যে কারণে নতুন করে গ্রেফতার অভিযান

পাভেল হায়দার চৌধুরী ১৩:৩৯ , অক্টোবর ১২ , ২০১৭

 

জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলবিএনপি-জামায়াতের যৌথ আন্দোলনের পরিকল্পনা নস্যাৎ করা ও দল দুইটি সব স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতিসঞ্চার করতে গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছে সরকার। এই অভিযান থেমে থেমে অব্যাহত থাকবে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন সরকারের এমন পরিকল্পনার কথা। এ গ্রেফতার অভিযানকে পুলিশের চলমান কাজের অংশ বলেও দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন দলের কোনও কোনও নেতা।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা আরও জানান, বিএনপি-জামায়াতের গ্রেফতার হওয়া নেতারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ওয়াচে’ ছিল। ফলে গ্রেফতার নেতাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীও জানান, সম্প্রতি বিএনপি-জামায়াতের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের গতিবিধি কড়া নজরদারিতে রেখেছে সরকার।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া জামায়াত নেতাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যেও তা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত গত সাড়ে আট বছর ধরে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, এটা বারবার প্রমাণ হয়েছে। তাই চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে দেশের জনগণকে নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এরই অংশ হিসেবে গ্রেফতার অভিযান। এটা অব্যাহত থাকবে, নিশ্চয়ই থাকবে।’

ফারুক খান আরও বলেন, ‘এর আগে আমরা দেখেছি, বিএনপি-জামায়াত এক হয়ে কোনও না কোনও চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকেই। তাই গ্রেফতার অভিযানও অব্যাহত রাখতে হয়। এটা তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান অভিযানেরই অংশ।’

জামায়াত নেতাদের দিয়ে গ্রেফতার অভিযান শুরুর অন্য আরেকটি কারণের কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধারকরা। তা হলো— চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র নিয়ে এই মুহূর্তে বেশি ব্যস্ত জামায়াত। আর সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে বিএনপিকে মাঠে নামিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি। জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এই তৎপরতা থামিয়ে দিতে চায় সরকার।

জানা গেছে, নির্বাচন পর্যন্ত সরকার দেশে কোনও অস্থিরতা চায় না। তাই অস্থিরতা তৈরির যেকোনও চেষ্টা অঙ্কুরেই নির্মূল করতে সম্ভাব্য সবকিছুই করবে সরকার। সে ক্ষেত্রে আগের মতোই জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির আন্দোলন দুইভাবে মোকাবিলা করা হবে— রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবে আওয়ামী লীগ, প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলা করবে সরকার।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন কারণে কমবেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছে সরকার। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেশি বৈরী অবস্থা তৈরি করতে পারে। তাই অস্থিরতা তৈরি করে ফায়দা হাসিল করার যেকোনও প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখানো হবে। তবে অন্য সূত্রগুলো জানায়, রাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি-প্রতিবাদে সরকার ও আওয়ামী লীগ সহনশীলতা দেখাবে।

গ্রেফতার অভিযান নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ বছরের ডিসেম্বর থেকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত দশম সংসদ নির্বাচনের আগের সময়ের মতো মাঠে নেমে ধ্বংসাত্মক তৎপরতার ছক কষছে বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। তাই তাদের ষড়যন্ত্র অঙ্কুরেই নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে সংলাপে বসার পরে বিএনপি ইসিতে দেওয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে মাঠ গরম করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর শুরুর জন্য তারা বেছে নিয়ে ডিসেম্বর মাসকে। তাছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অর্থ আত্মসাতের মামলার রায়কে ঘিরে বিএনপি মরণ কামড় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিএনপি আবার তারা দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে— এমন আশঙ্কা দেখছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এসব মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি হিসেবেই গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, বিএনপি এবারও নির্বাচন বয়কটের পথেই হাঁটছে। নির্বাচন বয়কট করলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে— এই চিন্তা এখন বিএনপিতে নেই। নিবন্ধন বাতিল হলেও রিট করে তা স্থগিত করানোর সুযোগ থাকায় নির্বাচনের বাইরে থাকার চিন্তাও রয়েছে বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, লন্ডন মিশন সফল হলে অর্থাৎ, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বোঝাপড়া এক হয়ে গেলে আন্দোলনের পথই বেছে নেবে বিএনপি। বিএনপির এই আন্দোলনের পরিকল্পনা ঠেকাতে রাজনৈতিকভাবে মাঠ দখল রাখা ছাড়াও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচন বয়কট ও নির্বাচন ঠেকানোর পলিসি নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে বসে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সেই কৌশল নির্ধারণেই ব্যস্ত। শেষ পর্যন্ত দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যাবে— এমনটাই ভাবছে তারা।’ নির্বাচনের এক বছর আগ থেকেই মাঠে নেমে বিএনপি ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করবে বলেও মনে করেন তিনি।

সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আছে, বিএনপি তাদের কৌশল বদলেছে। তারা এখন মাঠ দখলের চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে ডিসেম্বর মাস থেকে মাঠে নামা শুরু করবে। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন জোরালো করবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবউনকে বলেন, ‘আমার জানামতে এ গ্রেফতার অভিযানের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।’ সেই সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাইলে এই নেতা বলেন, ‘জামায়াতের গ্রেফতার হওয়া নেতারা আবারও সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের ছক কষছেন বলে জানি।’

সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বলে আমরা জেনেছি।’ এর সঙ্গে রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন: 

জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ ৯ জন আটক

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x