‘আমি এখনও স্বপ্নবাজ তরুণদের দেখতে পাই’

নিয়াজ আলম ১৭:০৩ , আগস্ট ১০ , ২০১৮

ড. শহিদুল আলম (ফাইল ফটো)

দৃক, ছবি মেলা এবং পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শহিদুল আলম বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি ও সংস্কৃতিতে অনেক অবদান রেখেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ‘কীভাবে আপনি এতকিছু পারেন?’ তার উত্তর ছিল- ‘আমি এখনও তরুণদের চোখে স্বপ্ন দেখি’।

লন্ডনে কমনওয়েলথ পিপলস সামিটের একটি প্রদর্শনীতে তার সঙ্গে দেখা করে এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া। সদা হাস্যোজ্জ্বল ও কথা বলার মেজাজে এই মানুষটি সেদিন খুবই ব্যস্ত ছিলেন। দক্ষিণ কেনসিংটনের সাইন্স মিউজিয়ামে দেখা মেলে তার। হাতে তখনও ক্যামেরা। জাদুঘরের কিউরেটরের সঙ্গে প্রদর্শনী নিয়ে কথা বলছেন। ভারতীয় ফটোগ্রাফির ১০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে সাজানো হয়েছিল প্রদর্শনীটি। পরের দিনই তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা। জাতিসংঘের সামনে মানবাধিকার নিয়ে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার অংশ হিসেবে জেনেভায় যাচ্ছিলেন তিনি। সেই সপ্তাহেই অ্যামস্টারডামে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা। তবে এই শত ব্যস্ততার মাঝে ঠিকই একটু কথা বলার সময় বের করে নিলেন। ধৈর্য নিয়ে বসলেন আমার সঙ্গে।

কমনওয়েলথ পিপলস সামিটে আপনার সংশ্লিষ্টতা কী নিয়ে?

শহিদুল আলম: এ নিয়ে দ্বিতীয়বার আমি এই কাজটির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছি। ‍দুই বছর আগে মাল্টায় কল্পনা’স ওয়ারিয়র্স নামে এক প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আমি তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করি। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কড়া নিরাপত্তার কারণে জনসাধারণ এই প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পারছে না।

আর এটা সত্যি যে কমনওয়েলথের বিষয়টা ব্যাখ্যা করা একটু কঠিনই। একজন পাকিস্তানি নারী বলেছিলেন, ‘আমরা যারা সবাই লুটের শিকার হয়েছিলাম তাদের একত্রে রাখে কমনওয়েলথ’

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আপনি কার কাছে দায়বদ্ধ?

শহিদুল আলম: প্রত্যেকেরই নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকা উচিত। এটাই সবচেয়ে জরুরি। আর নাগরিক হিসেবে অবশ্যই আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে আমাদের অনেক সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে অনেক সম্ভাবনাও। আমরা সাংস্কৃতিকভাবে খুবই সমৃদ্ধ। এর শিল্প অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। আর সেজন্যই আমি আমার কাজ করে যাই। 

ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী হলেন কীভাবে?

শহিদুল আলম: আমার মনে হয়, এটাতে আমার কৌতূহল ছিল বেশ। এর বৈশিষ্ট্যগুলো আমাকে আকৃষ্ট করতো। আমার ক্যামেরা ছিল না। সেটা পাওয়ার গল্পটাও মজার। লন্ডনে যখন আমি পিএইচডি করছিলাম তখন ফ্রেডি লেকার নামে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাদের লেকার এয়ারওয়েজের কথা জানান। সেটা ছিল প্রথম সারির এয়ারলাইন। ৯০ পাউন্ড খরচ করে টিকিট নিই আমি। যখন আমি স্কাইট্রেনে চড়ার অপেক্ষায় তখন এক বন্ধু জানায়, আমেরিকায় সস্তায় ক্যামেরা পাওয়া যায় এবং আমি যেন তার জন্য একটা নেই।

এরপর নিউইয়র্কে গিয়ে আমি একটি নিকন ক্যামেরা, ট্রাইপড, লেন্স ও ফ্ল্যাশগান কিনি। আমার কাছে স্লিপিং ব্যাগ ও তাঁবু ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কিছু জায়গা ঘুরে ছবি তুলতে থাকি। এরপর ফিরে আসি লন্ডনে। তবে তখন আমার বন্ধুটি জানায় তার কাছে ক্যামেরা কেনার টাকা নেই, আমিই যেন সেটা রেখে দেই। দুর্ঘটনাবশতই তাই ক্যামেরাটি আমারই হয়ে যায়।

অধিকারকর্মী হিসেবে কীভাবে কাজ শুরু করলেন?

শহিদুল আলম: যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সময় আমি সোশালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তাদের কার্যক্রমেই মূলত প্রভাবিত হই আমি। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে সবসময় সম্মানজনক একটি চাকরির জন্য চাপ দেওয়া হতে থাকে। আমি লাইফ সাইন্স নিয়ে আগ্রাহী ছিলাম। সেটা নিয়েই অনেকদূর পড়াশোনাও করেছি। কিন্তু যখন পিএইড করছিলাম তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে আমার দেশের কি সত্যিই আরেকজন রসায়নবিদ দরকার?

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি নিয়ে আপনার কোনও পরিকল্পনা আছে?

