শুধু লিখিত নয়, মৌখিক সাহিত্য সংরক্ষণও সমানভাবে জরুরি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ১৪:১৮ , নভেম্বর ০৯ , ২০১৮



সুকুমার সেন বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাসন্তিকা’ পত্রিকায় যে আধুনিক রচনা শুরু হয়েছিল উত্তরকালে কলকাতায় তা বিস্তার লাভ করেছিল। এমন কথাই উঠে আসে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: সংকট ও উত্তরণ’ শীর্ষক আলাপচারিতায়।
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আলোচনা করেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. নিখিলেশ রায় এবং কবি ও অধ্যাপক সুমন গুণ। সেশনটি সঞ্চালনা করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মোহাম্মদ মুহসিন।
শুরুতেই সংকট নিয়ে আলোচনায় বিশ্বজিৎ ঘোষ তুলে ধরেন দীনেশ চন্দ্র সেনের কথা, যিনি প্রথম বই লেখেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে, ১৮৯০ সালে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যকে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে বলা হয়, কিন্তু ১৯০৭ সালে যখন চর্যাপদ আবিষ্কৃত হলো এক রাতের মধ্যেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পাঁচশ’ বছর পিছিয়ে গেল। দীনেশ চন্দ্রের পরে সুকুমার রায়, আর সুকুমার রায়ের পরে গোপাল হালদার। কিন্তু তাদের পরে বাংলা সাহিত্য নিয়ে আর উল্লেখযোগ্য কোনও কাজ কেউ করে যাননি। এবং টেরিটোরিয়াল বায়াসনেসের (ভূখণ্ডগত পক্ষপাত) কারণে বিহার, ত্রিপুরা, আসামের সাহিত্য উপেক্ষিত হয়ে আছে আজও।
সুমন গুণের আলোচনায় ভর করে নস্টালজিয়া। তিনি বলেন তার ছাত্রজীবনের কথা। নব্বইয়ের দশকে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখনকার সিলেবাসে রবীন্দ্র-উত্তর সময়ের কিছুই ছিল না বলতে গেলে। বিগত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের সাহিত্যের ইতিহাস একদম শূন্য। পরিতাপের বিষয় এসব সমস্যা আজও বিদ্যমান। তাছাড়া উত্তরপূর্ব ভারতের সাহিত্যের কোনও কদর নেই। ইতিহাসে তাদের জায়গা নেই কোনও।
সঞ্চালক মোহাম্মদ মুহসিন আলোচনা শুরু করেছিলেন টেরিটোরিয়াল (ভূখণ্ডগত), রিলিজিয়াস (ধর্মীয়) ও আইডোলিজক্যাল (মতাদর্শগত) বায়াসনেস বা পক্ষপাতের কথা দিয়ে। পরে বিশ্বজিৎ ঘোষ বাংলা সাহিত্যের পরিবর্তে মুসলিম সাহিত্যের ইতিহাস কিংবা হিন্দু সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা বা বায়াসনেস নিয়েও পরিতাপ করেন।
ড. নিখিলেশ রায়ের কণ্ঠে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে শঙ্কা ফুটে ওঠে। তিনি কুচবিহার রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া রাজ-সাহিত্য নিয়েও দুঃখ করেন। ইতিহাস সাহিত্যের গতিকে বুঝতে সাহায্য করে, সাহিত্যের মন্দ্রতা তৈরি করে। আমাদের প্রসিদ্ধ লৌকিক সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের পরে আর কেউ অবদান রাখেননি। লৌকিক সাহিত্য টিকিয়ে রাখতে হলে এই বিষয়ে আরও যত্নশীল হওয়া উচিত বলে নিখিলেশ রায় মত দেন।
এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব? আলোচকদের সবাই প্রায় একই দাওয়াই দেন: লিখিত সাহিত্য ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি মৌখিক সাহিত্যের সংরক্ষণও করতে হবে সমান গুরুত্ব দিয়ে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগ খুবই কাম্য। আর্থিক সহায়তাও সমভাবে দরকারি।
সেশন শেষে কবি আসাদ মান্নানের আহ্বান ছিল পূর্ণাঙ্গ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় এগিয়ে আসায়। লিখিত না হলেও মৌখিক সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করবে— এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সুন্দর সেশনটির দাঁড়ি টানেন ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ।


 

/এইচআই/

x