ধেয়ে আসছে ‘সুন্দর পাখার প্রজাপতি’, লক্ষ্য হতে পারে বাংলাদেশও

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ২০:৩৮ , অক্টোবর ১০ , ২০১৮

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এগিয়ে আসছে তিতলি ঝড়

ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র প্রভাবে সাগর উত্তাল। বাড়ছে বাতাসের গতিবেগ। ‘সুন্দর পাখার প্রজাপতি’ নামের অর্থ হলেও তিতলিকে সম্ভব হলে এড়াতে চাইছে বাংলাদেশ। কিন্তু, তারপরেও পাখা নয় যেন থাবা মেলে ধরতেই বাংলাদেশ বা এর খুব কাছের ভারতের ওডিশা রাজ্যের গোপালপুর দিয়ে স্থলভাগে উঠতে পারে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা জলের পাখার প্রজাপতি তিতলি। তবে

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কায় দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত ও নদী বন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর। পাশাপাশি সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, বুধবার বেলা সাড়ে ৩টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সকল অভ্যন্তরীণ রুটে নৌ চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

আবহাওয়া অফিসের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তিতলি সামান্য পশ্চিম দিকে সরছে। তাই সবকিছু মিলিয়ে এখনই বলা যাচ্ছে যে এটি বাংলাদেশে আসবে। এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে উত্তর-পশ্চিম দিকে ওডিশার কাছাকাছি গোপালপুর দিয়ে উপকূলের কাছাকাছি আসতে পারে। সেখান থেকে একটু মোড় নিয়ে বাংলাদেশেও আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঘূর্ণিঝড় এখনও অনেক দূরে, এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটতে পারে। ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে চলার পথে বারবার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে বলে তারা জানান।  

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড়টি সামান্য উত্তর দিকে সরে গিয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। বুধবার সকালে ঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৪৫ কিলোমিটার দূরে থাকলেও দুপুরের পর তা এগিয়ে বন্দর থেকে ৯১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছে। একইভাবে কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে সকালে ৯০০ কিলোমিটার দূরে থাকলেও এখন তা ৮৭০ কিলোমিটার দূরত্বে এসে অবস্থান করছে। মংলা সমুদ্রবন্দরের ৮১৫ কিলোমিটার থেকে এগিয়ে ৭৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছে। এছাড়া পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে এটি সকালে ৮১৫ কিলোমিটার দূরে থাকলেও এখন তা এগিয়ে এসে ৭৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। একইসঙ্গে এটি ভারতের ওডিশা ও অন্ধ্র উপকূলের দিকেও এগোচ্ছে বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানায়।

আবহাওয়াবিদ এক এম রুহুল কুদ্দুছ জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর বিক্ষুব্ধ থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে চার নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসে গতিবেগ ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১১০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবল আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর বিক্ষুব্ধ।

এদিকে তিতলির প্রভাবে মঙ্গলবার রাত থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড়োবৃষ্টি ও বাতাস বইতে শুরু করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছে। কমে গেছে তাপমাত্রা। আজ ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সামান্য বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা বাতাস যেন আসন্ন শীতের আগমনকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামের অধিকাংশ জায়গা, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায়, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, ঝড়ের প্রভাবে ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলগুলোর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ ঝড়োহাওয়া বয়ে যেতে পারে। এইসব এলাকার নদী বন্দরগুলোকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এছাড়া অন্য এলাকার নদী বন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

জানা যায়, বিকেল পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামে ৬৬ মিলিমিটার। এরপর কুতুবদিয়ায় ৪৬ মিলিমিটার, হাতিয়ায় ৪৪ মিলিমিটার, রাঙ্গামাটিতে ৩৬ কিলোমিটার, কক্সবাজারে ২৯ মিলিমিটার, সীতাকুণ্ডে ২৮ মিলিমিটার, সন্দ্বীপে ২০ মিলিমিটার, মাইজদীকোর্টে ১৪ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ঢাকা, কুমিল্লা ও চাঁদপুরে সামান্য বৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে ঝড়ের কারণে বুধবার বেলা সাড়ে ৩টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব অভ্যন্তরীণ রুটে নৌ চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। বিআইডব্লিউটিএ’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় তিতলি ধেয়ে আসার কারণে এরইমধ্যে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখানো হয়েছে। এর ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ নদীবন্দরগুলোতে বৈরি আবহাওয়া বিরাজ করছে। ফলে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব অভ্যন্তরীণ রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। এরইমধ্যে সব নৌবন্দরগুলোতে এ নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) অধীন জাতিসংঘের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরে অবস্থিত বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং ওমান মিলে গঠিত সংস্থা এস্কেপ ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়ে থাকে। তিতলি’ নামটি পাকিস্তানের দেওয়া। তিতলি অর্থ, সুন্দর পাখার প্রজাপতি।

