সড়কে থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল

শেখ জাহাঙ্গীর আলম ১৩:৫৭ , আগস্ট ০৮ , ২০১৮

সড়ক দুর্ঘটনা

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে গত (২৯ জুলাই) বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী  নিহতের পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে আন্দোলনে নামে। তাদের এই আন্দোলন চলাকালে গত আট দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং  ৪৪ জন  আহত হয়েছেন ।  নিহতদের মধ্যে চার জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।  এসময় দেশে উল্লেখযোগ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৪টি।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে (র‌্যাডিসন হোটেলের উল্টোদিকে) বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আব্দুল করিম রাজু নিহত হয়।  ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বিমানবন্দর সড়কের বাঁ পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল তারা।  এ  সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে।  ঘটনাস্থলে  মীম ও রাজু নিহত এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। আহতদের কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়।  এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা  জাবালে নূর পরিবহনের ওই বাসে আগুন দেয় ও ভাঙচুর করে বেশ কয়েকটি বাস।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালেও একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে অনেকেই বিস্মিত হন। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চালকরা আইন ও নিয়ম না মেনে যানবাহন চালানোর কারণে কমছে না সড়কে প্রাণহানির ঘটনা। সেই সঙ্গে পথচারী, চালক ও যাত্রীসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে।  প্রশাসন যদি আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে, তবে সড়কে সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলবে এবং দুর্ঘটনাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।  এক্ষেত্রে কোনও  চালক যদি  আইন অমান্য করে, তবে তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তারা বলেন, যেসব দেশে আইনের শাসন রয়েছে সেসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি শূন্যের কোঠায়।  কারণ, সেখানে সবাই আইন মেনে চলে।  আর যেখানে আইনের প্রয়োগ নেই, সেখানে দুর্ঘটনাসহ নানা অপরাধ ঘটে থাকে।  তাই সড়কে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত জররি বলে মনে করছে বিশিষ্টজনেরা।

 

শিক্ষার্থীরা বলছে, আইন সংশোধন করে ঘাতক চালকদের সর্বাচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হোক। কারণ, সড়ক দুর্ঘটনার পর চালক আটক হলেও তার বিচার হয় না। কিছুদিন পর তারা জামিনে বেড়িয়ে আসেন। মালিকপক্ষ সামান্য ক্ষতিপুরণ দিয়ে সব কিছু মিটিয়ে ফেলে।  কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যে জীবন ঝড়ে যায়, তা তো আর ফিরে আসে না।  সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অনেক পরিবার পথে বসে যাচ্ছে।  তারপরও সড়কে থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল।

মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজের ছাত্র রেজওয়ান হাসান বলেন, ‘আমরা কোথায় আছি। সারাদেশে যখন আন্দোলন চলছে, তখনও রাজপথে বেপরোয়াভাবে যানবাহন কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। আমরা সড়কে আর কোনও লাশ দেখতে চাই না। আমরা নিরাপদ সড়ক চাই। ’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কের নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কুফল হলো সড়ক দুর্ঘটনা।  নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে।   তাদের দাবি, সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করা। ’

তিনি বলেন, ‘সড়কের সার্বিক অব্যবস্থাপনা থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো যাবে না।  সেজন্যেই আমাদের ছেলে মেয়েরা আন্দোলন করছে।  তবে সড়ক দুর্ঘটনা যে রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে, সেটি বলছি না।  ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ’

নতুন আইন প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে।  তিনি বলেন, ‘আইন হলে তা বাস্তবায়ন করার লিগ্যাল বাইন্ডিং তো থাকে।  বাস্তবায়ন করার শক্তি পাবে ।’

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো

গত ৪ আগস্ট (শনিবার) সকাল ১০টার দিকে নরসিংদীর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরা উপজেলার নীলকুটি এলাকায় একটি লেগুনার চাপায় মো. আবদুল্লাহ (১৭) নামের এক ছাত্রের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চালককে আটক করেছে পুলিশ। নিহত আবদুল্লাহ উপজেলার মাহমুদাবাদ ঝাড়তলা এলাকার মো. শাহজাহানের ছেলে। সে ভৈরবের হাজী আসমত আলী কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। একই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুরে  বড়বাড়ি এলাকায় কাভার্ডভ্যান চাপায় ফারহানা আলম মীম (২১) নামের এক কলেজছাত্রী নিহত হয়। এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধরা কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে। নিহত ফারহানা টঙ্গীর সফিউদ্দীন সরকার একাডেমির এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কুদুরিয়া এলাকার ফারুকের মেয়ে।

