একটি ইয়াবার চালান এবং কয়েকজন পুলিশ!

নুরুজ্জামান লাবু ২২:০৭ , অক্টোবর ১২ , ২০১৮

এএসআই আলম সোহরাওয়ার্দী রুবেল৫০ হাজার পিসের একটি ইয়াবার চালান এসেছিল টেকনাফ থেকে। দুই মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সেই চালানের মধ্যস্থতা করে দিয়েছিলেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। গোপনে মাদক ব্যবসায়ীর ফোনের সেই আলাপচারিতা জানতে পেরেছিলেন আরেক পুলিশ কর্মকর্তা। বিষয়টি তিনি জানিয়ে দেন তার আরেক সহযোগী পুলিশ কর্মকর্তাকে। তিনি  নারায়ণগঞ্জের মদন এলাকা থেকে ইয়াবার চালানসহ দুজনকে আটক করে নিয়ে যান নিজের বাসায়। ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের এক ডিআইজিকে এ খবর জানিয়ে দেয় সেই মাদক ব্যবসায়ী। পরে গোয়েন্দা পুলিশ গিয়ে ইয়াবার চালানসহ সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করে। একে একে গ্রেফতার হন আরও চার পুলিশ কর্মকর্তা।  আর এভাবেই বেরিয়ে আসে মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর কাহিনী।
এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম টিম চক্রটির ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের  মধ্যে পুলিশ সদস্য রয়েছেন পাঁচ জন। গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে ১০ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন— তারা আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।একই সঙ্গে টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালানটি যে পাঠিয়েছিল, তাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা একটি ইয়াবার মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুরো চক্রটির সন্ধান পেয়েছি। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। যে কোনও দিন আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে।’

সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মুন্সীগঞ্জের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম আরিফ ওরফে বাবা আরিফ নামে এক ব্যক্তি। তার স্ত্রী সাবিনা আক্তার রুনুও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। মাদক ব্যবসায়ী এই পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল একসময় মুন্সীগঞ্জের জেলা পুলিশে কর্মরত এসআই বিল্লালের। বদলী হয়ে মাদারীপুর হাইওয়ে পুলিশে যোগদান করলেও বাবা আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে কারাগারে ছিলেন মাদক ব্যবসায়ী বাবা আরিফ। অসুস্থতার কারণে তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে প্রায়ই আরিফের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন এসআই বিল্লাল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান,এসআই বিল্লালের সঙ্গে অনেক মাদক ব্যবসায়ীর যোগাযোগ ছিল। সেই যোগাযোগের সূত্র ধরেই তিনি আরিফকে টেকনাফ থেকে আসা ৫০ হাজার পিস ইয়াবার চালান গ্রহণ করার কথা বলে। আপাতত পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হবে জানালে আরিফ সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় এবং তার স্ত্রী রুনুকে ইয়াবার চালানটি গ্রহণের নির্দেশ দেয়। গত ৭ মার্চ দুপুরে এসআই  বিল্লাল ও মৌসুমী নামে তার আরেক সহযোগীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মদন বাসস্ট্যান্ডে সেই ইয়াবার চালান গ্রহণ করতে যায় আরিফের স্ত্রী রুনু। ইয়াবার চালানটি নিয়ে এসেছিল পেশায় ট্রাকচালকের সহযোগী রহমান নামে এক ব্যক্তি।

এদিকে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন মাদক ব্যবসায়ী আরিফের ফোনে আড়ি পেতে ছিলেন ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের তৎকালীন এএসআই  হাসানুল হক হাসান। হাসান মাদক ব্যবসায়ী আরিফের ইয়াবা চালান আসার কথা জানতে পারলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের না জানিয়ে তিনি বিষয়টি  জানিয়ে দেন নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত তার ব্যাচমেট এএসআই আলম সোহরাওয়ার্দী রুবেলকে। এএসআই রুবেল তাৎক্ষণিক কাওসার আহমেদ রিয়েল নামে এক সোর্সকে সঙ্গে নিয়ে চলে যান বন্দর থানাধীন মদন বাসস্ট্যান্ডে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ রুনু এবং রহমান নামে এক যুবককে আটক করেন। রুনুর সঙ্গে থাকা এসআই  বিল্লাল ও মৌসুমী পুলিশের অভিযান টের পেয়ে সটকে পড়ে সেখান থেকে।

