চট্টগ্রামে প্রকৌশলী নিখোঁজ, পুলিশের ধারণা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে

নুরুজ্জামান লাবু ১৮:১৫ , মে ১৬ , ২০১৮

সাদমান সৌমিকচট্টগ্রাম থেকে এক প্রকৌশলী নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার কারণে সে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছেন। জঙ্গিবাদের ভাষায় যাকে ‘হিজরত’ বলা হয়। ঢাকার মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে সদ্য পাস করা এই প্রকৌশলীর নাম সাদমান সৌমিক। এ বছরের ২২ এপ্রিল সে বাসা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি।
নিখোঁজের দুদিন পর তার বাবা আব্দুল আউয়াল বাদী হয়ে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ১২৯১) দায়ের করেছেন। চট্টগ্রামের থানা পুলিশের পাশাপাশি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।
২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর অনেক তরুণ নিখোঁজ হওয়ার খবর আসে, যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছিল। এমনকি গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গিই হামলার ছয় মাস থেকে একবছর আগে স্বেচ্ছায় নিজ নিজ বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। সেসময় অনেক তরুণ দেশ ছেড়ে সিরিয়ায় গিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের হয়ে কথিত জিহাদেও অংশ নিয়েছে। ২০১৫ সালে ইসলামিক স্টেটের হয়ে জিহাদে অংশ নিয়ে আশিকুর রহমান জিলানী নামে এক তরুণ নিহত হয়। সেও এমআইএসটি’র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ছিল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাঝখানে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘর ছাড়ার (হিজরত করার) প্রবণতা আবারও শুরু হয়েছে। সাদমান সৌমিকের মতো সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গি থেকে মাদ্রাসা পড়ুয়া এক কিশোরও সম্প্রতি নিখোঁজ হয়েছে। তার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের জন্য গঠিত পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি।

সিটিটিসি’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সাদমান সৌমিকের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছি। নিখোঁজ হওয়ার আগে তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও আমরা বিশ্লেষণ করে দেখছি। তার র‌্যাডিক্যালাইজড হওয়ার উপাদানগুলো আমরা পেয়েছি। তবে এখনও শতভাগ নিশ্চিত হতে পারিনি।’

সাদমানের স্বজনরা জানান, দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় সাদমান চট্টগ্রামের রেলওয়ে পাবলিক স্কুল, নাসিরাবাদ স্কুল ও চট্টগ্রাম কলেজিয়াট স্কুলে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করে। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকার মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-তে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাদমানের এক স্বজন জানান, বাসা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার আগের দিন রাতে সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাতের খাবার খায়। এরপর স্বাভাবিকভাবেই ঘুমাতে যায়। পরদিন ২৩ এপ্রিল ফজরের নামাজের সময় বাসা থেকে বেড়িয়ে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। ওই স্বজন বলেন, প্রতিদিন ফজরের নামাজের সময় সে তার বাবা-মাকে ডেকে দিতো। কিন্তু ওইদিন সে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা ধারণা করেছিল— হয়তো সে নামাজ পড়তেই গিয়েছে। কিন্তু সকাল পেড়িয়ে দুপুর গড়ালেও সে ফিরে না আসায়, পরিবারের পক্ষ থেকে ডাবল মুরিং থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি দায়ের করা হয়।

সাদমানের বাবা আব্দুল আউয়াল চট্টগ্রাম রেলওয়েতে চাকরি করেন। আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘সাদমান বাসা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে যায়নি। জিডি দায়েরের পর চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে পুলিশের একাধিক টিম বাসায় এসে এসব ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস জব্দ করে নিয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমি এখনও বুঝতে পারছি না, আমার ছেলের আসলে কী হয়েছে? সে স্বেচ্ছায় বাসা ছেড়ে গিয়েছে, নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনও ঘটনা রয়েছে, এখনও জানি না।

আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘সাদমান ছোটবেলা থেকেই নামাজ-কালাম পড়তো। ক্লাস নাইনে থাকতে সে বুখারী শরিফ পড়ে শেষ করেছিল। আমার কাছে কখনও মনে হয়নি যে ধর্মকর্ম নিয়ে কোনও এক্সট্রিম কিছু করছে। সাধারণ মুসলিম পরিবার হিসেবে আমরা এসব স্বাভাবিকই মনে করতাম।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাদমান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মিতালী রোড এলাকার ৭৬/১ পোস্তার পাড়ের একটি বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতো। ঢাকার এমআইএসটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর সে উত্তরার ‘বাংলা মার্ক’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করে। সেখানে ৭-৮ মাস চাকরি করার পর সে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার প্রান্তিক মেরিন সার্ভিসেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়। নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত ছিল।

