গ্রেনফেল টাওয়ার ট্র্যাজেডি: একবছরেও থামেনি কান্না

মুনজের আহমদ চৌধুরী, যুক্তরাজ্য ১২:২৬ , জুন ১৪ , ২০১৮

গ্রেনফেল টাওয়ারে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনব্রিটে‌নে গ্রেনফেল টাওয়ার ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হলো আজ ।২০১৭ সালের ১৪ জুন পশ্চিম লন্ডনের কেনসিংটনের বহুতল ভবন গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একই পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ ৭২ জনের প্রাণহা‌নি ঘটে ।ভয়াবহ ওই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হন আরও  প্রায় দেড়শতাধিক মানুষ।২৪ তলা ওই টাওয়ারে ছিল ১২৯টি ফ্ল্যাট।

জানা যায়, আগুনে নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন ২৩টি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। গত বছরের ১৪জুন রাত ১২টা ৫৪ মিনিটে চতুর্থ তলার ১৬ নম্বর ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের একটি ফ্রিজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে জানায় লন্ডন পুলিশ। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের ২৫০ জন দমকলকর্মী ও ৪০টি ফায়ার ইঞ্জিনের টানা ৪৮ ঘণ্টা লেগেছিল। কিন্তু ততক্ষণে নিভে যায় ৭২ জন মানুষের জীবনপ্রদীপ। টাওয়ার ও এর আশপাশের ভবনসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ১৫১টি বাড়িঘর।

গ্রেনফেল টাওয়ারের বিয়োগান্তক এই ট্র্যাজেডির এক বছর স্মরণে লন্ডেনে থাকছে বিভিন্ন কর্মসূচি। এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে পাবলিক তদন্ত। বৃহস্পতিবার (১৪ জুন) দুপুর দেড়টায় গ্রেনফেল টাওয়ারের কাছে সেন্ট ক্লেমেন্ট চার্চে আগুনে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। পাশাপাশি নিহতদের স্মরণে তাদের নাম পড়া হবে। এরপর সন্ধ্যা থেকে নর্থ কেনসিংটন কমিউনিটির সদস্যরা একসঙ্গে টাওয়ারের পাশে ২৪ ঘণ্টা জেগে থাকবেন।

বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫৪ মিনিট তথা আগুন লাগার সময় থেকে গ্রেনফেল টাওয়ারসহ আশপাশের ১২টি টাওয়ারে পাঁচ দিনব্যাপী প্রতিদিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত বিশেষভাবে আলোকোজ্জ্বল রাখা হবে। এছাড়া শুক্রবার (১৫ জুন) যুক্তরাজ্য জুড়ে স্কুলগুলোতে ‘গ্রিন ফর গ্রেনফেল’ কর্মসূচিতে সব শ্রেণির মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে গ্রেনফেল টাওয়ার ট্র্যাজেডির এক বছরকে সামনে রেখে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সে সময় দ্রুত দেখা করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ইভেনিং স্ট্যান্ডার্ডের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি জানিয়েছে, টেরিসা মে মনে করেন— দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে তার প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ছিল না। এ ঘটনায় যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কারণে নিজের ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ঘটনার পরদিন (২০১৭ সালের ১৫ জুন) প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এ ঘটনায় পাবলিক তদন্তের আদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের জানতে হবে কী হয়েছিল ও এর পুরোপুরি ব্যাখ্যা দিতে হবে।’ কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে করণীয় কী— এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে সেই সময় সাবেক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি স্যার মার্টিন মোর বিকের নেতৃত্বে পাবলিক তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন তিনি।

ঘটনার ঠিক তিন মাস পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর মি. মার্টিন তদন্ত শুরু করে বলেছিলেন, ‘তদন্ত প্রক্রিয়াটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়। এটি কাউকে শাস্তি দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে না। আমাদের লক্ষ্য কেবল সত্যের কাছে পৌঁছানো।’

স্যার মার্টিন ৩৫ জনের একটি দলের সহযোগিতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে একটি আইনি দল এবং বেসামরিক কর্মচারী ও তিনজন পরামর্শদাতা। ইতোমধ্যে গত ২১মে থেকে নয় দিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা।

তদন্তের প্রথম পর্বের প্রতিবেদন এ বছরের অক্টোবরে প্রকাশ করা হবে বলে আশা করছে তদন্ত দল। নতুন বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে’র হাতে দ্বিতীয় পর্ব ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট তুলে দেওয়া হবে।