সূত্র জানায়, এএসআই রুবেল ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের না জানিয়ে গ্রেফতার দুজনকে নিয়ে যান বন্দর উপজেলার রূপালী আবাসিক এলাকায় তার নিজের বাসায়। এদিকে পুলিশের হাতে রুনু ও রহমানের গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি এসআই বিল্লাল মাদক ব্যবসায়ী আরিফকে জানিয়ে দিয়ে মাদারীপুরে চলে যান। আরিফ বিষয়টি জানায় নরসিংদীর বেলাবো থানায় এক সময়ে কর্মরত এসআই মোর্শেদকে। মোর্শেদও একসময় মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন, সেখানেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। আরিফের কাছ থেকে জানতে পেরে এসআই মোর্শেদ ইয়াবার চালান গ্রহণকারী রুনুকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। এজন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকাও দেওয়া হয় এএসআই  রুবেলকে। কিন্তু রুবেল টাকা নিলেও ইয়াবার চালান ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। এনিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মাদক ব্যবসায়ী আরিফ মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা পুলিশের এক ডিআইজিকে পুরো ঘটনাটি জানিয়ে দেয়। সেই ডিআইজি বিষয়টি তাৎক্ষণিক জানান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে। ডিআইজিকে অবহিত করার বিষয়টিও ফোনে আড়ি পেতেই জেনে যান এএসআই  হাসানুল। তাৎক্ষণিক তিনি তা জানান এএসআই  রুবেলকে। নিজে বাঁচতে রুবেল এবার  ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি দ্রুত নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসিকে জানান। কিন্তু তিনি জব্দ করা ইয়াবার সংখ্যা বলেন মাত্র পাঁচ হাজার। এছাড়া, কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি বলেও ওসিকে মিথ্যা তথ্য দেন। এর আগেই তার সঙ্গে যোগ দেন সদর থানার আরেক কনস্টেবল আসাদ।

অন্যদিকে, ডিআইজির নির্দেশ পেয়ে নারায়ণগঞ্জের এসপি সঙ্গে সঙ্গে জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে নির্দেশ দেন— দ্রুত এএসআই  রুবেলের বাসায় অভিযান চালানোর। গোয়েন্দা পুলিশ সেখান থেকে এএসআই  রুবেল ও সাবিনা আক্তার রুনুকে গ্রেফতার এবং ৪৯ হাজার ইয়াবা জব্দ করে। অভিযানের আগেই ঘটনাস্থল থেকে সটকে পরেন এসআই মোর্শেদ। তার আগে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয় ইয়াবা সরবরাহকারী রহমানকে। গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কনস্টেবল আসাদ পালিয়ে যান।

সিআইডি সূত্র জানায়, ঘটনার পর দিন গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর মাসুদ বাদী হয়ে মাদক ব্যবসায়ী আরিফ, তার স্ত্রী রুনু, এএসআই  আলম সোহরাওয়ার্দী রুবেল ও তার সোর্স কাওসার আহমেদ রিয়েলকে আসামি করে মামলা (নম্বর ২৪) দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডির অর্গানইজড ক্রাইম ইউনিটকে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রুনু ও এএসআই  রুবেলকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ, প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসন্ধান করে ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা থেকে প্রথমে গ্রেফতার করেন ইয়াবার চালান নিয়ে আসা রহমানকে। রহমান জানায়, সে হাসানুল ইসলাম ওরফে বেলাল নামে এক ট্রাকচালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তার ট্রাকে নিয়মিত টেকনাফ থেকে লবণ আনার আড়ালে ইয়াবা আনা হতো। ইয়াবার চালানগুলো পাঠাতো টেকনাফের শফি ইসলাম ওরফে শফিক নামে এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। রহমানের দেওয়া তথ্য মতে, ট্রাকচালক বেলাল ও তার আরেক সহযোগী জয়নাল আবেদীন ছোটনের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে তদন্তকারীরা জানতে পারেন যে, তারা অন্য একটি মাদক মামলায় জেলে রয়েছে। পরে তাদের শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর পর ৩০ এপ্রিল রিমান্ডে আনা হয়। ড্রাইভার বেলাল, ছোটন ও রহমান তিন জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এএসআই  আলম সোহরাওয়ার্দী রুবেলের দেওয়া তথ্য মতে, গত  ৮ মে সোর্স কাওসার আহমেদ রিয়েলকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তারপর একে একে ১৫ মে রাজবাড়ী থেকে হাইওয়ে পুলিশের এসআই বেলাল ও নারায়ণগঞ্জ সদর থানার কনস্টেবল আসাদকে, ২০ মে নরসিংদীর বেলাবো থানার এসআই  মোর্শেদকে এবং ৫ জুন এএসআই হাসানুল হক হাসানকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরপরই কাউন্টার টেরোরিজম থেকে তাকে বদলী করে ঢাকা জেলা পুলিশে পাঠানো হয়েছিল। সর্বশেষ গত সোমবার (৮ অক্টোবর) এই মামলার আরেক আসামি মৌসুমীকে মুন্সীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। গ্রেফতারের পরদিন দোষ স্বীকার করে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মেহেদী মাসুদ বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া আসামিদের মধ্যে এসআই মোর্শেদ ছাড়া বাকি সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। টেকনাফ থেকে ইয়াবাগুলো যে ব্যক্তি পাঠিয়েছে, এখন তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাকে গ্রেফতার করতে পারলেই এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।’

 

 

 

 

/এপিএইচ/

x