প্রান্তিক মেরিন সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম সারোয়ার জানান, প্রাণ গ্রুপে যোগদান করার কথা বলে সাদমান তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মমাফিক অব্যাহতি পত্র নিয়ে গেছে। পরে তারা জানতে পারেন, সাদমান নিখোঁজ হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানে সে ৬-৭ মাস চাকরি করেছেন বলে জানান তিনি।

গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘সাদমান খুব শান্ত-শিষ্ট ও ভদ্র ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো। অফিসে তাকে ধর্মকর্ম নিয়ে কখনও এক্সট্রিম কোনও কিছু করতে বা বলতে শুনিনি। ছেলেটা হঠাৎ কেন নিখোঁজ হয়ে গেলো, আমরাও বুঝতে পারছি না।’

সাদমানের সর্বশেষ কর্মস্থল প্রান্তিক মেরিন সার্ভিসের এক সহকর্মী জানান, সাদমান খুব কম কথা বলতো। অন্যরা যেমন অফিসের ফাঁকে কলিগদের সঙ্গে আড্ডা দিতো, কিন্তু তাকে কখনও আড্ডায় শরিক হতে দেখেননি তিনি। দুপুরে খাবারের বিরতিতে বাসায় গিয়ে খাবার খেতো। আর সন্ধ্যা ছয়টায় অফিস টাইম শেষে সোজা বাসায় চলে যেতো। নামাজে যাবার সময় সহকর্মীদের আহ্বান জানালেও কাউকে কখনও জোর করে কিছু বলেনি।

আবারও হিজরতর উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ছে তরুণরা

জঙ্গি প্রতিরোধ কাজের সঙ্গে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি আবারও শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত তরুণদের কেউ কেউ কথিত জিহাদের নামে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ছে বলে তারা খবর পাচ্ছেন। সম্প্রতি রাজশাহী থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের দুই তরুণ ঘর ছেড়ে বান্দরবানে গিয়ে একটি মারকাজে (জঙ্গি আস্তানা) থাকা শুরু করলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ওই দুই তরুণকে রাজশাহীতে পাঠিয়ে তাদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের একজন কর্মকর্তা জানান, ওই দুই তরুণের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে। অনলাইনে জঙ্গিবাদের প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই ঘর ছাড়ার চেষ্টা করছে। এই দুই তরুণও অনলাইনে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘর ছেড়েছিল। তারা অনলাইনে জিহাদের ডাক পেয়েছিল।

গত ২৮ মার্চ টঙ্গির তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসা থেকে ইহসানুল হাসান সাজিদ নামে এক কিশোর নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় তার বাবা লিয়াকত আলী বাদী হয়ে টঙ্গি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর- ১৩৩৭) দায়ের করেছেন। গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার বাসন গ্রামের বাসিন্দা ইহসানুলও জঙ্গিবাদের কারণে ঘর ছাড়তে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হতে পারেননি তারা।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কথিত জিহাদের নামে হিজরতের এই ট্রেন্ড কমবেশি সবসময় ছিল। এখন ভেতরে ভেতরে কিছু প্রবণতা আছে। কৈশরোত্তীর্ণ অনেক তরুণ অ্যাডভেঞ্চার মনে করে ঘর ছাড়ার চেষ্টা করছে। আমরা তথ্য সংগ্রহ করে সাইবার পেট্রোলিং করছি।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই প্রবণতা বন্ধ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। এজন্য অভিভাবক, শিক্ষক, সুশীল সমাজসহ সবাইকে এগিয়ে এসে একটা জনমত তৈরি করতে হবে। আর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনও তরুণ মিসিং হলে পরিবারের লোকজন তাৎক্ষণিক রিপোর্ট করে না। পরে যখন রিপোর্ট করে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।’

(রিপোর্টটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম প্রতিনিধি হুমায়ূন মাসুদ)

/এপিএইচ/

x