গত ৩ আগস্ট (শুক্রবার) দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর মগবাজারের ওয়্যারলেস এলাকায় ফ্লাইওয়ার থেকে নামার পথে সাতক্ষীরাগামী এসপি গোল্ডেন লাইন বাসের (ঢাকা মেট্রো ঝ-১৪-০২১৪) ধাক্কায় সাইফুল ইসলাম রানা (৩০) নামের এক মোটরসাইকেল চালক নিহত হন। এই ঘটনায় পাশে থাকা রিকশা চালক ও এক যাত্রী আহত হন। পরে বাসটিতে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ পথচারীরা। স্থানীয় শিশির খান ও সৈয়দ কবীর উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পালিয়ে যাওয়ার সময় চালক ইমরান সরদারকে (২৫) ধরে স্থানীয় জনতা পিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে।  নিহত সাইফুল পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার শেরেবাংলা বাজার এলাকার শাহজাহান মিয়ার একমাত্র ছেলে। ঢাকার খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ানে থাকতেন। ওই দিন বিকালে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকায় একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চালক শাহীন (২২) নামে যুবকের মৃত্যু হয়েছেন। এই ঘটনায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে পথচারী মন রঞ্জন গোড়ামি (৫০) নামের পল্লীবিদ্যুতের একজন প্রকৌশলী আহত হন। এদিনই সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে ধামরাইয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জয়পুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুটি যাত্রীবাহী (সূর্যমুখী ও সেতু পরিবহনের) বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। এই ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হন।
গত ২ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) সকালে ঢাকার দোহারের চরকুশাই নামক স্থানে  ট্রাকচাপায় মো. রেশাদ হোসেন (১৩) নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়। রেশাদ সড়কের বিপরীত দিক থেকে মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিল। এই ঘটনায় ঘাতক ট্রাকটি জব্দ করে পুলিশ। নিহত রেশাদ নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।  সে দোহার উপজেলার জামালচর গ্রামের সামছুল হকে ছেলে। ওই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নজু মিয়ার হাট এলাকায় একটি বাসের ধাক্কায় আমজাদ (২২) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। একই দিন রাত ৮টার দিকে শেরপুরের শ্রীবরদীর নিলক্ষিয়া রোডে মোটরসাইকেল ও ট্রলির মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল চালক রবিউল (২৫) নামে এক যুবক নিহত হন। এ ঘটনায় আরও তিন জন আহত হন।

গত ১ আগস্ট (বুধবার) সকাল পৌনে ১০টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলে সংগ্রাম মেডিক্যালের সামনে জ্বালানিবাহী ট্রাকের ধাক্কায় মোশাররফ হোসেন (৪০) নামে এক মোটরসাইকেল চালকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ঘাতক চালককে আটক করে পুলিশ। একই দিনে বেলা ১১টার দিকে শিবপুর উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কামারটেক বাসস্ট্যান্ডে বাস ও প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে অজ্ঞাত এক নারী নিহত হন। এই ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন ও গাড়িচালক সহ মোট চারজন আহত হয়ন

গত ৩১ জুলাই (মঙ্গলবার) সকালে নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার শিবপুর বাজারে ট্রাকের ধাক্কায় মো. বাবলু হোসেন বাবু (৩৭) নামে এক ভ্যান চালক নিহত হয়। মহাদেবপুর থেকে শিষাগামী একটি ট্রাক তাকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একই দিন দুপুরে কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলায় গোমতা এলাকায় স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে যাত্রীবাহী বাসচাপায় আকলিমা আক্তার (১৬) নামে এক ছাত্রী নিহত হয়। এসময় আরও একজন গুরুতর আহত হয়। দুর্ঘটনার পর গাড়িটি দ্রুতগতিতে পালিয়ে গেছে বলে জানায় পুলিশ। আকলিমা আক্তার চান্দিনার গোমন্তা ইসাকিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। সে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ভাবটিপাড়া গ্রামের আবতি মিয়ার মেয়ে।

গত ৩০ জুলাই (সোমবার) দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হরিণহাটি এলাকার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ট্রাকচাপায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি নিহত হন। ড্রামভর্তি ওই ট্রাকের চাপায় ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এ সময় সড়কের পাশে থাকা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও ট্রাকটি ধাক্কা দিলে অটোরিকশার দুই যাত্রী আহত হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কে মনিটরিংয়ের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কী কী কারণে দুর্ঘটনা হতে পারে সেগুলো এখনও বের করা হয়নি।’

মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা হলে আমরা খুব টেনশনে থাকি।  কারণ, একটি দুর্ঘটনা মানে  মানুষের জীবনের, পরিবহন ও মালিকের অনেক ক্ষতি। এটা আমরা কোনোদিনও চাই না। ’

তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা কেন ঘটছে, সেটি খুঁজে বের করা দরকার। যেসব স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, আমি সেসব স্থানে যাবো এবং কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবো। ’

 

/এসজেএ/এপিএইচ/

x