নিয়মিত ভায়া টেস্ট কমাবে জরায়ুমুখের ক্যানসার

তাসকিনা ইয়াসমিন ১৮:৫০ , জানুয়ারি ১১ , ২০১৯





জননীর জন্য পদযাত্রা

জরায়ুমুখের ক্যানসার একটি যৌনবাহিত রোগ। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। চিকিৎসকরা বলছেন, এই ভাইরাসটি প্রতিরোধ করতে পারলে জরায়ুমুখের ক্যানসার থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। 

বিশ্বে জরায়ুমুখের ক্যানসারে নারী মৃত্যুর হারে বাংলাদেশের অবস্থান  দ্বিতীয়। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রতিবছর পাঁচ লাখ ২৮ হাজার নারী জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন দুই লাখ ৬৬ হাজার জন। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে মারা যান ৮ হাজার ৬৮ জন নারী, যা মোট ক্যানসারে মৃত্যুর ১২ ভাগ।

প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবার দিনটিকে জরায়ুমুখের সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এবছরও শনিবার (১২ জানুয়ারি) এই দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
ক্যানসারবিরোধী মোর্চা ‘মার্চ ফর মাদার’ ও ‘আন্তর্জাতিক রোটারি জেলা ৩২৮১’-এর  সমন্বয়ক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’ নামে আমরা এই দিবসে শোভাযাত্রার আয়োজন করি। সারাদেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এতে অংশ নেন।  
তিনি বলেন, ‘আমাদের নারীরা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংকোচের কারণে স্তন বা জরায়ুর কোনও সমস্যা দেখলে, তা বলতে চান না। তারা যখন এই রোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসেন, তখন আর তাদেরকে বাঁচানোর কোনও উপায় থাকে না। সে জন্যই আমরা বলে থাকি— একজন নারী তার স্তন বা জরায়ু নিয়ে কেন লজ্জা পাবেন। একজন নারী তার জরায়ুতে সন্তান ধারণ করেন। তিনি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রথম তার সন্তানকে বুকের দুধ দেন এবং পুষ্টি দেন। তাহলে, নারীর তো এই দুই স্থান তার সবচেয়ে গর্বের স্থান। তিনি কেন এই অঙ্গ দুটি নিয়ে লজ্জা করবেন। নারীর এই অঙ্গ দুটিতে কোনও সমস্যা দেখা দিলে— অবশ্যই তাকে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।’

ডা. রাসকিন বলেন, ‘পুরুষের ক্ষেত্রে আমরা বলি— নারীর প্রতি পুরুষের রয়েছে জন্মঋণ। প্রত্যেক পুরুষ নারীর গর্ভ থেকে এসেছে। মায়ের ঋণ-তো কোনোভাবেই শোধ করা সম্ভব না। আমরা বলি যে, মায়ের জরায়ুর কাছে যে জন্মঋণ আছে, সেটার জন্যই তাদের এই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা করা দরকার। এটা যুদ্ধ করার একটা বিষয় এবং এটি প্রাথমিকভাবে ধরা পড়লে এই যুদ্ধ জয় করা সম্ভব।’ 
ক্যানসার প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মোসাররত জাহান সৌরভ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিশোরী বয়সে জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রতিরোধের ভ্যাকসিন নিলে এবং কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললে, এটা  প্রতিরোধ করা সম্ভব। কেবল বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেও অনেক নারীকে এই রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। জরায়ুমুখ এবং স্তন ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ভালো হয়ে যায়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা। আমরা চাই, মানুষ এই রোগটি সম্পর্কে সচেতন হোক।’ 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জরায়ুমুখের ক্যানসার হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) কারণে হয়। এটি জরায়ুতে না গেলে কোনোভাবেই ক্যানসার হবে না। জন্মের সময়  কোনও নারী এই ভাইরাস শরীরে করে নিয়ে আসে না। ভাইরাসটি অবশ্যই শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে জরায়ুতে আসে। পুরুষ নিজে আক্রান্ত হওয়ার পর নারী তার শরীরে গ্রহণ করে। শরীরের নিজস্ব রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভালো হলে ক্যানসারের সেল মারা যায়। কিন্তু যেসব নারী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মানেন না, বেশি সন্তান জন্ম দেন এবং গরিব নারীরা বেশি সংখ্যায় এই রোগের ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া, যাদের স্বামী বহুগামিতায় লিপ্ত সেই নারীরাও এই রোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।’

ডা. কাজল বলেন, ‘আমরা বারবারই বলছি— এটা যৌনবাহিত ভাইরাস। কোনও নারী যদি শুধু তার স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন, তাহলে বুঝতে হবে যে, অবশ্যই এটি অন্য কোনও নারীর কাছ থেকে তার স্বামী বহন করেছেন। কিংবা, কোনও পুরুষ যদি বলেন যে, তিনি শুধু তার স্ত্রীর সঙ্গেই শারীরিক সম্পর্ক করেছেন, তাহলে অবশ্যই তার স্ত্রী অন্য কোনও পুরুষের কাছ থেকে এই ভাইরাস পেয়েছেন।’ 
জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কারও যেন বহুগামিতার স্বভাব না থাকে। বাল্যবিয়ে যেন না হয়। কেননা, ১৫-১৬ বছর না হলে নারীর জরায়ু মুখের কোষগুলো পরিপক্ক হয় না। তাই বাল্যবিয়েকে আমরা না বলছি। অপরিণত বয়সে বিয়ে হচ্ছে যাদের বা সন্তান হচ্ছে, তখন তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা কম থাকে। তাই, আমরা অল্প বয়সে বিয়ে এবং যৌন সম্পর্ককে না বলছি। এছাড়া, যে নারীর বিয়ে হয়েছে তিনি তিন বছর পর পর ভায়া টেস্ট করাতে পারেন। এই টেস্টটি জরায়ুমুখে এসিটিক এসিড ও লিটমাস পেপার দিয়ে করানো হয়। দেখা হয় যে, রং পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। রেজাল্ট যদি পজিটিভ হয়, তাহলে ওই নারীকে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো করাতে যাবে।’

ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন,  ‘ভায়া টেস্ট করার জন্য জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই পরীক্ষাটি তিন বছর পরপর করতেই হবে। কারণ, আমার শরীরে এই ভাইরাসটি আছে কিনা, সেটা জানা জরুরি। তাই নিজের সুরক্ষার জন্যই এই টেস্ট করাতে হবে। এই টেস্টে জরায়ু মুখের ক্যানসারের পূর্ববর্তী অবস্থাটা ধরা পড়ে।’

ভ্যাকসিন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এইচপিভি ভাইরাসের চারটি টিকা আবিষ্কার হয়েছে। এটি কিশোরী বয়সে দেওয়াটা আসল  সময়। বিয়ের আগেই এই টিকা দেওয়া দরকার। বিয়ের পর যৌন সম্পর্ক শুরু হয়ে গেলে, এই ভ্যাকসিন তেমন কাজ করবে না। কেউ ভ্যাকসিন নিলেও তাকে অবশ্যই তিন বছর পরপর পরীক্ষার মধ্যে যেতে হবে। কারণ, ভ্যাকসিন দিয়ে ৬০ ভাগ নিরাপদ থাকা যায়, বাকি ৪০ ভাগের জন্য অবশ্যই ভায়া টেস্ট করাতে হবে। উন্নত বিশ্বে ১০-১২ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী উভয়কেই এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও কেউ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছে না।’

/এপিএইচ/

x