যারা ফেরেনি

আমানুর রহমান রনি ০১:০২ , ডিসেম্বর ০৮ , ২০১৭

 

এখনও খোঁজ মেলেনি এই ছয় জনের‘হঠাৎ করেই হয়তো ছেলে ফিরে আসবে। এই আশা নিয়ে বাড়ির বাইরে বসে থাকি। অপেক্ষা করি রোজ কিন্তু সেই অপেক্ষার পালা কবে শেষ হবে জানি না।’ সাংবাদিক উৎপল দাসের নিখোঁজ হওয়ার দেড় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার বাবা চিত্তরঞ্জন দাস জানেন না ছেলের কোনও খবর। প্রতিটি দিন আসে আর ভাবেন, আজই মনে হয় সেই প্রতীক্ষার শেষ হবে, হাসি মুখে ফিরে আসবে উৎপল। তবে প্রতিটি দিনই তারা নিরাশ হন।

গত ১০ অক্টোবর সাংবাদিক উৎপল দাস রাজধানীর মতিঝিল থেকে নিখোঁজ হন। এই ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়। এরপর উৎপলের পরিবারের কাছে কয়েকবার ফোন করে বিকাশে টাকা চাওয়া হয়। তবে পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে এটি ছিল প্রতারকদের ফোন। সেই নম্বরের সূত্র ধরেও উৎপলের কোনও খোঁজ মেলেনি। তার ফেসবুক আইডি ও মোবাইল ফোন কখনও কখনও খোলা পাওয়া গেছে। তবে তার হদিস মিলেনি।

উৎপলের বাবা বলেন, ‘আমরা দিন গুনছি বসে বসে, কী করার আছে। ওর (উৎপল) মা সারাদিনই কান্নাকাটি করেন। যার ছেলে নিখোঁজ, সে-ই জানে কী ঘটে যাচ্ছে তার জীবনে। এই কষ্ট আমি বুঝাতে পারবো না। আমাদের ঘুম নেই, খাওয়া নেই। একটা কিছু অন্তত জানতে পারলে মনটাকে বোঝ দিতে পারতাম। কিছুই জানি না। এখন আর আমাদের কেউ খোঁজও নেয় না। কান্নাই আমাদের স্বান্তনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ, র‌্যাব কেউ একটা ফোন দেয় না। আশা বা স্বান্তনার কথাও যদি বলতো কেউ, তাও বলে না। এতো আন্দোলন হলো, প্রতিবাদ হলো! তাতেও কারও টনক নড়ে না।’  

উৎপলসহ গত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে ‘নিখোঁজ’ হন ১৪ জন। এদের মধ্যে আট জন ফিরেছেন। বাকি ছয় জনের এখনও সন্ধান মেলেনি। উৎপলের বাবার মতো অন্য নিখোঁজ পাঁচ ব্যক্তির  বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন ও স্বজনরা এভাবে তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন। অসহায় স্বজনরা বলছে, অপেক্ষা ছাড়া তাদের কিছুই করার নেই। কারণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিখোঁজদের বিষয়ে কিছুই জানাতে পারছে না।

মানবাধিকারকর্মী ‍নূর খান একটি নিখোঁজের ঘটনার সঙ্গে আরেকটি নিখোঁজের মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেয়াল করলে দেখা যাবে, একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনার মিল রয়েছে। এই নিখোঁজ কাম্য নয়। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত; তা না হলে এরা রাষ্ট্র গ্রাস করে ফেলবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে এই নিখোঁজের ঘটনা বাড়ছেই।’ তিনি কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, রাজধানীর ৩০০ ফিট থেকে এর আগেও অপহরণ হয়েছে। গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থেকে মেয়েকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তার গাড়িটিও সেখানে পাওয়া যায়।

নিখোঁজ মারুফ জামান সর্বশেষ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি কাতারের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবেও কাজ করেছেন। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মারুফ জামানের ব্যক্তিগত গাড়িটি খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফিট সড়ক থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।

মারুফ জামান নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাসায় গিয়ে তিন জন সুঠামদেহী ব্যক্তি তার কম্পিউটার ও ল্যাপটপ নিয়ে যায়। এসময় তারা বাসায় তল্লাশিও চালায়। মারুফ জামান নিখোঁজ হওয়ার পরপরই ওই তিন ব্যক্তি তার বাসায় যান। এমনটিই দাবি করা হয়েছে নিখোঁজ সাবেক রাষ্ট্রদূতের পরিবারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

