নিটোরের অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা সেবা নিয়ে অভিযোগ রোগীদের

তাসকিনা ইয়াসমিন ০৫:৩৫ , জুলাই ১০ , ২০১৮

রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ নিয়ে। তারা বলছেন, অস্ত্রোপচারের সময় বলা হয়, আপনার রোগীর পা কেটে ফেলতে হবে। এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি? এছাড়া হাসপাতালে ঠিকমতো চিকিৎসক, নার্স না পাওয়া, রোগী ভর্তি করতে গেলে বাড়তি অর্থ খরচ, ওষুধের অপ্রতুলতার অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা।

ছোট বোনকে খুলনা থেকে এনে নিটোরে ভর্তি করেছেন সিদ্ধার্থ দে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে চিকিৎসকরা ঠিকমতো রোগী দেখে না। তাই বোনকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছি। এখানকার চিকিৎসকরা ক্যারাম খেলে, অথচ রোগীর জন্য ডাকলে আসে না। নার্সদের তো পাওয়াই যায় না। খালি প্রতি পদে পদে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে বলা হয়। সরকারি হাসপাতালে এতো খরচ জানলে এখানে আসতাম না।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ায় স্বামীকে হাসপাতালে আনেন নারায়ণগঞ্জের গৃহবধূ চন্দনা। তিনি বলেন, এখানে আসার পর পায়ের অবস্থা খারাপ থাকায় চিকিৎসকরা তার এক পা কেটে ফেলেছে। তিনি এখানে চিকিৎসক ও নার্সের সেবায় সন্তুষ্ট বলে জানান।

চাঁদপুরের ব্যবসায়ী মো. মাসুদ আহমেদ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তাকে পরিবারের সদস্যরা নিটোর হাসপাতালে নিয়ে আসে। সেখানে চিকিৎসকরা প্রথমে তাকে ভর্তি করেন, পরে গভীর রাতে হৃদরোগ হাসপাতালে পাঠান। সেখান থেকে আবার নিটোরে ফিরে আসেন। এ প্রসঙ্গে মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিটোরের খুবই খারাপ অবস্থা। চিকিৎসক মুমূর্ষু রোগীদেরও সহজে ধরতে চায় না। প্রতি পদে পদে হাসপাতালের কর্মীদের টাকা দেওয়া লাগে। টাকা ছাড়া কোন কাজই হয় না।

মাসুদের অ্যাটেন্ড্যান্ট সোহেল গাজী বলেন, প্রথম দিন হাসপাতালে আসার পর তার কোন চিকিৎসাই হয়নি। পরদিন তাকে অস্ত্রোপচার কক্ষে ঢোকায়। সেখানে রোগীকে ভেতরে রেখে বাইরে এসে বলে যে, রোগীর পা কেটে ফেলতে হবে। আমি তখন না করি। কারণ, রোগী বয়সে তরুণ। তার সারাজীবন পড়ে আছে। এরপর অর্থোপেডিক সার্জন ডা. কৃষ্ণপ্রিয় দাশের কাছে নিয়ে আসি। তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তার অস্ত্রোপচার করেন। এখন আমার ভাই তার দুই পা নিয়েই সুস্থ আছে।

সোহেল গাজী অভিযোগ করে বলেন, নিটোরে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার কক্ষে রোগীকে ঢোকানোর পর পা কাটার কথা বলেন। এ সময় সাহস করে খুব কম রোগীকেই বের করে আনতে পারে আত্মীয়রা। বেশিরভাগ রোগীরই পা কেটে ফেলা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. কৃষ্ণপ্রিয় দাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আসলে চিকিৎসরা বলে নাকি অন্য কেউ পা কেটে ফেলার জন্য বলে, এ ব্যাপারে আমার পক্ষে মন্তব্য করা আসলে সম্ভব নয়। বাংলাদেশে তো বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসক আছে। আদৌ বলে নাকি অন্য কেউ বলে, নাম হয় চিকিৎসকের। হাসপাতালে অনেকেই থাকে। আসলে কে বলছে, আমার পক্ষে বলা খুব মুশকিল।

