যৌন হয়রানি ও পাচারের ঝুঁকিতে রোহিঙ্গা শিশুরা

উদিসা ইসলাম ২০:৫৭ , জানুয়ারি ১৩ , ২০১৮

রোহিঙ্গা শিশুরাডিপথেরিয়ার মতো মহামারির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি নতুন করে যৌন হয়রানি ও পাচার হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা শিশুদের মাঝে। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) প্রতিবেদন বলছে, কেবল রোহিঙ্গা শিশু নয়, আশ্রয়দাতা দেশের শিশু-কিশোরদেরও বড় অংশ যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার শঙ্কায় আছে। কক্সবাজার উখিয়া এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা বলছেন, শুনেছি, এ রকম  ঘটনা ঘটছে। দীর্ঘদিন দুর্যোগ মোকাবিলা ও শরণার্থীদের নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা বলছেন, শরণার্থী শিবিরে যৌন হয়রানি ও পাচারের মতো অপরাধ ঘটার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। তবে, এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

এদিকে, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে শিশুপল্লি বানানোর কথা থাকলেও জমি ঠিক করেও পাচারের আশঙ্কায় তা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা শিশুর নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। হিউম্যানটেরিয়ান সিচ্যুয়েশনাল রিপোর্ট-১৭-তে ইউনিসেফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় অধিবাসীদের শিশু, কিশোররা যৌন হয়রানি, পাচার, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রমের শিকার হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে।

প্রতিবেদন বলছে, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মতে, ২৫ আগস্টের পর আসা ৩ লাখ ৮০ হাজার ৪৮০ শিশুর মানবিক সহায়তা প্রয়াজন। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৫৮ শতাংশই শিশু। আবার এই শিশুদের ৬০ শতাংশই মেয়ে।

মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব বোধ করলে তখন তাদের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিচ্যুতি ঘটে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক মাহবুবা নাসরিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও সময়ই শরণার্থী শিবিরে বা আশ্রয়কেন্দ্রে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া ও পাচারের আশঙ্কার কথা মাথায় রাখতে বলা হয়। যথাযথভাবে আশ্রয় নেওয়াদের তালিকাভুক্ত না করা, সে সময়ের ক্যাম্পকেন্দ্রিক অস্থির জীবনযাপন ও প্রলোভনে পা দেওয়ার কারণে পাচারের শিকার হতে হয়। আর যখন কোনও জায়গায় বিভিন্ন পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সম্মেলন ঘটে। যৌন হয়রানি ঘটলেও বিচার চাওয়ার সুযোগ থাকে না তখন শঙ্কা আরও বাড়ে।’  তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশু সুরক্ষার বিষয়টা সবচে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেসব সংস্থা ক্যাম্পে কাজ করছেন, তারা সেই সুরক্ষার বিষয়টা নিশ্চিত না করতে পারলে কাজের অনুমতি পাবেন না, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার।’ 

এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই মাসের প্রতিবেদন বলছে, গত ২৫ আগস্ট থেকে সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে ভয়াবহ সংক্রামক, চর্মরোগ, বিলুপ্ত ডিপথেরিয়া আক্রমণ করছে। এখনও সবার কাছে ভ্যাকসিন নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কক্সবাজারের টিম লিডার ওয়াহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি নিজেও ডিপথেরিয়ার প্রতিষেধক নিতে বাধ্য হয়েছি। এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকানো না গেলে মানুষের ডিসপ্লেস হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। সেদিক থেকে পাচারের শঙ্কা সবসময়ই থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যৌন হয়রানি ও পাচারের অভিযোগ আমাদের কানে এসেছে। কিন্তু আমরা  দিনের খুবই সীমাবদ্ধ ও নির্ধারিত একটি সময়ে ক্যাম্পে যেতে পারি। এজন্য বিস্তারিত বলতে পারবো না। তবে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা যারা আছেন, তারাও সমান সহিংসতা ও পাচারের শঙ্কার মধ্যে বাস করছেন।’

রোহিঙ্গাশিশুদের নিয়ে শিশুপল্লি বানানোর পরিকল্পনা থাকলেও সেটি না হওয়ার পেছনে এই পাচার হওয়ার শঙ্কাই কাজ করেছে উল্লেখ করেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মাহিদুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‍শুরুতেই যখন দেখা গেছে, আশ্রয় রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশুদের পরিমাণ অনেক বেশি, তখন সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে একটি শিশুপল্লি করার জন্য আলাদা করে জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত জটিলতায় পাচার হওয়ার শঙ্কা থেকে পরে সেটি বাদ দেওয়া হয়।’

জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শরণার্থী শিবিরে গিয়ে বেসরকারি সংস্থা বা গণণমাধ্যমগুলো যখন নাম ক্যাম্পের ঠিকানা দিয়ে বলে দেয়, এই শিশু বাবা-মা হারিয়ে দেশ ত্যাগ করে এসেছে, তখনই এর মাধ্যমে পাচারকারীদের সামনে ক্লু হাজির করা হয়। আমরা সেই দায় এড়াতে পারি না।’ তিনি বলেন, ‘যখন নৌকায় রোহিঙ্গারা বিদেশ যাওয়ার সময় আটক হয়েছে, সেখানে কি কেবল রেহিঙ্গা পাওয়া গেছে? স্থানীয় বাঙালিদেরও পাওয়া গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি যখন তৈরি হবে, তখন সেটি ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরের শিশু বলে কাউকে আলাদা যাবে না।’ বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

/এমএনএইচ/

x