এছাড়া চার নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেতের অর্থ হলো বন্দর ঘূর্ণিঝড় কবলিত। কিন্তু, ঘূর্ণিঝড়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার মতো তেমন বিপজ্জনক সময় এখনও আসেনি।

আমাদের উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খোলাপণ্য খালাস বন্ধ

চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। লাগাতার বৃষ্টিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে জনজীবনে। তবে বুধবার (১০ অক্টোবর) বিকাল থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকায় এই স্থবিরতা কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে।পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হওয়া আশঙ্কায় বহির্নোঙরে খোলাপণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা শ্রীকান্ত কুমার বসাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চট্টগ্রামের আকাশ আংশিক মেঘাচ্ছন্ন থাকাবে। সেই সঙ্গে অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ঝড়ো ও ধমকা হাওয়া আকারে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বা তার চেয়েও অধিক বেগে প্রবাহিত হতে পারে।বুধবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

বৈরী আবহাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গম, সার চিনি জাতীয় খোলাপণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। তবে বন্দরের জেটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় বহির্নোঙরে খোলাপণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। বুধবার সকাল থেকে এটি বন্ধ রাখা হয়। তবে বন্দরের জেটিতে সব ধরনের পণ্য খালাস স্বাভাবিক রয়েছে।’

অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় তিতলিকে কেন্দ্র করে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি বুধবার নগরীর মতিঝরনা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত দু’দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। লাগাতার বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটনা ঘটতে পারে এই আশঙ্কা থেকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে তাদের সরে যেতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। বুধবার আমরা মতিঝরনা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছি। ওইসব এলাকায় বসবাসকারীদের লালখান বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিতে বলা হয়েছে।’

তিতলি পর্যবেক্ষণে খুলনায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, ২৪২ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত

খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনা জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা বুধবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলার ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সভায় জানানো হয়, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় তিতলির কারণে আবহাওয়া দফতর মোংলা ও পায়রা বন্দরকে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় খুলনা জেলায় দুই শ’ ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা ও উপজেলায় মেডিক্যাল টিমের সদস্যরা প্রস্তুত আছেন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, সরকারি, বেসরকারি সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা সর্তক আছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। খুলনা জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের টেলিফোন নম্বর ০৪১-৭২০৩৬৯।

সভায় জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি দফতরগুলো তাদের প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরে। যেকোনও সম্ভাব্য দুর্যোগে সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে উদ্ধার কার্যক্রম, ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় খুলনা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জিয়াউর রহমান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ারদারসহ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বরিশালের সব নৌযান বন্ধ, সমুদ্র বন্দরে ৪ নম্বর সংকেত

বরিশাল প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে বৈরী আবহাওয়ার জন্য বরিশাল নদী বন্দর থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এখানকার নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। এ নির্দেশের ফলে বরিশাল সদর ঘাট থেকে বরিশাল টু ঢাকা নৌযানসহ দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নদীপথে ছোট-বড় সকল প্রকার লঞ্চ, ট্রলার, পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে।

বরিশাল নদী বন্দরের পোর্ট অফিসার মো.মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দেশের প্রায় সর্বত্রই নদীপথে নৌযান বন্ধ রাখা হয়েছে। আবহাওয়া অফিসের সিগন্যাল অনুযায়ী ঢাকা থেকে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাব কেটে গেলে আবহাওয়া অফিসের সিগন্যাল অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে সমুদ্র বন্দরে ৪ নম্বর আর নদী বন্দরে ২ নম্বর সর্তক সংকেত দেখানো হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় তিতলি আগামীকাল ভারতের উডিশা দিয়ে বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে আবহাওয়া অফিস সূত্র আরো জানায়,উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড় হাওয়ার পাশাপাশি ভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। এদিকে সকাল থেকেই দিনভর বরিশাল নগরীতে হালকা বৃষ্টিপাতসহ মেঘলা আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন রয়েছে।

