নাক ডাকা সমস্যা দূর করবে ঘুম ল্যাব

তাসকিনা ইয়াসমিন ১৭:৪৫ , মে ১৭ , ২০১৮

 


বিএসএমএমইউ-তে ঘুম ল্যাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

ঘুম ল্যাবের মাধ্যমে দূর হবে নাক ডাকার মতো বিরক্তিকর সমস্যা। পাশাপাশি অনিদ্রা থেকে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া রোধ, অনিদ্রার কারণে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতাও দূর করতে সহায়তা করবে এই ল্যাব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে মঙ্গলবার (১৫ মে) এই ল্যাব উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ব্লকে অটোল্যারিংগোলজি হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের ৬২৮ নম্বর রুম থেকে এটি পরিচালিত হবে। এই ল্যাবের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের ইনভেস্টিগেশন করা হবে।

ঘুম ল্যাব প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। এখন থেকেই এটি চালু হচ্ছে। ল্যাবের জিনিসপত্র কেনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া বা নাক ডাকার সুচিকিৎসা ও প্রতিরোধের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে নাক, কান ও গলা বিভাগ কাজ করবে। এ বিষয়ে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।’

এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউ’র অটোল্যারিংগোলজি হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মনজুরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্বে স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগীর সংখ্যা ২২ মিলিয়ন। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষদের তিন থেকে সাত শতাংশ এবং নারীদের ২ দশমিক ৫ শতাংশের নাক ডাকা সমস্যা রয়েছে। ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন, ফাস্টফুড গ্রহণ, ব্যায়াম না করা ইত্যাদি কারণে নাক ডাকা সমস্যা হয়ে থাকে।’

অটোল্যারিংগোলজি হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এএইচএম জহুরুল হক সাচ্চু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক মানুষই নিদ্রাজনিত সমস্যায় ভোগেন। শুধু এর কারণেই অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত হন। ঘুমকে বলা হয় মানুষের মৌলিক অধিকার। ঘুম বলতে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন একটানা গভীর ঘুমকে বোঝায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিদ্রাহীনতার পেছনে নানা কারণ থাকে। এই সমস্যাগুলো কারও জিহ্বায়, কারও মুখ গহ্বরে, কারও ঊর্ধ্ব শ্বাসনালীতে, আবার কারও ব্রেনে থাকে। এই কারণে নিদ্রাহীনতার বাইরেও হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা তৈরি হতে পারে। শুধু ঘুমের সমস্যা থেকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুও হতে পারে। কারণ, ঘুম কম হলে মানুষের কাজে মনোনিবেশের পরিমাণও অনেক কমে যায়।’

অধ্যাপক ডা. মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘নাক ডাকা সমস্যা প্রতিরোধে শাকসবজি বেশি করে খাওয়া এবং ব্যায়ামের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নাক ডাকায় আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সিপাপ ( CPAP ) ব্যবহার করতে পারেন। শিশুরাও টনসিল অ্যাডেনোইডের (Adenoid) কারণে নাক ডাকা সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। নাক ডাকা সমস্যা দূর করতে অনেক সময় সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।’

অধ্যাপক ডা. এএইচএম জহুরুল হক সাচ্চু বলেন, ‘এই ল্যাবরেটরি চালুর মাধ্যমে আমরা বুঝে নিতে পারবো এই রোগের সমস্যার গভীরতা কতটুকু। এই সমস্যাটি কোন জায়গা থেকে উৎপত্তি। সমস্যাটি কি শুধু একটি উৎস থেকে হচ্ছে, নাকি অন্য কোনও স্থান থেকে হচ্ছে। এটির ফলে শুধু মেডিসিন দিলেই কাজ হবে নাকি সার্জারিও লাগবে, এই বিষয়গুলো আমরা দেখবো। এতে রোগ নির্ণয় দ্রুত করা সম্ভব হবে। দেশে ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র দুই ভাগও যদি আমাদের ল্যাবে আসে, তাহলে দেশের একটি বৃহৎ অংশের কর্মঘণ্টা বাড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ল্যাবে রোগীকে ৫-৬ ঘণ্টা পুরোপুরি ঘুমাতে দিয়ে তার পরীক্ষা করা হবে। তার জন্য ল্যাবকে সেভাবেই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রথমত, যাদের স্থূলকায় খর্বাকৃতির ঘাড় রয়েছে, যাদের নাকে কিংবা শ্বাসনালীতে হাড় বড় রয়েছে, জন্মগতভাবে জিহ্বা অস্বাভাবিক, সেই ধরনের রোগীদের আমরা পরীক্ষা করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নামমাত্র মূল্যে এখানে ঘুমের পরীক্ষা করবো। রোগী যেভাবে বাসায় ঘুমায়, সেভাবেই তার ঘুমানোর জন্য ব্যবস্থা করা হবে। নির্ধারিত চিকিৎসক, সেবিকা ও স্টাফ দিয়েই ল্যাবটি পরিচালিত হবে। এরজন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা পরবর্তী স্টাফের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, দুই বছর আগে নাক, কান ও গলা বিভাগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়। দুই বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা ল্যাব প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পায়। যাদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তারা শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগে যোগাযোগ করবেন। সেখান থেকে চিকিৎসকরা বাছাই করে রোগীদের এই ল্যাবে পাঠাবেন। দেশে প্রাইভেট সেক্টরে স্লিপ ল্যাবের কার্যক্রম আগে থেকে চালু হলেও সরকারি পর্যায়ে এটিই প্রথম।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া সার্জারির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রথম জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে এই পদ্ধতি শুরু করি আমরা। ২০০৫ সাল থেকে এটা চালু হয়। এর আগে স্কয়ার হাসপাতাল, অ্যাপোলো হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে এই ঘুম ল্যাব স্থাপন করা হয়। এটি আসলে একটি টেস্ট, এটির মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় করা হবে। দেশের দেড় কোটি লোক নাক ডাকা ও ঘুম সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন। ভালো ঘুম মানে হচ্ছে বেটার লাইফ। ভালো ঘুম ছাড়া মানুষ ভালো থাকে না।’

বিএসএমএমইউ সূত্র জানায়, স্লিপ ল্যাবের কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে অটোল্যারিংগোলজি হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান তরফদার, অধ্যাপক ডা. মো. মনজুরুল আলম, সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াহিদ্দুজ্জামান, কনসালটেন্ট ডা. মো. ইদ্রিস আলীসহ সংশ্লিষ্টরা মূল দায়িত্ব পালন করবেন।

/এআর/ এপিএইচ/চেক-এমওএফ/

x