ঠেলাঠেলির দিন শেষ!

শেখ জাহাঙ্গীর আলম ১৭:৫২ , জুলাই ১১ , ২০১৮

 

হাতিরঝিল থানা

যেকোনও অপরাধের ঘটনা,কিংবা দুর্ঘটনা নিয়ে রাজধানীর পাঁচটি থানার ঠেলাঠেলি থেকে অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দারা। সম্প্রতি হাতিরঝিলকে পূর্ণাঙ্গ থানা হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার।

হাতিরঝিল এলাকাটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, রমনা, রামপুরা, বাড্ডা ও গুলশান থানার অংশ ছিল। অভিযোগ আছে, এই এলাকায় কোনও অপরাধ বা সড়কে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থল শনাক্ত করতে এই পাঁচটি থানার কর্মকর্তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতেন।  অভিযোগ জানাতে ভুক্তভোগীরা এসব থানায় গেলে কেবল ঘটনাস্থল কোন থানার অধীন, সেই অজুহাতে দায় এড়ানোর চেষ্টা করতেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এতে করে ওই এলাকার মানুষেরাও পুলিশের সেবা থেকে বঞ্চিত হতেন। হাতিরঝিল থানা চালুর পর থেকে এসব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও বঞ্চনার অবসান ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয়রা। নিজ এলাকার থানায় গেলেই পুলিশের সহায়তা পাওয়া যাবে,এমনটাই ভরসা করছেন এলাকাবাসী। 

ডিএমপির ৫০তম থানা হিসেবে গত ৭ জুলাই (শনিবার) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল হাতিরঝিল থানার উদ্বোধন করেন। এসময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওইদিন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, এখন থেকে এই এলাকার নাগরিকদের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের পুলিশি সেবা দেবে হাতিরঝিল থানা। ফলে মানুষের ভোগান্তি কমবে।

হাতিরঝিলের মীরবাগ এলাকার বাসিন্দা কাজী নিরু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনি সহযোগিতা পেতে আগে যেতে হতো রমনা, বাড্ডা, রামপুরা গুলশান, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। অনেক কষ্ট হতো, এখন হাতিরঝিল থানা হওয়াতে ভালো হয়েছে। যে কোনও আইনি সুবিধা পেতে এখন আর দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে হবে না।’ 

মধুবাগ বাজারের মুদি দোকানি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাতিরঝিল থানা চালু হওয়াতে আমরা খুশি। এখন রাতের বেলাতেও এলাকায় পুলিশের টহল  থাকবে। সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। যথেষ্ট পরিমাণে নিরাপত্তা পাবো বলে আমরা আশা করছি।’

সোমবার (৯ জুলাই) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নবগঠিত ৫০তম থানা হাতিরঝিলে সরেজমিনে দেখা গেছে, থানার প্রবেশ গেট বরাবর রয়েছে ডিউটি অফিসারের কক্ষ। সামনেই সশস্ত্র এক কনস্টেবল পাহারায় দিচ্ছেন। ভবনের সিড়ির বামপাশে রয়েছে নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র। ভবনের নিচতলায় সিড়িলাগোয়া সেরেস্তাদারের কক্ষ। এরপরেই অফিসার ইনচার্জ এবং পরিদর্শক তদন্ত ও অপারেশনের দুটি কক্ষ।

হাতিরঝিল থানাহাতিরঝিল এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব বন্টনে ব্যস্ত সময় পার করছেন থানার ওসি। এই থানাকে পাঁচটি বিটে ভাগ করে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। সরেজমিনে দেখা যায়, থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষের ভেতর দিয়ে গিয়ে সামনেই রয়েছে হাজতখানা। সেখানে ৫/৭ জন বন্দি রয়েছে।

দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত রয়েছেন ডিউটি অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তাহমিনা এবং তার পাশে বসে আছেন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) তানিয়া আক্তার। দুপুর দেড়টার দিকে থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে একজন মধ্যবয়সী লোক আসেন। তিনি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) লিখে থানায় জমা দেন। কী বিষয়ে জিডি করা হচ্ছে, জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ভাই, আমার গাড়ির পেছনে অন্য একটি গাড়ি ধাক্কা দিয়েছে। আমার গাড়ির কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এই কারণে গাড়ির ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম বিষয়ে একটি জিডি করছি।’

