ভুয়া চাকরিদাতা, পাঁচ টিমে প্রতারণা

রাফসান জানি ১৬:১৪ , এপ্রিল ১৬ , ২০১৯

পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিয়োগের ভুয়া শর্ত

সবুর আলীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। বোনের স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকেন বিমানবন্দর এলাকায়। ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে নিয়োগের চিঠি পেয়েছেন সবুর আলী। চাকরিতে যোগদানের তারিখ ছিল গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। আর এই চাকরি পেতে তিনি ১১ লাখ টাকা দিয়েছেন নড়াইলের শেখ জাকির হোসেনকে। টাকা দিয়ে নিয়োগপত্র হাতে পেলেও চাকরিতে যোগদান করা হয়নি তার। কারণ, তার নামে ইস্যু করা নিয়োগপত্রটি ছিল ভুয়া। যারা তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, তারা সংঘবদ্ধ প্রতারক দলের সদস্য। সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে।

শুধু সবুর আলী নয়, আরও প্রায় ১৬০ জনের সঙ্গে একই ধরনের প্রতারণা করেছে চক্রটি। একেকজনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতারকচক্রের সদস্যরা। সবুর আলী নিজের এবং তার পরিচিত আরও দুজনের চাকরি পেতে এই প্রতারকদের হাতে তুলে দিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা।

এভাবে প্রতারিত হয়ে কয়েকজন চাকরিপ্রত্যাশী বেকার যুবক র‌্যাব-৪ এ অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে সোমবার (১৫ এপ্রিল) প্রতারকচক্রের ১৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গ্রেফতার প্রতারকরা হলো— লিংকন ওরফে মাসুদ ওরফে প্রশান্ত কুমার সাহা, হাসান জিয়া, শাকির আলী শাকিল, জান্নাতুল ফেরদাউস রাসেল, সেলিম সরদার, শেখ জাকির হোসেন, আব্দুল কাদের শরীফ, হুমায়ূন কবীর, খলিলুর রহমান, ইসমাইল হোসেন, রাকিবুল ইসলাম ওরফে সম্রাট, আবুল হোসেন ওরফে সাইমুন, কেরামত হোসেন, রুবেল বিশ্বাস, কামরুজ্জামান এবং সাইফুল ইসলাম।

তারা সংঘবদ্ধভাবে সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে আসছিল। গত আট বছরে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। টার্গেট ব্যক্তিকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্য এই চক্রের সদস্যরা পাঁচটি গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করতো।

সেনাবাহিনীর নামে ভুয়া নিয়োগ পত্র

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির জানান, পত্রিকায় কোনও সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর পরই প্রতারকদের তৎপরতা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করে তাদের প্রমোটর টিম, যাদের দায়িত্ব চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করা। এই গ্রুপের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে। তাদের লক্ষ্য থাকে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষিত বেকারদের টার্গেট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখানো। তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রার্থীদের কাছ থেকে সিভি, শিক্ষাগত যোগ্যতার ফটোকপি, জন্ম সনদ, নাগরিকত্বের সনদ ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি সংগ্রহ করে। এগুলো সংগ্রহের পর চাকরিপ্রার্থীদের বলা হয়— এসব কাগজ ঢাকায় পাঠানো হবে।

এভাবেই ভুক্তভোগী সবুর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল নড়াইলের শেখ জাকির হোসেনের। কোনও একজনের মাধ্যমে জাকির হোসেনের নম্বর পান সবুর। এরপর সেই নম্বরে ফোন করেন এবং প্রাথমিক আলোচনা করেন। এভাবে আলাপচারিতা চলাকালে একদিন কাগজপত্রসহ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচ সংলগ্ন এলাকায় সবুরকে ডাকে জাকির। যাবতীয় কাগজপত্র নেওয়ার পর সবুরকে একটি স্থানে বসিয়ে রেখে ‘ভেতর থেকে আসছি’ বলে জাকির চলে যায়। আবার ফিরে এসে একটি খাতায় সবুরের স্বাক্ষর নেয় জাকির। সবুরকে বলা হয়— এটা পরীক্ষার খাতা, স্বাক্ষর করো, পরীক্ষা হয়ে গেছে। এবার ভাইভা ও মেডিক্যাল পরীক্ষা। এরপরই নিয়োগ হবে বলে সবুরকে জানানো হয়।

এই কথিত লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার কাজটি করে প্রতারক দলের ব্যবস্থাপনা টিম। এই টিম রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বা বড় হোটেলে অবস্থান করে এবং সেখানে চাকরিপ্রত্যাশীদের নিয়ে যাওয়া হয়। তখন যাবতীয় কাগজপত্র পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা না নিয়েই কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করা হয়। এরপর দেওয়া হয় বিভিন্ন শর্ত। এসব শর্তে প্রার্থী রাজি হলে চাকরি হওয়া সাপেক্ষে কত টাকা দিতে হবে, তার একটা চুক্তি হয়। চুক্তির কাজটি ব্যবস্থাপনা টিমের মাধ্যমেই করা হয়।

