ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব

শরিফুল ইসলাম ২৩:১১ , জুলাই ১২ , ২০১৮

যশোরে শেখ হাসিনা টেকনোলজি পার্ক (ছবি: ঢাকা ট্রিবিউনের সৌজন্যে)

তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১০ বছর আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। যথার্থভাবেই তারা তাদের কর্মসূচির নাম দিয়েছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ।’ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশ। পরপর দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবির্ভূত হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বের এক উদীয়মান দেশ হিসেবে । আওয়ামী লীগ সরকার আইসিটিকে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। বহু ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সরকার। গত ৯ বছর ধরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহু প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যেই পাড়ি দিয়েছে অনেকটা পথ। বাংলাদেশে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ সেবার গ্রহীতাদের সংখ্যা তেমনি বেড়েছে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ও সেবা রফতানি করে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ। শিক্ষা ও সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। এসবই সম্ভব হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতে সরকারি নীতিগত সমর্থন নিশ্চিত করায়।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি: আইসিটি খাতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সড কাজের ১৬.৮ শতাংশই আসে বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে থাকা ভারতে যায় ২৪.৬ শতাংশ কাজ।

পেশাদার আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির তিনটি শাখায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। বেকার জনগোষ্ঠীর ১৩ হাজার জনকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। তাদেরকে গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, ওয়েব ডিজাইনিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং বিভাগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই ১১ হাজার ২৯০ জনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিপিও থেকে দ্রুত বেড়ে চলেছে বাংলাদেশের রফতানি আয়। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশি কাজ করছেন।

কানেকটিভিটি নিশ্চিতকরণ: ১০ বছর আগে বাংলাদেশের মাত্র ২ কোটি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সুযোগ পেত। ২০১৮ সালের এপ্রিল নাগাদ এ সংখ্যা ১৫ কোটিতে উপনীত হয়েছে। একই সময়কালে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৬০ লাখে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি একশ জনে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা গ্রহীতার সংখ্যা যথাক্রমে ৯১ জন ও ৫০ জন। জিএসএম অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বের দশম বৃহত্তম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব।

উপজেলা তথ্যকেন্দ্র, জেলা প্রশাসক দফতরের ই-সার্ভিস সেন্টার, ১৯৭ টি উপজেলায় স্থাপিত ই-সেন্টার, গ্রামীণ এলাকার পোস্ট অফিস এবং ২৫৪টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কৃষি, জন্ম নিবন্ধন, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা প্রদানসহ অন্যান্য বহু সেবা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৬৪টি জেলা প্রশাসকের দফতর, ২৪০টি সরকারি বিভাগ এবং ৫৮ টি মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর নিয়ে প্রায় ১৮ হাজার ৪৩৪টি সরকারি কার্যালয়কে নিয়ে আসা হয়েছে সমন্বিত নেটওয়ার্কের অধীনে।

সরাসরি যোগাযোগ, বার্তা ও তথ্য প্রেরণ এবং সভা অনুষ্ঠানের জন্য ৮৮৩টি ভিডিও কনফারেনসিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে । ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে সরকারি দফতরগুলোতে ই-ফাইলিং ও সরকারি কেনাকাটায় ই-জিপি ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৃহৎ অবকাঠামোর পরিকল্পনা: গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, রংপুর, বরিশাল, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, কুমিল্লা সদর (দক্ষিণ), চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজারের রামু, নাটোরের সিঙরা , সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ এবং খুলনার কুয়েট ক্যাম্পাসে মোট ১২টি আইটি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার অপটিকাল ফাইবার কেবল স্থাপন করা হয়েছে সারা দেশে। কুয়াকাটায় স্থাপিত হয়েছে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল, যা ব্যবহার করে বাংলাদেশ পাবে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ৫০০ গিগাবাইট গতির ইন্টারনেট সেবা।

গত জুনে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত তার বাজেট বক্তৃতায় নিশ্চিত করেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় থাকা বিষয়গুলোর একটি। তিনি বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, দোরগোড়ায় দ্রুত সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা বড় পরিসরে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলেছি।’

‘আমাদের আন্তরিক চেষ্টার কারণে পার্বত্য এলাকার তিন দুর্গম জেলায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়েছে, যা ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি।’

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার সম্প্রতি বলেছেন, এক বছরে মধ্যে দেশের সবগুলো ইউনিয়ন পরিষদকে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে এবং দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপিত হবে একটি করে ডিজিটাল পরীক্ষাগার।

২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণেও সরকারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গত মে মাস পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে হওয়া দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অনন্য উচ্চতায় ওঠার ঘটনাটি ঘটেছে মহাকাশে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে। ২০১৮ সালের ১১ মে মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করে মহাকাশ যুগে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা তে অবস্থিত কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।’ বাংলাদেশের মূল ভূমি ও বঙ্গোপসাগরে দেশের সমুদ্রসীমার অন্তর্ভুক্ত এলাকা ছাড়াও নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার কিছু এলাকা স্যাটেলাইটটির আওতায় রয়েছে।

সামনে থাকা বাধা: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের যাত্রা অব্যাহত থাকলেও সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের এই যাত্রায় সামনের পথ খুব একটা মসৃণ নয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের মতে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা দক্ষ মানব সম্পদের অভাব এবং শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিল্পখাতে প্রত্যাশিত দক্ষতার মাঝে থাকা ব্যবধান। তিনি জানিয়েছেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৪টি বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন—মানসম্পদ উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি ও ই-গভর্নেন্স নিশ্চিত করা এবং শিল্প খাতকে উৎসাহ দেওয়া।’

‘গত বছর আমরা ই-গভর্নেন্স নিয়ে আমরা প্রচুর কাজ করেছি। আন্তর্জাতিক বাজারে স্থানীয় মানবসম্পদ ব্যবহারের কৌশল নিয়েও আমরা কাজ করেছি। কানেক্টিভিটি নিশ্চিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছি আমরা। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অর্জিত হয়েছে অগ্রগতি।’

‘ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেছেন, সবচেয়ে বড় কথা ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা মানুষের মনে অনেক বড় পরিবর্তন এনেছে। তার ভাষ্য, ‘স্লোগানটি মানুষকে উদীপ্ত করেছে। আমরা দেখছি দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

‘সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া, হাইটেক পার্ক স্থাপন ও স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচির কারণে সেবা খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পেরেছে। বিশেষ করে বাজেট আইসিটি খাতের সহায়ক ছিল।’

‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের’ (বেসিসের) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির বলেছেন, সরকার আইসিটি খাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে, এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মসূচিকে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে স্থান দিয়েছে ১০ বছর আগে। তার ভাষ্য, ‘সরকার গঠনের পর থেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা ও কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া এবং ইন্টারনেটের মূল্য হ্রাস ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। এসব উদ্যোগের কারণেই তথ্য প্রযুক্তি খাত বাংলাদেশে এখন এতো শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। সরকারের এ বিষয়ে প্রশংসা প্রাপ্য।’

(প্রতিবেদনটি প্রথমে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত)

/এএমএ/ টিএন/

x