‘শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, এটা বোঝে না মালিকেরা’

শেখ জাহাঙ্গীর আলম, আশুলিয়া থেকে ২২:২৫ , জানুয়ারি ১২ , ২০১৯

জিরাবো এলাকায় জড়ো হওয়া শ্রমিকেরা

‘সরকার আমাগো মজুরি বাড়াইছে, কিন্তু মালিকেরা আমাদের ন্যায্য মজুরি দেয় না। উল্টা মালিক বলে– বেতন যা দেয় তাতেই সন্তুষ্ট থেকে কাজ করতে হবে; না হলে চলে যেতে। আমরা শ্রমিকেরা যদি না বাঁচি, তবে এই শিল্পও বাঁচবে না। আমরা বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, দেশেরও উন্নতি হবে; কিন্তু এটা মালিকেরা বোঝে না।’

ন্যায্য বেতন-ভাতার দাবিতে শনিবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন পোশাক শ্রমিকেরা। এদিন দুপুরে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা সড়ক থেকে সরে যান। এসময় মো. শামীম নামে এক শ্রমিক বাংলা ট্রিবিউনকে উপরের কথাগুলো বলেন।

জিরাবোতে অবস্থিত হামিম গ্রুপ লিমিটেডে অপারেটর পদে চাকরি করেন মো. শামীম। গত তিন বছর ধরে এই কারখানায় তিনি কাজ করছেন বলে জানান। জিরাবোর নরসিৎহপুরের অন্ধ কলোনিতে তিনি বসবাস করেন।

শামীম বলেন, ‘শরীরের ঘাম ঝড়াইয়া আমরা প্রোডাক্টশন দিই। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ডিউটি করি। তারপর আবার রাত ১০টা পর্যন্ত ওভারটাইম করি। এরপরও মালিকপক্ষ গালাগালি করে। কথায় কথায় চাকরি থেকে বাদ দেয়। কিন্তু মালিক আমাদের ন্যায্য মজুরি দেয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার তো আমাদের মজুরি নির্ধারণ করে দিছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বেতন পাই না। কোনোমতে সংসার চালাই। কিন্তু মালিক বলে, এক টাকাও বাড়াবে না। সেই কারণেই আমরা কাজ বন্ধ করছি। এর জন্য মালিক আবার প্রশাসন ও পুলিশের ভয় দেখায়।’

এর আগে আজ ৬ষ্ঠ দিনের মতো ন্যায্য বেতন-ভাতার দাবিতে আশুলিয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এদিন বেলা ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাপুর মহাসড়কের জামগড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে যানবাহনের যাত্রীসহ ১০ শ্রমিক আহত হন।

শ্রমিকরা জানান, সরকার নির্ধারিত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন না করায় এবং এ নিয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়ায় তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দিতে ধাওয়া দেয়। এসময় তাদের অন্তত ১০-১৫ জন শ্রমিক আহত হন। যদি মালিকপক্ষ তাদের ন্যায্য মজুরি না দেয়, তবে তারা কাজ বন্ধ রাখবেন। কোনও শ্রমিক কাজ করবেন না।

ডেকো ডিজাইন গ্রুপ লি. এর সুইং অপারেটর শামসুন নাহার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন অপারেটরের বেতন দেয় ৯ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু সরকারি মজুরি কাঠামো অনুযায়ী আমাদের নুন্যতম বেতন ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু মালিক তা দিচ্ছে না। আমরা চাই, ন্যূনতম বেতন ১৬ হাজার টাকা আর বেসিক ১০ হাজার টাকা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেতনের কথা কওয়া যায় না। গার্মেন্টসের ফ্লোর ইনচার্জ যারা আছে, তারা পর্যন্ত খারাপ ভাষায় গালাগালি শুরু করে। পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়-ভীতি দেখায়।’

হামিম গ্রুপের স্যাম্পল সেকশনের অপারেটর কিরন বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেড় বছর ধরে এই গার্মেন্টসে কাজ করি, কিন্তু বেতন বাড়ে না। আমাদের বেতনের বেসিক এখন ৪ হাজার ৫ টাকা। সব মিলিয়ে ৮ হাজার টাকা পাই। এতে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। এদিকে, সরকার শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি করেছে জেনে বাড়িওয়ালারা ৪-৫শ’ টাকা করে ভাড়া বাড়াইছে। আমরা ভাড়া দিয়ে খাবো কী আর জমাবো কী? কিন্তু মালিকপক্ষ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী বেতন দিচ্ছে না।’

গাড়ি ভাঙচুরের ব্যাপারে শ্রমিকদের দাবি, সড়কে তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। তারা গাড়ি ভাঙচুর করেননি। কারা করেছে, তাও তারা জানেন না।

এদিকে পুলিশ বলছে, আশুলিয়া এলাকার প্রায় ২০টি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে নামেন এবং অবরোধের পাশাপাশি তারা বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করেন। পরে শিল্প পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

একটি পোশাক কারখানার সামনে পুলিশ

দুপুরের পরে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, আশুলিয়া জামগড়া এলাকাসহ আশেপাশে থাকা হামিম গ্রুপ লি., ডেকো ডিজাইন গ্রুপ, নেক্স কালেকশন গার্মেন্টস, ডেবুনিয়া গ্রুপ, হলিউড গার্মেন্টসসহ অন্য গার্মেন্টসের সামনে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা রয়েছেন।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) সানা সামিনুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামগড়া এলাকাসহ আশপাশের প্রায় ২০টি কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়কে নেমে অবরোধের পাশাপাশি যানবাহন ভাঙচুর করে। এসময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান নিক্ষেপ করা হয়। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’

 

/এমএ/

x