরা সবাই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ছিল।

র‌্যাব ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গিদের একজন কোনও কিছুতে পারদর্শী হলে তারা সেই কর্যক্রম অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়, যেন অন্য জঙ্গিরাও বোমা, গ্রেনেড তৈরি করে নাশকতা করতে পারে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বোমা বিশেষজ্ঞ বড় মিজানকে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। পুলিশকে সে জানায়, বোমা বিশেষজ্ঞ সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজানসহ কয়েকজন আইইডি তৈরিতে পারদর্শী। তারা বেশ কয়েকজনকে এই প্রশিক্ষণ দিয়েছে। 

নিরাপত্ত বিশ্লেষক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, ‘জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির কৌশল ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া আছে। সেখান থেকে তারা শিখছে। এছাড়া যারা মেধাবি, তাদের টার্গেট করে দলে বেড়ানোর চেষ্টা করছে জঙ্গিরা। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

/এমএনএইচ/

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x