তিনি বলেন, আসলে আমরা সব সময় পা সেফ করার চেষ্টা করি। অনেক সময় পা নষ্ট হয়ে যায়, অকেজো হয়ে যায়, গ্যাংরিন বলে সেগুলোকে, সেক্ষেত্রে হয়তো অনেক সময় জীবন বাঁচানোর জন্য পা কাটতে হয়। সেটাতো সিচুয়েশন অনুযায়ী ডিফার করে। ঢালাওভাবে এ রকমভাবে বলা খুব মুশকিল যে, অ্যাকসিডেন্ট হলেই পা কেটে ফেলে। আমাদের কাজই তো আসলে পা সেফ করা। হাত বা পায়ের সুরক্ষাই আমাদের টার্গেট। কখনোই পা কাটতে চাইবো না। কখনও যদি গ্যাংরিন হয়ে যায়, যে পা রাখলে জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় বলি যে, জীবন বাঁচানোর জন্য পা কাটতে হবে। তাছাড়া ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে পা বাঁচানো যায়। আর এক ভাগ বা তারও কম সিভিয়ার ট্রমা যদি হয় যে, পা রাখলেই কাজ করতে পারবে না, পায়ের মাংস নাই, চামড়া নাই, ইনফেকশন হয়ে যায়, জিরো পয়েন্ট জিরো ফাইভ পার্সেন্টে ক্ষেত্রে হয়তো এমন সিচুয়েশনে চেষ্টা করার পর ফেইলিয়র হওয়ার পর আমরা পা কাটার জন্য বলে থাকি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুজ্জামান শাহীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি নিজেই নিটোরে দীর্ঘদিন ছিলাম। সেখানে আমি ছাত্রও ছিলাম, আবার চাকরিও করেছি। কখনোই দেখিনি যে, কোনও রোগীর পা কেটে ফেলার প্রয়োজন নেই, কিন্তু কেটে ফেলা হচ্ছে। এটা আমরা চিকিৎসকরা কখনোই করি না। তবে এটা ঠিক যে, চিকিৎসকদের ব্যাপারে রোগীর আত্মীয়রা এমন অভিযোগ করতেই থাকবে। আর সরকারি হাসপাতালের ব্যাপারে মানুষ একটু বেশি এসব অভিযোগ করে মজা পায়। আমাদের চিকিৎসকদের এর মধ্যে থেকেই কাজ করে যেতে হবে।

নিটোরের একজন আবাসিক সার্জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এখানে রোগীর চিকিৎসা ক্ষেত্রে তো অনেক অসুবিধা আছেই। এখানে নিউরো, হৃদরোগসহ বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে টিম নেই। যার কারণে মুমূর্ষু রোগীকেও হাসপাতালের বাইরে পাঠাতে হয়। হাসপাতালের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের মেনটেইন করা খুব কঠিন হয়। রোগীর সঙ্গে রোগীর অ্যাটেনড্যান্ট সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। এ কারণে অনেক রোগীর ইনফেকশন হয়। অ্যাটেনড্যান্ট সংখ্যা কমাতে আসলে সবার সচেতনতা দরকার।

হাসপাতালটিতে যে পরিমাণ রোগীর চাপ সে তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের সমন্বয়ের অভাব তো আছেই। আবার ব্লাড ব্যাংকে, ঔষধ ও ইন্সট্রুমেন্টের অপ্রতুল সরবরাহ রোগীদের সুচিকিৎসাকে ব্যাহত করে।

নিটোরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এখানে ২৫ ভাগ রোগী আসে যারা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার রোগীরা এখানে আসে। সর্বাত্মক চেষ্টা করি রোগীকে সেবা দিতে। আমাদের চিকিৎসক-নার্সরা সার্বক্ষণিক তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

রোগীদের অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলার জন্য নিটোরের পরিচালক ডা. মো. গনি মোল্লার অফিসে দুই দিন গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর ফোনে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ত আছেন বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

/টিওয়াই/এমপি/

x