তৃতীয় ধাপে প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কাজ করে প্রতারকদের ভাইবা টিম। এরা প্রার্থীদের ভাইবা নেওয়ার জন্য অভিনব কৌশল অবলম্বন করে বলে জানান র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির। তিনি বলেন, ‘চাকরিপ্রত্যাশীদের মনে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য সেনাবাহিনীর চাকরির ক্ষেত্রে সেনানিবাসের আশেপাশের এলাকায় সুবিধাজনক স্থানে ডেকে প্রার্থীর নাম-ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ চাকরি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্ন করে ভুয়া মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। একই রকম পদ্ধতিতে তারা ভূমি অফিস, রেলওয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রে সচিবালয়ের আশেপাশে সুবিধাজনক জায়গায় ভুয়া মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে।’

চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির জানান, এরপর চতুর্থ ধাপে করা হয় মেডিক্যাল টেস্ট। বলা হয়, মেডিক্যাল টেস্টে উত্তীর্ণ হতে পারলেই চাকরি নিশ্চিত। এই প্রতারকচক্রের সদস্যরা ঢাকা সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় একটি ভুয়া মেডিক্যাল সেন্টারও স্থাপন করেছিল। সেখানে প্রার্থীদের নিয়ে এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো। ভুয়া এই মেডিক্যাল সেন্টারটি গত সপ্তাহে বন্ধ করে দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

র‌্যাব-৪ এর কর্মকর্তা মেজর কাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গত বুধবার (১০ এপ্রিল) ভুয়া মেডিক্যাল সেন্টারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেন্টারটি মূলত এই প্রতারকদের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।’

প্রতারকদের তৈরি আবেদন ফরম

মেডিক্যাল টেস্টে সবাইকেই উত্তীর্ণ করা হয়। এরপর শেষ ধাপ। এই টিমের নাম হাই অফিসিয়াল টিম। লিখিত পরীক্ষা, ভাইবা ও মেডিক্যাল পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর এই টিম কাজ শুরু করে। হাই অফিসিয়াল টিমের সদস্যরা সেনাবাহিনীর চাকরির ক্ষেত্রে কর্নেল, লে. কর্নেল, মেজর, সহকারী পরিচালক অথবা সহকারী সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। তারা চাকরিপ্রত্যাশীদেরকে মৌখিক ও মেডিক্যাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণসহ নিয়োগপত্র প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং নিয়োগপত্র প্রদান করে। এ সময় চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং মৌলিক প্রশিক্ষণ শুরুর তারিখও উল্লেখ করে দেয় তারা।

নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে এবং চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োগপত্রও দেখানো হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগপত্রটি প্রার্থীর কাছে হস্তান্তর করা হয় না বলে জানান র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির। তিনি বলেন, ‘চাকরিতে যোগদানের ৩-৪ দিন আগে চুক্তি অনুযায়ী টাকাগুলো নিয়ে নেয় প্রতারকরা। নিয়োগের চিঠি যেহেতু আগেই দেখানো হয়, ফলে চাকরিদাতাকে টাকা প্রদানে আর সন্দেহ করেন না প্রার্থীর পরিবারের সদস্যরা। নিয়োগপত্রটি অরিজিন্যাল নিয়োগপত্রের মতো করেই বানানো হয়।’

নিয়োগপত্র সামনাসামনি দেখানো হলেও টাকা নেওয়ার পর প্রতারকরা বলে, নিয়োগপত্রটি যাবে ডাকযোগে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে হাতে হাতেও দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানে অথবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগদান করতে হাজির হয়ে জানতে পারেন, নিয়োগপত্রটি ভুয়া এবং প্রতারিত হয়েছেন বলে তারা নিশ্চিত হন।

ভুক্তভোগী সবুর আলীর নিয়োগপত্রে স্বাক্ষরদাতার নাম লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম এবং তার পদবি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরের সিনিয়র রেকর্ড অফিসার। যদিও বাস্তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে এ নামে কোনও রেকর্ড অফিসারের অস্তিত্ব নেই, পুরো বিষয়টিই ভুয়া।

চাকরিপ্রত্যাশীরা যখন বুঝতে পারেন তারা প্রতারিত হয়েছেন, ততক্ষণে প্রতারকরা তাদের মোবাইলে ব্যবহৃত সিম কার্ড বন্ধ করে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়, জানালেন র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির।

/এপিএইচ/এমএমজে/

x