পটুয়াখালী-ঢাকা লঞ্চ চলাচল বন্ধ, পায়রায় ৪ নম্বর সংকেত

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে পটুয়াখালীতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে মৃদু বাতাস বইছে। কমেছে ভ্যাপসা গরম। কিছুটা শীত অনুভূত হচ্ছে। পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখানো করা হয়েছে। সাগর উত্তাল রয়েছে।

পটুয়াখালী নদী বন্দরের একজন কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বুধবার (১০ অক্টোবর) বিকালে এখানকার নদী বন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখানোয় পটুয়াখালী থেকে ঢাকাগামী ডাবল ডেকার লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৪ নম্বর সংকেত দেখানো হয়েছে।

বাগেরহাটে আতঙ্ক, মোংলায় জাহাজ আগমন--নির্গমন বন্ধ

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় তিতলি ধেঁয়ে আসায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মানুষদের মধ্যে। মোংলা বন্দরে বিদেশি জাহাজ আগমন ও নিগর্মন বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বুধবার (১০ অক্টোবর) দুপুর থেকে জেলার সব অঞ্চলে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। কখনো কখনো দমকা হাওয়ার সঙ্গে মুশলধারেও বৃষ্টি হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় তিতলির তাণ্ডব মোকাবেলায় বুধবার বিকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত শরণখোলা,মোংলা,মোড়েলগঞ্জ ও রামপালের স্থানীয় প্রশাসন,ফায়ার সার্ভিস,মেডিকেল টিম ও রেড ক্রিসেন্টসহ জেলায় ২৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরে বিশেষ সতর্ক বার্তা অ্যালার্ট-২ ঘোষণা করেছে। ঘূর্ণিঝড় সতর্কতার কারণে মোংলা বন্দরে বিদেশি জাহাজ আগমন ও নিগর্মন বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে সকল লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। এদিকে বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়ছে বিশাল বিশাল ঢেউ। সুন্দরবনের সকল পর্যটকদের ও সুন্দরবনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার মো. দুরুল হুদা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত জারির পর বুধবার দুপুরে প্রস্তুতিমূলক সভা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরে ঘোষণা করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট-২। ঘূর্ণিঝড় সতর্কতার কারণে বন্দরে বিদেশি জাহাজ আগমন ও নিগর্মন বন্ধ রাখা হয়েছে। জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে বন্দর জেটিতে অবস্থানরত সকল বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস কাজ দ্রুত শেষ করা হচ্ছে।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সর্তকতা হিসেবে সুন্দরবনের সকল পর্যটককে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। সুন্দরবনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। বন বিভাগের সকল নৌযান নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় তিতলি মোকাবেলায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে উপকূলের সব আশ্রয়কেন্দ্র। সকল সরকারি কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কাজী আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলের লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে আনা, তাদের আশ্রয়,খাবার,ওষুধের ব্যবস্থাসহ নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপকূলে বাস করা লোকজনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ এবং সাগরে থাকা মাছ ধরা নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভোলায় নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল

ভোলা প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’র প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভোলা সংলগ্ন মেঘনা ও তেতুলিয়া নদী। মেঘনা নদীর পানি বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার সর্বত্র গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।ভারি বর্ষণও হয়েছে। ভোলাসহ উপকূলীয় এলাকায় ৪ নম্বর বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বুধবার দুপুরে জরুরি প্রস্তুতি সভা করেছে জেলা প্রশাসন।

প্রস্তুতি সভায় ভোলার সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সকল যাত্রীবাহী,পণ্যবাহী ও মাছ ধরার নৌ-যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় মেডিক্যাল টিম ও জরুরি উদ্ধার কাজে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। সকাল থেকেই ভোলার প্রায় ৫০০টি সাইক্লোন সেল্টারকে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক জানান, ভোলা সদরসহ ৭টি উপজেলায় কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সকাল ভোলার প্রায় ৫০০টি সাইক্লোন শেল্টারকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। 

/এসএনএস/এসএস/এমএএ/টিএন/

x