এদিকে সাতজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ছয় মাস বয়সী এক মৃত শিশুকে পাওয়া গেছে মায়ের হাতে । শিশুটির মা ফারাহ হামদানকে ১৯ ও ২০ তলার মধ্যখানে পাওয়া যায়। এ সময় তার হাতেই ছিল ছয় মাস বয়সী হতভাগ্য শিশু লিনা। একইসঙ্গে লিনার ৮ বছর বয়সী বোনকে ২০ তলা থেকে উদ্ধার করা হলেও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ক্ষ‌তিগ্রস্ত প‌রিবারের কথা

গ্রেনফেল টাওয়ারে নিজ প‌রিবারের চারজনসহ মারা যান মৌ‌লভীবাজারের কমরু মিয়া। তার ভাগ্নে ও ক‌মিউনি‌টি নেতা কেএম আবু তা‌হির চৌধুরীর বলেন, ‘গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুনের পর এক‌টি প্রতারক চক্র নিহতদের স্বজন সেজে হাজার হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নেয়। পু‌লিশ এখন অভিযুক্তদের গ্রেফতার করছে।’

গ্রেনফেল টাওয়ারের বর্তমান অবস্থাকমরু মিয়ার পরিবারকে নিয়ে স্মৃ‌তিচারণ করে তা‌হির চৌধুরী বাংলা ট্রি‌বিউনকে বলেন, ‘কমরু মিয়ার এক ছেলে ওইদিন ঘরে না থাকায় বেঁচে গিয়ে‌ছিলেন।

কমরু মিয়ার ভা‌তিজা আবদুর র‌হিম বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ক্ষ‌তিগ্রস্ত প‌রিবারের যথাযথ ক্ষ‌তিপূরণ দাবি কর‌ছি।’

প্রশ্ন‌বিদ্ধ ব্রি‌টিশ মিডিয়া‌

গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুন লাগার দুই সপ্তাহ পর শনাক্ত হয় হোসনা ও তার মায়ের লাশ। এরপর পাওয়া যায় প‌রিবারের আরেক সদস্যের লাশ। এর মধ্যে হোসনা’র লাশ পাওয়া যায় ১৭ তলার লিফটের পাশে। তার ৬৪ বছর বয়সী মা রাবেয়া বেগমকেও একই ‌ফ্লোরে তাদের ফ্ল্যাটে পাওয়া যায়। ডেন্টাল রেকর্ড পরীক্ষার মাধ্যমে মা-মেয়ের লাশ শনাক্ত করা হয়। 

এদিকে বাবা ও দুই ছেলের লাশ শনাক্ত না হওয়ায় এবং ভিন্ন ভিন্ন স্থা‌ন থেকে মা-মেয়ের লাশ উদ্ধারের বিষয়ে বিতর্কিত খবর প্রকাশ করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল কয়েকটি ব্রিটিশ মিডিয়া। বৃদ্ধ বাবা কমরু মিয়াকে নিচে নামানো সম্ভব না হওয়ায় দেড় ঘণ্টা সময় পেয়েও ভবন থেকে বে‌রিয়ে আসার চেষ্টা করেন‌নি হোসনা, তার মা ও দুই ভাই— সেসময় এমন রিপোর্ট প্রকাশ করে কিছু ইংরেজি দৈনিক। কমরু মিয়াকে রেখে নিজেদের জীবন বাঁচানোর কোনও চেষ্টা করেন‌নি তার পরিবারের সদস্যরা এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করে গণমাধ্যমগুলো।এসব প্রতিবেদনের বেশিরভাগের শিরোনাম ছিল, ‘একইসঙ্গে মরতে মৃত্যুকে বরণ’।

যদি তাই ঘটে তবে পাঁচজনের লাশ একই ফ্ল্যাটে থাকার কথা। সেখানে হোসনার লাশ লিফটের পাশে, আর মায়ের লাশ নিজেদের ফ্ল্যাটে মিললো কীভাবে? বাবা আর দুই ভাইয়ের লাশও সেই ফ্লাটে পাওয়া যায়নি।এতে প্রতিবেদনগুলো বিতর্কিত হয়ে পড়ে। 

অনেকে সে সময় মন্তব্য করেন, এত প্রাণহানি আর দা‌য়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবহেলাকে আড়াল করতেই এমন রিপোর্ট প্রকাশ করে পাঠকের দৃ‌ষ্টি সরানোর চেষ্টা করা হয়ে‌ছিল।

 

/আই এ/জেএইচ/

x