শহিদুল আলম: হ্যাঁ। ১৯৯৩ সালে আমি ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’র জন্য গবেষণা করছিলাম। সে সময় পল্টনে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করার একটি বিখ্যাত ছবি আমার সামনে আসে। ছবিটি তুলেছিলেন রশিদ তালুকদার। আমি রশিদ ভাইকে বোঝাতে সক্ষম হই যে এটা আমাদের ইতিহাসের অংশ। সবাইকে এটা জানানো উচিত।

আদালতে শহিদুল আলম

১৯৭১ সালে অনেক বাংলাদেশি ছবি তুলেছিল। কিন্তু আমাদের দেখার সুযোগ হয়নি। আমরা পশ্চিমা ফটোগ্রাফারদের ছবিই দেখছিলাম। কারণ সেগুলো মূলধারার ছিল। বাংলাদেশি ফটোগ্রাফাররা সুযোগ পায়নি। একথা ভেবেই আমি তাই সারাবিশ্ব থেকে এমন সব ছবি সংগ্রহ করার কাজে নেমে পড়ি।

দৃক তৈরির চিন্তা আমার অনেকটা সেখান থেকেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫তম বার্ষিকীতে এই সংগঠনটির পথচলা। স্থানীয়রা যেন নিজের ছবি দিয়ে গল্প বলতে পারে সেজন্যই এর প্রতিষ্ঠা। আমরা ছবি দিয়ে ক্যালেন্ডার তৈরির উদ্যোগ নিই। তখনই মূলত আমরা বাংলাদেশি কাজ সংগ্রহ করতে শুরু করি। আর এখন আমাদের সংগ্রহে আসলেই ১৯৭১ সালের সবচেয়ে ভালো ছবিগুলো আছে।

আমি এখন চেষ্টা করছি বাংলাদেশেই ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আবার আয়োজন করতে। কারণ, সবকিছু বাদ দিলেও আমরা রিঙ্গো স্টার লিওন রাসেল, জোয়ান বায়েজ, বব ডিলান, বিল প্রেস্টনসহ বাকিদের কাছে ঋণী। আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছিলেন রবি শংকর। কিন্তু এখন সেটা আয়োজন খুবই কঠিন। কপিরাইটসহ বেশ কিছু জটিলতা আছে। তিনি এখন বেঁচে নেই। তাই আমার মনে হয় না এটা আবার সামনে আনা যাবে।

আমার মনে হয় স্বাধীনতা যুদ্ধে এই শিল্পীদের অবদানের জন্য আমরা বিশ্বের কাছে ঋণী। তাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে ও আমাদের এই ইতিহাস তুলে ধরতে এই আয়োজন আবার করা দরকার। 

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিয়ে আপনার মতামত কী?

শহিদুল আলম: আমার মনে হয়, জাদুঘর থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সংগ্রহে থাকা জিনিসপত্র গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি জানি না তাদের কিউরেটাল নীতি কি। আমি দেখেছি অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদরা দ্বিধান্বিত থাকেন। বলা হয়ে থাকে, ‘ঈশ্বর অতীত পরিবর্তন করতে পারেন না। কিন্তু ইতিহাসবিদরা পারেন।’

শহিদুল আলমের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন নিয়াজ আলম

 আপনার আদর্শিক অবস্থান কী?

শহিদুল আলম: এখনকার একমাত্র রাজনীতি হচ্ছে পুঁজি। আমাদের আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা জামাত বড় চারটি দলই ডানপন্থী। দেশের জন্য আমার নিজের ভূমিকা নিয়ে বেশ কয়েকবার আমি চিন্তা করেছি। অবশ্যই এটা আমার দেশ।। আমি নিজেকে বৈশ্বিক নাগরিক ভাবলেও আমার পরিচয় আমি একজন বাংলাদেশি। আমার দেশ আমাকে অনেক দিয়েছে। আমি অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি এখানে। আমার চিন্তা করতে হচ্ছে না আগামীকাল আমার পেটে ভাত জুটবে কিনা। এই নিশ্চয়তাই তো দেশের কাছে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমি অনেকভাবে ঋণী।

আপনি এখন কাজ চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ কীভাবে পান

শহিদুল আলম: আমি যখন পড়াই বা শেখাই তখন তরুণদের সাথে কাজ করতে হয়। আর দেশে যত সমস্যাই থাক না কেন আমি তরুণদের মাঝে স্বপ্ন দেখতে পাই। তারা এখনও বিশ্বাস করে যে পরিবর্তন সম্ভব। আমি তরুণদের চোখে এখন ক্রোধ দেখি, আশা দেখি। আর এজন্যই আমার মনে হয় আমরা দেশ গঠনের সঠিক পথে আছি।

নিয়াজ আলম ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদনা পরিষদের একজন সদস্য। তিনি একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। ১৯৯২ সাল থেকে করপোরেট দায়বদ্ধতা ও এথিকাল বিজনেস নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ২০০১-১০ সাল পর্যন্ত লন্ডন পেনশন্স ফান্ড অথরিটির বোর্ড সদস্য ছিলেন নিয়াজ আলম। এছাড়া ওয়ার অন ওয়ান্টর ভাইস চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

/এমএইচ/এমওএফ/

x