‘দুই দিনের ভাতের ক্ষুধা কি একবেলার খিচুড়িতে যায়?’

আমানুর রহমান রনি ০২:৫২ , মার্চ ১৪ , ২০১৮

 



আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া মিরপুরের বস্তি‘একবেলা পাতলা খিচুড়িতে কি ভাতের ক্ষুধা মরে? তিন বেলার মধ্যে দুপুরে একবেলা খিচুড়ি দেয়। তাও থাবাইয়া নিতে হয়। দুই দিনে ভাত খাইনি। তাই খিচুড়িও আনতে যাই না। আজ মেয়ের বান্ধবীর বাসা থেকে ভাত দিছে, দুই দিন পর তাই খেলাম। আমাদের বস্তিবাসীর খবর নেওয়ার কেউ নেই’— এ কথা বলেন রাজধানীর পল্লবীর বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে ঘরহারা জামালপুরের দিলরুবা বেগম।

তিনি বলেন, ‘শুনছি খিচুড়ি দেয় প্রতিদিন দুপুরে, তাও থাবাথাবি করে আনতে হয়। ঘরবাড়ি পুড়ে সব শেষ। এখন এই থাবাথাবি করে খিচুড়ি আনার শক্তি নাই। তিন বেলা ভাতের ক্ষুধা এই একবেলার খিচুড়িতে কি যাবে? তাই আনি না।’
মঙ্গলবার দুপুরে পোড়া বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, বস্তির পোড়া ঘরের ছাইয়ের উপর কেউ বসে আছে, কেউ ছাই পরিস্কার করেছেন। গত দুই দিন ধরে এক কাপড়েই আছেন তারা। কারো কারো স্বজন বিস্কুট, কেক, রুটি কিনে দিচ্ছেন, তাই তারা খাচ্ছেন। অনেকে পোড়া খুঁটির সঙ্গে কাপড় টানিয়ে তার নিচে অসহায় বসে আছেন।
বরিশাল বাকেরগঞ্জের রাজমিস্ত্রির সহকারী নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় আমার পরিবারের সবাই ঘুমে ছিল। আগুন আগুন বলে চিৎকার শুনে আমাদের ঘুম ভাঙে। স্ত্রী, ছেলে, মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে দরজা খুলি। লাইট জ্বালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু বিদ্যুৎ ছিল না। এরপর বাসা থেকে বরে হয়ে যাই। তখন আগুন অনেক দূরে ছিল। স্ত্রী ও সন্তানদের বস্তির বাইরে রেখে বাসা থেকে জিনিসপত্র বের করার চিন্তা করছিলাম। কিন্তু বস্তির বাইরে যাওয়ার পর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আর ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। ততক্ষণে আগুন আমাদের ঘরে লেগে যায়। সামনেই সব পুড়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে ভাড়ায় থাকতাম। দুই দিনে কোনও কাজকর্ম করতে পারিনি। বাসা থেকে কিছু বের করতে পারিনি। এক কাপড়ে এখনও আছি। পকেটে টাকা নাই; কী খাবো? আমার স্ত্রী যে বাসায় কাজ করতো সেই বাসা থেকে খাবার দিয়েছে তাই খেয়েছি আজ। এখনও কোনও সাহায্য পাইনি।’
মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, আগুনে মোট চারটি বস্তির ঘর পুড়েছে। বস্তি চারটি হলো হারুনাবাদ বস্তি, কবির মোল্লা বস্তি, নাগর আলী মাতব্বর বস্তি ও সাত্তার মোল্লা বস্তি। প্রতিটি বস্তিতে দেড় হাজারের বেশি ঘর ছিল। সব পুড়ে গেছে। বাসিন্দারা স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনের সাতটি ফ্লোরে আশ্রয় নিয়েছেন।
মূলত এখানে কিছু খাস জমিও রয়েছে। তবে তাও প্রভাবশালীরা দখল করে বস্তি থেকে টাকা নেয়। এখানে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা গেছে, তারা এখানে থাকতে পারবেন নাকি তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে?
তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘যারা যেখানে ছিল, সেখানেই তারা থাকতে পারবেন। তাদের কেউ তাড়াবে না। তারা ঘর না তৈরি করা পযন্ত আমার মার্কেটে থাকবে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কোনও তৎপরতা গত দুই দিনে এই বস্তিতে দেখা যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও সহযোগিতা করা হয়নি। তবে জেলা প্রশাসন একটা তালিকা করার কথা থাকলেও সেই তালিকা তৈরি করে দিচ্ছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুসারীরা। এই তালিকার পর তাদের ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে বস্তিবাসী আপদকালীন কোনও সহযোগিতা পায়নি।
রবিবার (১১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টার দিকে ওই বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়।ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করে সোমবার সকাল ৭টা ২২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
বস্তিতে অনেকেই মাটির ভাড়া দিয়ে ঘর তৈরি করে থাকতেন। কেউ কেউ একাধিক ঘর তৈরি করে আবার অন্যের কাছে ভাড়াও দিতেন। তিন থেকে চার হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হতো।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) শাহিদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বরাদ্দ অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবারকেই ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। আমরা তালিকা করেছি। তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেককে চাল দেওয়া হবে।’

/এইচআই /

x