মারুফ জামানের বড় বোন শাহরিনা কামাল ও ছোট ভাই রিফাত জামান গণমাধ্যমে পাঠানো ওই যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে দ্রুত তাকে ফের দেওয়ার অনুরোধ জানান।

এর আগে গত ৭ নভেম্বর নিখোঁজ হন নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোবশ্বার হাসান সিজার। ওইদিন বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগারগাঁওয়ে আইডিবি ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের একটি মিটিংয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে বের হওয়ার পরপরই তিনি নিখোঁজ হন। ওই দিন সর্বশেষ ৬টা ৪১ মিনিটেও আগারগাঁও এলাকাতেই ছিল তার অবস্থান। একমাসেও তার সন্ধান মিলেনি।

সিজারের পরিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাষ্ট্রপ্রধানের মাধ্যমে তাকে ফেরত পাওয়ার আবেদন জানিয়েছে। তার বাবা মোতাহের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা কোনও ফোন পাইনি। কোনও মুক্তিপণের বিষয়ও আসেনি। শুধু প্রার্থনা করছি। এক মাস হয়ে গেলো এখনও কোনও খোঁজ পেলাম না। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আল্লাহ আল্লহ করছি। আমাদের কান্না কোথাও না কোথাও পৌঁছাবে।’

নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনায় যথাযথ তদন্ত হলে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না বলেও মনে করেন নূর খান। তিনি বলেন, ‘ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে কোনও একটি সংস্থা, কোনও কিছু নিয়ে তদন্ত করছে। কারণ, অপহৃত ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ডকুমেন্টের দিকে তাদের নজর। এটিতে তাই মনে হচ্ছে।’

২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ। অপহরণকারীরা কারণ ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন নিয়েছে আর গাড়িটি রেখে গেছে। তারও কোনও খোঁজ মেলেনি সাড়ে তিন মাসে। কোথায় আছে কিভাবে আছে তা কেউ জানেন না। সাদাতের স্ত্রী লুনা সাদাত আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অফিসে যাওয়ার সময় সে অপহৃত হয়। এসময় তার গাড়িতে একটি ল্যাপটপ এবং দুটি মোবাইল ফোন ছিল। ঘটনার পর আমাদের কাছে কেউ কোনও চাঁদা বা মুক্তিপণও চায়নি।’

তিনি বলেন, ‘সাদাত অপহৃত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দুটি অ্যাপস (হোয়াটস আপস, ভাইবার) দুদিন দীর্ঘ বিরতিতে খোলা ছিল। প্রথম খোলা পাওয়া যায় গত ২৪ আগস্ট এবং দ্বিতীয়বার খোলা পাওয়া যায় ১১ সেপ্টেম্বর। এই সাড়ে তিন মাসে আর খোলা পাওয়া যায়নি।’

২৫ আগস্ট ধানমন্ডির স্টার কাবারের সামনে থেকে নিখোঁজ হন কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ইশরাক আহমেদ (২০)। তিনি ঢাকায় ছুটিতে এসেছিলেন। এ নিখোঁজ ছাত্রের বাবা তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন আহমেদ ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। ইশারকের নিখোঁজের বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখনও কোনও তথ্য পাইনি। আমারা চেষ্টা করছি, অগ্রগতি হলে জানাবো।’

ইশরাকের একদিন পর কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম. এম আমিনুর রহমান নিখোঁজ হন। গত ২৭ আগস্ট রাত ১০টার দিকে নয়াপল্টন থেকে সাভারের আমিনবাজারে পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের পাশে বাসার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করেনি।

অপহরণের পর কোনও অপহৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্রের প্রতি অপহরণকারীদের আগ্রহ সন্দেহজনক বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত অপহৃত হওয়ার পর তার বাসা থেকে কম্পিউটার নেওয়া হলো। কিন্তু সন্ত্রাসীরা শুধু কম্পিউটার নেবে না। তারা টাকা-পয়সাও নেবে অথবা দাবি করবে।’

গত চার মাসে যে আট জন ফিরে এসেছেন তারা হলেন ব্যাংক এশিয়ার এভিপি শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অসিত ঘোষ অসিত, বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার অনিরুদ্ধ কুমার রায়, দক্ষিণ বনশ্রীর নকিয়া-সিমেন্সের সাবেক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ, অ্যাভেনটিস-স্যানোফির ফার্মাসিস্ট জামাল রহমান, শাজাহানপুরের ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন ও গুলশানের প্রকাশক তানভীর ইয়াসিন করিম।

 

/এএম/

x