বেড়েছে শিশু ধর্ষণ, ৪ কারণ চিহ্নিত

উদিসা ইসলাম ১০:১০ , জানুয়ারি ১০ , ২০১৯

বেড়েছে শিশু ধর্ষণসোমবার (৭ জানুয়ারি) রাজধানীর ডেমরায় দুই শিশু নিখোঁজ হয়। অভিভাবকরা সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে এসে মেঝেতে শিশুদের স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেন। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাসায় খাটের নিচ থেকে শিশু দু’টির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেফতারের পর ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তরা জানায়, লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নাম করে শিশু দু’টিকে প্রথমে বাসায় ডেকে আনা হয়। পরে চিৎকারের মুখে ধর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে প্রথমে একজনকে গলা টিপে এবং পরে আরেকজনকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

৫ জানুয়ারি ২০১৯। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় দুই বছর ১০ দিনের একটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে টিনশেড বস্তিতে মা-বাবা ও তিন বোনের সঙ্গে থাকতো শিশু আয়েশা। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও বিকালে খেলতে বের হয় শিশুটি। সন্ধ্যার দিকে টিনশেড বস্তির পাশের চার তলা বাড়ির সামনে আয়েশার রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। আয়েশার পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ— শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

বছরের শুরুতেই একের পর এক শিশু ধর্ষণের সংবাদে সমাজ গবেষক ও মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিন বছরে শিশু ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে সহিংসতা ঘটানোর পরিমাণ। তারা মনে করেন— মাদকের যথেচ্ছ ব্যবহার, শিশু ধর্ষণ ঘটনার ‍শুরুতেই প্রশাসনের গাফিলতি, আর বিচারহীনতার কারণে বাড়ছে ধর্ষণের সংখ্যা। ধর্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় হতে হয় না বলেও এই মানসিক বিকৃতি অব্যাহত থাকে বলেও মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের ‘স্টেট অব চাইল্ড রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৭ সালে দেশে ৫৯৩টি  শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৪৪৬টি শিশু। অর্থাৎ, ওই এক বছরে শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে শতকরা ৩৩ ভাগ। ২০১৮ সালে সংঘটিত ধর্ষণের হিসাব মানবাধিকার সংগঠনগুলো এখনও প্রকাশ না করলেও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে— এবছর কেবল ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। আর  ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম ৮ দিনে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বছরের শুরুতেই ঢাকা, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাতটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমাজে অস্থিরতা, রাজনীতিতে হিংসার বহিঃপ্রকাশ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ যখন তৈরি হয়, তখন এধরনের অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। আমাদের মধ্যে বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে, এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যাওয়া সেটিরই প্রতিফলন। এ পরিস্থিতিতে নানা অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে সংখ্যাটা আমরা বলছি, সেটা প্রকৃত সংখ্যা না, প্রকৃত সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি।’ এ বিষয়ে করণীয় উল্লেখ করতে গিয়ে নূর খান বলেন, ‘আইনের শাসন কায়েম করা প্রথম এবং শেষ কাজ। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করে এবং জনগণকে সচেতন করে তুলে এ পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্ষণ যে কেবল যৌন আকর্ষণের জন্য হয়, তা নয়। কিছু লোকের মনোবিকৃতি চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে গেছে।’ শাস্তির ব্যবস্থা দুর্বল হওয়াতে অরাজকতা ও নৃশংসতা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘যারা খারাপ কাজ করে, অপরাধ করে তাদের সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত না করে, সামাজিকভাবে তাদের নিরাপত্তাবেষ্টনির মধ্যে নিয়ে উল্টো নারীকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ বিষয়টি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কেননা, এতে করে ধর্ষকরা প্রশ্রয় পেয়ে যায়।’ মাদক নিয়ন্ত্রণ না করা এবং মাদকাশক্তদের ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকাকেও দায়ী করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যুদ্ধ হোক, শান্তি হোক যখন সমাজে এধরনের ঘটনা ঘটে, তখন সমাজের ভেতরে অস্থিরতার প্রকাশ ঘটে। কোনও সময়েই ধর্ষণের ঘটনা মেনে নেওয়া নয়। কিন্তু যুদ্ধের সময়কার ধর্ষণের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। কিন্তু শান্তির সময়ের ব্যাখ্যা থাকে না।’ তিনি আরও  বলেন, ‘আমরা সভ্য হচ্ছি বটে, সংখ্যা দিয়ে অনেক সূচকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যতক্ষণ সামাজিক এ রোগ নিরাময় সম্ভব হচ্ছে না, ততক্ষণ আমরা নিজেদের সভ্য দাবি করতে পারি না। শুধু আইন দিয়ে এটি নিরাময় সম্ভব না, আমাদের মাইন্ডসেটের পরিবর্তন জরুরি।’

 

/এপিএইচ/

x