ডিউটি অফিসার এসআই তাহমিনা জানান, থানার কাজ শুরু পর থেকে এ পর্যন্ত ৭/৮টি জিডি এন্ট্রি হয়েছে। এছাড়া, গতকাল (রবিবার) রাতে ডিবি পুলিশ একটি মাদকের মামলা দায়ের করেছে।হাতিরঝিল এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।’

এসআই তাহমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাতিরঝিল নতুন থানা এবং থানায় আমার প্রথম ডিউটি। আজই প্রথম আমি ডিউটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর আগে ডিএমপি সদরদফতরে ছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘থানায় দায়িত্ব পালন করতে ভালোই লাগছে। কিছু নতুন কাজও শেখা যাবে।’

দুপুর দু’টার দিকে থানার গেট দিয়ে এক নারী প্রবেশ করেন।মুখে হাসি লেগে আছে তার। ডিউটি অফিসের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবল রনজিৎ তাকে জিজ্ঞাসা করেন— ‘কোথায় যাবেন?’ জবাবে ওই নারী বলেন, ‘কই যামু, আইলাম থানা দেখতে। সবাই কয় নতুন থানা হইছে, তাই আইলাম।’

ওই নারী জানান, তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। থাকেন হাতিরঝিলের মধুবাগ এলাকায়। শনিবারও (৮ জুলাই) তিনি নতুন থানা দেখতে এসেছিলেন।কিন্তু অনেক পুলিশ থাকায় দেখার সুযোগ পাননি। তাই  ফের এসেছেন থানা দেখতে।  

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু মো. ফজলুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্যই ডিএমপি এই থানাটি গঠন করেছে। আগে হাতিরঝিল ছিল পাঁচটি থানার বর্ডারে। সেখান থেকে সম্পূর্ণ এলাকাটিকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে এলাকাবাসী সঠিকভাবে থানার সেবা ও সহযোগিতা পায়। ঘটনা কোন এলাকার,এখন আর সেই জটিলতায় ভুগতে হবে না। সবাই হাতিরঝিল থানাতেই আসতে পারবে।’

নবগঠিত হাতিরঝিল থানাতিনি বলেন, ‘সবদিক বিবেচনা করে আমরা মনে করি, হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দারা উন্নত সেবা পাবেন। আর আমরা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও থানার সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।’

হাতিরঝিল থানার আওতায় যেসব এলাকা

হাতিরঝিল থানাটি ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের শিল্পাঞ্চল জোনের আওতাভুক্ত। রাজধানীর বাংলামটরের একাংশ,ইস্কাটনের একাংশ, মগবাজার,মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার একাংশ,পশ্চিম রামপুরা,উলন,নয়াটোলা, মধুবাগ, মীরবাগ,মহানগর আবাসিক এলাকা, হাতিরঝিল, বাড্ডা লিংক রোড, আবুল হোসেন রোড, ওয়াপদা রোড, ওয়্যারলেস মোড়ের একাংশ, পেয়ারাবাগ, দিলু রোড, মালিবাগ রেলক্রসিং, হাজীপাড়া, হোটেল সোনারগাঁও, হাতিরঝিল প্রজেক্ট, পুলিশ প্লাজা এলাকার একাংশ নিয়ে গঠিত হয়েছে এই থানা।

হাতিরঝিল থানার জনবল

নতুন এই থানার মোট জনবল রয়েছে ৭১ জন। এদের মধ্যে পরিদর্শক তিন জন। উপ-পরিদর্শক (এসআই ) ১২ জন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই ) ২১ জন এবং কনস্টেবল ৩৫ জন।

হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) এসকে খোদা নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই এলাকার জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুলিশের দায়িত্ব পালনে থানায় পর্যাপ্ত যানবাহন রয়েছে। আমাদের সাতটি টহল গাড়ি ও  আটটি মোটরসাইকেল রয়েছে। দায়িত্ব পালনের কাজে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে লজিস্টিক সাপোর্ট পাচ্ছি।’ 

তিনি বলেন, ‘পুরো হাতিরঝিল থানাকে পাঁচটি বিটে ভাগ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। সামনে আরও দুটি বিট বাড়ানোর বিষয়ে কাজ চলছে।’

 

 

/এপিএইচ/

x