বিনা বেতনে ১৪ বছর স্কুলশিক্ষকের, এমপিওবঞ্চিত কলেজ শিক্ষক

এস এম আববাস ০৩:৫২ , জুন ১৩ , ২০১৮






এ এস এম নাজমুল আলমের নিয়োগ পরীক্ষার ফল এবং হাসনা হেনার অভিযোগপত্র

শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে চাকরি শুরু করেন এএসএম নাজমুল আলম। তবে এমপিওভুক্তির আগেই তিনি চাকরি হারান। মামলা করে চাকরি ফেরত পেলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে বেতন হয়নি। ফলে ১৪ বছর বিনা বেতনেই চাকরি করছেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
একইভাবে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েও এমপিও সুপারিশ বঞ্চিত হয়েছেন ভোলার চরফ্যাশনের দুলারহাট আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হাসনা হেনা। প্রতিকার চেয়ে মন্ত্রণালয় ও মাউশিতে আবেদন করলেও অধ্যক্ষের অসহযোগিতায় ১০ কর্মদিবসের তদন্ত আটকে রয়েছে ৮ মাসের বেশি সময়।
মাউশির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, নাজমুল আলম এবং হাসনা হেনাই নন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতায় এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন অনেক শিক্ষক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ২২ মার্চ কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হন নাজমুল আলম। ওই বছরের ৫ এপ্রিল তাকে নিয়োগ দেওয়া হলেও ২০০৬ সালে বরখাস্ত করা হয়। চাকরি ফেরত পেতে মামলা করেন। ২০১১ সালের ৭ আগস্ট মামলায় নিজের পক্ষে রায় পান তিনি। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ২০১১ সালের ১১ আগস্ট অতিরিক্ত জজ আদালত সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের রায় বহাল রাখেন।
কিন্তু মামলা নিষ্পত্তির আগেই বাণিজ্য বিষয়ে একাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশ ছিল, মামলা চলার সময় কোনও শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
মামলা নিষ্পত্তির পর আদালতের রায় মানতে নাজমুল আলমকে পুনঃনিয়োগের ব্যবস্থা নেন কর্তৃপক্ষ। বাণিজ্য বিষয়ে শূন্যপদ না থাকায় ব্যবসায়ে শিক্ষা বিষয় উল্লেখ করে নাজমুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রাপ্যতা না থাকলেও এমপিওর জন্য সুপারিশ করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। ফলে এমপিওভুক্ত হতে পারেননি নাজমুল আলম। স্কুল কর্তৃপক্ষ নাজমুল আলমকে জানান, এমপিও দিচ্ছে না মাউশি।
নাজমুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার নিয়োগের পর আরও দুজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। তারা সবাই এমপিও পেয়েছেন। আমি ১৪ বছর অপেক্ষা করেও এমপিও পাইনি। আদালত ছেড়ে স্কুল আর মাউশির দরজায় ঘুরছি।’
এ বিষয়ে মাউশির সহকারী পরিচালক (সেসিপ) মো. সবুজ আলম বলেন, ‘শিক্ষক নাজমুল আলমের এমপিও সুপারিশ না করে অন্য শিক্ষককের জন্য সুপারিশ করেন প্রধান শিক্ষক। সে কারণে প্রথমে তার এমপিও হয়নি। পরে প্রাপ্যতা না থাকলেও আবার এমপিও সুপারিশ পাঠানো হয়। তাতে আবারও বঞ্চিত হন তিনি।’
অভিযোগের বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক খবির উদ্দিন মিল্কী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার পর তার এমপিও পেতে সুপারিশ করি। কেন হলো না তা বলতে পারবো না। তারটাই হচ্ছে না।’
প্রাপ্যতা না থাকার পরও এমপিও সুপারিশ করলেন কেন জানতে চাইলে অন্য প্রসঙ্গ টেনে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘তিনি বঞ্চিত হয়েছেন সত্যি। তাই তার জন্য আমি আবার এমপিও সুপারিশ করে পাঠিয়েছি।’
একইভাবে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েও এমপিও সুপারিশ বঞ্চিত হয়েছেন ভোলার দুলারহাট আদর্শ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হাসনা হেনা। ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর তাকে নিয়োগ দেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পদের বিপরীতে তার এমপিও সুপারিশ না করে অন্য একজনকে নিয়োগ দিয়ে তার এমপিও সুপারিশ করা হয়।
হাসনা হেনার অভিযোগ, সমাজবিজ্ঞান বিষয় অনুমোদন না নিয়ে অন্য একজন শিক্ষককে নিয়োগবিধি না মেনে নিয়োগ দিয়ে এমপিও সুপারিশ করেন কর্তৃপক্ষ। এমপিও সুপারিশের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে পরে নিয়োগ দেওয়া শিক্ষক এমপিওভুক্ত হন। এ অবস্থায় তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং মাউশির মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১ আগস্ট মাউশির ওই সময়ের মহাপরিচালক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরবর্তী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় মাউশির সহকারী পরিচালক (সেসিফ) মো. সবুজ আলমকে।
জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক (সেসিফ) মো. সবুজ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনিবার্য কারণবশত তদন্ত করতে পারবো না বলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’
কী কারণে তদন্ত করতে পারবেন না তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান এই কর্মকর্তা।
মাউশির পরিচালক (কলেজ) কার্যালয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, দুলারহাট আদর্শ ডিগ্রি কলেজের অধক্ষের অসহযোগিতার কারণে তদন্ত করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। তবে অধ্যক্ষ এ কে এম শাহে আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উনি (হাসনা হেনা) সঠিক তথ্য দেননি।’
হাসনা হেনার জন্য সুপারিশ না করে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষকের জন্য কেন এমপিও সুপারিশ করা হয়েছে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তথ্য সঠিক নয়।’ এরপর আর কোনও কথা বলেননি তিনি।
তবে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল মো. জাকির হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসনা হেনার নিয়োগের পর নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকের এমপিও হয়েছে। কেন হাসনা হেনার এমপিও সুপারিশ আগে করা হয়নি তা অধ্যক্ষ বলতে পারবেন।’
হাসনা হেনা বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘আমার নিয়োগের পর শিক্ষক কর্মচারীর তালিকায় নাম নেই, নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, এমন শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ। বিষয় অনুমোদন না নিয়েই এমপিও সুপারিশ করে ওই শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করেছেন। এ বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তদন্তে অসহযোগিতা করছেন কলেজ অধ্যক্ষ।’

/এইচআই/চেক-এমওএফ/

x